T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত

পূর্ণদীপ্তা সুধীরা বসু

 

স্বামী বিবেকানন্দ আর ভগিনী নিবেদিতা ১৮৯৮ সালে নভেম্বর মাসে , বোসপাড়া লেনে মেয়েদের জন্যে একটি স্কুল খুললেন ,তার আগেই আমাদের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মশাই , ১৮৫৮ সালে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলী,মেদিনিপুর জেলা আর কলকাতাতে প্রায় ৩৫ টি মেয়েদের স্কুল স্থাপন করে ফেলেছেন। ১৮৬৮ সালে ২৮৮ টি মেয়েদের স্কুলের হদিশ পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে সিস্টারের এই নতুন বিদ্যালয় টি কেন অভিনব!বিদ্যালয় টি নিয়ে একটি পরিশীলিত শব্দবন্ধ আছে, “স্বামীজীর ইচ্ছামূর্তি” । নিবেদিতার লেখায় পাওয়া যাচ্ছে, “when the women see themselves in their true place as related to the sail on which they live, as related to the past out of which they have sprang,; when they become aware of the needs of their own people, then shall a worthy education be realised.” এইখানে ‘own people’ বলতে কিন্তু কেবল পরিবারের মানুষ নয়… ‘দেশবাসী’ এই ভাবনাটার উন্মেষ চায়ছেন নিবেদিতা।এই ভাবনা আর আদর্শ পাথেয় করেই বহু মানবী এগিয়ে চলেছেন। সুধীরা বসু তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

লোকমাতা নিবেদিতা যখন প্রবল ব্যস্ত তাঁর নানান কর্ম কাণ্ড নিয়ে তখন বোসপাড়া লেনের ছোট্ট মেয়েদের ইস্কুলের প্রতিদিনের কাজ কর্ম কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সিস্টার ক্রিস্টিন। সেই সময়ের বাংলার রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯০৪ সালে অরবিন্দ ঘোষ আলিপুর বোমা মামলায় ধরা পড়েন। তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন দেবব্রত বসু। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি ধরা পড়েন আর কারাবাস করতে হয়। দেবব্রত বসু প্রবল ভাবে স্বামী বিবেকানন্দের অনুগামী। জেল থেকে বার হয়ে এসে তিনি শ্রী শ্রী মায়ের কাছে আশ্রয় পান,তাঁর সাধু নাম হয়েছিল স্বামী প্রজ্ঞানন্দ। একাধারে দেশপ্রেমিক,স্থিতধী,শাস্ত্রজ্ঞ, আর রামকৃষ্ণ মঠ আর মিশনের আমৃত্যু কর্মী এই দেবব্রত বসুর এক ভগিনী ছিলেন যার নাম ছিল ‘খুদি’। যিনি আসলে প্রখ্যাত হলেন সুধীরা বসু বলে। বালিকা বয়সেই পিতৃহারা হন সুধীরা। বাড়িতে শ্রী অরবিন্দ ঘোষ, ভুপেন দত্ত প্রভৃতিদের বক্তব্য জানতে পারতেন। স্বামী বিবেকানন্দের ছোট ভাই ভুপেন দত্তর লেখা থেকে সুধীরা বসু ব্যাপারে কিছু তথ্য পাওয়া যায়।সেই সময় অল্প বয়সী মেয়েরা নানা ভাবে বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন। সুধীরা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে সেগুলি করেছেন।চরকা কাটা,লুকিয়ে অস্ত্র পাচার, বিপ্লবীদের আত্মগোপনে সহায়তা প্রভৃতি। ১৯০৩ সালে মাত্র পনের বছর ব্যসে মাতৃহারা হলেন সুধীরা। দেবব্রত বসু তখন পুরী ,কটক প্রভৃতি ঘুরে ঘুরে বক্তৃতা দিতে যাচ্ছেন। দাদা দেবব্রত বসু ছোটবোন টিকে তৎকালীন অন্তপুরের দীপশিখার মতো করে তৈরি করতে চাননি। একা রেলের টিকিট কাটতে পাঠাতেন বোনকে।আজকের সামাজিক পরিমণ্ডলে বসে কাজটি খুব কঠিন মনে হচ্ছে না। কিন্তু তখন এই কাজ টি একটি মেয়ের জন্যে অ্যাডভেঞ্চার প্রায়। মায়ের মৃত্যুর পর সুধীরার মধ্যে স্বদেশ চেতনা আর আধ্যাত্মিক চেতনা আরও পরিস্ফুট হল। এই সময় তিনি পিসতুতো বোন কে নিয়ে কোন ‘পুরুষ’ অভিভাবক ছাড়া জগন্নাথ দর্শন করতে পুরী গেলেন।তখন রেলপথ ছিল না।জঙ্গল,নদী,পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করেছিলেন। মজার ব্যাপার খাঁটি প্রাচীন সন্ন্যাস বেশ ধারণ করে অর্থাৎ হাতে ত্রিশূল, কমন্ডুলু,গেরুয়া বসন পরা দুই কিশোরী এই যাত্রা করেছিল। পথ কেবল জন্তু জানোয়ারের বিপদ বা দুর্গমতা দিয়ে ঘেরা ছিল না। পথে একবার তাদের দুজন কে ‘দুষ্ট’ এক লোককে শায়েস্তা করতে হয়েছিল। দাদা দেবব্রত বসু সুরক্ষিত জীবনের বিলাসিতা থেকে অন্য দিকে নিয়ে যেতে চাইছিলেন।১৯০৬ সালে বাগবাজারে নিয়ে এলেন সুধীরা কে। বাগবাজার তখন সারদা দেবীর পবিত্র বসবাস। সুধীরার বয়স ১৭ বছর বয়স। সরলাবালা সরকার লিখেছেন, “সুধীরা যখন প্রথম নিবেদিতা শিক্ষালয়ে আসেন তখন নিবেদিতা ছিলেন না। সুধীরা আসা মাত্র ভগিনী ক্রিস্টিন তাঁকে দু হাতে বুকে জড়িয়ে নিলেন। সুধীরা পেলেন স্নেহের অতলস্পর্শী গভীরতা, আর ক্রিস্টিন পেলেন যেন নিজের ছোটবোন কে।”

১৯০৪ সালেই সিস্টার নিবেদিতা তাঁর স্কুলের আয়তন বাড়িয়ে নিয়েছিলেন। ১৬নং বোস পাড়া লেনের বাড়িটার সাথে ১৭ নং বাড়িটিও বিদ্যালয়ের কাজের জন্যে নেওয়া হয়।একসাথে বিদ্যালয় আর তাঁদের বসবাস করার জন্যে এই বাড়ি দুটি ব্যবহার হয়। ১৯০৪ সালের ২৬শে জুলাই নিবেদিতা ম্যাক্‌লাউড কে লিখছেন,“আমি কয়েকজন কে শিক্ষকতার জন্যে ট্রেনিং দিচ্ছি।তাঁদের অনুশীলনের জন্যেই স্কুলটি খোলা দরকার ছিল।সব মিলিয়ে এতো কাজ আছে যে আমার আর অন্য কিছু করার অবকাশ নেই। সপ্তাহে দুই দিন করে কৃস্টিনের কাছে বেশ কয়েকজন মহিলা সেলাই ও অনান্য বিষয় শিখতে আসছেন,হাতের কাজ করে উপার্জনের আশায়। আগে একথা অসম্ভব ছিল যে, বিবাহিত মহিলারা অন্তঃপুর ছেরে-একজন ইউরপিয়ানের বাড়ি কিছু শেখার জন্যে আসতে পারে।এখন কিন্তু তাঁরা আসছেন এবং এর জন্যে তাঁদের কোন অসুবিধার মধ্যে পড়তে হচ্ছে না।” এই সময় এই বিদ্যালয়ে অন্তঃপুরিকা আর বয়স্কদের প্রথাগত বিদ্যায় শিক্ষিত করে তুলতে ‘পুরস্ত্রী’ বিভাগ ও শুরু করেন। পাশ্চাত্য সভ্যতা কে সাধারণ বাঙালি হিন্দু পরিবার ভয় পেত। সেখানে সিস্টার নিবেদিতার পরম ভারতীয় আদর্শের চেহারা তাদের ভরসা দিয়েছিল। পরিবারের মেয়েরা ‘বয়ে’ যাবে না জেনে , তাঁদের শিক্ষা গ্রহনের জন্যে পাঠাত। নিবেদিতা শিক্ষিকাদের তৈরি করছিলেন। পরবর্তী কালে যেন তাঁর প্রজ্বলিত মশাল ধারণ করার মানুষ তৈরি হয়। সুধীরা বসুর হৃদয় আর মস্তিষ্কে যথেষ্ট ‘দাহ্য পদার্থ’ ছিল। সুধীরা দেবী যোগ দিলেন নিবেদিতার বিদ্যালয়ে।

সুধীরা বসু কে তাঁর দাদা ‘অন্য ধরনের মানুষ ’ হিসাবে তৈরি করছিলেন। তৎকালীন ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষা আর নিজস্ব চারিত্রিক তেজ নিয়ে প্রজ্বলিত হয়ে উঠলেন।এই সময় নিজের বাড়ি থেকে যাতায়াত করে বিদ্যালয়ে ক্লাস নিতেন। বিনা পারিশ্রমিকে ‘পুরস্ত্রী’ বিভাগে বাংলা পড়াতেন। মাঝে মাঝে গীতার ক্লাস নিতেন। তাঁর পরিশীলিত ব্যক্তিত্বের মধুরতা স্বাভাবিক ভাবেই ছাত্রীদের কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। আত্মস্মৃতিতে প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণা মাতাজি লিখেছেন, “যখন সুধীরাদি এলেন (নিবেদিতার বিদ্যালয়ে)তখন আমাদের একটু ওপরের ক্লাস।তিনি আমাদের খুব ভালবাসতেন। আমাদের তাঁর ওপর অদ্ভুত ভালোবাসা পড়েছিল।সকলের মধ্যে ধর্মভাবটা জাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টাটা সুধীরাদির খুব ছিল।” নিবেদিতা তাঁর ছাত্রীদের ইতিহাস পড়াতেন, ছবি আঁকতে শেখাতেন, আর বড় মেয়েদের ইংরেজি শেখাতেন। একটু বড় ছাত্রীরা ছোট মেয়েদের শেখাত। সুধীরা দেবী এদের পাশে থাকতেন। সব সমস্যা আর প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যে তিনি থাকতেন। আর দুই মহান ভগিনীদ্বয় এর কাছ থেকে শিখতে লাগলেন অন্য ধরণের ত্যাগ আর শৃঙ্খলা। ‘অনন্যা সুধীরা’ গ্রন্থে অশেষপ্রাণা লিখছেন, “ শৃঙ্খলার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন নিবেদিতা, কোন কিছুর অপচয় একদম পছন্দ করতেন না।নিজে সর্বস্ব ত্যাগ করে এসেছেন যে!তাই এই সব বিষয়ে ছিল তাঁর সজাগ নজর। নিবেদিতার স্কুল ছিল অতি গরিব।নিবেদিতা ছাত্রীদের সেলাইএর জন্যে জামা টেঁকেও দিতেন। টেঁকে দেওয়ার পর জামা সেলাই হয়ে গেলে সুতাগুলি আবার সযত্নে খুলে গুছিয়ে রাখতে হত অন্য জামা টাঁকতে ব্যবহার করা হবে বলে।ছাত্রীরা যাতে সুতা, পেন্সিল, কাপড়ের টুকরা প্রভৃতি অযথা নষ্ট না করে সেজন্যে অত্যন্ত সাবধানী ছিলেন নিবেদিতা। সহজ বৈরাগ্যবশতঃ সুধীরা একদিন ক্রিস্টিন এর কাছে জানতে চেয়েছিলেনঃ “ আমরা তো সন্ন্যাসিনী, এত ছোট ছোট বিষয়ে আসক্তি থাকা কি ভালো?” ক্রিস্টিনের কাছ থেকে এই কথা শোনামাত্র নিবেদিতা দৃঢ় ভাবে বলেন “সুধীরার এরকম কথা বলা উচিৎ নয়। এরকম মনোভাব কখন প্রশ্রয় দেবে না। সুতাগুলি গুছিয়ে রাখা তো পূজারই কাজ।”
ভগিনী ক্রিস্টিন কে সুধীরা ‘ছোড়দি’ বলে সম্বোধন করতেন। ক্রিস্টিন এর কাছ থেকে সুধীরা শিখতেন ইংরেজি, আর ক্রিস্টিন সুধীরার কাছ থেকে শিখতেন বাংলা ভাষা।
দুজনের মধ্যে পরম সখ্য ছিল। বিদ্যালয়ের পক্ষে যা খুব আশাব্যঞ্জক হয়ে উঠেছিল। বিদ্যালয়টি কলেবরে বাড়তে লাগল। সে সময় অনেক বালবিধবা মেয়েরা বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল।সুধীরা তাদের মতো সাদা কাপড় পরতেন। ছাত্রীর মৃত্যু সংবাদের খাওয়া দাওয়া ছেড়েছেন বলে জানা যায়। তিনি অনাথ একটি মেয়ে যার নাম ‘ভুতি’ কে মানুষ করেছেন। স্বামী সারদানন্দ দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত অঞ্চল থেকে এনে দিয়েছিলেন।১৯১০ সালের একটি চিঠিতে নিবেদিতা ছাত্রী সংখ্যা ২০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬০ জন হওয়া তে উল্লাস প্রকাশ করছেন। নিবেদিতা ১৯১১ সালের অক্টোবরে পূজার ছুটিতে হিমালয়ে গেলেন। অসুস্থ ছিলেন। হিমালয় তাঁর শেষ আশ্রয় হল। অশেষপ্রানা তাঁর ‘অনন্য সুধীরা’ তে লিখছেন। “ যাবার আগে সুধীরা কে স্কুলে আসতে বললে তিনি রাজী হননি।কারণ স্কুল পরিচালনায় ভগিনীর সঙ্গে তাঁর কিছু মতানৈক্য হয়েছিল।কিন্তু সুধীরা কল্পনাতেও আনতে পারেননি যে এবারে হিমালয়ই হবে নিবেদিতার অন্তিম আশ্রয়। জগদম্বার আশীর্বাদপূত এই বিদ্যালয়ের ভিত্তিতে যে ‘সংকল্প’ অন্তঃশায়ী নদীর মতো প্রবাহিত হচ্ছিল, তা নিবেদিতার প্রয়াণের পরেও রুদ্ধ হয়ে যায়নি। সিস্টারের মৃত্যুতে ব্যাথিত ক্রিস্টিন দ্রুত ফিরে আসেন ও বিদ্যালয়ের। দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর এই কাজে সর্বতোভাবে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন অনুতপ্ত সুধীরা । মর্মাহত সুধীরা দ্বিগুণ উদ্যমের সাথে নিবেদিতার সাধনার ধন এই বিদ্যালয়ের কাজে মন প্রাণ ঢেলে দেন।” ১৯১২ সালে বিদ্যালয়ের প্রাপ্তন ছাত্রী ও সুধীরার উদ্যমে আরও দুটি ইস্কুল খোলা হয়ে ছিল। হাতিবাগান আর বালির গঙ্গাধারে।

১৯১৪ সালে এপ্রিল মাসে ক্রিস্টিন স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার আর কোন ব্যক্তিগত কারণে আমেরিকা যান।এদিকে সারা পৃথিবী জুড়ে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।জার্মানিতে জন্ম বলে ক্রিস্টিনের ভারতে ফিরে আসায় বাধা দেয় ইংরেজ সরকার। জার্মান শত্রু দেশ। ক্রিস্টিন না থাকার ফলে স্বাভাবিক ভাবেই বিদ্যালয়ের কাজ সুধীরা দেবীর ওপর নস্ত হয়। ক্রিস্টিন তাঁর চিঠিতে লিখে জানান সুধিরাকে তিনি বিদ্যালয় টি সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবে পরিচালনা করবার উপযুক্ত মনে করেন। “do not feel that you are bound in any way to carry out my ideas. This is your work and you are free. I mean every word of that ….. we must produce a few women unusual intellectual and spiritual power who will combine best and noblest of the East and west without the faults of either ….. with a few such a woman safely leaves the future.”
স্বামীজীর ইচ্ছা স্বরূপ আর নিবেদিতার সাধনা স্বরূপ এই বিদ্যালয়টির দায়িত্ব এসে পড়ল সুধীরা দেবীর হাতে। নিবেদিতার হাতে যে মশাল স্বামীজী তুলে দিয়ে ছিলেন,সেই মশাল সুধীরার হাতে এল।
এখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে স্বামী বিবেকানন্দ কেন সিস্টার নিবেদিতাকে ভারতবর্ষে এনেছিলেন? ১৯৯৮ সালে শ্রদ্ধাপ্রানা মাতাজী একটি বক্তৃতায় এই প্রশ্ন তুলে বলেছেন, “ নিবেদিতার মতো অসাধারণ ব্যক্তিত্ব শালিনী নারী কে স্বামী বিবেকানন্দ প্রাইমারী স্কুল খুলে অ-আ-ক-খ শেখানোর কাজে কেন আহ্বান জানিয়ে ছিলেন?মনে হয় স্বামীজীর সে আহ্বানের পশ্চাতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন মুখ্য ছিল না। কারণ এখানে দুটি বিষয় মনে রাখা দরকার।
১। বিদ্যালয় শুরু হবার আগে স্বামীজী মারগারেট নোবেল কে ব্রমহচরজ ব্রতে দীক্ষিত করে ‘নিবেদিতা’ নাম দিয়েছিলেন।
২। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সংঘ জননী শ্রীশ্রীমা স্বয়ং, শ্রী রামকৃষ্ণের অবর্তমানে যিনি ছিলেন সংঘের আধ্যাত্মিক পালয়িত্রি। এখানেই প্রমাণিত স্বামীজী চেয়েছিলেন ছেলেদের মত মেয়েদের জন্যেও একটি মঠ স্থাপন করতে।”

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার।১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে পূজ্যপাদ স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ শ্রীশ্রীমাকে একটি পত্র লেখেন। দক্ষিণ ভারতের জনৈকা ভক্তকন্যা ব্রহ্মচারিণীর জীবনযাপন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তার উত্তরে শ্রীমৎ স্বামী সারদানন্দ শ্রীশ্রীমার অভিমত প্রকাশ করে জানান,

“১ম–কন্যার ওইরূপ স্বাভাবিক মতি বুদ্ধি বা প্রকৃতি কতকটা চাই। ২য়—তাহার ওইরূপ শিক্ষা ও সঙ্গ চাই এবং অনুকূল দেশে অবস্থান চাই।

৩য়—তাহার জীবিকার উপযোগী সংস্থান চাই যাহাতে অপরের ওপর নির্ভর না করিয়া সে কাল কাটাইতে পারে।”

একজন মানুষ কেবল মাত্র ঈশ্বর ভরসা করে সংসার ছেড়ে আসবে তাঁর জন্যে যে জীবন যাপনের যে ইঙ্গিত রইল সেটা কিন্তু অতি বাস্তব সম্মত। তিন নম্বর পয়েন্ট টা দেখে সারদা দেবীকে এক অতি আধুনিকা মানুষ বলে মনে হয়। নিজস্ব জীবন বোধ অন্য কারো আশ্রয়ে থেকে উৎযাপন করা সম্ভব নয়। আমরা সিস্টার নিবেদিতার বড়ি ,আচার বিক্রির পরিকল্পনার মধ্যে সেই চেতনা দেখতে পাই। স্বামী বিবেকানন্দের ‘আত্মনো মোক্ষার্থং’ সাধনার সঙ্গে ‘জগদ্ধিতায় কাজের জন্য নিজেকে উপযুক্ত করে তুলতে হলে যে ভাবে এগোতে হবে তা— শ্রীশ্রীমার এ-চিঠিতে ভবিষ্যৎ শ্রীসারদা মঠের ব্রহ্মচারিণীদের সঙ্ঘে প্রবেশ সম্বন্ধে যা যা প্রয়োজনীয় তার পরিষ্কার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

১৯১০ সালে সুধীরা বসু একটি চিঠিতে সংসার ছেড়ে চলে আসার কথা লিখেছিলেন। কারণ হিসাবে লিখছেন, “…কারণ অনেক স্ত্রীলোকই আমাদের মুখ চাহিয়া আছে। যদিও এখন অত্যন্ত অর্থের অভাব,কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস অর্থের জন্যে কিছুই আটকায় না । যথার্থ অভাব প্রাণের, নিজেকে প্রস্তুত করিতে হইবে।” দক্ষিন ভারত থেকে প্রচুর মেয়ে সংসার ছেড়ে সেবা আর ঈশ্বর এর জন্যে জীবনপাত করতে চেয়ে চিঠি দিচ্ছেন। স্বামী সারদানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা আর ক্রিস্টিন নানা ভাবে একটি নারীমঠের পত্তনের জন্যে চেষ্টা করলেও হচ্ছিল না। শ্রীমা সারদা দেবী নির্দেশ দেবেন কবে তার জন্যে অপেক্ষমাণ হয়ে আছেন সুধীরা। যে বছর রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেলেন অর্থাৎ ১৯১৩ সাল ।সেই বছর রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন একটি রিপোর্ট বার করেন যাতে স্বামী সারদানন্দ আন্তরিক ভাবে ওই বিভাগের জন্যে আবেদন জানান। দারুন অর্থাভাবের মধ্যে ১৯১৪- ১৯১৫ সালে মাসিক ৩০ টাকা ভাড়ায় ৬৮/২/বি, রামকান্ত বোস স্ট্রিটের বাড়িতে ‘মাতৃমন্দির’ উদ্বোধন করা হয়। এই মন্দিরে ১২ জন আশ্রমিক বাস করত। একজন ছিল অনাথ। ১৯১৭ সালে ৫৩/১ বোসপাড়া লেনের বাড়িতে উঠে আসে। বাড়ির ভাড়া বেড়ে হয়েছিল ৫০ টাকা। ১৯১৯ থেকে ১৯২২ সালের বিদ্যালয়ের কার্যবিবরণী তে স্বামী সারদানন্দ লিখে গেলেন, “১৯১৪ খৃষ্টাব্দের শেষভাগে ইহাদের অগ্রণী শ্রীমতী সুধীরা বসু ঐ বিষয়ে কৃতসঙ্কল্প হইয়া নিবেদিতা বিদ্যালয়ের অঙ্গীভূত ভাবে একটি ছাত্রী-নিবাস খুলিয়া দিলেন এবং ঐরূপ ব্রতধারিণী হইতে কৃতসঙ্কল্প অপর কয়েকজনও ঐসময়ে তাঁহার সহিত যোগদান করিলেন। তদবধি শ্রীমতী সুধীরা তাঁহার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যেরূপ দক্ষতা ও প্রাণপণ চেষ্টার সহিত এই প্রতিষ্ঠানটীর জন্য কার্য্য করিয়া গিয়াছেন তাহা প্রকাশ করা অসাধ্য। তাঁহার সুনিপুণ কার্য পরিচালনায় অতি স্বল্প কালের মধ্যেই উহার সুনাম চতুর্দিকে বিস্তৃত হইয়া সাধারণকে উহার প্রতি সশ্রদ্ধ করিয়া তুলিয়াছিল। ঐ কালে বেলুড় মঠের ট্রাষ্টিগণ এই কার্য্যের সহায়তায় কেবল মাত্র বাড়ীভাড়া যোগাড় করিয়া দিতেছিলেন এবং বাকী সমস্ত ব্যয়ভার শ্রীমতী সুধীরা ও তাঁহার সহচারিণীগণ ভদ্র-পরিবারে ছাত্রী পড়াইয়া এবং বয়ন, সীবন, সূচী-শিল্প প্রভৃতি নানা উপায়ে অর্থ উপার্জন পূর্ব্বক আপনারাই বহন করিতেছিলেন। এখন পর্যন্ত উহা ঐরূপ ভাবেই চলিতেছে। অতএব স্বাবলম্বন ও পরার্থে ত্যাগই যে ইঁহাদের জীবনের মূলমন্ত্র তাহা আর বলিতে হইবে না

স্কুল ছুটি হলে সুধীরা দেবী তীর্থ ভ্রমণে যেতেন। নির্ভীক,ঈশ্বর প্রেমে মগ্ন এই পূর্ণ মানবীর আধ্যাত্মিক জীবন নিয়ে লেখার ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু বলতে চাইছি সারদা দেবীর পুণ্য আশ্রয়ে যারা নিজেদের কে মানুষের সেবায় বিলীন করলেন তাঁদের মধ্যে সুধীরা বসু অন্যতম। তিনি সারদা মঠের বীজটিকে প্রাণের মাঝে নিয়ে পালন করলেন। “অনন্যা সুধীরা” গ্রন্থে অশেষ প্রাণা লিখেছেন, “সেবার কাশীধামে শ্রীশ্রীমায়ের জন্মতিথিতে সুধীরা মায়ের সান্নিধ্যেই কাটালেন। ঐদিন সেবাশ্রমে তিথি উপলক্ষে মায়ের উপস্থিতিতে আনন্দের সঙ্গে পূজা, হোম ইত্যাদি হয়েছিল। একদিন সুধীরাদিকে মা জিজ্ঞাসা করে জানলেন তখনও সুধীরাদি সেবাশ্রম দেখেননি। তখন গোলাপ-মার সঙ্গে তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন সেবাশ্রমের জীবন্ত বিশ্বনাথের সেবা দেখতে। ওখানেই একদিন স্বামী ব্রহ্মানন্দ সুধীরাকে বলেন : “সুধীরা, এখানে মেয়েদের সেবা ছেলেরা করে, তুমি একটা মেয়ে দিতে পার না?” তখন থেকেই সুধীরা ঐ বিষয়ে চিন্তা করেন এবং সরলাকে নার্সিং পড়ানোর কথা তাঁর মনে জাগে ।”

এই খানে শুরু হল আমাদের তথাকথিত সংস্কৃতির কঠিন আর অপ্রয়োজনীয় দেওয়ালটা ভাঙার গল্প। সরলা নার্সিং পড়ে, শিখে কাজে নামলেন। যে কাজ সে যুগে কোন ভদ্র পরিবারের মেয়ে করত না। সুধীরা দির প্রিয়,পরম ঈশ্বর অনুরাগিণী ‘সরলা’ কিংবা ‘পারুল’ হলেন সারদা মঠের সকলের প্রিয় প্রথম প্রেসিডেন্ট মাতাজী প্রব্যাজিকা ভারতী প্রাণা । সুধীরা দেবী তাঁকে রক্ষা করলেন,তৈরি করলেন, পালন করলেন।সরলা কে লেখা একটি অতি ব্যক্তিগত লেখা চিঠি পড়লে বোঝা যায়,তাঁর মনের আগুনের আলো আর তাপ।

“আমাদের কি ভালবাসা, মান-অভিমান, দ্বেষ-হিংসা লইয়া থাকার অবসর আছে? আমার দৃঢ় বিশ্বাস তোমার মনে ছাপ পড়ে নাই। আর যদিই বা পড়ে থাকে, দূর করে দাও। আমি কে? একটা রক্ত-মাংস-পিণ্ডাকারে মা-রই অংশ। যেটুকু আমার অভাব আছে সেটুকু পূরণ করতে জন্মেছি। নানান শিক্ষায় সেটুকু পূর্ণ হয়ে মার জিনিস মাতেই মিশে যাব। তাই আমার দোষ অভাব অনেক থাকতে পারে, সেটুকু না দেখাই তোমাদের কর্তব্য। যদিই বা দেখ আর আমাকে ভালবাস, তা হলে যাতে আমার সে সব ভাল হয় সেজন্য প্রার্থনা কর। কিন্তু আমার জন্য এইসব মনে স্থান দিয়া নিজের ক্ষতি কেন কর? তা কোর না। তোমাদের চেয়েও আমাকে একজন ভালবাসেন—তিনি আমার মঙ্গল দেখিতেছেন, তিনিই মঙ্গল করিবেন।

আশীর্বাদ করি যে জন্য শত অত্যাচার ভোগ করে কষ্ট দুঃখকে বরণ করেছ, সেই কষ্ট দুঃখ শত সুখ-শান্তির আকারে তোমার পথ মধুর করুক। যথার্থ ত্যাগীর আদর্শ জগতে দেখাও। তুচ্ছ মায়া-মোহ দূর হয়ে যাক।”

সুধীরা বসু সারদা মঠ গড়ে তোলার জন্যে প্রাথমিক চেষ্টা করে গিয়েছিলেন। সুধীরা বসু মারা গিয়েছিলেন সারদা দেবী মারা যাবার কিছুদিন পরে,একটি ট্রেন দুর্ঘটনায়।তাঁর মৃত্যুর ফলে সারদা মঠ গড়ে ওঠার কাজ টি কিছুটা শক্তি হারায়।সারদা মঠ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। সাল তারিখের বাঁধনে এই সর্বত্যাগী, মহা কর্মযোগী, মানবিক আর আধুনিক সুধীরা বসু মানুষটি কে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।তাঁকে প্রণাম।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।