আজ সকাল থেকেই শ্যামপুরের শরৎ কলোনিতে বিরাট শোরগোল।কারণটা হলো সকাল থেকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা এই কলোনিতেই থাকা ছোট্ট মেয়ে মুন্নিকে।আজ সকালে দাদুর সাথে বাজারে যাবে বলে বায়না জুড়েছিল সে।দাদু তপন বাবুও তাই ছোট্ট চার বছরের নাতনিকে নিয়ে বাজারে গিয়েছিল সবজী কিনতে।মুন্নিদের বাড়ী থেকে বাজার খুব বেশি দূর নয়।তপন বাবুর বাজার করা যখন শেষের মুখে হঠাৎই ভিড়ের ভিতর পিছন ফিরে মুন্নিকে সে আর দেখতে পায়না।কোথায় গেলো মুন্নি?সারা বাজার সে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল,একে তাকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো কিন্তু কেউই তাকে মুন্নির খোঁজ দিতে পারলনা।অবশেষে বৃদ্ধ তপন বাবু বাড়ী ফিরে এলেন এই ভেবে যদি মুন্নি বাড়ী চলে এসে থাকে।সব শুনে মুন্নির মা সুমনা হাউহাউ করে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। কলোনির প্রায় বেশিরভাগ লোকজনই ভোর হতে না হতেই কাজে বেরিয়ে যায়।তবু যারা বাড়ীতে ছিল তারা সুমনার বুকফাটা কান্নার আওয়াজে মুন্নিদের বাড়ীতে এসে হাজির হতে থাকে।কি তাজ্জব ব্যাপার!!জলজ্যান্ত মেয়েটা দাদুর কাছ থেকে যাবে কোথায়?কেউ বুঝে উঠতেই পারছেনা।দু চারজন এদিক সেদিক খুঁজতেও লাগলো মুন্নিকে।বাজারেও খোঁজ করতে লাগলো কেউ কেউ।কিন্তু কেউই কোনো খবর দিতে পারছেনা।এমতবস্থায় একজন কলোনিতেই থাকা ব্যক্তি আসছিল মুন্নিদের বাড়ীর পাশের রাস্তা দিয়ে।সে হৈ হট্টগোল শুনে একে তাকে জিজ্ঞাসা করে তার কারণ।তাদেরই একজন বলে মুন্নিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।তখন সেই ব্যক্তি বলে সে মুন্নিকে নাকি রেল লাইনের ওপার এ দেখেছে কলোনিরই ছেলে হাবার সাথে।হাবা কথা বলতে পারেনা।একটু অপ্রকৃতিস্থ।কিন্তু বাচ্চাদের খুব ভালোবাসে। কিন্তু কে বুঝবে সে কথা।সারা পাড়ার লোক রে রে করে ছুটে যায় হাবার বাড়ীর দিকে। বাড়ীতে হাবার মা ছাড়া আর কাউকেই পাওয়া যায়না।হাবার মা বলে হাবা সেই সকালে বেরিয়েছে,এখনও বাড়ী আসেনি ।আর সে যদি মুন্নিকে সাথে নিয়েও কোথাও যায় তবে মুন্নির কোনো ক্ষতি সে করবেনা।কারণ মুন্নিকে সে খুবই ভালবাসে। কিন্তু কে শোনে কার কথা!!!সবাই ছুটলো এবার রেল লাইনের ধারে।এই কলোনির পাশ দিয়ে চলে গেছে রেল লাইন।রেল লাইন এর পাশেই কিছু ঝুপড়ি আছে।সেখানে মুন্নির কিছু বন্ধুও আছে। সেখানে একটু খোঁজাখুঁজি করতেই তারা দেখতে পেলো মুন্নি আর হাবাকে।মাটির উপর পড়ে আছে মুন্নি।হাত পা কেটে রক্ত পড়ছে। হাবা তাকে কোলে তোলার চেষ্টা করছে। আর কোথায় যায়!! মুন্নির মা সুমনা ছুটে গিয়ে মুন্নিকে কোলে তুলে নেয়।বাকি কলোনির ছেলে বুড়ো মহিলা সবাই মিলে হাবার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অকথ্য ভাবে পেটাতে থাকে শুধু এই ভেবে যে হাবা তার বিকৃত রুচির কারণে মুন্নির উপর অত্যাচার করে তাকে রেল লাইনের ধারে ফেলে দিতে চেয়েছিল ।প্রমাণ লোপাট করতেই মুন্নিকে কোলে তুলে ফেলে দিত চলন্ত ট্রেনের সামনে।ফলে এটাই প্রমাণ হতো ট্রেনের ধাক্কায় মুন্নির মৃত্যু হয়েছে। পাড়ার লোকেরা হাবার শীর্ণ শরীরটার উপর নাগাড়ে লাথি,চড় ,ঘুষি মেরেই চলেছে।হাবা মুখে কথা বলতে পারেনা।তাই তার মুখ দিয়ে শুধু একটা গোঙানি বেরিয়ে আসতে লাগলো।
এই বিরাট চিৎকার চেঁচামেচি শুনে পাশের বস্তির লোকেরা ছুটে আসে ঘটনা স্থলে ।তারা তো হাবাকে অমন ভাবে মারছে দেখে অবাক।বস্তির লোকেরা তখন ছোটে তাকে বাঁচাতে।বস্তির এক মহিলা সুমনাকে ঝাঁঝিয়ে বলে উঠে”নিজের মেয়েকে যখন সামলে রাখতেই পারবেনা ওকে বিইয়ে ছিলে কেনো?তোমার ঐ মেয়ে একা রেল লাইন টপকে আমাদের বস্তিতে আসছিল।তখন একটা ট্রেন হর্ন দিতে দিতে এগিয়ে আসছিল জোর গতিতে।ওই হাবা ,নিজের প্রাণ বাজি রেখে তোমার মেয়ে কে বাঁচায়।ছিটকে পড়ে যায় দুজনে।তাতেই হাত পা কেটেছে তোমার মেয়ের।আর তোমরা কিছু না জেনে নিরপরাধ ছেলেটার উপর এমন অত্যাচার করলে গা?”
লজ্জায় মাথা নত হয়ে গেলো সবার।হাবার দুর্বল শরীর কাঁপতে থাকে ভয়ে আর যন্ত্রণায়।ততক্ষণে মুন্নি ঝাঁপিয়ে পড়েছে হাবার বুকের উপর।মুন্নিকে বুকে নিয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে থাকে হাবা।ঠিক তখনই একটা আবার ট্রেন চলে যায় ওদের পাশ দিয়ে দুরন্ত গতিতে।হাবা মুন্নিকে আর একটু বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরে পরম মমতায়।