ক্যাফে গদ্যে পায়েল চ্যাটার্জী

বৃষ্টি, রাস্তা এবং….

-একা লাগে তোমার?
-তা মাঝে মাঝে লাগে বৈকি।
-ইস আমিও যদি একা থাকতে পারতাম!
-তোমার একাকীত্ব ভালো লাগে?
-একলা হলে নিজেকে অনুভব করা যায়। একেকদিন তোমায় দেখে কষ্ট হয়। তোমার বুকের উপর দিয়ে হু-হু করে গাড়ি ছুটে চলে। মানুষও তাদের পায়ের শব্দে তোমায় বিব্রত করে। কিন্তু এখন মাঝে মাঝেই শুধু শূন্যতা। তখন ভারী হিংসে হয় তোমায় দেখে।
-আমি মোটেই বিব্রত হই না। পথ যে মানুষেরই সৃষ্টি। সেই পথ মানুষকে না ভালোবেসে থাকতে পারে কখনও? মানুষের সমারোহ আমায় আনন্দ দেয়।
-মানুষকে আমিও ভালোবাসি। কিন্তু ভিড় আমার ভালো লাগেনা।
-আপনজনেদের সঙ্গ কখনই ভিড় নয়। তবে তোমার তো একলা থাকার উপায় নেই।
-জানি, বৃষ্টির ফোঁটা চাইলেও একলা হতে পারে না। ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে আসি পৃথিবীর বুকে। তোমার তপ্ত শরীরকে শান্তি দিই।
-একা এই পৃথিবীর বুকে নেমে এলে পারতে তুমি পৃথিবীকে শান্ত করতে? আমায় স্বস্তি দিতে? তুমি একলা এলে স্নিগ্ধতার স্রোত বইত কি?
-তা হয়তো বইতো না। তবে আমরা সব বৃষ্টির ফোঁটা যখন একসঙ্গে মিলে যাই, নিজের অস্তিত্বই বুঝতে পারিনা।
-তোমরা পৃথিবীর বুকে এমন একসঙ্গে ধরা দাও বলেই সবুজ এখনো মুছে যায়নি। সকলে মিলেই তো আমার ধুলো , ময়লা মুছে দাও। স্বচ্ছ হয়ে যাই আমি।
-তা ঠিক। কিন্তু আমার বড় একলা হতে ইচ্ছে করে। সেদিন ঐ সবুজ পাতায় টুপ করে পড়েছিলাম খানিকক্ষণের জন্য। অনেকক্ষণ নিজের একাকীত্বকে অনুভব করতে পারছিলাম। দুটো ছেলেমেয়ে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমার ভারী ভালো লাগছিল। কিন্তু খানিক পরেই যেইনা মুষলধারে বৃষ্টি এলো, আমি মিলিয়ে গেলাম , সব বৃষ্টির ফোঁটাদের সঙ্গে। স্রোতে ভেসে গেলাম।আমার আর কোনো অস্তিত্বই রইল না।
-তোমার এই কয়েক মুহূর্তের জন্য একলা হওয়া আসলে আকাশ ভাঙ্গা বারিধারার পূর্বাভাস। সেই আশা পৃথিবীর বুকে জাগাবে বলেই তুমি একলা হওয়ার সুযোগটুকু পেয়েছিলে।
-কিছুদিন আগে যেমন তুমি সুযোগ পেয়েছিলে নিঃসঙ্গতা উপভোগ করার?
-রাস্তা কখনোই নিঃসঙ্গতা উপভোগ করতে পারে না। আমার খুব কষ্ট হতো সে সময়। মানুষ নেই, গাড়ি নেই, শব্দ নেই, রোদ, ঝড় , জল স’য়ে আমি যেন জীবন বিমুখ হয়ে পড়ছিলাম। রাস্তা মানেই মানুষ। জনমানবহীন রাস্তা শ্মশানের সমান।
-কোলাহল তোমার এত ভালো লাগে?
-কোলাহল ছাড়া জগত বাঁচবে কেমন করে?
-মানুষ যে তোমার যত্ন করে না, যান-বাহন তোমায় ক্ষতবিক্ষত করে, তোমায় ময়লা করে, দূষণ-ধোঁয়ায় ভরিয়ে দেয়, তোমার কষ্ট হয়না? এসবের পরেও এই ভিড়কে ভালবাসতে তোমার কুণ্ঠা বোধ হয় না?
-মানুষ আমায় ভরিয়ে রাখে, স্মৃতি-সুধায়। মানুষের পায়ের শব্দে কত রকম অনুভূতি লুকিয়ে থাকে জানো! আমি রাজপথ হই বা মেঠো পথ, টুকরো টুকরো স্মৃতির আঁকিবুকি ছড়িয়ে থাকে চারিদিকে। সেসব স্মৃতি চিহ্ন বুকে নিয়ে শুধু অপেক্ষা করি।
-অপেক্ষা? মানুষের?
-জীবনের। স্মৃতির। ওই বাচ্চাটা যখন মায়ের আদরে ধরা দেবে না বলে তার মায়ের হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে, আমি ওর সঙ্গে খিলখিলিয়ে হেসে উঠি। কোন প্রেমিকার অভিমানে বা ছদ্ম রাগে এগিয়ে চলার স্মৃতি ধরে রাখতে ভারী ভালো লাগে আমার।
-তোমার এই ভিড়ের মাঝে দু’দণ্ড একলা হতে ইচ্ছে করে না? ইচ্ছে করে না শান্তিতে জিরিয়ে নিতে? মানুষ তোমার উপর দিয়ে অলক্ষ্যের পিছনে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। ভালো লাগে এসব দেখতে?
-লক্ষ্য-অলক্ষ্যের থেকেও মানুষ বড় আমার কাছে। আমাকে মানুষ যেমন ক্ষতবিক্ষত করে, তেমনি আমার সেই ক্ষততে তপ্ত ওষুধ ঢেলে দেয়। তখন তো একাই পড়ে থাকি আমি। তবে শুধুই অন্তঃসারশূন্য ছোটার সাক্ষী নই আমি। জীবন পথে থেমে যাওয়ার ও তো সাক্ষী। ক্লান্ত পথিক আমার উপরেই জিরিয়ে নেয়। মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাওয়া মানুষের চোখের জল দেখলে ভিড়েও একা হয়ে যাই আমি।
-নিরবিচ্ছিন্ন চলার সাক্ষী তুমি। তবে তোমার মত করে ভাবতে পারলে মন্দ হত না।
-চলমান জীবনের অধিকারী তো তুমিও। মেঘের কোলে জন্মে আকাশের পথ বেয়ে তুমি পৃথিবীর বুকে ঝরে পড়ো।
-তখন আমার ভারী আনন্দ হয়।
-একা ঝরে পড়লে এভাবে আনন্দ উপভোগ করতে পারতে? খানিক বাদেই তো মিলিয়ে যেতে।
-তা হয়তো যেতাম। কিন্তু পৃথিবী হয়তো আমায় মনে রাখত। একটা বৃষ্টির ফোঁটাকে মনে রাখত, মূল্যবান বিন্দুর মতো।
-পৃথিবীর অন্তহীন অস্তিত্বে তোমার ভূমিকাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। একটা বিন্দুর মতো বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়লেও মাটির গন্ধটা পাল্টে যায়।
-পৃথিবী আমাকে মনে রাখে! সহস্র ফোঁটার মিলিত উপন্যাস বৃষ্টিকে মনে রাখে। পৃথিবীর বৃষ্টিকে প্রয়োজন। স্রোতকে প্রয়োজন। সেখানে এক টুকরো ফোঁটার অস্তিত্বের কি মূল্য আছে? তাইতো আমি একলা হতে চাই। একলা ঝরে পড়তে চাই পৃথিবীর বুকে।
-কখনো মরুভূমি দেখেছো? মরুভূমির রুক্ষতাকে জিজ্ঞেস কোরো, এক বিন্দু বৃষ্টির মূল্য । তোমার বিন্দুর মতো পৃথিবীতে নেমে আসা আসলে একটা সম্ভাবনা। আশার খোঁজ।
-আশা? চাহিদা? তাতে আমি নিজেকে অনুভব করতে পারি কই?
-গাড়িটার গায়ে বিন্দু বিন্দু তুমি। তোমার অস্তিত্ব। প্রেমিকার গালে যখন বৃষ্টির ফোঁটা লেগে থাকে, প্রেমিকের মনের অবস্থাটা জিজ্ঞেস করো কখনো। নিজেকে অনুভব করবে তুমি। যে মানুষটা চাতক পাখির মতো তোমার অপেক্ষায় থাকে, তাকে জিজ্ঞেস কোরো একফোঁটা বৃষ্টির মূল্য। কতটা আশ্বাস লুকিয়ে থাকে বৃষ্টির একটা ফোঁটায়, তা জানার চেষ্টা করেছ কখনো?
-আমি তবে অস্তিত্বহীন নই? এক বিন্দু বৃষ্টিও মূল্যবান?
-মুক্তোর মতো দামী। আশা-আকাঙ্ক্ষায় ভরা এক ফোঁটা বৃষ্টি। তুমি যখন এক বিন্দু হয়ে পৃথিবীতে ঝরে পড়ো, মানুষ আশ্বস্ত হয়। সে বিশ্বাস করে, এরপর স্নিগ্ধ বৃষ্টি-ধারায় স্নাত হবে পৃথিবী। এমন অনেকটা বিশ্বাস জুড়ে থাকা এক ফোঁটা বৃষ্টি জীবনের মতোই মূল্যবান।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।