গারো পাহাড়ের গদ্যে নীলম সামন্ত

বাউল গাছ
দৃশ্যটা খুব সহজ। হাইওয়ের পাশে একটা গাছ উপড়ে পড়ে আছে। খুব সাধারণ একটা গাছ৷ আঁকা শেখার শুরুর দিকে বাচ্চারা আঁকে৷ কিংবা পার্টস অফ ট্রি বোঝানোর ক্লাসে বোর্ডে আঁকা হয়। শেকড়ের কিছু মাটি ছড়িয়ে পড়েছে রাস্তার দিকে। শরীরটা শুয়ে আছে জমির ওপর৷ কিছুদিন আগেই ফসল কাটা হয়েছে৷ সম্ভবত গম।
গমের ভেতর অন্যরকম আগুন থাকে৷ গম খামারে উঠে যাবার পরেও পড়ে থাকে মাঠ জুড়ে৷ সে আগুনে গাছ পুড়ছেনা ঠিক কথা। পুড়ছে বিনা পদবির জোনাকি সহ ঘোর অমাবস্যা।
এরকম মধ্যরাতে ফুলছাপের ওড়না মাথায় দাঁড়িয়েছিলাম বেশ কিছুক্ষণ। মনে মনে স্কেচবুকে টান দিলাম জলরঙ। যেখানে গাছের ওপর জোনাকির জায়গায় ছড়িয়েছি অজানা নক্ষত্র। কেউ মৃত। কেউ জীবিত। মাথার দিকে যত্ন করে রেখে দিয়েছি প্রাচীন পাতকুয়া৷ স্বচ্ছ জল৷ হাঁটু পর্যন্ত ধুতি ও মাথায় বিরাট পাগড়ি নিয়ে তেষ্টা মেটাতে বসেছে গ্রামের মুখিয়া সমেত গোটা চারজন। ছবিতে লোকগুলোর মুখে রাজকীয় গোফ। সাথে গম ও আঁখের গন্ধ৷ এই গ্রাম পুরুষতান্ত্রিক৷ তাই মেয়েরা বাস করে পাশের গ্রামে। যেখানে সম্পর্ক স্থাপনের নাম করে পুরুষরা যায়। হাতে থাকে মিষ্টির প্যাকেট ও রাইটিং প্যাড।
আমি চাইছি এই গ্রামে খুব সাধারণ অথচ বড় বড় পাতা সমেত গাছ থাকুক। প্রতিটি রাস্তার মোড়ে। কিংবা গোয়ালঘরের পাশে৷ ভোরবেলায় গরু ডাকুক কিংবা মুরগী, সবার শৈশব একে একে উড়ে যাবে কাগজের উড়োজাহাজে। তারপর আমি আপনি বা আমাদের মত আরও কিছু জন আস্তে আস্তে নেমে যাবে নিজেদের গভীরে। অনেকটা গভীরে, যেখানে জমা আছে বাতাসের সর, স্নানঘাট। যেখানে আলো অন্ধকারের তফাত পারস্পরিক প্রতিবিম্ব।
এই সমস্ত ছবি কোন এক্সিবিশনের জন্য নয়। মরা গাছ কিংবা ছেঁড়া আগুনের হাহাকার জমানোর চেষ্টা মাত্র। গাছের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নক্ষত্রগুলো আমারই পোষা৷ ইচ্ছে মত তুলে ঢুকিয়ে দিই মানুষের মজ্জায়। যেখানে রয়েছে অভিধানের অন্তর্বাস। রোজ ঘুমোতে গিয়ে মনে করি পূর্বপুরুষ গাছের মত ছিলেন তাঁদের মৃত্যুর পর কান্নাকাটি করা মানুষেরদল বৃহত্তর সংসারের ঢাল কিংবা ভাঙা লক্ষ্মী-ভাণ্ডার৷ চাইলেই বৃষ্টি নামিয়ে আনে মাঠের পর মাঠে। ফসল নয়, মানুষ নয় সমস্ত পারমুটেশন কম্বিনেশনের নিয়ম ভেঙে জন্ম নেয় খয়েরি হাঁস সাথে অসংখ্য বিমর্ষ দৃশ্য।