ক্যাফে স্পেশালে পায়েল চ্যাটার্জী

জীবন্মৃত্যু

-পরিচয়?
-আমার পরিচয়? শুনবে নাকি দেখবে?
-দেখবো? কেমন করে? তোমায় দেখা যায় বুঝি? জীবনকে দেখা যায়?
-চাইলেই দেখা যায়! তবে আমায় দেখার মধ্যে অদেখাই থাকে বেশি।
-আসলে তোমার শেষ হলেই আমি আসি। তাই তোমায় আমি কখনো দেখতে পাই না। তবে আমায় কিন্তু দেখা যায়। সৃষ্টির শেষ আমি। তুমি মানে জীবন থেমে গেলে আমি এসে দুয়ার আগলে দাঁড়াই। মৃত্যু। তোমার শেষেই আমার শুরু।
-“তোমার হল শুরু আমার হল সারা, তোমায় আমায় মিলে এমনি বহে ধারা”। তুমি আর আমি মিলে মিশে থাকি। তবু তুমি আমায় দেখতে পাওনা। কিন্তু আমি দেখতে পাই তোমায়।
-জীবন নাকি মৃত্যু দেখতে পায়! এও আবার হয় নাকি! অবিশ্বাস্য! আমরা মিলেমিশে থাকতে পারি না। তোমার অন্তেই আমার আরম্ভ।
-কে বলেছে পারেনা! শোনো তবে?
-গল্প শোনাবে?জীবনের গল্প?
-জীবন ও মৃত্যুর একসঙ্গে পথচলার গল্প!
-তুমি কি বেঁচেও মরে থাকার কথা বলছ? জীবন্মৃতদের গল্প শোনাবে? আষাঢ়ে গল্প নয় তো?
-বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়-শ্রাবণ সব মাসজুড়েই তোমার-আমার এক সঙ্গে পথ চলার কাহিনী। গল্প হলেও সত্যি।
-শোনাও তবে।
-১৯৯৯। মে মাস। কারগিল। ওঁরা সবই খেতে বসেছে। ক্যাপ্টেন তখন গান গাইছে। “সো গ্যায়া আসমা”। ওদিকে উঁচু পাহাড় জুড়ে তোমার হাতছানি। অপেক্ষা। মৃত্যুর অপেক্ষা।
-বাকিটা জানি। অতর্কিত আক্রমণ। ৫২৭ জন সৈন্য। ওরা আমায় ভয় পায়নি। মৃত্যুকে একটুও ভয় পায়নি। যুদ্ধ চলেছিল প্রায় তিন মাস। কিন্তু এখানে তুমি মানে জীবন কোথায়?
-বুঝলে না? আক্রমণ হওয়ার আগে জুনিয়র ছেলেটা গান গাইছিল ক্যাপ্টেন এর সঙ্গে গলা মিলিয়ে। তার আগে প্রেমিকাকে ফোন করেছিল। গান শোনানোর জন্য। “যব কোই বাত বিগড় যায়ে”। আশ্বাস, ভালোবাসা। সব অনুভূতি জুড়ে শুধু আমি ছিলাম। জীবনের স্পর্শ। ছেলেটা জানতো কয়েক মুহুর্ত পরেই হয়তো সব নিভে যেতে পারে। তাও হাসছিল। মৃত্য ওঁদের যখন গ্রাস করল, ওঁর হাসি মুখটায় কি ছিল জানো? জীবন ।আমি। ওঁদের বন্ধ চোখগুলো কি দ্যুতিময় ছিল! জ্বলজ্বল করছিলাম আমি। এরপরও বলবে জীবন-মৃত্যু সরলরেখায় চলে না?
-এটা সরলরেখা হলো কই? সমান্তরাল বলতে পারি।
-তুমি আকাশ দেখেছো?
-সবাই বলে আমার গ্রাসে পড়লে সকলেই নাকি আকাশে চলে যায়।
-সে তো দূরত্ব বোঝানোর জন্য বলে। ‌২০১৬। বায়ুসেনা। পাঠানকোট।আক্রমণ। যাঁরা এক আকাশের মত বিস্তৃত সুরক্ষা দেয় তাঁদের দেহ ছিন্ন-ভিন্ন। এ কে ফরটিসেভেন। গ্রেনেডস আই ই ডি। ওঁদের আকাশজোড়া স্বপ্ন ছিল। ‌ তুমি গ্রাস করলে। মৃত্যু দিল অমরত্বের জীবন। কোথাও কি তুমি আমি এক বিন্দুতে মিলিত হলাম না?
-আচ্ছা মেনে নিলাম। কিন্তু আমি এলে যে তোমার শেষ হয় সেটা অস্বীকার করতে পারো?
-আমি যদি বলি কখনো তোমার আগমনে লুকিয়ে থাকে আমার আরম্ভ!
-সে কেমন?
-২০১৯। ১৪ ই ফেব্রুয়ারি।
-তুমি যাকে ভালোবাসার দিন বল?
-একটা দেশ। একটা ভালো বাসা। শান্তির নীড়। তাহলে প্রতিদিনই হয় ভালোবাসার দিন। বাকিটা শোনো। পুলওয়ামায় কনভয়ে গাড়ির ভিতরে তখন ছেলেটা তাঁর প্রেমিকাকে চিঠি লিখছিল। “ভালোবাসা কারে কয়”। একটা গোলাপ পাঠাবে ভেবেছিল। ছেলেটার হাতে ছিল। তারপর! সুইসাইড-বম্বার। স্বয়ং মৃত্যুদূত। চিঠিটা রক্তে মাখামাখি।
-চিঠিটা নিশ্চয়ই আর প্রেমিকার কাছে পৌঁছয়নি!
-রক্তস্নাত চিঠি আর শুকনো গোলাপ! তোমার মানে মৃত্যুর প্রতীক। জানো চিঠিটা ছিন্নভিন্ন হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়েছিল বিন্দুর মতো। প্রত্যেকটা বিন্দুতে কে ছিল জানো? আমি ছিলাম। জীবন। গোলাপের পাপড়িগুলো ঝরে ঝরে পড়ছিল। একেকটা পাপড়িতেও আমি ছিলাম। অজস্র সুরক্ষিত জীবনের জন্য।
-৪০জন সৈন্যের মৃত্যুতে নিজের সৃষ্টি খুঁজছো তুমি?
-ওই মৃত্যুর মুহূর্তে নিরাপদে কত জীবনের সৃষ্টি হচ্ছিল সেই হিসেব রেখেছো তুমি? ওই নিরাপত্তাই তো আমি। জীবন।
-তোমার অকাট্য যুক্তি।
-জীবনের যুক্তি এমনই অকাট্য হয়। কদিন আগে সকলে স্বাধীনতা উদযাপনে ব্যস্ত ছিল। তোমার বিনিময়ে আমায় পাওয়া। তার উদযাপন। স্বাধীনতার পথ। জীবন-মৃত্যু সেখানেও হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে। তার কদিন পরেই আবার তুমি হানা দিলে। বারামুল্লায়। প্রতিটা মৃত্যুতেই বাসা বেঁধে থাকি আমি। জীবন। অস্বীকার করতে পারো? গালওয়ান উপত্যকার মিষ্টি সকাল। অনেকগুলো জীবনীশক্তির আলো মাখামাখি করে অবস্থান করছিল।
-পরেরটা জানি। যুদ্ধ। অন্ধকার সেই আলোকে মুছে দিল।
-ভুল জানো। দেহ গুলো যখন নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ছিলো, ওই দূরের বাড়ীটায় গরম ভাতের গন্ধ ম’ম’ করছিল। সাদা ধবধবে শিউলি ফুলের মত ভাত বেড়ে দেওয়া হচ্ছিল। এমন মৃত্যুর আলোয় অজস্র জীবন দ্যুতিময় হয়ে ওঠে। যাঁরা রোজ আমার প্রহর গোনে, যাঁদের কাছে তুমি মানে মৃত্যু শুধুই সময়ের অপেক্ষা, হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ জীবন আলোকিত হয়ে চলেছে সেই মৃত্যুদের আয়োজন করা সুরক্ষার ঘেরাটোপে। মহাকালের কোলে এভাবেই জীবন-মৃত্যু মাখামাখি হয়ে থাকে।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!