সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ২৬)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (জয়দ্রথ)

বাঙালির ঘরে ঘরে একটি প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে,’ জন জামাই ভাগ্না/ তিন নয় আপনা’। এই কথাটা কেন বললাম?

মহাভারতের কেন্দ্রবিন্দু রাজ্য হস্তিনাপুরের একমাত্র জামাই, ধৃতরাষ্ট্র এবং পান্ডুর একশ’এক কৌরব এবং পাঁচ পাণ্ডব মিলিয়ে একশ’ছয় ভাইয়ের পর সবচেয়ে কনিষ্ঠা ভগিনী দুঃশলার স্বামী, জয়দ্রথ। মহাভারতে বর্ণিত সিন্ধু রাজ্যের রাজা বৃদ্ধাক্ষত্র’র একমাত্র পুত্র হলেন জয়দ্রথ,যিনি খুব অল্প বয়সেই সিন্ধু প্রদেশের রাজ সিংহাসনের অধিকারী হয়েছিলেন। তবে রাজা হলেই যে সে মহান হবে বা তার চিন্তাভাবনায় উন্নত সমাজ ও সভ্যতা গড়ে উঠবে এমনটা বোধহয় সব সময় হয় না। মানুষের মধ্যেই তো দেবতা ও অসুর দুই থাকে যার চিন্তাভাবনা যেদিকে বয়ে যায় তার কর্মকাণ্ডও সেরকমই হয়ে থাকে।

কোন অপরাধী যখন অপরাধ করে তখন সে কিন্তু কাজটা কে অপরাধমূলকভাবে ব্যাখ্যা করে করে না। তার দৃষ্টিভঙ্গিতে সেটাই ঠিক মনে হয় তাই করে। হয়তো তার লোভ পূরণের জন্য কিংবা প্রতিশোধ স্পৃহার জন্য কিংবা কাম ক্রোধ ইত্যাদির ওপর বশবর্তী হয়ে করে। তবে তার বোধ বা বুদ্ধি নেই এ চিন্তা ভাবনা একেবারেই সঠিক নয়। হয়তো তার বোধ সমাজের অনুকূল দৃষ্টিভঙ্গিতে সামাজিক নয়। হয়তো তার কাজগুলো সামাজিকভাবে নৈতিক নয়। তাও বলবো, একটি বুদ্ধিদীপ্ত মানুষই কিন্তু প্রতিনায়কের ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত হলেই যে প্রতিনায়ক হবে এমন না। একটি অসংগঠিত শুভশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য কোন সংগঠিত অশুভশক্তি একা থাকে না। তার পাশে থাকার জন্য আরও বেশ কিছু মাথা থাকে। যারা জোটবদ্ধ হয়ে শক্তি বৃদ্ধি করে। মহাভারতে আমরা এরকম ধরনেরই অনেক মাথা দেখতে পাই। যেমন কৌরবদের পক্ষে যে সমস্ত রাজারা যোগদান করে গৌরবদের শক্তি বৃদ্ধি করেছিল তারা প্রত্যেকেই কোন না কোন রাজ্যের শক্তিশালী রাজা। শুধু যুদ্ধই নয়, গোড়া উপর দুর্যোধনের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কেউ না কেউ ছিলেন। যদি আমরা পাশা খেলার কথা ধরে নেই, দূর্যোধন কিন্তু নিজে সরাসরি পাশা খেলেনি পান্ডবদের হারিয়ে যাওয়ার জন্য। খেলেছিলেন শকুনি। আবার সেই সভায় দূর্যোধনকে মানসিক বল বৃদ্ধির জন্য নানান রাজ্যের রাজা ছিলেন। আবার এও দেখি মতান্তর থাকা সত্ত্বেও তাদের পারিপার্শ্বিক বয়ঃজ্যেষ্ঠরাও ছিলেন। হয়তো মৌখিক কোন প্রতিবাদ করেনি বা পক্ষপাতও করেননি কিন্তু উপস্থিত থেকে দেখিয়ে দিয়েছেন কৌরব ও পান্ডবদের মধ্যে কার পাল্লা ভারী। কৌরবদের দলে এমনই একজন পাল্লা ভারী করার রাজা যাকে প্রত্যক্ষ সহচর না বলেও হৃষ্টপুষ্ট সমর্থক বলা চলে তিনি হলেন হলেন সিন্ধুদের রাজা জয়দ্রথ- হস্তিনাপুরের একমাত্র কন্যা দুঃশলার স্বামী।

সিন্ধুদের বললাম এই কারণে, সিন্ধু দেশে যারা থাকতেন তারাই সিন্ধু বা সৈন্ধব। প্রাচীন ভারতবর্ষের সিন্দুদের অবস্থান বলতে যে অঞ্চলটুকু সিন্ধু নদীর জলে পরিপুষ্ট। বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্দ অঞ্চলটিকে বলা যায় সে যুগের সিন্ধু রাজ্য। ভৌগোলিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নিম্ন সিন্ধু উপত্যকাটি মুলতান শহর থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল যা বর্তমানের সম্পূর্ণ ‘বালুচিস্তান’কে নিয়ে মূলতান থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল। মহাভারতে এই অঞ্চলটিকে সিন্ধু-সৌবীর অঞ্চল বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জয়দ্রথ ছিলেন এই নিম্ন সিন্ধু-সৌবীর রাজা৷ তার রাজনৈতিক শক্তি কিংবা নিজস্ব শক্তি ও মাহাত্ম্যের বিচারে তিনি কখনোই মহাভারতের প্রধান কোনো চরিত্র কিংবা প্রতিনায়েকের ভূমিকায় বসবেন এমনটা নয়। যে কারণেই তিনি একটি সামান্য পার্শ্ব চরিত্র। অথচ সময় বুঝে, মানুষ বুঝে প্রধান প্রতিনায়কের সাথে থেকে তার অভীষ্ট বিষয়গুলোকে পরিনতি দেওয়াও কর্তব্য হিসেবে কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন।

দ্রোনপর্বে বলা হয়েছে তিনি পরোক্ষভাবে জাম্বের পুনর্জন্ম। আর এইজন্মের পরিচয়টুকু তো আগেই দিলাম। হস্তিনাপুরের একমাত্র রাজকন্যা দুঃশলার সাথে তাঁর বিবাহের হেতু খুব একটা বিস্তৃতভাবে ব্যাসদেব বর্ণনা না করলেও একথা স্পষ্ট, সিন্ধু প্রদেশের সাথে সখ্যতা বজায় রাখা। আসলে তৎকালীন সমাজে রাজবাড়ীর ছেলেমেয়েদের বিবাহগুলো এরকমই হয়ে থাকতো। তবে একমাত্র রাজকন্যার স্বামী হিসেবে জয়দ্রথ যে স্বভাব চরিত্রও খুব ভাল ছিল তা কিন্তু নয়। কারণ সে যুগের বহুবিবাহের প্রচলন থাকা সত্ত্বেও জয়দ্রথের কামুক মনের পরিচয় আমরা পেয়ে থাকি।

পাঞ্চাল কন্যা দ্রৌপদীর যখন স্বয়ংবর সভা হয় তখন তিনি সেখানেও উপস্থিত ছিলেন। দ্রুপদ কুমার ধৃষ্টদ্যুম্ন এক এক করে সমস্ত রাজার পরিচয় যখন দ্রৌপদীর সামনে তুলে ধরছিলেন তখনই জয়দ্রথ কে উদ্দেশ্য করে উচ্চারণ করেছিলেন ‘ভগীরথো বৃহৎক্ষত্রঃ সৈন্ধবশ্চ জয়দ্রথঃ’। যেখানে আমরা প্রথম জানতে পারি জয়দ্রথ সিন্ধু প্রদেশের রাজা। তবে অন্যান্য রাজাদের মতো তাঁকে ধনুক তুলে মাছের চোখ ভেদ করার চেষ্টা কিংবা অপচেষ্টা কোনটাই করতে দেখা যায় না। আবার দ্রৌপদীর মতো তৎকালীন ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরীর প্রতি তার চেয়ে একেবারেই কামনা ছিল না তা অনস্বীকার্য। তবে তিনি কেন এসেছিলেন? নিছকিই সমস্ত রাজা-রাজড়ারা আসছে তাই আসা নাকি স্বয়ংবর সভার বিচিত্র ঘটনার সাক্ষী হিসেবে নিজের নাম লিখিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে?

দ্রৌপদীর প্রতি যে তার কামুক নজর ছিল তা পরবর্তীকালে কম্যক বনে প্রকাশ পায়। পঞ্চপান্ডবদের তখন বনবাস চলছে। তারা দ্বৈতবন ছেড়ে কম্যক বনে এসে বসবাস করছেন। এই সময় তাদের সঙ্গে বয়ঃজ্যেষ্ঠ বলতে ছিলেন তাদের কুলপুরোহিত ধৌম্য এবং মহর্ষি তৃণবিন্দু। তৃণবিন্দু ছিলেন আগন্তুক ঋষি। আসলে বনবাসের দিনগুলোতে নানান মুনি ঋষিরা এসে পঞ্চপান্ডবের সাথে বসবাস করতেন। তাদের মধ্যে কেউ থেকে যেতেন আবার কেউ চলেও যেতেন। তবে রাজবাড়ীতে যেভাবে অতিথি আপ্যায়ন করা হয় সেই সমস্ত অত্যাবশ্যকীয় আড়ম্বর সামান্য পর্ণকুটিরে ছিল না। কিন্তু যুগে যুগে অতিথি নারায়ণ। তাই অতিথি সেবার উদ্দেশ্যেই পুরোহিত ধৌম্য এবং মহর্ষি তৃণবিন্দুর অনুমতি নিয়ে পঞ্চপান্ডব গিয়েছিলেন মৃগয়ায় — মৃগয়াং পুরুষব্যাঘ্রা ব্রাহ্মণার্থে পরন্তপাঃ। অরণ্যআশ্রমে আর কিসের ভয় থাকতে পারে? অত্যন্ত নিশ্চিন্তে এই বৃদ্ধ দুইজন নিজ নিজ কর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন৷ আর সেই মুহূর্তেই অরণ্যের পথ দিয়ে শাল্ব দেশে যাচ্ছেন সিন্ধুপতি জয়দ্রথ। নাঃ তিনি কোন রাজ্য দখলের লড়াইতে যাচ্ছেন না, তিনি যাচ্ছিলেন বিবাহ করতে। এর আগে যে শুধু দুঃশালা কে বিয়ে করেছিলেন এমন না, দুঃশলা ছাড়াও বেশ কয়েকটি বিবাহ তার ছিল। কিন্তু সমস্ত নারী থেকেই তার সরস মনোভাব উঠে যাওয়ার কারণে নতুন বিবাহের প্রয়োজন। আসলে পুরুষ রাজার কাম কিভাবেই বা থামিয়ে রাখা যায়।

চলবে….

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।