রন্ধনশালার ইতিহাসে পিয়াংকী (পর্ব – ২)

পাকপ্রণালী

 

শ্রাবণ মাস চলছে,তেরো তারিখ। আজ খুব বৃষ্টি। ঝাঁকে ঝাঁকে অচেনা সব পাখি উড়ে যাচ্ছে আকাশে, রান্না করতে করতে রান্নাঘরেরই জানালা দিয়ে দেখছি। আমার টগর গাছে অগুনতি ফুল। সাদাফুল আর সবুজ পাতার কম্বিনেশনে জলের বিন্দুগুলো যেন মুক্তোর মতো। কোনও জহুরি যেন নিজে হাতে বসিয়েছে এসব একটু একটু করে। বিষয় যখন পাকপ্রণালী তখন প্রকৃতির মাঝে আবারও রান্নায় ফিরি।
রান্নায় অগ্নিসংযোগ নিয়ে কথা বলছিলাম, রান্না হয়ে ওঠার প্রথম স্টেপই হল আগুন,তাপ।

“ভৃজি পাকে ভবেদ্ধাতুর্যস্মাৎ পাচয়তে হ্যসৌ”
(যোগিযাজ্ঞবল্ক্য)
সংস্কৃত ভৃজ ধাতুর অর্থ পাক। এই ভৃজ থেকে ‘ভৃজি’ তার থেকে ভাজা বা ভাজি এসেছে। এমনকি ইংরেজিতে ভাজাকে যে Fry বলা হয় সেটাও এই ভৃজ এর পরিবর্ধিত রূপ। এই ভৃজি থেকে এসেছে ফেরিজি। কিভাবে? সংস্কত থেকে ইংরেজি ভাষায় পরিবর্তনের সময় ‘ভ’ কে ‘ফ’ হিসেবে উচ্চারণ করতে গিয়ে এই ঘটনা ঘটেছে।ফেরিজি থেকে ফেরাই। সেখান থেকে আরও সংক্ষিপ্ত হয়ে ফ্রাই। এমনকি এই ভৃজ ধাতু থেকে ইংরেজি virgin শব্দটিও এসেছে বলে মনে করা হয়।

আগুন থেকে যজ্ঞ,যজ্ঞ থেকে আহার — এই যে পর্যায়ক্রম, একটু গভীর মনোযোগ এবং অনুশীলনের সাথে যদি এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা যায় তাহলে জানা যাবে বেদ পুরাণে বর্ণিত সূক্তগুলো কী অসম্ভব জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণের আখর, খনি বললেও অতিরিক্ত বলা হবে না। প্রাচীন যুগে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি ছিল রাজঋষিদের একমাত্র কাজ। ধীরে ধীরে আগুন সর্বভুক হল। মহর্ষি ভৃগুর সন্তান চ্যবনমুনি জন্মালেন। আয়ুর্বেদবিজ্ঞানে যে চ্যবনপ্রাশ আজ পৃথিবী বিখ্যাত তার সূত্র এই অগ্নি ভৃগু চ্যবন।

“অগ্রং গচ্ছন্তি ভূতানাং যেন ভূতানি নিত্যদা
কর্ম্মস্বিহ বিচিত্রেষ সোগ্রাণী বহ্নির্রুচ্যতে”
(মহাভারত)

হিন্দু বৈদিক যুগে এত যজ্ঞ আর সেই থেকে প্রক্রিয়াজাত হয়ে আহার অবধি — এই যে কাজ তা আজ আর হয় না বা বলা যায় সেই ধৈর্য সময় সদিচ্ছা কারোর মধ্যে তেমন দেখাও যায় না।

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে ফিরি। চলুন ঢুঁ মেরে আসি বাংলার রান্নাঘরে, দেখে আসি প্রথম এবং প্রধান খাদ্য ভাতের রমরমা।

চতুর্দশ শতকের প্রাকৃত পৈঙ্গল’ গ্রন্থে লেখা আছে —
“ওগগরা ভত্তা রম্ভঅ পত্তা গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সজুক্তা
মৌইলি মচ্ছা নলিতা গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা(ই) পুনবন্তা ”

অর্থাৎ, যে রমণী কলাপাতায় গরম ভাত, ঘি, মৌরলা মাছ এবং এবং নলিতা অর্থাৎ পাট শাক পরিবেশন করে স্বামীকে খাওয়ায়, সেই স্বামী পূণ্যবান।
সেই স্বামী পূণ্যবান বা ভাগ্যবান যে হবেন এ তো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আসতে চাইছি ভাতের কথায়। ধরতে চাইছি সেই সময় যখনও ভাতের প্রমাণ রয়েছে এইসমস্ত লেখায়।
ভাতের প্রধান উপকরণ ধান।এই ধান আসলে কোনও গাছ নয়,এক ধরনের ঘাস। পুজো-আচ্চায় আমরা ভাতের বদলে যে ডালিয়া সেদ্ধ করে খাই সেটিও একপ্রকার ঘাস,শ্যামাঘাসের বীজ। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ঘাঁটাঘাঁটি করলে এমন কয়েক হাজার প্রজাতির ধানের উল্লেখ পাব। ভাত তৈরির যে ধান তাও তো প্রায় দশ হাজার বছর আগের কথা। অবিভক্ত ভারতে ৪০০০০ জাতের ধান নাকি চাষ করা হত। ভাবা যায় বলুন তো!

কবি রায়গুণাকার ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যের মানসিংহ পর্বে মা অন্নপূর্ণার রন্ধন সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে নানান রকম ধানের নাম উল্লেখ করেছেন।

“মোটা সরু ধানের তণ্ডুল তরতমে
আশু বোরো আমন রান্ধিলা ক্রমে ক্রমে।।
দলকচু ওলকচু ঘিকলা পাতরা
মেঘহাসা কালামনা রায় পানিভরা।।
কালিন্দি কণকচুর ছায়াচুর পুদি
শুয়া শাহি হার লেবু গুয়াখুরি সুঁদি।।
বিশালি পোয়াল বিড়ো কলামোচা আর
কৈজুরী বাবুরছড়ি চিনা ধলবার।।
দাশুশাহি বাঁশফুল ছিলাট করুচি
কেলাজিরা পদ্মরাজ দুদরাজ লুচি।।
কাঁটাচরাঙ্গী কোঁচাই কপিলভোগ রান্ধে
ধুলে বাঁশ গজাল ইন্দ্রের মন বান্ধে।।
বাজাল মরিচশালী ভুরা বেণাফুল
কাজলা শংকরচিনা চিনি সমতুল।।
মাকু মেটে মসিলোট শিবজটা পরে
দুদপনা গঙ্গাজল মুনিমন হরে।।
সুধা দুধকমল খড়িকামুটি রান্ধে
বিষ্ণুভোগ গন্ধেশ্বরী গন্ধভার কান্ধে।।
রান্ধিয়া পায়রারস রামসে বাঁশ্লমতি
কদমা কুসুমাশালী মনোহর অতি।।
রমা লক্ষ্মী আলতা দানার গুঁড়া রান্ধে
জুতি গন্ধমালতি অমৃতে ফেলে বান্ধে।।
লতামউ প্রভৃতি রাঢ়ের সরু চালু
রসে গন্ধে অমৃত আপনি আলুথালু।।
অন্নদার রন্ধন ভারত কিবা কয়
মৃত হয় অমৃত অমৃত মৃত হয়।।

প্রবাদবাক্যের মতো একটি কথা প্রচলিত আছে বাংলায়,সেটি হল ” ভেতো বাঙালি “। ঠিকই, বাঙালি দেশেই থাকুক বা বিদেশে ভাত ছাড়া তাদের মধ্যাহ্ন ভোজ অসম্পূর্ণ। কিন্তু এই ভাতপ্রীতির কথা বলতে গেলে অবশ্যই বলতে হয় বাংলা ভাষায় লেখা ভারতবর্ষের প্রথম রান্নার বই “পাকপ্রণালী “র কথা যার রচয়িতা বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়। তিঁনি এই বইতে সঠিক পদ্ধতিতে ভাত রান্না করার পর্যায়গুলো বলেছেন।

চাল দেবে যত তত, জল দেবে তার তিন তত
ফুটলে পরে ভাতে কাটি, তারপরে দেবে জ্বালে ভাটি ”
অর্থাৎ যে পাত্র মেপে চাল নেওয়া হবে,সেই পাত্র মেপেই তিনগুণ দিতে হবে জল। ভাত ফুটে যাবার পর আগুনের তাপ একদম কমিয়ে ফেলার জন্য জ্বাল অর্থাৎ আগুনে ভাটি অর্থাৎ ভাটা কমানো উচিত। বাংলার রন্ধনশিল্প এত সমৃদ্ধ যে অবাক হতে হয়। এই সমস্ত বই আজ বাংলাকে গর্বিত করেছে

এবার আসি হাত প্রসঙ্গে আরেকটি তথ্যে। নৈষধচরিত-এ বলা হয়েছে, পরিবেশিত অন্ন থেকে ধূম ধোঁয়া উঠছে,তার প্রত্যেকটি কণা অভগ্ন, একটি থেকে আর একটি বিচ্ছিন্ন, সে অন্ন সুসিদ্ধ সুস্বাদু ও শুভ্রবর্ণ, সরু এবং সৌরভময়। এখানেও ঝরঝরে ভাতের গল্প।

চরকসংহিতার একটি শ্লোক এক্ষেত্রে বলা হয়ত দরকার

” সুধৌত: প্রস্রুত: স্বিন্ন: সন্তপ্তশ্চৌদনোলঘু:
অধৌত : প্রস্রুত: স্বিন্ন: শীতশ্চাপ্যোদনোগুরু:”
অর্থাৎ সুসিদ্ধ অন্ন বা ভাত জল দিয়ে ধুয়ে ফেল গাললে এবং গরম থাকাকালীন আহার করলে তা লঘুপাক হয়। কিন্তু কাচা জল দিয়ে না ধুয়ে ফেন গাললে এবং ভাত ঠান্ডা হয়ে যাবার পর খেলে তা গুরুপাক হবার কারণ । তবে সত্যি বলতে কী এসব শুধু আজ লেখা বইতেই থেকে গেছে। বর্তমান ব্যস্ততার জীবনে এমন কোনও মানুষ নেই যিনি এত পরিপাটি নিখুঁত নিয়ম মেনে খাবার খেতে পারবেন
এর আগে ধানের হরেক নাম দেখেছি এবার চলুন ভাতের রকমফের দেখা যাক।
১৩৬৩ সালে লেখা প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর “আমিষ ও নিরামিষ আহার ” বইতে তিঁনি চাল ধোয়া ভাতবাড়া ফেনগালানো থেকে শুরু করে ভাত সাফ করার বিশেষ উপায় সম্পর্কেও বলে গেছেন।
ভাতের আবার কত রকমফের। আতপ সিদ্ধ তো আছেই সাথে আছে মোটা চালের ভাত, নোনাভাত, চরু,পান্তাভাত,ভেজাভাত, ফেনসা (ফেনা) ভাত, ভাতমণ্ড, হাতাপোড়া সাঁতলানআমানি, ক্ষারণিভাত
থ্যাকারাভাত,এমনকি ভাতমাখাও। পান্তা-ইলিশ হোক বা আসামের পাখাল, পান্তাভাতের দোসর সে নিজেই। মুঘল আমলেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অতিথি অভ্যাগতদের খাবারের মেনুতেও নাকি পান্তাভাত থাকত।

ধান চাল ভাতের গল্প যেন শেষ হবার নয়। বাংলার ব্রত বিশ্বাস লোককথা সবকিছুতেই যেন তার অসীম যাতায়াত।
সদুক্তি কর্ণামৃতের সেই বিখ্যাত শ্লোকবাক্য মনে পড়ে যাচ্ছে —

” শালিচ্ছেদ- সমৃদ্ধ হালিকগ্রহা: সংসৃষ্ট নীলোৎপল
স্নিগ্ধ শ্যাম যব প্ররোহ নিবিড়োব্যাদীর্ঘ সীমোদেরা:।
মোদন্তে পরিবৃত্ত ধেন্বন্ডুহচ্ছাগা: পলালৈনর্বৈ:
সংসক্ত ধ্বনদিক্ষুযন্ত্রমুখরা গ্রাম্য গুড়ামোদিন:।।

বাংলায় লোকের মুখে মুখে একসময় ফিরত কত ছড়া,এমনই একটি ছড়া যেখানে যবন হরিদাস হরিনাম সংকীর্তন করছেন আর লোকজনের মুখে মুখে ছড়াচ্ছে,”যদি ধানে কিছু মূল্য চড়ে /তবে এগুলারে ধরি কিলাইমু ঘাড়ে”,। বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত থেকে এই তথ্য পাওয়া যায় যে, সেসময় জনসাধারণের ভাবনা ছিল হরিনাম প্রচার করলে ধানের মূল্য চড়বে। ভাবা যায়?

ধান। প্রধান খাদ্যশস্যই নয় বাংলার জনজীবনে পয়মন্ত এই ধান জন্মিদিনে বা বিবাহ উপনয়নের মতো শুভকাজে অতিমাত্রায় ব্যবহৃত একটি আবেগ,

আজকের লেখা শেষ করব বাংলার প্রাণের কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার দুটি পংক্তি দিয়ে —

“ওখানে চাঁদের রাতে প্রান্তরে চাষার নাচ হত
ধানের অদ্ভুত রস খেয়ে ফেলে মাঝি বাগদির
ঈশ্বরী মেয়ের সাথে
বিবাহের কিছু আগে – বিবাহের কিছু পরে- সন্তানের জন্মাবার আগে”

১৪ই শ্রাবণ ১৪৩০
রবিবার
রাত ২:৪৪

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।