T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় নীলম সামন্ত

ঘুড়ি ঘিরে রকমারি ঘুড়ি

বিশ্বকর্মা পূজো যে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব সে কথা জানতে বয়স হয়ে গেছিল আঠেরো! মেদিনীপুরে এসবের চল থাকলেও আমাদের গ্রামের বাড়িতে বিশ্বকর্মা পূজো মানে যন্ত্রপাতি গাড়ি ঘোড়া ইত্যাদি পূজো৷ আর আমাদের বাড়িতে বাবার দোকান পূজো৷ আমাদের কাছে ঘুড়ি মানে শীতকাল৷ দোকান থেকে কেনা ঘুড়ি নয়। খবরের কাগজ কেটে বানানো৷ যার একটা বিরাট ল্যাজ থাকত। মাঞ্জা কি জানতাম না৷ বোকাভাঁড় থেকে পয়সা বার করে নাইলন সুতো কিনে আনতাম৷ আর যার যার ঘুড়ি কেটে যেত তার সুতো জুড়ে নিতাম৷ আহা! কী রঙিন সেসব দিন৷ অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটার পর ফাঁকা মাঠের আলে দাঁড়িয়ে চলত ঘুড়ি ওড়ানো। উৎসব টুৎসব বলে কিছু ছিল না। স্রেফ মজা আর কমপিটিশন। অন্যের ঘুড়ি কেটে দেব কিংবা ওর থেকে বেশি উঁচুতে ওড়াবো৷ আজ লিখতে বসে ভাবছি এভাবেই আমরা না জেনে না বুঝেই কমপিটিশনে নেমে পড়ি। এর থেকে এগিয়ে যাওয়া ওকে টপকে যাওয়া। নিজের পারাগুলো নিয়ে তুল্যমূল্য বিচার করে নিজের উচ্চতা মেপে নেওয়া৷ খেলাই যে কখন মানুষের বিকাশের দিক বদল করে দেয় সে কথা একজন মনোবিজ্ঞানীই ভালো বলতে পারেন৷

যাইহোক ঘুড়ি যে উৎসব সে কথা জেনেছিলাম হাম দিল দে চুকে সনম সিনেমা দেখে৷ ওই যে গানটা, “কাই পো ছে… ঢিল দে ঢিল দে দে রে ভাইয়া” মকর সংক্রান্তির বিকেলের উৎসব৷ শীতকালে ভালো উত্তুরে বাতাস বয় সে কারণেই বোধহয় ঘুড়ি ওড়ানোর গল্পগুলো শীতকালে বেশি। আমি জানিনা আমাদের বাংলায় কেন বিশ্বকর্মাপূজোর দিন ঘুড়ি ওড়ানো হয়৷ মকরের উৎসব আমি নিজেও দেখেছি দীর্ঘ ন’বছর প্রবাসে থাকাকালীন। আর কলকাতায় হোস্টেলে থাকতে বিশ্বকর্মাপূজোর ঘুড়ি উৎসব৷ আমার জানালার সামনের বাড়িতে দুই ভাই তার বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে ঘুড়ি ওড়াতো। হোস্টেল থেকে নাম দেওয়া হয়েছিল হ্যাবলাদা আর ক্যাবলাদা৷ তিন বছ দেখেছি প্রতিবার হ্যাবলাদা জিতে যেত আর তারপর ক্যাবলাদাকে জেতাতে লেগে পড়ত৷ ভাই ভাই সম্পর্কের টান৷ সন্ধেবেলায় রাস্তায় বেরোলে দেখতাম রংবেরঙের ঘুড়ি পড়ে আছে নিজেদের মতো। কেউ ছিঁড়ে গেছে। কেউ আবার সুতো কাটা অবস্থায় গাছে ঝুলছে৷ প্রয়োজন ফুরোলে মানুষই মানুষের খোঁজ রাখে না ঘুড়ির কি করে খোঁজ করবে?

এরপর আবার সিনেমায় ঘুড়ি উৎসব তবে তা বিশ্বকর্মাপূজো উপলক্ষেই৷ সিনেমার নাম জাপানিজ ওয়াইফ৷ আমার দেখা শ্রেষ্ঠ প্রেম শ্রেষ্ঠ সম্পর্কের সিনেমা। বাংলা ভাষায় এতো উচ্চমানের সিনেমা হয় আজকাল অন্য ভাষার সিনেমা দেখতেই মন চায় না৷ উফফ রাহুল বোসের সে কী দুর্দান্ত অভিনয়। প্রেম যে সব সময় সঙ্গে থাকা সারাদিন কথা বলার ওপর নির্ভর করে না এই সিনেমায় বুঝেছিলাম। একজন জাপানিজ আর একজন সুন্দরবনের ভেতো বাঙালি। দুজনেই ডিকসনারি দেখে শব্দ খুঁজে চিঠি লিখছে৷ উফফ কি মধুর প্রেম। তা এমন প্রেমে ঘুড়ি এলো কি করে? এলো৷ স্নেহময়কে তাকাকু পাঠিয়ে ছিল৷ বিশাল একখানা বাক্স ভরে বিশাল আকারের ঘুড়ি সব। নানান ক্যারেকটারের গঠনে। কোনটা পাখি কোনটা ড্রাগন কোনটা প্রজাপতি৷ স্নেহময়ের ভাইপো বলত জাপানি কাকির জাপানি ঘুড়ি৷ সত্যি বলতে কি অমন ঘুড়ি যে হয় সিনেমাটা না দেখলে জানতামই না৷ তবে সিনেমায় জানা হলেও দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেই সময়টাতে আমার সিঙ্গাপুরে বাস৷ সপ্তাহান্তে আমরা বাঙালি পরিবাররা সবাই মিলে কোস্টাল এরিয়ায় ঘুরতে যেতাম। সেখানে দেখেছি ওই রকম বিশালাকার ঘুড়ি। যার নানান অংশ খোলা। বাচ্চাদের বাবা মায়েরা জুড়ে জুড়ে বড় বড় ঘুড়ি বানিয়ে দিচ্ছেন আর কোস্টাল এরিয়ার বাতাসে তা আকাশ ভরে উড়ে বেড়াচ্ছে৷ হাঁ করে দেখতাম সেই অপূর্ব দৃশ্য। কোন ভাবেই মাপ পেতাম না৷ আজ মনে হয় নিজে হাতে ওড়ালে আনন্দটা দ্বিগুণ হতে পারত।

ওই দ্বিগুণ চতুর্গুণ আনন্দের সাথে আমরাও আকাশে ঘুরে নিতাম। এরোপ্লেনের ঠিক নিচ দিয়ে। যেভাবে আজও জানালা থেকে দেখি একটা পাখি দুটো পাখি দলবদ্ধ পাখি উড়ে বেড়ায় আর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় এয়ার এসিয়া৷ পেটে তার ভর্তি মানুষ৷

হাজার ঘুড়ি ওড়ালেও মানুষ কখনও ঘুড়ির মতো উড়তে পারে না৷ তবে অন্যের আনন্দের উপাদান হয় আর তাদের আনন্দ ফুরিয়ে গেলে ঘুড়ির মতো সুতো কাটা হয়ে কিংবা ছেঁড়া ফাটা অবস্থায় এক রাশ অবহেলা কুড়িয়ে যে যার নিজ রূপে পড়ে থাকে এদিক ওদিক৷ এখন মনে হয় ঘুড়িও নিজের অজান্তে মানুষেরই কথা বলে৷

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।