ক্যাফে গল্পে প্রদীপ দে

রক্তিম অস্তরাগ

তাপ্তির মন আজ খুব ভাল। তরতাজা লাগে তাকে। গরাদের রডের ফাঁক দিয়ে অস্তরাগের আলো তার মুখমন্ডলকে উদ্ভাসিত করে, রোমান্টিক করে তোলে। সিথির সিঁদুরে রক্তিমতা মেখে যায়। অনেক মানসিক জয়ে আজ তার শিয়রে শিরোপা হয়েছে।
ধনীর ঘরের মেয়ে। কি করে যে পাড়ার মস্তানের পাল্লায় তার এত বড় ক্ষতি হবে সে বঝতে পারে নি। কলেজ যাওয়ার পথে টোন টিটকারি শিষের আওয়াজে তার কান ঝালাপালা করে দিত। দু-চারদিন তাপ্তি অবজ্ঞা করেছে। তারপর একদিন রাস্তার মাঝে ওদের গ্রুপের প্রধান মাস্তানকে ধরে ঠাটিয়ে এক‌টা চড় কষিয়ে দেয় ওর গালে। পাড়ার লোকজন জমে যায়। মস্তান সে যাত্রায় পালিয়ে যায়।
তাপ্তির মনে অনেক সাহস। যদিও একটা ক্ষীণ আশংকা তাকে গ্রাস করে – অন্য লোকের কাছে ভুল খবর যাবে এই ভেবে।
আশংকা সত্যি হলো তবে অন্যভাবে। সবে রাত দশটা বাজে টিউশন নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে কয়েকজন মিলে ওকে ঘিরে ধরলো। রাস্তা যে একেবারে নির্জন ছিল তা বলা যাবে না, কিন্তু দুর্ভাগ্য কেউ এগিয়ে এলো না। তাপ্তি খুব চিৎকার চেঁচামেচি করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু সবাই ‘ চাচা আপন প্রান বাঁচা ‘ বলে চেনা মস্তানদের থেকে নিজেদের অচেনা হয়ে থাকতেই চাইলো। ময়দান ফাঁকা হলে তাপ্তি একা একটি মেয়ে লড়াই চালালো পালানোর জন্য। মুখে রুমাল চেপে ধরলো একটা মিষ্টি গন্ধে তাপ্তি অচেতন হয়ে পড়লো।
যখন সচেতন হলো তাপ্তি যন্ত্রনায় কাতরে উঠলো। অনেক কষ্টে চোখ খুললো – দেখলো তার গায়ে কোন বস্ত্র নেই, একেবারে উলঙ্গ হয়ে পড়ে আছে। কোমড়ের নীচের অংশে তীব্র যন্ত্রনার সঙ্গে রক্তক্ষরণে তার নিন্মাংগ ভেসে গেছে। নিমেষে মালুম হলো সে ধর্ষিতা। সব মনে পড়ে গেল। দুচোখ জলে ভরে এল – কিন্তু কিছুই করার ছিল না। নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাটের দোতলায় মস্তানেরা তার শরীর টাকে ছিঁড়েফুঁড়ে দিয়েছে। উঠে বসবার চেষ্টা করলো তাপ্তি। কিন্তু অসফল হয়ে মাথা এলিয়ে দিল -ঘোর কাটিয়ে মস্তান গুলোকে মনে করার চেষ্টা চালালো – মনে পড়েছে ওরা চারজন ছিল।
অচৈতন অবস্থায় ওই পিশাচেরা তার শরীরটাকে নিজেদের মত ব্যবহার করেছে। ভাবতেই তাপ্তি এখন বড় অসহায় বোধ করলো নিজেকে — বেশিক্ষণ বেশিকিছু ভাবার অবকাশ সে পেল না – আবার জ্ঞান হারালো।
যখন পুরোপুরি জ্ঞান এলো দেখলো সে হসপিটালে। সেদিনই তার ছুটি হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে একরাশ লজ্জা আর ঘৃণার আবর্তে সে আবর্তিত হয়ে পড়লো।
আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষায় ছিল। পুলিশ, উকিল ঘুরে কোর্টে। বিভৎস অবর্ণনীয় এক অধ্যায়। একদল শকুন তার শরীরটাকে ছিঁড়েফুঁড়ে ভোগ করেছে আর এরা বিচারের নামে সেই ছেঁড়াফোঁড়া দেহটাকে বিবস্ত্র অবস্থায় পেয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খোঁজার নামে আরও একবার ধর্ষণ করে দিল।
বিচার শেষ হলো। শাগরেদগুলো ধরা পড়লো কিন্তু গুরু বেপাত্তা হয়ে গেল! ওযে ছিল ধনী ঘরের পুত্র এবং ক্ষমতাবান এক মন্ত্রীমহোদয়ের আশীর্বাদধন্য।
তাপ্তি একাকী এক নিজস্ব নির্জনতায় ডুবে গেল।
আশেপাশের সবকিছু যেন হঠাৎই অপরিচিত হয়ে হারিয়ে গেল। জীবন অতর্কিতে থেমে গেল। কিন্তু কার দোষে? এতে তার কি ভুমিকা ছিল? সেতো অন্য মেয়ের মতই বাঁচতে চেয়েছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষীর অভিলাষে।
কিছুদিন কেটে গেল। তাপ্তি ততোদিনে নিজেকে গুছিয়ে নিল। পরিকল্পনার পদ্ধতি নিজেই বার করলো।এক প্রিয় বন্ধু ওর জন্যই অপেক্ষায় ছিল। ওই কাজে নেমে পড়লো, মোবাইলে খবরাখবর নিতে থাকলো।
চরম মূহুর্তে খবর এল। তাপ্তি এইদিনটার, এই সময়েরই জন্য নিজেকে তৈরী করে রেখেছিল, মধ্যরাতে চুপিসারে বাড়ি থেকে বের হল। যে নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাট বাড়িতে তার চরম হেনস্থা হতে হয়েছিল সেখানে পৌঁছে গেল। ইশারায় কাজ হয়ে গেল – মুহুর্তের মধ্যে ধারালো অস্ত্রটি চোখ মুখ বেঁধে পিলারে আটকে রাখা মনুষ্যরূপী জানোয়ারটার পেটে চালিয়ে দিল — আওয়াজ বিহীন অবস্থায় ধর্ষনকারী ছটফট করতে লাগলো –ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এসে তাপ্তির অপরিচ্ছন্ন শরীরটাকে ধুইয়ে দিল। মস্তানের মস্তানি চিরদিনের জন্য থেমে গেল।
রক্তবন্যা বয়ে গেল। তাপ্তি তাতে নিজেকে স্নান করালো। শেষে অবশ হয়ে পড়লো।
যার সাহায্যে এত কিছু হলো সেই সাহায্যকারী নিজের জীবন বিপন্ন করে দিল। বন্ধু এসে বন্ধুর হাত ধরে নিল। তাপ্তি ভয়ে তার একান্ত প্রিয় বন্ধু সাহসকে জড়িয়ে ধরলো। সাহস শান্ত করলো — ভয় নেই আমারা দুজনেই ধরা দেব — জেলে যাবো।
তাপ্তির আজ আর ভয় নেই। সাহস তাপ্তির শরীরের বওয়া রক্ত দিয়েই ওর সিঁথি রঙে রাঙিয়ে দিল।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।