বাংলা একাডেমিতে কাজী নজরুল স্মৃতিচারণে এম উমর ফারুক

বাংলা একাডেমিতে কাজী নজরুল স্মৃতি

বর্ধমান হাউস। এই ভবন ঘিরে গড়ে ওঠে বাংলা একাডেমি। এটি নজরুল স্মৃতিবিজড়িত স্থান। বর্ধমান হাউসের ভেতর রয়েছে নজরুল স্মৃতিকক্ষ। যদিও অব্যবস্থাপনা আর অযত্নে কক্ষের অনেক কিছুই আজ নষ্ট হওয়ার পথে। স্মৃতিকক্ষ প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শকের জন্য খোলা থাকার কথা থাকলেও সংস্কার কাজের নামে এটি তালাবদ্ধ হয়ে আছে। যদিও একাডেমি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিগগিরই কক্ষটি খুলে দেওয়া হবে।

ঢাকার সঙ্গে কবি নজরুলের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো এই বর্ধমান হাউস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সময় কবি এখানে বেশ কিছুদিন আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী মোতাহার হোসেন সে সময় বর্ধমান হাউসে বাস করতেন। নজরুলবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা গ্রন্থে দেখা যাচ্ছে, মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে কবি দ্বিতীয়বার ঢাকা আসেন। ওই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন।

কবি বর্ধমান হাউসের বাউন্ডারির মধ্যে অবস্থিত বড় একটি পুকুরে নিয়মিত সাঁতার কাটতেন। অবসর সময় পুকুরঘাটে বসে আড্ডা দিতেন। কিন্তু সেই পুকুরেও এখন গাছের পাতার পঁচা গন্ধ। বছরের একটি সময় পুকুরে পানি থাকে না। অথচ এই পুকুরঘাটও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ডানপিটে নজরুলের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই পুকুরের সঙ্গে। বর্ধমান হাউসে থাকাকালীন কবি কয়েকটি কালজয়ী রচনা লেখেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশের রণসংগীত ‘চল্ চল্ চল্’। এ ছাড়া ‘এ বাসি আসরে আসিলে কে গো ছলিতে’ গানটিও তিনি এখানে বসে রচনা করেন। কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিকথা থেকে বিষয়গুলো জানা যায়।

বর্ধমান হাউসের সেই পুকুরটি বর্তমানে ডোবায় পরিণত হয়েছে। অযত্ন এবং অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। নজরুলের স্মৃতিধন্য পুকুর রক্ষায় বাংলা একাডেমির কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। এমনকি সেখানে কোনো স্মৃতিফলকও নেই।

পুকুরের পানি ঘন সবুজ, শ্যাওলায় ভরা

বর্ধমান হাউসে কবির স্মৃতি ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’। ১৯৭৮ সালের ২৯ আগস্ট বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মৃতিকক্ষের উদ্বোধন করা হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। সেদিন অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে কাজী মোতাহার হোসেন দর্শকদের মন্তব্যের খাতায় লিখেছেন: ‘আজ ২৯/৮/৭৮ তারিখে নজরুল স্মৃতিকক্ষ উদ্বোধন করা হলো। এটা আমার পক্ষে অতিশয় সুখের দিন; অবশ্য সে আমার নিজের গুণে নয়, নজরুল যে আমার সমসাময়িক কালের বন্ধু ছিলেন।’ আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের নজরুলবিষয়ক একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন ছিল উদ্বোধনী দিনে।

ঘটা করে উদ্বোধন হলেও পরবর্তী সময় নজরুল স্মৃতিকক্ষ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারেনি বাংলা একাডেমি। ধুলাবালির স্তর জমেছে আসবাবপত্রে। পলেস্তারা খসে পড়েছে দেয়াল থেকে। এক কোণায় ঝুলিয়ে রাখা বীণা হাতে নজরুলের ওপর আঁকা একটি চিত্রকর্ম প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। একাডেমির বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এর আগে কক্ষটি দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হতো। বসতেন একাডেমির কর্মকর্তারা। একসময় এটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বাংলা একাডেমির জনসংযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক অপরেশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, ‘আমরা এ বছরের শুরুতে নজরুল স্মৃতিকক্ষ নতুন করে খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। মার্চ পর্যন্ত সংস্কার কাজ হয়েছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে তা আটকে গেছে।’

একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই একুশে বইমেলার ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। এরপরই আমি কক্ষটি সংস্কার করে দর্শনার্থী এবং গবেষকদের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। যেহেতু মূল ভবনটি খুব পুরনো, বয়সের ভারে কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে। তবে এখন কাজ আটকে আছে করোনার কারণে।’

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!