ক্যাফে স্পেশাল পায়েল চ্যাটার্জী

আলোয় ভরা সোহাগ

ছবি সৌজন্য- লেখিকা…

-কি দেখছ অমন করে?
-তোমায়
-আমায়! আমায় দেখতে পাও?
-দেখতে পাই বলেই তো রোজ আসি এখানে। তুমি পাও না আমায় দেখতে? অবশ্য তুমি কি আর….
-এখন সব দেখতে পাই। সেই সেতু। একই জায়গা, একই সময়। রোজ এখানে এসে অপেক্ষা করো তুমি। ‌ না দেখার কোন উপায় রেখেছো তুমি?
-ওই দূরের বিন্দু বিন্দু আলোগুলোকেও দেখতে পাও তবে?
-আজকাল শুধু দেখিই না, ছুঁতেও পারি ওদের। তারপর আলোয় মাখামাখি করি, নিজেকেও আর তোমাকেও।
-আমাকেও!
-তুমি যখন ওই দিঘীটায় ঢিল ছুড়ে জলের আওয়াজ শোনো, আর তোমার চোখে দিগন্তের আলো এসে পড়ে, ওই আলো আমিই তোমায় মাখিয়ে দিই।
-শুধু আমার চোখে আলো মাখানোর চেষ্টা করো তুমি! আমি চোখদুটো হারিয়েছি বলে, তাই না? কিন্তু আমার মন! নিশ্ছিদ্র অন্ধকার সেখানে। চোখের থেকেও বেশি।
-সব অন্ধকারই তো দূর করতে চেয়েছিলাম। তোমার আঁকা ছবিগুলো এখনো আমার বাড়ির দেওয়ালে। ওগুলো দেখার বড় ইচ্ছে ছিল আমার। আর ছবি আঁকতে পারো না বোধহয়!
– রোজ রঙের ঝাঁপি থেকে রংগুলো হাঁতড়ে বের করি। তারপর সাদা ক্যানভাসে নীল রঙের একখানা আকাশ ঢেলে দিই। তারপর তোমার আগুন রঙের ওই ওড়নাটা আকাশের সাজাবো বলে অপেক্ষা করি। শুধু অপেক্ষাই সার হয়। তোমার চোখের জলে সব রং ধুয়ে যায়।
-ওই যে হলুদ রঙের পাখি, সাদা রঙের জাহাজ, ওদের ছবি আঁকো না আর?
-তোমায় সঙ্গে নিয়ে যে গোলাপি ঘরটার ছবি এঁকেছিলাম, যেটার জানলায় হলুদ পাখিটা বসে থাকতো! সেদিন দেখলাম পাখিটা উড়ে যাচ্ছে। আমি স্পষ্ট দেখলাম, সাদা জাহাজের মাস্তুলএর উপর পাখিটা বসে আছে। আমি সিঁড়ি দিয়ে নামলাম। কিন্তু হাত বাড়াতেই পাখিটা উড়ে গেল। আর খুঁজে পেলাম না।
-সব স্বপ্ন ছিল। ভাগ্যিস সেদিন ওই ছেলে-মেয়েগুলো আশে-পাশে ছিল, নইলে পা পিছলে যেত তোমার।
-হয়তো! জানো আজকাল ক্যানভাসে যাই রং দিই, ধূসর রং ফুটে ওঠে।
-তুমি তো ধূসর রং ভালবাসতে! কত রহস্য লুকিয়ে থাকে নাকি। গূঢ়তার রং ধূসর।
– সেই জন্যেই বোধ হয় আজকাল সব ধূসর দেখতে পাই।
-রেলিংগুলোতে এমন কান পেতে কি শুনছো?
-জলের আওয়াজ। সেদিনের সেই সন্ধ্যেটাতেও এমন শব্দ ছিল জলে।
-সেদিন নৌকায় ভেসে বেড়ানোর সময় মাছেদের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ওরা যেন খিলখিলিয়ে হাসছিল। কি মিষ্টি শব্দ! তারপর রাস্তায় আসতেই ধোঁয়া, গাড়ির হর্ন, কেমন যেন চাপ চাপ অন্ধকারের মতো আওয়াজ। উফ। এত আওয়াজের মাঝে রোজ এখানে কেন আসো!
-এই সবকিছুর মাঝে যে তুমি আছো। এই রেলিং, এই রাস্তা, সেতু সবকিছুতে তোমার গন্ধ লেগে আছে। আমার তো ওই জলের কাছে যেতে খুব ইচ্ছে করে , সেই নৌকাটা খুঁজতে, যেটাতে শেষবার আমরা চড়েছিলাম।
-আর যেও না! আবার যদি সেদিনের মত পা পিছলে যায়, আর আশেপাশে ওই ছেলেমেয়েগুলো না থাকে!
-বাঁচতে কে চায়!
-রংএর জন্য বাঁচবে। আর সেই রঙে মিশে থাকবো আমি। একটা সাদা ক্যানভাস আনবে এখানে? আমি বলব আর তুমি আঁকবে।
-আগে যেরকম তোমার আবদারে ছবি আঁকতাম। তুমি আবদার করতে, আমি রঙের মেলা সাজাতাম।
-ঠিক যেমন এখন আকাশে সোহাগের রঙের মেলা। আমি তো রং চিনতামও না। তুমি চিনিয়েছিল।
-এখন ছবি আঁকলে তোমায় রং চিনিয়ে দিতে হবে… আমি তো আর চিনে নিতে পারব না।
– অনুভব তো করতে পারবে! ঠিক যেমন ঐদিন আমি অনুভব করছিলাম! সেই শেষবার নৌকায় চড়লাম তোমার সঙ্গে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আকাশে মেঘ করেছে, লাল সিঁদুরএর মতো মেঘ, সন্ধ্যে নামছে, ঝালমুড়ি, ঘাটের ধারের মন্দিরের ঘন্টার শব্দ, তোমার আঙ্গুলের গন্ধ, গন্ধ,শব্দ মিলিয়ে সন্ধ্যেটা কেমন যেন মায়াবী ছিল সেদিন।
– এ সব কিছুই দেখার কথা ছিল তোমার। দু’চোখ মেলে। পরের দিনই অপারেশন…সব রং দেখতে পেতে…কিন্তু লরিটা… ওইভাবে যদি না আসতো.. আমার দোষ…
-তুমি রাস্তা পেরনো সময় সেদিন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলে..
-কি গভীর… আমি বিভোর ছিলাম..
-তুমি আগামীর স্বপ্নে বিভোর ছিলে..
-আমি আলোর স্বপ্ন দেখছিলাম.. তোমার দু’চোখ… তারার মধ্যে তারা… তুমি সব দেখতে পাচ্ছ… আকাশ, পাখি, নৌকো , জল, বাড়ি , পৃথিবী… রং… নতুন শহরে আমাদের আস্তানা.. কিন্তু কালো ধোঁয়া.. সব অন্ধকার … তোমায় হারালাম.. চিরদিনের মত..
-শুধু আমায় হারালে… যে চোখ দিয়ে রংয়ের সাযুজ্য অনুভব করে ছবি আঁকতে.. তোমার সেই চোখ ও তো হারালে.. তবু এই পথ চিনে রোজ এখানে আসো…!
-গঙ্গার পাশের এই জায়গাটা তোমার বড় প্রিয় ছিল… এখান থেকে আকাশটা সবচেয়ে সুন্দর লাগতো… এই পথ চেনার জন্য চোখের প্রয়োজন হয়না, অনুভবই যথেষ্ট।
-শুধু ছবি আঁকাটা… মিস করো খুব… তাই না..?
-চোখ হারালে কি মনের দৃষ্টি আরো স্পষ্ট হয়…? মনে মনে কত ছবি আঁকি… তোমার দেওয়া ফুলগুলোর রং, তোমার প্রিয় হলুদ পাখি, সাদা জাহাজ, সব ছবি আঁকি.. মনে মনে.. শুধু শেষে একটা মাকড়সা কালো কালো পা দিয়ে জাল বুনে চলে ছবিগুলোর মধ্যে। সব অন্ধকার হয়ে যায়।
-আমি এই মেঘের দেশে বেশ আছি, তোমায় দেখি, আলো দেখি, সিঁদুর রঙের আকাশ দেখি, আমার ইচ্ছেগুলোকেও দেখতে পাই, শুধু ছুঁতে পারি না কিছুই।
-এবার পাবে!
-কেমন করে?
-আমরা একসঙ্গে দেখব এবার। সব রং, আলো। সবকিছু। হলুদ রঙের পাখিটা দেখতে পাচ্ছি, ডানা ঝাপটাচ্ছে, সাদা রঙের জাহাজে বসে আছে। আর ওই যে আমাদের গোলাপি রঙের ঘরটা। ‌ সব দেখতে পাচ্ছি। জলে সবার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
-কিন্তু তোমার চোখ…
-চোখ দিয়ে দেখছি না.. চোখ বন্ধ… ভিতরে একটা আলো আসছে… আমি জলে নামছি.. জল পা বেয়ে আমায় আঁকড়ে ধরেছে… এই তো গঙ্গার ঘাটের সেই সিঁড়ি.. সেদিনের সব আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি… রাস্তা গাড়ির হর্ন.. লরি.. তুমি.. ওড়না.. রক্ত..আমার চোখ..আস্তে আস্তে সব থেমে যাচ্ছে.. কি শান্তি.. আমি আবার দেখতে পাচ্ছি.. কি সুন্দর সব রং.. ছবি আঁকবো.. জলের নিচে কি আকাশ থাকে.. চাঁদ উঠেছে.. চাঁদের বুকে তারাদের ভিড়ে আমি মিশে যাচ্ছি..আলোয়.. ওপরের ব্রিজ, বিন্দু বিন্দু আলো, সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে… মিলিয়ে যাচ্ছে.. জলের নিচে শুধুই জ্যোৎস্না.. সঙ্গে তুমি আর আমি..
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।