T3 || আমি ও রবীন্দ্রনাথ || সংখ্যায় পায়েল চট্টোপাধ্যায়

গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে’

কবির সব সৃষ্টি সীমাহীন অনন্তের মত। সব সীমানা ছাড়িয়ে স্রোতের মত বয়ে চলে। গহনকুসুমকুঞ্জমাঝে কবিতাটিও সৃষ্টির আকাশে আজো উজ্জ্বল। অমলিন। সেই সৃষ্টি নিয়ে নানা স্মৃতিচারণা করেছেন কবি তাঁর জীবনস্মৃতিতে। কবির জন্মদিনে তাই ফিরে দেখা সেসব-

নিজের জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন

”.. একদিন মধ্যাহ্নে খুব মেঘ করিয়াছে। সেই মেঘলা দিনের ছায়াঘন অবকাশের আনন্দে বাড়ির ভিতরে এক ঘরে খাটের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া একটি স্লেট লইয়া লিখিলাম ‘গহনকুসুমকুঞ্জমাঝে’। লিখিয়া ভারি খুশি হইলাম।”

১২৮৪ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ সংখ্যা ভারতীতে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘ভানুসিংহের পদাবলী’র এটি প্রথম কবিতা। রচনাকালে কবিগুরুর বয়স ছিল ষোল বছর।

১৮৭৫ সালে বাবার সঙ্গে নৌকা ভ্রমণে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিশোরবেলায় প্রবেশ করছেন কবি তখন। তাঁর অন্তরে সব সময় কিছু খোঁজার চেষ্টা। ‘অতি পুরাতন ফোর্ট উইলিয়ামের প্রকাশিত গীতগোবিন্দ’ খুঁজে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এ বইয়ের সবটুকু অর্থ অন্তঃস্থ হয়নি, তবে ছন্দের টানে এই বইয়ের মধ্যে ডুবে গিয়েছিলেন কবি। তাই তাঁর জীবনস্মৃতিতেও স্থান পেয়েছিল এই বই পড়ার স্মৃতি।

”সেই গীতগোবিন্দ খোলা আছে , কতবার পড়িয়াছি তাহা বলিতে পারি না। গদ্যরীতিতে সেই বইখানি ছাপানো ছিল বলিয়া জয়দেবের বিচিত্র ছন্দকে নিজের চেষ্টায় আবিষ্কার করিয়া লইতে হইত, আর সেই যে আমার বড় আনন্দের কাজ ছিল। যেদিন আমি ‘অহহ কলয়ামি বলয়াদি-মণিভূষণং হরিবিরহদহনবহনেন বহুদূষণং’- এই পদটি ঠিকমতো জ্যোতি রাখিয়া পড়িতে পারিলাম, সেদিন কতই খুশি হইয়াছিলাম।”

কবির অন্তরে তখন আনন্দের স্রোত। তিনি এই সমস্ত বইটি একটি খাতায় নকল করে নিয়েছিলেন। টান ছাড়তে পারেননি এই বইয়ের। সুরের মত করেই এই বইয়ের অর্থ কবির অন্তরে বইত। তবে দু’বছর লেগেছিল এই পড়াকে আত্মস্থ করতে। এরপর তিনি অক্ষয় সরকারের প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ পড়েছিলেন।

কবি বিদ্যাপতির মৈথিলী পদ কোন টীকার উপর নির্ভর না করেই পড়তেন। তবে যে শব্দ কবিকে বিব্রত করতো, তার সঙ্গে আরো সখ্য পাতানোর চেষ্টা করতেন। কবি লিখেছেন ‘বিশেষ কোন দুরূহ শব্দ যেখানে যতবার ব্যবহৃত হইয়াছে, সমস্ত আমি একটি ছোট বাঁধানো খাতায় নোট করিয়া রাখিতাম।’

এদিকে সময় বয়ে গেছে। কবির হাতে এসেছে বালক-কবি চ্যাটার্টনের কাহিনী। কবির মধ্যে সৃষ্টির আনন্দ ‘আনন্দধারার’ মত করেই বইছে তখন। কবি লিখেছেন
”চ্যাটার্টন প্রাচীন কবিদের এমন নকল করিয়া কবিতা লিখিয়াছিলেন যে অনেকেই তাহা ধরিতে পারে নাই। অবশেষে ষোলো বছর বয়সে এই হতভাগ্য বালক-কবি আত্মহত্যা করিয়া মরিয়াছিলেন। আপাতত আত্মহত্যার অনাবশ্যক অংশটুকু হাতে রাখিয়া, কোমর বাঁধিয়া দ্বিতীয় চ্যাটার্টন হইবার চেষ্টায় ব্যাপৃত হইলাম।”

কবিতা লেখা তখন প্রায় শেষ। এরপর তিনি গুণীজনদের কাছে নিয়ে যান তাঁর সৃষ্ট এই কবিতা। একজন বলেছিলেন ”এ তো বেশ হইয়াছে।”

এরপর কিশোর কবি জনৈক সাহিত্য বিশেষজ্ঞকেও শুনিয়েছিলেন এই কবিতা। তিনি বলেছিলেন ”এ পুঁথি আমার নিতান্তই চাই। এমন কবিতা বিদ্যাপতি, চন্ডীদাসের হাত দিয়াও বাহির হইতে পারিতো না।”

দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র সুধীন্দ্রনাথের স্ত্রী চারুবালার জ্যাঠামশাই নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায় আধুনিক ভারতীয় গীতিকাব্য বিষয়ে তাঁর গবেষণা গ্রন্থে এই কবিতার সপ্রশংস উল্লেখ করেছিলেন।

নিজের জীবনস্মৃতিতে ‘গহনকুসুমকুঞ্জমাঝে’ কবিতা রচনার স্মৃতি সকৌতুক উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেই সময়কার সাহিত্যের অভিজ্ঞ পাঠকরাও প্রভাবিত হয়েছিলেন কবির এই রচনায়। কোন মধ্যযুগীয় পদকর্তার রচনা ভেবেছিলেন তাঁরা। নিতান্তই সমসাময়িক এক কিশোরের রচনা বলে ধরতে পারেননি তাঁরা।

এবার সুরের পালা। ‘গহনকুসুমকুঞ্জমাঝে’ গানটির সুরকার নিয়ে রয়েছে দ্বন্দ্ব। ‘ভারতী’তে প্রথম প্রকাশের সময়, এই গানে বিহাগড়া রাগের উল্লেখ ছিল বলে প্রশান্ত কুমার পাল ‘রবিজীবনীতে’ লিখেছেন। অর্থাৎ তখনই কবিতাটিতে সুর দেওয়া হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। এদিকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘অশ্রুমতী’ নাটকে মলিনার গান হিসেবে এটি ব্যবহার করেন। সেখানে আবার এটির সুর ঝিঁঝিট বলে উল্লেখ করা আছে। তাই এ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।
তবে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে বিষ্ণুপুরী ঘরানার বেহাগ যা বিহাগড়া হিসেবে পরিচিত, অবরোহণে কোমল নিখাদ সম্বনিত বেহাগের সেই চেহারাটি কবিগুরুর অতি প্রিয় ছিল, তাঁর দেওয়া বহু সুরে এই রাগের ছায়া পড়েছে। তবে সুরারোপ যাঁরই হোক না কেন, এই গানের কথা, সুরের মাধুর্য কবির অন্তরের অন্তঃস্থলের সৌন্দর্যেরই পরিচয় বার্তা।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!