একটা বছর। ২০২০। শুরু। ভালোই ছিল। শীতের সকাল, কুয়াশা। নতুন বছরের আলোরা সংসার পাততে শুরু করেছিল।
খেজুরের গুড়। ছোটুর বাবা এনেছে ওর জন্য। ‘গুড় দে রুটি খাব’। ছোটুর আনন্দ হচ্ছে। ওর বাবা আবার কাজে ফিরে যাবে। বাবা যাওয়ার আগে নিশ্চয়ই মা পায়েস তৈরি করবে। বাবা এলে মায়ের হাতে পায়েসের গন্ধ পাওয়া যায়। ওই গন্ধের আশায় ছোটুর রাতে ঘুম হয়নি কাল।
শ্যামলী স্কুলে যায়। ওর ভালো লাগে যেতে। ক্লাসঘর। দিদিমণি। ওর পাশেই রোজ রিম্পা বসে। নাড়ুদার দোকান থেকে আচার কিনে নিয়ে ফেরে ও। এটা ঝাল আচার। মায়ের তৈরী টক আচার এর থেকে ভালো। মা এখন আর কুলের আচার তৈরি করছে না। বলেছে সরস্বতী ‘পুজোর আগে কুল খেতে নেই’। এবার শ্যামলী সরস্বতী পুজোয় শাড়ি পরবে। হলুদ শাড়ি। রজতকেও বলবে হলুদ পাঞ্জাবি পরতে।
রঞ্জনবাবুর বইয়ের দোকানে আজ চাঁদের হাট। গুনে গুনে দশজন লোক। একই দিনে। কয়েক ঘন্টায়। ওই নীল জামা পরা মেয়েটা বইয়ের গন্ধ শোঁকে। ওকে দেখে মায়ের কথা মনে পড়ে। মায়ের আবার ভাতের গন্ধ খুব পছন্দ ছিল। নীল জামা পরা মেয়েটাকে দেখে নিজের মেয়ের কথা মনে হলো। অসময়ে একটা নতুন জামা পেয়ে ওর মুখটাও এরকম চকচক করবে।
তখনো মৃত্যুদূতের এই গ্রহ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসেনি। অদৃশ্য জীবাণুর মতই শ্যামলী, ছোটু, রঞ্জনবাবুদের দেওয়াল জুড়ে ওঁত পেতে বসেছিল।
এক শান্ত সকাল। গ্রাম, শহর, মফঃস্বল সকলেই আড়মোড়া ভাঙতে। দিন গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে শুরু করেছে। সমস্ত হিসেবরা ইচ্ছের অলি গলি পেরিয়ে মন আর মস্তিষ্কের মাঝের রাস্তা পার হওয়ার চিন্তা করছে। পাগলী বুড়ি রাস্তা পার হচ্ছে। ওর ছেলে জ্বরে কাবু। ওষুধ আনতে যাচ্ছে। মৃত্যুর হাতছানির খবর সবে শুরু হয়েছে। ছেলেটা কিছুই জানেনা। ও ভাবছে শরীরটা ভালো হলে একবার ওপাড়ায় যেতে হবে। এবার পুজোর ঢাকের বায়না করতে! যেতে পারবে তো?
আজ সকালের ক্রিকেট ম্যাচটা মিস হয়ে গেল দিপুর। ওদের কম্প্লেক্স জুড়ে যেন মৃত্যুর অভিঘাত। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দিপু দেখতে পাচ্ছিল। তুই গোলাপী বল। রাজপথ থেকে গলি পেরিয়ে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। আকাশের বুকে নানা রঙের রামধনু-আঁকা চেষ্টা করছে। রং গুলো কি জল রং! সব হারিয়ে যাচ্ছে । নিঃশব্দে একটা দৈত্য গ্রাস করছে। চারিদিক অন্ধকার। অন্ধকারে নাকি ছায়া পড়ে না?
গলির পর গলি নিমেষে পেরিয়ে যাচ্ছে অন্তরা। ওর পা কি তবে শূন্যে রয়েছে? শূন্যই বটে। শূন্যেই তো মিলিয়ে যাচ্ছে সব ইচ্ছেগুলো। এমন হালকা লাগছে কেনো নিজেকে। পায়ের তলায় মাটি নেই বলে? চাকরি। শক্ত ভিত। ‘ছিল’ থেকে ‘নেই’ হয়ে গেল। ‘কোভিড ক্রাইসিস স্টাফ ম্যানেজমেন্ট’। একটি গালভরা নাম দিয়েছে অফিস। নামের তলায় চাপা পড়ে যাচ্ছে অন্তরার দীর্ঘশ্বাস।
দাগটা কিছুতেই উঠছে না। ফিনাইল ডেটল সবরকম জীবানুনাশক ব্যবহার করে ফেলেছে জিনিয়া। তবুও নাছোড়বান্দার মত ব্যবহার করছে। ঠিক জিনিয়ার কপালের কালশিটের মতন। লকডাউন। সমীজিতের বাড়ি থেকে কাজ। বাড়িটা হঠাৎ করেই দমবন্ধ হয়ে উঠলো। পূর্ব দিকের জানালাটা রোজ খুলে দেয় এখন জিনিয়া । মিঠে রোদের গন্ধটা ভালো লাগে ওর। সমীজিতের পারফিউমের মত বোঁটকা গন্ধ নয়। পারফিউমের ওই বোতলটা ছুড়েই তো সেদিন..
একটা লোক। ঘুমোচ্ছে। তক্তপোশে। রোদ এসে পড়েছে তাঁর গায়ে। সোনার মত। ঠিক যেন সোনার ফসল। মাঠে সোনার ফসল ফলায় দানভীর। ওঁর মেয়ে আসবে কদিন পরে। লোকটা স্বপ্ন দেখছে। সন্তানের প্রিয় খাবার সাজিয়ে দিয়েছে থালায়। ঠিক যেন গয়নার মত। স্বপ্নটা ভেঙে গেল। খাবারের পাশে ওরকম কি উড়ে বেড়াচ্ছে? পঙ্গপাল! বিপদ! এই বছর তো ফসল বিক্রির টাকায় বাড়ি সরানোর কথা ছিল দানভীরের। ইচ্ছেগুলো এমন নীলকন্ঠ পাখির মত উড়ে যায় কেন?
ঝড়। টিউলিপ গাছটা দেখছে সূর্যমুখীকে। একটা একটা করে পাপড়ি, পাতা সব ঝরে যাচ্ছে। ও জানে, বেশিক্ষণ টিকে থাকবে না নিজেও। মাটির সন্তান, মাটির বুকেই লুটোপুটি খাবে।
উত্তরাখণ্ড। সবুজ। হলুদ পাখি টা জঙ্গলের চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দক্ষিণ দিকের গাছটাতে ওর বাসা। ছানা গুলোর চোখ ফুটছে। বাসার পাশেই লাল রং। কোন নতুন ফুল গাছ? খেয়াল করেনি হলুদ পাখি? পাখিটার চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছে। উত্তাপে। চারিদিকে যেন কৃষ্ণচূড়ার মতো লাল রঙ ছড়িয়ে পড়ছে। তবে কি সব রঙ আগুনের লকলকে শিখা? পাখিটা মেঘ দেখতে ভালোবাসে। আজ সব ধোঁয়াশা দেখছে।
বছরটায় কি তবে শুধুই মৃত্যুর স্রোত চারিদিকে? স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে নিয়তি? আলোরা কোথায় গিয়ে মুখ লুকালো তবে? অদৃশ্য বীজাণুটা যেন সাক্ষাৎ অন্ধকারের দূত! একটার পর একটা মানুষ গিলে নিচ্ছে। মৃত্যুর ঘরটা বড় জনবহুল হয়ে পড়ছে। ও ঘরে শূন্যের দেখা নেই। তবে কি কোথাও কোনো আলো নেই?
একটা ডাক্তার। হাসপাতালে রোগী দেখছে। ছোটুর বাবা এসেছে। জ্বর সেরে গেছে। লকডাউন। পাখি বাসায় ফিরতে চাইছে। তারপর! অনেকটা রাস্তা। পথে পথে মুক্ত ছড়ানো। ডাক্তারবাবুর গাড়ি। স্টিয়ারিংয়েও সমান দক্ষ ডাক্তারবাবু। ছোটুর বাবাকে বাসায় ফেরাতে হবে যে।
শ্যামলীর জ্বর। রজতের সঙ্গে ফেরার পথে হাওয়া লেগেছে। রজত ফোন ধরছেনা। কাল টেস্টের রিপোর্ট এসেছে। নেগেটিভ। রজতকে বলার জন্যেই ফোন করছিল শ্যামলী… কিন্তু আজকাল রোগটা হলেই সবকিছুতে ভাঙ্গন ধরছে নাকি! শরীর-স্বাস্থ্য, মন। শ্যামলী রিম্পার কাছে যাবে। ওর স্মার্ট ফোন আছে। দুজনে একসঙ্গে অনলাইন ক্লাস করবে কাল থেকে। হাওয়াটা এখনো শ্যামলীর গায়ে লেগে আছে। আত্মবিশ্বাস, আত্মপ্রত্যয়ের হাওয়া।
ছেলে বারবার বলেছে প্রয়োজনে ওর স্মার্টফোনটা ব্যবহার করতে। রঞ্জনবাবু নেয়নি। ছেলেটা কথা শোনে না। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তে ছেড়ে দিল। মনে দাগ না কাটলে নাকি পড়াশোনা হয় না। বাংলা নিয়ে কলেজে ভর্তি হলো। চাকরির চিন্তা, বইয়ের দোকানের দোদুল্যমান অবস্থা সব মিলিয়ে বাবা-ছেলের সম্পর্কে বড়সড় পাথর জমেছে। সেই ছেলেই আজ কলেজে পড়াচ্ছে। পাথরটা তবে রয়ে গেছে। ছেলে নিজেই কাল বাবার বইয়ের দোকানের অ্যাপ চালু করেছে। অনলাইন ক্লাস নেওয়ার ফাঁকে সে পৌঁছে দেবে বাবার পরিশ্রমের ফসলকে। স্নেহের স্বাদ বুঝি এমনই মিষ্টি। এই কঠিন সময়টা না এলে কী বোঝা যেত?
বুড়ির ছেলেটা কোলকাতায় ঢাক বাজাতে এসেছে। যেটুকু পাওয়া যায় আর কি! মায়ের গায়ের শতছিন্ন শাড়িটা এবার বদলে দিতে হবে তো। কোলকাতার আকাশ কোন বছর এমন নীল লাগেনি তো ওর! ঝকঝকে, সুন্দর। ঠিক ওর গাঁয়ের আকাশের মত। এবার বাড়ি ফিরে একটা আমলতাস গাছ লাগাবে ছেলেটা। ওখানে হলুদ পাখিরা বাসা বাঁধবে। যে বাসা কোন ঝড়, আগুনেই পোড়ে না।
স্যাঁতস্যাঁতে মেঝে, নোনা ধরা দেওয়াল। জিনিয়াস নতুন বাড়ির অবস্থা এটাই। তবুও এটা বাড়ি। নামমাত্র আশ্রয় নয়। এই বাড়িটার একটা সোঁদা গন্ধ আছে। সমীজিতের পারফিউমের বোঁটকা গন্ধের মতো নয়। সোঁদা গন্ধে স্বপ্ন বোনার আশায় জিনিয়া। ভাগ্যিস খারাপ সময়টা এল। সাহস দিল জিনিয়াকে, মিথ্যে বেড়া ভাঙ্গার। একটা টিউলিপ, আরেকটা সূর্যমুখীর চারা এনেছে জিনিয়া। জানালার পাশে রাখবে। রোজ জল দেবে। ওদের আদরে জিনিয়ার কপালের কালশিটে দাগ দা এবার নিশ্চয়ই চলে যাবে।
মেয়ের বাড়ির পাশের ফাঁকা জমিতে বসে আছে দানভীর। বাপ-মেয়ে তারা গুনছে একসঙ্গে। মেয়ে প্রথমবার বাবাকে একটা সাদা ফতুয়া কিনে দিয়েছে। নতুন জমিটা কিনতে বাড়িটা গেছে। ওই বাড়ির দাওয়া এখন মহাজনের হিসেবে রক্ষার ঘর। মেয়ে বাপের যেন কিসের বাঁধন জুড়েছে। ভাগ্যিস খারাপ সময়টা এল! এরপরের আলোটা বাপ-মেয়ে একসঙ্গে দেখার অপেক্ষায়।
বছরটা সময়ের অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার নয়। বরং অন্ধকারের অন্ধকূপ থেকে আলোটুকু খুঁজে নেওয়ার। ঝড়, অসুখ গ্রহের ভার বাড়িয়েছে। আতঙ্কেরা দাগ কেটেছে। সব আলোরা পাশাপাশি সংসার করে না। মাঝে অন্ধকারের সাঁকো থাকে। সেই সাঁকো পেরোনোর অপেক্ষা। অপেক্ষার অন্য নাম বুঝি জীবনের জয়গান?