সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ৮)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (অম্বা অম্বিকা অম্বালিকা)

 

এতক্ষণ যা বললাম সবটাই অম্বাকে ঘিরে। এবার বলব অম্বিকা ও অম্বালিকার কথা। সমস্ত নিয়ম-কানুন মেনেই বিচিত্রবীর্যের সাথে বোনের বিবাহ হয়েছিল। বিবাহ পরবর্তী জীবন তাঁদের যে খুব দুঃখের ছিল তা কিন্তু নয়। অন্তত যতদিন বিচিত্রবীর্য বেঁচে ছিলেন। অম্বিকা ও অম্বালিকার দৈহিক আমরা বর্ণনা মহাভারতে পাই। তাঁদের শরীরের লাবণ্য বৃহতীপুষ্পের মতো শ্যামবর্ণ, কোঁকড়ানো নীলাভ চুল, রক্তবর্ণের নখ এবং স্থুলকায় নিতম্ব ও স্তন যুগল। তাঁরা লোকের সম্মান-গৌরব বুঝতেন, সুলক্ষণা ছিলেন এবং বংশের মঙ্গলসূচনা করতেন। তাঁরা বিচিত্রবীর্যকে পতি লাভ করেছেন মনে করে, যথানিয়মে তাঁর শুশ্রূষা করতেন। আর বিচিত্রবীর্যও তাদের প্রতি কামাসক্ত হয়ে পড়েন। টানা সাত বছর ধরে এই দুই রমণীর মন উদ্বেলিত করতে থাকেন। তবে এই সুখ বেশিদিন সহ্য হয়নি। যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বিচিত্রবীর্য।

দুর্ভোগ এর পরেই শুরু হয়। কারণ মারা যাওয়ার আগে বিচিত্রবীর্যের কোন সন্তান জন্ম হয়নি। এদিকে ভরতবংশের জন্য বংশধর চাই। কোথায় পাওয়া যাবে সেই বংশধর? কিভাবেই বা পাওয়া যাবে? তাঁদের শাশুড়ি মা অর্থাৎ সত্যবতী ভীষ্মকে অনুরোধ করেন সন্তান দান করার জন্য। ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা আবারও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে তিনি ক্ষেত্রজ পুত্র জন্ম দেওয়ার পরামর্শ দিলেন অর্থাৎ অন্যের ঔরসজাত সন্তান। সেই পরামর্শ অনুযায়ী সমস্ত দিক বিচার বিবেচনা করে বেদব্যাসের ডাক পড়ল। তিনি বেদ পাঠ করতে করতে এলেনও। সত্যবতী তাকে তার সমস্যার কথা বললেন এবং অনুরোধ করলেন ভাতৃজায়ার গর্ভে পুত্রসন্তান উৎপন্ন করতে। বেদব্যাস মায়ের কথা ফেলে দেননি। রাজি হয়েছিলেন এবং জানিয়েছিলেন কিছু ব্রত আচরণের কথা যা না পালন করে কোন রমণীই তাঁর কাছে আসতে পারেন না। কিন্তু সত্যবতী দীর্ঘ সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে চাননি তাই বেদব্যাস বলেছিলেন তাঁর বিকৃত রূপ ওই রমণীদের সহ্য করতে হবে আর সেটাই হবে তাঁদের ব্রতপালন। এই সবকিছু শুনে সত্যবতী তাঁর পুত্রবধূদের বুঝিয়ে বললেন কেন এই পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে এবং তাঁদের কি কি করণীয়। তাঁরা রাজি হলেন। অবশ্য রাজি না হয়ে কোন উপায় ছিল না। সদ্য স্বামীহারা স্ত্রী, বাড়ির গুরুজনদের কথা শোনাটাই তাঁদের কর্তব্য।

ঋতুস্নাতা পুত্রবধূ অম্বিকাকে শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন শাশুড়ী সত্যবতী৷ এবং গোপনে জানালেন তাঁর এক দেবর আছেন যিনি রাত্রি দ্বিপ্রহরে এই ঘরেই আসবেন, তিনি যেন প্রতীক্ষা করেন৷ শাশুড়ির সেই কথা শুনে মনোহর বিছানায় শুয়ে দেবর ভীষ্মকে এবং দেবরস্থানীয় কুরুবংশীয় প্রধান পুরুষদের চিন্তা করতে লাগলেন। যথাসময়ে বেদব্যাস ঘরে এলেন৷ আলোকিত ঘরে অম্বিকা বেদব্যাসের পিঙ্গলবর্ণের জটা ও দাড়ি এবং দুটি উজ্জ্বল চোখ দেখে অম্বিকা ভয়ে দু’চোখ বন্ধ করে ফেললেন। সেই অবস্থাতেই বেদব্যাস অম্বিকার সঙ্গে রমণে প্রবৃত্ত হলেন। সমস্ত রমণ-প্রক্রিয়ায় অম্বিকা একটি বারও চোখ খুললেন না এবং রমণকারী পুরুষটির দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারলেন না। এরপর যখন বেদব্যাস ঘরের বাইরে গেলেন সত্যবতী জিজ্ঞেস করেছিলেন কেমন পুত্র আসবে। বেদব্যাস বলেছিলেন অম্বিকার গর্ভে যে পুত্র আসবে সে দশ হাজার হাতির সমান বলবান হবে, রাজর্ষিশ্রেষ্ঠ, বিদ্বান হবেন৷ তার একশ’ পুত্র হবে৷ কিন্তু মায়ের দোষে সে জন্মান্ধ হবে৷ এ’কথায় সত্যবতী বুঝলেন সিংহাসনে বসার উপযুক্ত বংশধর আসছে না। কারণ কোন অন্ধ ব্যক্তি কুরুবংশের উপযুক্ত রাজা হবে না৷ যথা সময়ে জন্মান্ধ পুত্রসন্তান জন্মাল। হ্যাঁ ঠিকই বুঝেছেন জন্মেছিল ধৃতরাষ্ট্র।

এরকম ভাবেই পান্ডুরও জন্ম হয়েছিল। অম্বিকার জন্মান্ধ সন্তান জন্মাবে তা আগে থেকেই জেনে যাবার ফলে সত্যবতী অম্বালিকাকে পড়িয়ে বুঝিয়ে ওই একই ভাবে শোবার ঘরে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু অম্বালিকাও বেদব্যাসের বিকৃত আকার দেখে ভয় পেয়ে পান্ডুবর্ণ হয়ে গেছিলেন৷ বেদব্যাস সত্যবতীকে জানিয়েছিলেন এই পুত্রসন্তান অত্যন্ত বিক্রমশালী ও জগদ্‌বিখ্যাত হবে; কিন্তু ওর মায়ের দোষে পাণ্ডুবর্ণ হবে। সেই বালকের আবার মহাধনুর্ধর পাঁচটি পুত্র হবে।

সত্যবতীর মন শান্ত হচ্ছিল না৷ কারণ একটা না একটা খুঁত থেকেই যাচ্ছে৷ তাই আবারও অম্বিকাকে নিযুক্ত করলেন৷ কিন্তু অম্বিকা আগের অভিজ্ঞতা মনে করে এগোতে পারেননি। পাঠিয়েছিলেন তাঁরই এক দাসী, অনামিকাকে৷ সুন্দর করে সাজিয়ে, গয়না পরিয়ে। সেই দাসী বেদব্যাসকে আদর যত্নের সঙ্গে পরিচর্যা করল। এতে বেদব্যাস সন্তুষ্ট হয়েছিলেন৷ রমনে লিপ্ত হবার পর বলেছিলেন যে পুত্র সন্তান আসবে সে ধার্মিক ও জগতের সমস্ত বুদ্ধিমানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হবেন। জন্ম হল বিদুরের৷ এই ঘটনা পরে বেদব্যাসই সত্যবতীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন৷

এতো কিছুর পর কি বোঝা গেল বলুন তো? অন্যের ঔরসে সন্তান উৎপন্ন অর্থাৎ ক্ষেত্রজ সন্তান হল আজকের স্পার্ম ডোনারের গল্প৷ সে যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞান আজকের মত এত উন্নত না হলেও ক্ষেত্রজ যে সন্তান জন্ম দেওয়ার ধারণা ছিল। এই ধারণাটির উন্নত ও আধুনিক বিবর্তন স্পার্ম ডোনার। ভুল বললাম কি? আজকের দিনে এটি বহুল প্রচলিত একটি পন্থা যার দ্বারা অনেকেই মা হন। তবে বিজ্ঞানের সহায়তার কারণে মেয়েদের অপরিচিত পুরুষের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হতে হয় না৷ এ কতখানি আশির্বাদ বিজ্ঞানের বলুন তো৷ অম্বিকা, অম্বালিকা সন্তান উৎপাদন হেতু একটি অপরিচিত ও বিকৃত চেহারার মানুষের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ তাঁদের কেউ জিজ্ঞেস করেনি ওই মানুষটার সাথে রাত কাটাতে চায় কিনা৷ এ যেন একপ্রকার মগের মুলুক৷ মগের মুলুক না হলেও একধরনের অত্যাচার৷ অন্তত আমার কাছে৷ স্বামী নেই বলে বাড়ির গুরুজনদের পছন্দ মতো পুরুষের সাথে সঙ্গম করতে হবে সেখানে তাঁদের মত অমতের কোন জায়গাই নেই৷ উফ কি নিষ্ঠুর সমাজ! নিজেদের বংশধর আনার তাগিদে এ কি অত্যাচার নয়? কিন্তু সে সব শোনার, জানার বা বোঝার জন্য কেউ ছিল না৷ আর পাঁচটা সাধারণ রাণীদের মতোই সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তাদের হয়তো আর কোন বিশেষ প্রয়োজনই ছিল না সংসারে৷ তাই কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন পরবর্তীতে এই দুই চরিত্রের খুব একটা উল্লেখ রাখেননি ৷ কেবল এইটুকু দেখিয়েছেন, শেষ বয়সে এই দুই বোন বনে চলে যায় এবং তপস্যা করে বাকি জীবন কাটিয়ে দেয়৷

এই দুই সন্তান জন্ম দেওয়াই যেন অম্বিকা ও অম্বালিকার প্রধান কাজ। ওই যে অতো কান্ড করে বিবাহ হল, তা সন্তান উৎপাদনেই ফুরলো। এই কাজটি সম্পন্ন না হলে হয়তো অম্বিকা বা অম্বালিকার সামান্যতম গুরুত্বও দেখা যেত না মহাকাব্যে। শুধু কি অম্বিকা অম্বালিকা? আজকের দিনে অনেক স্ত্রী আছে যারা সন্তান প্রসব না করতে পারলে কিংবা বংশধর দিতে না পারলে তাদের যেন পরিবারে কোন মূল্যই নেই৷ পাঁচ হাজার বছর কেটে গেছে ঠিকই কিন্তু সমাজে বাড়ির বৌদের জায়গাটা আজও একই রয়েছে৷ আর এরকমই থেকে যাবে আরও বহু যুগ৷ অনেক অনেক অম্বিকা অম্বালিকা ঘরের বিছানায় ভয় লুকোয়, জানালায় মাথা ঠুকে চোখের জল ফেলে। শুধু তাদের কথা নিয়ে নতুন কোন মহাকাব্য তৈরি হয় না৷ প্রাচীন এক এবং অদ্বিতীয় মহাকাব্যে বার বার তাদের ভেতর দিয়ে আজকের নারীদের একই দুর্দশাগ্রস্ত মুখ ফুটে ওঠে। তাই বলি এ পৃথিবীতে আসলে কিছুই বদলায়নি৷

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।