সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নিলাম সামন্ত (পর্ব – ৩০)

মহাভারতের মহানির্মাণ (অশ্বত্থামা)
অথচ, অশ্বত্থামাকে আমরা কখনোই মহাভারতের কোন লঘু চরিত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারিনা। যেখানে অশ্বথামার পিতা ছিলেন দ্রোণাচার্য, দাদু ঋষি ভরদ্বাজ, আবার মামা কৃপাচার্য। বড় বড় রথি মহারথীদের সাহচর্যে যে তার বেড়ে ওঠা। সেই চরিত্র কিভাবেই বা লঘুচরিত্র হতে পারে? জন্মের সময় দ্রোণাচার্যের আর্থিক সঙ্গতি খুব একটা ভালো ছিল না তাই হস্তিনাপুর নিবাসী অস্ত্র গুরু কৃপাচার্যের আমন্ত্রণে সপরিবারে দ্রোণাচার্য গিয়ে উঠলেন। কৃপাচার্য তখন রাজবাড়ী ছোট্ট ছোট্ট কৌরব ও পান্ডবদের অস্ত্রশিক্ষা গুরু। আবার অস্ত্রশিক্ষা এমনই ছিল যে তার শিক্ষায় অস্ত্র চালনা যে কেবলমাত্র বীর করে তুলবে কোন যোদ্ধাকে তা নয়, তাঁর শিক্ষায় অস্ত্র চালনাও শিল্প হয়ে ওঠে। যেমনটা আমরা অর্জুনের তীর চালনায় দেখি কিংবা ভীমের গদা চালনায়৷ কৃপাচার্য আস্তে আস্তে করে দ্রোণাচার্যকে হস্তিনাপুরের রাজবাড়ির সাথে সংযুক্ত করতে থাকেন। এবং অস্ত্রশিক্ষাগুরু হিসেবে খুব একটা কষ্টভোগ না করেই দ্রোণের জায়গাও হয়ে যায়। দু’খানি শিক্ষকের মাঝে বড় হওয়ার কারণে অশ্বত্থামার আলাদা করে কোন শিক্ষাগুরুর প্রয়োজন হয়নি। বেদবেদাঙ্গ সে গুরু দ্রোণের কাছ থেকেই শিখেছে। আবার ছোট থেকে তার অস্ত্রশিক্ষা এমন ভাবেই শুরু হয়েছে যে অস্ত্রশিক্ষা পূরণ হওয়ার আগেই গুরুগৃহে বসবাসকারী অন্যান্য শিক্ষার্থীদেরও সে অল্প বিস্তর শিক্ষাদান করতে থাকে। ওই যেমনটা শিক্ষকের ছেলেমেয়েদের হয় তেমনি। শিক্ষক বাবার সান্নিধ্যে থেকে ছেলেমেয়েরা অনেক কিছুই জেনে যায়, এবং সেইগুলো নিয়ে বাবার ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানোর চেষ্টা করে থাকে। অশ্বত্থামারও খানিকটা এই পরিস্থিতিই ছিল।
গুরু দ্রোণ অস্ত্রশিক্ষা গুরু হলেও তিনি কিন্তু কখনোই পাঁচটা সাধারন মানুষের মতো জীবন যাপন করতে চাননি। বড়লোক বন্ধু পাঞ্চাল রাজা ধ্রুপদের সান্নিধ্যে থেকে খানিক রাজ্য পেতে লোভ করেছিলেন, আবার সেখান থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর প্রকাশ্য সংকল্পও জানিয়ে চলে এসেছিলেন। আপাত দৃষ্টিতে এইসব আত্মসম্মান খোয়ানোর ক্রোধ থেকে বলেছেন মনে হলেও বড়লোক জীবন যাপনের লোভ যে একেবারেই ছিল না তা কিন্তু নয়। সাধারণ ব্রাহ্মণের ছেলে বলে অশ্বথামাকে পারেননি, আর অশ্বত্থামাকে দুধ খাওয়াতেই হবে এই উদ্দেশ্যে তিনি অটুট থাকলেন। সেই উদ্দেশ্য সফল করতেই ভীষ্মের শ্মরণাপন্ন। এই ঘটনাগুলো না বললে অশ্বত্থামাকে পুরোপুরি তুলে ধরা যায় না।
শিক্ষাগুরুদের পারিবারিক সাহচর্যে বড় হওয়ার কারণে অশ্বত্থামা কিন্তু নিজেকে সবার মধ্যে কোনদিনই বিলিয়ে দেয়নি। সবসময়ই আলাদাভাবে নিজের জায়গা বজায় রেখে চলেছে। সে যেন গুরুর পর আরো এক ছোট গুরু। গুরুপুত্র হওয়ার কারণে ছোট থেকেই গুরুগৃহে তার আলাদা যত্ন। কিছুটা স্বজনপোষণের আওতায় ছিল বলা চলে। গুরু দ্রোণাচার্য পুত্রস্নেহ থেকে নিজেকে কখনোই সরিয়ে রাখতে পারেননি। যখন কৌরব ও পান্ডবদের কষ্ট শিক্ষায় শিক্ষিত করছেন, দেখা যাচ্ছে তাদের কোন একটা কাজে বিশেষভাবে ব্যস্ত রেখে সেই সময়টুকুতে অশ্বথামাকে আলাদা করে একটু বেশি শিখিয়ে দেওয়ার। এমত অবস্থায় একদিন অর্জুনেরও মুখোমুখি হয়ে পড়েছিলেন। তবে গুরু দ্রোন কখনোই অন্যান্য শিষ্যদের অবহেলিত করতেন না, এবং সেই মুহূর্তে অর্জুনকেও তিনি কোনোভাবেই এড়িয়ে যাননি। উল্টে সেই একই শিক্ষা অর্জন কেও দিয়েছিলেন। ছোট থেকেই আলাদাভাবে অতিরিক্ত যত্ন পাওয়া অশ্বত্থামার কাছে অভ্যাসের থেকেও অনেক বেশি স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। জিনগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে দ্রোণাচার্যের শম ও দমের গুন না পেয়ে অশ্বত্থামা পেয়েছিল বড়লোক হয়ে বাঁচার ইচ্ছা। কারণ অস্ত্রশিক্ষাগুরুর পত্র হিসেবে তার তো কখনোই রাজা হওয়ার কথা নয়।
তার বড় বড় ইচ্ছা, শখের খোঁজ রাখত দুর্যোধন। তাই উন্নত ঘোড়া বা এই ধরণের জিনিসপত্রের বিনিময়ে অশ্বত্থামার সাথে আলাদাভাবে বন্ধুত্বটুকু স্বার্থ চরিতার্থের উদ্দ্যেশ্যে করে ফেলেছিল। আর অশ্বত্থামাও তার ভালো থাকা ও সুখ যাপনের সামনে মানুষদের দোষগুণ বিচার করার বুদ্ধি ও বিবেকটুকু খোলা রাখেনি৷ স্রেফ সাময়িক ভালো থাকাই বরাবরের গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
শিবের সাধনা করে দ্রোণাচার্য পুত্র সন্তান হিসেবে অশ্বত্থামাকে পেয়েছিলেন। তাই পুত্রকে যে সব সময় কোন সুযোগ পাইয়ে দিতে হবে বা নিশ্চিত ভবিষ্যতের গদিতে বসিয়ে দিতে হবে এই পরিকল্পনা পিতা দ্রোণের মাথায় ও মনে সর্বদাই ছিল৷ শিষ্যদের পাঞ্চাল রাজা ধ্রুপদকে পরাজিত করে গুরুদক্ষিণা চাওয়ার নির্দেশই তা প্রমাণ করে। কারণ ঘটনাটির ফল হিসেবে আমরা দেখছি, পঞ্চপান্ডব ধ্রুপদকে হারিয়ে গুরুদক্ষিণা দেওয়ার পর গুরু দ্রোণ রাজা ধ্রুপদকে মনে করিয়ে দেন পুরনো কিছু ঘটনা৷ যার ফলে তিনি পাঞ্চাল রাজ্যের অর্ধেক দ্রোণকে দিয়ে দিতে বাধ্য হন৷ কিন্তু ওই অর্ধেক পাঞ্চাল রাজ্যের সিংহাসনে দ্রোণ নিজে না বসে, বসালেন পুত্র অশ্বত্থামাকে। ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে এভাবেই পা বাড়িয়ে ছিলেন।
রাজ্যাভিষেক করিয়ে অশ্বত্থামা রাজা হলেন ঠিকই তবে বেশিদিন সেখানে বসবাস করেননি৷ কিছু কাল পরেই ফিরে এসেছিল হস্তিনাপুরে৷ হস্তিনাপুরের আরামের জীবন বা শান্তির ভাত, বন্ধুদের সান্নিধ্য পাঞ্চাল রাজ্যে বুঝি ছিল না৷ সেখানে রাজার দায়িত্ব অনেক বেশি। বুদ্ধি, মন কে অনেক বেশি কাজ করাতে হবে৷ অতো খাটুনি করে কি আর রাজা হতে ভাল লাগে?
চলবে…