সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ১৩)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (বিকর্ণ)
বিকর্ণকে আমরা প্রথমবার দেখতে পাই শকুনির বিখ্যাত পাশাখেলায়, অধ্যায় ছেষট্টি। যখন একে একে সব কিছু হারিয়ে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির নিজের ভাইদেরও হারালেন সাথে পঞ্চপান্ডব ভার্যা যাজ্ঞসেনীকেও সবাই টেনে আনলেন, হয়তো তাঁর অপমানের সীমা না আন্দাজ করেই এমনটা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর বিবস্ত্র হওয়ার মুহূর্তে চুপ করে থাকাটাও আশ্চর্যজনক। দ্যুতসভায় আমরা প্রধানত দুটো দল দেখি। পাণ্ডব, হেরে যাওয়া মাথা নিচু করে বসে থাকা পাঁচ ভাই, এবং জিতে যাওয়া শকুনি সমেত কৌরবদের হিংস্র হাসি। এই দুই দলের মাঝে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করছে দুঃশাসন। বয়ঃজ্যেষ্ঠ সমেত সকলেই দেখছে। সে উপভোগ করুক কিংবা না করুক দেখাই যেন প্রধান কাজ। একশ’ কৌরবের মধ্যে নিরানব্বই কেন বললাম? কারণ একজন কৌরব, সারা সভার মধ্যে একজন মানুষ যিনি আদর্শ ও ধর্মের নিরিখে প্রতিবাদ করাটাই প্রয়োজনীয় মনে করেছিলেন। তিনি আর কেউ নন এই অবহেলিত চরিত্র বিকর্ণ। এই প্রসঙ্গে কবি আর্যতীর্থের বিকর্ণ কবিতার কটা লাইন বলতে পারি-
“খল শকুনি দেখছে সবই, বস্তুত সে ধ্বংস চায়,
ঘরের মাটি লাল হয়ে যাক, দেশবিভাগের যন্ত্রণায়।
সুশীল সভায় ঘটছে যখন, রাজঅপরাধ জঘন্য,
ঠিক তখনই তার বিরোধে, চেঁচিয়ে ওঠেন বিকর্ণ।”
ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে কোন কুলবধূকে ভরা সভায় টেনে এনে অপমান করা যে একেবারেই অনৈতিক সে কথা সেদিন বিকর্ণ বলেছিলেন এও বলেছিলেন যে স্ত্রীর ওপর পঞ্চপান্ডবের সমান অধিকার সেই স্ত্রীকে বাকি চার ভাইয়ের অমতে একা কিভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে হিসেবে ব্যবহার করেন যুধিষ্ঠির। অথচ যুধিষ্ঠিরই নাকি ধর্মরাজ। সেদিনের দ্যুতসভায় প্রতিবাদী বিকর্ণের জয়গান হয়েছিল ঠিকই কিন্তু কোন লাভ হয়নি। উল্টে দুর্যোধন তাঁর কথাকে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়ে ‘বালকোচিত’ আখ্যা দেন। উপরি পাওনা হিসেবে কর্ণও বিকর্ণকে যথেচ্ছ অপমান করেন। সেদিনের সভায় বিকর্ণ ধর্ম ত্যাগ করেননি সভা ত্যাগ করে চলে গেছিলেন। প্রশ্ন থেকেই যায়, ধর্মরাজ আসলে কে?
এই ঘটনা ঘটার পর আমরা বিকর্ণকে সেভাবে আর দেখতে পাই না। তাঁর আবির্ভাব ঘটে যুদ্ধের তেরো দিনের দিন৷ একশ’ কৌরব কে মারার সংকল্পে ভীম তখন প্রায় সাফল্যের পথে। আর কৌরবরা ক্রমশ শেষের দিকে, কুরুক্ষেত্র তখন শ্মশানভূমি, রক্তের বন্যা বইছে, গান্ধারীর খোল ক্রমশ খালি হচ্ছে। এ-দিন জয়দ্রথকে মারার জন্য অর্জুন এগিয়ে যায়, তাঁকে সঙ্গ দেয় ভীম। এমন সময় হঠাৎই দুর্যোধন বিকর্ণকে পাঠান ভীমকে মেরে ফেলার জন্য। বিকর্ণ আর ভীম মুখোমুখি। ভীমের বিবেক বলে বিকর্ণকে মারা যায় না, সেকথা সে অকপটে মনেও করিয়ে দেয়। “তুমি একমাত্র কৌরব যে জানো ধর্ম কী। তুমি সরে দাঁড়াও আমি তোমায় বধ করতে চাই না। তুমি একমাত্র যে সেই সভায় দুর্যোধনের প্রতিবাদ করেছিলে।” বিকর্ণ পিছিয়ে যাওয়ার মানুষ নন, ভীমকে স্পষ্ট জানান, “আজ আমার সরে যাওয়াটা অধর্ম হবে, আমি জানি কৌরবদের এই যুদ্ধে জয়লাভ কোনদিনই হবে না যেহেতু বাসুদেব কৃষ্ণ পাণ্ডব পক্ষে আছেন, কিন্তু আমি আমার সকল ভাই এবং জ্যেষ্ঠ্য ভাই দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করতে পারবো না। আমি ধার্মিক কিন্তু বিভীষণ নই। আমাকে যুদ্ধ করতেই হবে।” তিনি আরও বলেন, “সেই সভাস্থলে আমার যা কর্তব্য ছিল আমি করেছি কিন্তু এখন আমার কর্তব্য ভাইদের রক্ষা করা। তাই এসো আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব করো বৃকোদর ভীম।” এ কথা শোনার পর ভীম ও বিকর্নের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। কখনো বিকর্ণ এগিয়ে থাকে তো কখনো ভীম। বিকর্ণ মহান ধনুর্ধর হলেও গদাযুদ্ধে সেরকম পারদর্শিতা তার ছিল না। তাই ভীম এর কাছে গদাযুদ্ধে শেষমেষ পরাজিত হয় এবং প্রাণ ত্যাগ করে।
কথায় বলে Everything is fair in love and war. বিকর্ণ এখানে কোন ছলচাতুরি অবলম্বন করতেই পারতেন, কিংবা নিজের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে গেলেও যেতে পারতেন। কারণ তাঁর আদর্শের সাথে বাকি কৌরবদের আদর্শ কোনদিনই মিলেনি। কিন্তু কোথাও কোনোভাবেই বিকর্ণ অধর্মের পথ অবলম্বন করেননি৷ মহাভারতের চরিত্র গুলির মধ্যে ধর্মপ্রাণ বলে আমরা যাকে চিনি এই যুধিষ্ঠির রণকৌশল হেতু বলেছিলেন ‘অশ্বত্থামা রণে হত ইতি গজ’। সেই সত্যবাদী কে পথ ধরতে হয়েছিল। আবার যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ হচ্ছিল কখনো নীরব থেকে তার স্বামী যুধিষ্ঠির সহ বাকি চার ভাই প্রমাণ করছিলেন নারী মানেই ভোগ্যবস্তু। নিজের স্ত্রীর প্রতি সম্মান তিনি দেখাতে পারেননি। এত ধর্মপ্রাণ তবুও এটুকু বোঝেননি যে দুর্যোধনের হাতে গেলে দ্রৌপদীর ঠিক কতটা অপমান হতে পারে? নিতান্তই কি নাবালক যিনি পাশাখেলায় সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি হারিয়ে ভাইকে পণ হিসেবে ব্যবহার করলেন এবং নিজের স্ত্রীকেও৷ তিনি যে পাশাখেলায় পটু নন একথা তার সব থেকে বেশি জানা জরুরী ছিল। মানছি কৌরবদের প্রতি তার ভাতৃস্নেহ ছিল, কিন্তু ভাতৃস্নেহের কারণে নিজের স্ত্রীকে পণ হিসেবে ব্যবহার করায় কোন আদর্শ আমি দেখতে পাই না। আবার কর্ণ কে যেখানে মহাদানী বলা হয় সেখানেও কর্ণের চরিত্রের নানান দিক বিচার করে আমার বারবারই মনে হয়েছে বিকর্ণের কাছে এঁরাও যেন ফিকে হয়ে যায়।
একশ’ কৌরবের মধ্যে একমাত্র বিকর্ণ যিনি জানতেন পান্ডবদের হাত যেখানে শ্রীকৃষ্ণ ধরে আছে সেখানে কৌরবদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তবু প্রাণের ভয় তিনি করেননি। ধর্ম ছেড়ে কাপুরুষের মতো পালিয়ে যায়নি। ভাইদের পাশে থেকেছেন কারণ সেটাই তার ধর্ম ছিল। কৌরব পক্ষের একলা হয়েও তিনি অনন্য। একলা হয়েও তার বিবেক বোধ, ও চেতনার প্রতীক হিসেবে একশ’ জনের অন্যতম একজন। আজও এই দেশের দ্রৌপদীদের আমরা দেখতে পাই। যৌন নিগ্রহের কতই নিষ্ঠুরতা প্রকাশ্যে আসে। সেই নারীদের চিৎকার, রাগ, ইত্যাদির জন্য শক্তি যোগাতে এখনো বিকর্ণের প্রয়োজন হয়। তাই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে হলেও বিকরণের এই নক্ষত্রখচিত চরিত্রটি আমরা যেন সর্বদাই মনে রাখি। মহাভারতে ধর্মপ্রাণ হিসেবে যুধিষ্ঠির পূজিত হলে পাশাপাশি যেন বিকর্ণও সম্মানিত হয়।