শরৎ প্রভাতে আকাশে মেঘ ও রৌদ্রের লুকোচুরি চলিতেছে। আমি বায়ু পরিবর্তনের নিমিত্ত পর্বতের পাদদেশে একটি ছোট্ট কুটিরে আসিয়া উপস্থিত। বাহিরে দুটি চেয়ার পাশাপাশি… আমি একা বসিয়া আছি। চায়ের কাপটা থেকে তখনো ধোঁয়া উঠিতেছে। দূরে রাশি রাশি পর্বতশ্রেণি, সেই শৈলচূড়ার বরফের উপর সকালের আলো ঠিকরিয়া পড়িয়াছে । আমি মুগ্ধ হইয়া সেই সৌন্দর্য উপভোগ করছি, ঘরে শিশির এখনো ঘুমের জগতে। ওকে ডাকি নাই আজ। বিবাহের পর হইতে এমন শান্তির ঘুম ও কোনোদিন ঘুমায় নাই। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই শিশির এসে বসল আমার পাশে।
মুখে স্নিগ্ধতা আর চোখে এক উজ্জ্বল দীপ্তি, কিন্তু নিরাশা। এখনো আঠারো হয় নাই… চায়ের কাপটা টানিয়া লইল, ধীরে চুমুক দিয়া বলিল, ‘কাজটা কী ঠিক হলো?’
আমি উত্তর না দিয়া মুখ টিপিয়া শুধু হাসিলাম। তারপর বলিলাম, ‘কী করিলে ভালো হইত…’
‘মা বাবার কথা শুনিয়া লওয়া অবশ্য কর্তব্য ছিল। না হয়, আর একটা বিবাহই হইত?
‘আর আমার স্ত্রীর? কারো আদরের হৈমর… কারো শিশিরের… কী হইত তাহার…’
নিশ্চুপ হৈম। আমার শিশির।
বলিল, ‘শিশির ক্ষণস্থায়ী জানা আছে তো তাহা…’
‘বিলক্ষণ… তাই তো প্রতি ভোরে ঘুম হইতে উঠিয়া পড়ি… আর বিন্দু বিন্দু শিশির কণা সঞ্চয় করিয়া রাখি হৃদয়ে। হৃদয়ে যাহার অবস্থান সে কি কখনো ক্ষণস্থায়ী হইতে পারে?
শিশির আর কোনো কথা কহিল না। ঘটনার পূর্বাপর স্মরণ করিয়া আর একবার শিহরিত হইয়া উঠিল।
সকালের সূর্যের আলো গায়ে মাখিয়া আনমনে বসিয়া রহিল। আমার মনে হইল ওর মন বুঝি সেই খোট্টার দেশে তাহার বাবার নিকট পাড়ি দিয়াছে। আর তারপরেই সিদ্ধান্ত লইলাম, দিন দুয়েকের মধ্যেই এখান হইতে বেরিয়ে যাবো।
পিতা কন্যার কিছুদিন এক সাথে থাকাটা শারীরিক ও মানসিক শান্তির কারণ হইবে। হয়তো প্রাণোচ্ছলতা ফিরে আসতে পারে এই বিষণ্ণ মনে।
***
শিশির আমার মানস প্রতিমা। রবি কবির বয়ানেই বলি, ‘যে আমার সাধনার ধন ছিল; সে আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার সম্পদ।’
আমি মাত্র ঊনিশে এক অমূল্য সম্পদ পাইয়া নিজেকে তাহাতে সমর্পণ করিলাম। বলিয়াছি, তাহার দুটি পা-কে আমি ছবি দেখিবা মাত্র নিজের হৃদয়াসনে অধিষ্ঠিত করিয়াছি। কিন্তু মুখের বিষাদের কোনো নাগাল আমি পাই নাই কোনোদিন।
বিবাহের পর হইতে লক্ষ্য করিলাম একটা প্রাণবন্ত মেয়ে চোখের সামনে কেমন যেন জড় পদার্থে পরিণত হইতেছে। বয়স তাহার সতেরো, এই একটা দোষে অপমানের মালা তাহার গলায় ঝুলাইয়া দেওয়া হইল। অবহেলা ও অসম্মানের চক্করে কেমন যেন নিজেকে শামুকের ন্যায় গুটাইয়া লইতে থাকিল।
সেইদিন আমি এক নতুন উপলব্ধিতে পৌঁছিলাম, যে আমি শিশিরের সংস্পর্শে পূর্ণ হইলেও পূর্ণতা দিইনি তাকে, আসলে সেই পূর্ণতা দেওয়া কিভাবে সম্ভব সেটা আমি উপলব্ধিই করতে পারিনি। তাই জানালার গারদে যেদিন তাকে মাথা রাখিয়া উদাস হইয়া বসিয়া থাকিতে দেখিলাম, সেদিন চঞ্চল হইয়া উঠিল আমার মন। আর একটা কোনো উপায় বের করবার জন্য উদগ্রীব হইয়া উঠিলাম।
উপায় কিন্তু হইয়াও হইল না। আমার বাবা আর শিশিরের বাবার মধ্যে লক্ষ যোজন দূরত্ব। এবং পরিশেষে শিশিরের বাবা আমার বাবার সাথে পেরে না উঠে চুপ করিয়া গেলেন।
আর আমি…? আমি সাহসে ভর করে বলিয়াই ফেলিলাম, ‘হৈমকে আমি লইয়া যাইব।’
বাবা বলিয়া উঠিলেন, ‘বটে…’
আমি বলিলাম, ‘উহার শরীরে সমস্যা হইতেছে, ডাক্তার বায়ু পরিবর্তন আবশ্যক জানাইলেন। তাহার পর এভাবে রাখা ঠিক হইবে না।’
বাবা তো অগ্নিশর্মা। বিস্মিত মা রাগিয়া ঘরে চলিয়া গেলেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলেন আমার শ্বশুর মহাশয়। কন্যার সহিত বাক বিনিময় করিয়া তিনি বিদায় লইলেন। আর আমার স্ত্রী শিশির… চুপ করিয়া ঘরে চলিয়া গেল। আর আমি বাহিরে চলিয়া গেলাম। বন্ধুরা আমার শক্ত মেরুদণ্ডের জন্য বাহবা দিয়ে উৎসাহিত করিল। এবং শিশিরের বায়ু পরিবর্তন করানোর ব্যাপারে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলাম।
***
এর পর গঙ্গার জল বহু বহিয়া গিয়াছে। আমিও পায়ের তলার মাটি শক্ত করবার চেষ্টা করতে থাকি। রাতে বাড়ি ফিরিয়া দেখি শিশিরের নিস্তব্ধ প্রতিক্রিয়া। একদিন আদর করে জড়িয়ে ধরে বলিলাম, ‘কী ব্যাপার, একটু তো আমিও সান্নিধ্য পেতে পারি…’
একটু হাসিয়া উত্তর দিল, ‘দিই না?’
‘সেই শিশির কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে…’
শিশির কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু চোখে উষ্ণতা অনুভব করলাম আমার বুকে…আমি ধীরে ধীরে মাথায় হাত বুলাইতে লাগলাম।
এদিকে বাড়িতে শিশিরের সতীন আনার তোড়জোড় শুরু হইয়াছে। ফলে আমিও একটু কম বাড়িতে আসি। রাতে নীরব কান্নার সাক্ষী হই।
মা আমার জন্য এক দ্বাদশবর্ষীয়া কন্যা পছন্দ করিয়া যে রাত্রে আমার পড়ার টেবিলে আনিয়া উপস্থিত করিলেন, আমি সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলাম না আর নয়, এবারে শিশিরের জন্য আমাকেই কিছু ভাবিতে হইবে।
আমি তাই করিলাম। আমার টিউশনের জমানো টাকা ও শিশিরকে লইয়া বাবার সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। বাবা আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করিলেন। আর আমি মুক্তির আনন্দে শিশিরের হাত ধরে বের হইয়া পড়িলাম।
পর্বতের ধারেই একটা ঘর নেব ভাবিয়া পর্বত প্রান্তে উপস্থিত হইলাম। স্ত্রীকে ভালোবাসা দেবার কারণে আমি আজ ত্যাজ্য।
তাই ভাবিলাম আজ শিশিরকে তার বাবার কাছে লইয়া যাই, যদি সেই পুরোনো শিশিরকে পাইয়া যাই, যে হৈমন্তীর আড়ালে হারিয়ে গিয়াছে।
প্রস্তাব মাত্রই চোখে সেই প্রথম অনুভূতির পরশ লক্ষ্য করলাম।
(রবি ঠাকুরের গল্পের চরিত্র নিয়ে কাঁটা ছেঁড়া করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।)