ক্যাফে এক মাসের গল্পে নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত

অহিংসা পরমো ধম্ম

(লেখাটি সম্পূর্ণ কল্পনা প্রসুত। ঐতিহাসিক নয়। )

আর বেশী পথ নেই মধ্য রাত্রির আগেই রাজধানী প্রবেশ করতে পারবে জয়সেন। ক্লান্ত হলেও জয়সেন বিরতি চায় না। সামনে বিরাট রুক্ষ প্রান্তর। বৃষ্টি হলে এখান দিয়ে এভাবে যাতায়াত করা যায় না। কারণ বিরাট বিরাট ঘাসের জঙ্গল হয়ে যায়। সেই সময় অনেক শ্বাপদ আর দস্যুর এখানে উপদ্রব হয়। এখন সম্পূর্ণ রিক্ত ভূমি। রাস্তা অনেক টা কমে গেল। আচমকা সামনে ছোটা অশ্ব টি সহ আরোহী উদ্ধব উল্টে পড়ে গেল। দীর্ঘবাহু মুহূর্তে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। জয়সেন চমকে ওঠে। হঠাৎ যেন মাটি ফুঁরে উঠে দাঁড়ায়, তিনটি তিরধনুক হাতে শীর্ণ শরীর। মাটিতে এভাবে কেউ লুকিয়ে থাকতে পারে তা আশা করেনি । একমুখ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণ। জয়সেন চিনতে পারল। সেও হেসে ফেলল।“দাক্ষায়ন, এ রসিকতার মানে কি?” জয়সেন দ্রুত মাটিতে নেমে এগিয়ে যায়। উদ্ভব উঠে দাঁড়িয়েছে।একটি তির অশ্বের পায়ে আঘাত করেছে। মাধব অত্যন্ত বিরক্ত হল। দাক্ষায়ন খুব ধুরন্ধর যোদ্ধা। এক কালে বহু যুদ্ধ, কেবল তার কৌশলের ওপর নির্ভর করে জিতিয়ে এনেছে জয়সেন। কিন্তু রাজার সাথে দাক্ষায়নের মত মেলে না। জয়সেনের সাথে আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয় দাক্ষায়ন। “আমি জানতাম তুমি এই পথে আসবে।” দাক্ষায়ন বলে। অশ্বের শুশ্রূষা করতে থাকে মাধব। দীর্ঘবাহু অস্ত্র নামায় না। কারণ দাক্ষায়ন কে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। “তুমি একটা দিন আমার সাথে কাটাও, জয়সেন। অনেক কথা জমে আছে। বন্ধুর কি বন্ধুর প্রতি কর্তব্য নেই?” দাক্ষায়ন পরিহাস করে বলে। সারাদিনের দীর্ঘ পথযাত্রায় ক্লান্ত জয়সেনের মন টলে গেল। সে নির্দেশ দিল আজকের যাত্রা এখানে বিরতি টানার । মাধব প্রমাদ গোনে। তার আর আজ রাতে ঘুম হবে না।দীর্ঘবাহুকেও সজাগ থাকতে হবে। বেশ কিছু বন্য পাখী হত্যা করেছে দাক্ষায়নের সঙ্গীরা। কিছু বন্য ফল। রাতের এই আহার। আগুনে পাখীর মাংস ঝলসে নিচ্ছিল দাক্ষায়ন। মাধব জানিয়ে দিল সে মাংস খাবে না। দাক্ষায়ন আর তার বন্ধুরা সকলে হো হো করে হেসে উঠল।মাধব বুঝতে পারে এরা রাজার আদেশ মানতে ইচ্ছুক নন। রাজা অকারণে প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ করেছেন। জয়সেন আনন্দ করে মাংস খেলেন। মাধব ছাড়া অন্য সকলে খেল। উদ্ধব জয়সেনের শয়নের উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে পারল না। দাক্ষায়ন তাই নিয়েও পরিহাস করে বলল, জয়সেন বড় অলস আর আরামপ্রিয় হয়ে গিয়েছেন। জয়সেনের অহংকারে লাগলো। সে রাজার পৃষ্ঠপোষকতাতে বিলাস করে কিন্তু আদ্যন্ত যোদ্ধা। সে উদ্ধব কে বিরত করল। আগুনের চারপাশে হাঁটুর ওপর হাত রেখে নানান কথা হতে লাগল। দীর্ঘবাহু পায়চারী করে শ্বাপদ সঙ্কুল এই স্থানে বিপদের কথা ভেবে। দাক্ষায়ন জয়সেন কে সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করল, “ তুমি রাজার এই ‘অহিংসা’ সম্পূর্ণ মেনে নিচ্ছ? এটা ভুল হচ্ছে না। বিদেশ থেকে যদি কোন আক্রমণ হয় আমরা আমাদের রক্ষা করতে পারবো?” জয়সেন মাথা নিচু করে শুনতে শুনতে চোখ তুলে তাকায়।সামান্য হাসির রেখা দেখা দেয় তার মুখে। “জোর করে কাউকে অহিংসক বানানো যায়? আমি কি ভয়ানক হিংস্র তুমি জানো তো!” দাক্ষায়ন রাগত স্বরে বলে, “আমাদের পল্লিতে পল্লিতে লোক পাঠানো হচ্ছে পশু হত্যা বন্ধ করার জন্যে। ছোট বাচ্চাদের অহিংসা শিক্ষা দিতে বলা হচ্ছে। লোকগুলোকে কি যেন নাম দেওয়া হয়েছে?” পাশ থেকে তার সঙ্গী বলে, “ধর্ম্যামাত্য”। “ ঐ দ্যাখো , ধর্ম্যামাত্য…আবার এতবড় নামকরণ , হাস্যকর। ভেবে দ্যাখো, ব্যাধের সন্তান আমরা । শিকার ভুলে গেলে, অস্ত্রশাস্ত্র ভুলে গেলে থাকল কি?”খুব দ্রুত বলে চলে দাক্ষায়ন, “ তারা পল্লীতে এলেই আমি সরে চলে আসি। অসহ্য লাগে। বড় বিপদ এলে কি ভাবে সামলাবে ভাবো।” জয়সেন এতোটা তলিয়ে ভাবেনি। তার যুক্তিযুক্ত মনে হল। সে কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলে ওঠে, “এটা ভুল হচ্ছে। আমি রাজার সাথে কথা বলব। উনি আমার কথা শুনবেন।” “ না শুনবেন না। উনি কোনদিন কোন কথা শোনেননি। তাঁর যখন যুদ্ধ ভালো লেগেছে তখন অকারণে যুদ্ধ করিয়েছেন। এখন এক বৌদ্ধ ভিক্ষু কে খুব মনে ধরেছে তাই … সেই ভিক্ষু যা বলে তাই তিনি করবেন।” জয়সেন সম্মতি দিলেন।“তুমি রাজদ্রোহ না কর, অন্তত কোন উপায় বার কর। এই ভিক্ষুকে সরিয়ে দাও। দেখবে রাজা ধীরে ধীরে বদলে গেছে। তুমি এটা করতে পারো জয়সেন। এটা দেশের জন্যে করা দরকার।” জয়সেন চুপ করে আছে।“চুপ থেকো না জয়সেন” দাক্ষায়ন দৃঢ়তার সাথে বলে, “ ভুলে যেও না তুমি দেবী পুজক। তোমার দেবীর মন্দিরে এককালে হাজার ছাগ বলি দিয়ে তুমি তাঁকে তুষ্ট করতে।” জয়সেন উঠে দাঁড়ায়। স্থান ত্যাগ করে হাঁটতে থাকে। দীর্ঘবাহু সাথে চলতে থাকে। দাক্ষায়ন অত্যন্ত রুক্ষ ভাবে চিৎকার করে, “ তুমি ভীতু, অলস, আরামপ্রিয় আর অবশ্যই অধার্মিক।” দীর্ঘবাহু রুখে দাঁড়ায়। জয়সেন বিরত করে। দীর্ঘবাহু কে দাঁড়াতে বলে। “ তুমি আমার সাথে একটু একান্তে এসো দাক্ষায়ন।সব কথা সবার সামনে হয় না।” জয়সেন শান্ত ভাবে বলে।দাক্ষায়ন লাফ দিয়ে ওঠে। দীর্ঘবাহু তাঁকে আটকায়। মাধব তার হাত থেকে তির-ধনুক নিয়ে নেয়, কোমরে একটি ছোট কিন্তু ধারালো ছুরি ছিল তাও নিয়ে নেয়। জয়সেনের শারীরিক শক্তি যথেষ্ট ,তাই আর ভয় পায় না মাধব। অত্যন্ত রাগত হয়ে বিড়বিড় করতে করতে দাক্ষায়ন, জয়সেনের দিকে যাত্রা করে।

বেশ কিছুটা দূরে একটা বজ্রাহত তাল গাছের ভাঙা গুড়ি আছে। তার পাশে বসে জয়সেন। পাশে এসে দাঁড়ায় দাক্ষায়ন। ক্রোধে তার শ্বাসের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তার দেহ থেকে পশুর শুকনো চামড়ার গন্ধ বার হচ্ছে। “বল ,তুমি কি চাও দাক্ষায়ন?” জয়সেন জিজ্ঞাসা করে। “রাজার বৌদ্ধ গুরুর মৃত্যু চাই আমি, সে মরে গেলে রাজাকে আর ঐ সব অদ্ভুত বদবুদ্ধি দেবার কেউ থাকবে না।”শুকনো ঠোঁট চেটে নেয় দাক্ষায়ন। “রাজা কিন্তু সকলকে রক্ষা করার কথা বলছেন। সাধারণ প্রজা খুশি। তাছাড়া নিজের ধর্ম ত্যাগের কথা তো তিনি বলেননি। ভগবান বুদ্ধের প্রতি মানুষের প্রবল ভালোবাসা। সেটা কে কি করে বাদ দেবে?তারা অহিংসা আর বৌদ্ধ ধম্ম দুই জীবনে গ্রহণ করেছে।” জয়সেন বলে। “এক সহচরকে আমি পাঠিয়েছি খোঁজ নিতে… সুযোগ বুঝেই সে যেন আঘাত করে। তুমি কি ভাবছ বা করছ তা নিয়ে আমার বিন্দু মাত্র চিন্তা নেই। তুমি যে আমার কথা বুঝবে না আমি জানতাম! ফুঃ!” দাক্ষায়ন বলে।“আমি তোমার সব কথা বুঝতে পারছি, ভিক্ষু নিগ্রোধ কুমার কে সরিয়ে দিলেই হবে কি?”, জয়সেন উঠে দাঁড়িয়ে যায়। “হবে, রাজা এমনি নড়বড় করছে।উনি কষ্টে পাগল হবেন। বউ চলে গেছে। সেই দুঃখে এই পুঁচকে গুরু ঠাকুর কে আঁকড়ে ধরেছে। তারপর উত্তরাধিকারী কেউ ঠিক করা নেই। আমি কথা দিচ্ছি এই এলাকার সমস্ত উপজাতিদের দল নিয়ে তোমার পাশে দাঁড়াব।রাজাকে তুমি কারারুদ্ধ করবে। তুমি রাজা হবে। রাজা হবার সব গুণ তোমার আছে। আমি পশ্চিম দেশের অধিকর্তার সাথে দরকার হলে কথা বলব। সে রাজি না হলেও ভয় নেই। তাঁর নীচে একজন অধিনায়ক আছে, সে আগের মাসেই আমার সাথে দেখা করে গেছে ” দাক্ষায়ন ঝড়ের মত বলে চলে। জয়সেন হতবাক হয়। “নিগ্রোধ কুমার কে হত্যা করা খুব সোজা,কিন্তু সাধারণ প্রজা তার ওপর ক্ষেপে যাবে!অনেক সেনাপতি আর সেনারাও বিপক্ষে চলে যেতে পারে। ” জয়সেন শুকনো গলায় বলে চলে।“সেইজন্যে তো তোমাকে বলছি, তুমি খুব সহজে এটা করতে পারবে। তোমাকে কেউ সন্দেহ করবে না।একটা সুযোগ পেলেই আড়াল থেকে …” হিস হিস করে বলে চলে দাক্ষায়ন। জয়সেন অবাক হয়। সে এভাবে কেন ভাবতে পারে না। রাজা তাকে খুব স্নেহ করে। কিন্তু সেটা তো কাজের সম্পর্ক। সে দেশের শাসক হতে পারে!আগুনের মতো বুকের মধ্যে টা পুড়ে যাচ্ছে। কেউ তাকে শাসক হিসাবে ভাবছে! রাজার সিংহাসন তার হতে পারে। জয়সেন নিজেকে রাজ সিংহাসনে দেখতে পায়। দাক্ষায়ন কে কথা দেয় , সে নিগ্রোধ কুমার কে শেষ করবে। আর রাজার দুর্বলতার সুযোগে অভ্যুথান ঘটাবে। দাক্ষায়ন তৈরি থাকবে। মাধব, উদ্ধব, আর দীর্ঘবাহুকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করতে হবে। এই বিরাট রাষ্ট্রের সে অধিকারী হবে। এবার তার মস্তিষ্ক আর পারছে না। ঘুম আসছে। দাক্ষায়ন আর তাঁর সঙ্গীরাও শুয়ে পড়ল। দীর্ঘবাহু আর মাধব জেগে থাকার চেষ্টা করলেও ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘুমের মধ্যে মাধবের আচমকা দম বন্ধ হয়ে আসে। তার বুকের ওপর প্রবল চাপ। কোন রকমে চোখ খোলে মাধব। দেখে বুকের ওপরে জয়সেন ,তার গলা টিপে ধরেছে। মাধবের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা । বিশেষ কৌশলে জয়সেন কে সরিয়ে দিতে পারে। অন্ধকারের মধ্যে অন্য সকলে উঠে দাঁড়িয়েছে।দীর্ঘবাহু অস্ত্র হাতে নিলেও সে মাধব কে আক্রমণ করে না। সে জানে মাধব অতি মাত্রায় বিশ্বস্ত। বেশ কিছুক্ষন খক্‌ খক্‌ করে কাশে মাধব। তারপর চিত হয়ে শুয়ে থাকা জয়সেনের কাছে যায়।“ কি ,অপরাধ আমার প্রভু? আমি কি করেছি?” সে ভাঙা গলায় জানায়। জয়সেন গোঙাতে গোঙাতে বলে, “তুই কাকে কাল রাতে আমার কাছে এনেছিলি মাধব? কাকে?” “আমি জানি না, ঐ অন্ধকারে আমি দেখিনি”, হতবাক মাধব নিচু স্বরে বলে। সে আমাকে কিছুতেই ঘুমাতে দিচ্ছে না।তাকে কি আমি আগে থেকে চিনি। সে সারাক্ষন আমাকে ডাকছে। আমি তাকে জানতে চাই। ” “আমি সত্যি তাকে চিনি না।” মাধব বড় কাতর স্বরে বলে। উঠে বসায় জয়সেন কে।যেটুকু জল তার কাছে ছিল সেটুকু পাণ করায়। সকলে নিশ্চিন্ত হল। মাধব পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। “আমি কি তাকে চিনি মাধব। আমার স্থির বিশ্বাস একে আমি চিনি। কিন্তু কে? তুমি ফিরে যেতে পারবে সেখানে। খুঁজে দেখবে?” মাধব কে ‘তুই’ সম্বোধন করে না জয়সেন।খুব সন্তর্পণে এ কথা গুলি বলে জয়সেন। “এখন রাজধানী তে আপনার পাশে আমার থাকা দরকার। আপনি দ্বিপরাজ্যে যাত্রা করলে , আমি বরং খুঁজে দেখবো।”মাধব বলে।জয়সেন যেখানে শুয়ে ছিল সেখানেই আছন্নের মতো পড়ে রইল। মধ্য বয়সে উপস্থিত জয়সেনের একাধিক স্ত্রী, তাছাড়া বহু বিনোদিনী কে মাধব চেনে।অনেক জনের সাথেই অনেক রকম ঘটনা। মন টা আবার উচাটন হল মাধবের। মাধব পাশে বসে রইল। পুব আকাশে লাল রঙ। রাজাধানী আর দুই প্রহরের দূরত্ব। আবার যাত্রার জন্যে তৈরি হল সবাই।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!