T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় নবনীতা চট্টোপাধ্যায়

অন্য পুজো
ঘুম থেকে উঠেই মনটা বিগড়ে গেল নিবারণের| জানালার বাইরে আস্ত একটা কালো আকাশ ঝুলে আছে| রোদ্দুরের লেশ মাত্রা নেই| গত দশদিন ধরে একটানা ঝোড়ো হাওয়া, বৃষ্টি হয়েই চলেছে| আশ্বিন পড়ে গেছে বেশ কয়েকদিন হলো| প্রকৃতির অবস্থা দেখে কে বলবে যে আর কয় দিন পরেই পুজো শুরু হবে| এদিকে রোদ্দুরের অভাবে নিবারণের অবস্থা যে সঙ্গীণ | পূজোর আগে ঢাক গুলোকে রোদ্দুর না খাওয়ালে তো মহা বিপত্তি| নিবারণ পেশায় ঢাকি| ঢাক বাজানোর বরাত তো দূর্গাপূজো, আর ছোটো খাটো খানকয়েক পূজোতে পায়, বাকি সময় খেতমজুরের কাজ করেই সংসার চালায় সে| এই ভারি বৃষ্টিতে খেতের কাজ ও বন্ধ| এদিক সেদিক থেকে তুলে আনা কলমীশাক, মানকচু এসব দিয়েই ভাত দিচ্ছে বউ| চাল ও প্রায় বাড়ন্ত হয়ে এলো| বাড়িতে বৃদ্ধা মা, পাঁচ বছরের মেয়ে মিনিকে নিয়ে চারজনের সংসার তার| কোথা থেকে সে এদের মুখে অন্ন তুলে দেবে এই চিন্তায় রাত্রে তার ঘুম আসে না| টিনের চালের উপর টগড় বগড় করে দাপটের সাথে বৃষ্টি নামে| নিবারণ সিঁটিয়ে শুয়ে থাকে|
আধভিজে হয়ে ঘরে ঢুকলো মিনতি, নিবারণের বউ| সেই কোন ভোরবেলায় উঠে সে ভিজে ভিজে উঠোনে বাসী কাজ সারছিলো| হাতে কয়েকটা সবুজ সতেজ ঝিঙ্গে| ‘কোথায় পেলে ঝিঙে? ‘ নিবারণ শুধালো|
‘ওই মনসাতলার থানে ভাঙা পাঁচিলের উপর দেখি হয়ে আছে| মা কয়েকদিন ধরেই বলছিলো ঝিঙের ঝোল খাবে|’
নিবারণ বিছানার একপাশে ঘুমন্ত মেয়ের মাথায় হাত দিলো| মেঘলার প্রায়ান্ধকার ঘরের খোলা জানালার একফালি আলো এসে পড়েছে ঘুমন্ত শিশুর মুখে| কি নিস্পাপ পবিত্র এক মুখ| সবুজ রঙের জীর্ণ একখানি কাঁথা তার গায়ে| মনে হয় সবুজ ঘাসের উপর টাটকা একখানি শিউলি ফুল| কাল ঘুমোবার আগে বাবাকে
জড়িয়ে বলেছিলো “বাবা, এবার পূজোয় আমার নতুন জামা হবে না? ”
“কেন হবে না মা| নিশ্চয়ই হবে| আমি আগে ঢাক বাজিয়ে ফিরে আসি|”
“তখন তো মা দূর্গা বাড়ি ফিরে যাবে| আমি বুঝি পুরানো জামা পরে ঠাকুর দেখবো? ”
মিনির মাথায় স্নেহের হাত বুলায়া নিবারণ| সামান্য একটা বায়না, অথচ সে নিরুপায়| সব সেরে তার বাড়ী ফিরতে ফিরতে কালীপূজো হয়ে যাবে| ছোট্ট মিনির আর সবার মতো নতুন জামা পরে পূজো দেখা হবে না| একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালো নিবারণ| বৃষ্টি হয়েই চলেছে| মা.. মাগো একটু দেখো আমাদের… মনে মনে প্রণাম জানায় সে|
পরের দিন থেকে বৃষ্টি সরে গিয়ে ঝলমলে রোদ্দুর চারদিকে| যত বেলা বাড়ে, রোদ্দুরের তেজ ও বাড়ে তত| নিবারণ হাসিমুখে ঢাক শুকায় রোদ্দুরে, মিনতি সারা উঠান জুড়ে মেলে দেয় আধভিজে কাঁথা, জামাকাপড়| মিনি হাসিমুখে খেলে বেড়ায় চারপাশে| কাদামাখা রাস্তা দিয়ে ভ্যান গাড়ী করে বাঁশ নিয়ে যায় ঝন্টু| গ্রামের বটতলায় প্যান্ডেল হবে পূজোর| বেড়ার ধারের শিউলি তলা থেকে নীচু হয়ে ফুল কুড়োয় নিবারণের মা| এইসময় প্রতি বছর গাছ ভরে ফুল হয়| এইরকম পর পর কয়েকদিন রোদ ঝলমলে দিন পার হয়ে যায়| নিবারণ ঢাক বাজানোর বরাত পেয়েছে কলকাতার এক আবাসনে| তার বাড়ী থেকে আড়াই ঘন্টার পথ| একটু সুবিধা হয়েছে| লক্ষীপুজোর পর বাড়ী আসতে পারবে| আবার কালীপূজোয় যাবে সেখানে ঢাক বাজাতে| গ্রামের আরো দুইজন ঢাকীর সাথে সে চতুর্থীর দিন রওনা দিল কলকাতায়|
পূজো শুরু হয়| প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে শুরু হয় মা দূর্গার আরাধনা| কচিকাচারা নতুন জামা পরে হুল্লোড়ে মাতে| তার মাঝে মিনিকে মলিন পুরানো জামায় দেখে বন্ধুরা বলে ” কিরে মিনি তোর পূজোর জামা কই? ”
” কালীপূজোর পরে বাবা নিয়ে আসবে| বাবা বলেছে সবার পূজো একসাথে শুরু হয় না| কারো কারোর অনেক দেরীতে পুজো শুরু হয়| মা দূর্গা তাদের জন্য আরো একবার আসেন|”