আদর করে মাথার চুলগুলো ঘেঁটে দিচ্ছেন জ্যাঠামশায়। বললেন, এই যে প্রশ্নটা করলে এটা মগজের জোরে করলে। আর মগজে ঠিক সময়ে রক্ত পৌঁছে তাকে কাজ করার শক্তি যোগাচ্ছে হৃৎপিণ্ড। হৃদয়বত্তা, সহৃদয়তা যখন বলি, তখন আসলে বিবেচনা করার ক্ষমতাকেই বোঝাই। সেটা হয় মগজে। আর মগজকে খাবার যুগিয়ে চালু রাখে হৃৎপিণ্ড।
না জ্যেঠু, তবু বলো, মগজ না হৃৎপিণ্ড, কোন্ টা আগে?
দ্যাখো খোকা, কই মাছ কেটেকুটে রান্নার কড়াতে চাপালেও নড়তে থাকে। মাছের হৃৎপিণ্ড আছে। মগজও আছে। তবে মগজটা তার ভারি একটুখানি। হৃৎপিণ্ডও তার বড়ো সেকেলে ধাঁচের। প্রকৃতি মগজ আর হৃৎপিণ্ডকে একসাথে বিকশিত করতে করতে নতুন নতুন প্রাণী তৈরি করে ফেলেছে। মা তো। যখন তুমি আর অনু খেতে বসো, তখন কি মা কাউকে কম দেয়? দুজনেই সমান আদরের। তেমনি, প্রকৃতি মাতা মগজ আর হৃৎপিণ্ডকে দিনের পর দিন আধুনিক করে গড়ে তুলেছেন।
তবে, জ্যাঠামশায় একটু দম নেন, কথায় বলে যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। মগজ মরে গেলে আমরা বলি ব্রেনডেথ। আমাদের ডাক্তারের চোখে মগজের মৃত্যুটাই আসল মৃত্যু। ওকে আমাদের ভাষায় বলে ক্লিনিক্যাল ডেথ। তারপরেও খানিকটা সময় হৃৎপিণ্ড জিইয়ে থাকে।
এই সময়টার মধ্যে সেই হৃৎপিণ্ড নিয়ে অন্যের শরীরে বসিয়ে দেওয়া যায়। আমাদের দেশ স্বাধীনতা পাবার দু বছরের মধ্যে অ্যানাটমি অ্যাক্ট তৈরি করা হয়েছে। তবে কুসংস্কার ছাড়িয়ে এসব চালু করতে এখনো সময় লাগবে।
ফাঁসি যখন দেওয়া হয়, তখন সবচাইতে কম কষ্ট দেবার জন্য ঘাড়ের কাছে একটা ভারি ধারালো জিনিস এসে পড়ে, সুষুন্মা কাণ্ডটা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তখন ফাঁসির আসামি আর কোনো কষ্ট টের পায় না। যদিও দেহটা আরো খানিকক্ষণ ধড়ফড় করতে থাকে।
চোখ বড় বড় করে খোকা শোনে। এই ভাবেই ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়েছিল?
জ্যাঠামশায় বললেন, তাই তো জানি।
কেউ মারা গেছে কি করে বোঝা যায় জ্যেঠু?
জ্যাঠামশায় বললেন, আমাদের চোখে কেউ মারা গেছেন মানে, তার ক্লিনিক্যাল ডেথ হয়ে গেছে।
খোকা বলে, মানে মগজ মরে গেছে?
ঠিক তাই। আর মগজ মরে যাওয়া মানে কি বলো তো?
খোকা বলে, লোকটা আর কিছু টের পাবে না।
ঠিক বলেছো। তখন চোখের পাতা টেনে চোখের মণির উপর সুড়সুড়ি দিলেও সাড়া জাগবে না। চোখের মণি ভারি সংবেদনশীল। চোখে তোমার বালি পড়েছে কখনো?
খোকা হাসে।
মা বলেন রবিঠাকুরের একটা উপন্যাস আছে চোখের বালি। মহেন্দ্রর বৌ আশা বিনোদিনীর সঙ্গে চোখের বালি পাতিয়েছিল।
তাহলে মগজই আসল, তাই না জ্যেঠু?
জ্যাঠামশায় বলতে থাকেন, তোমার মা জ্যাঠাইমা দামি বেনারসি শাড়ি কত যত্ন করে পাট করে তোরঙ্গে তুলে রাখেন। তাই না?
মা আর জ্যাঠাইমা হাসেন।
তেমনি করে খুলির মধ্যে অতি যত্ন করে প্রকৃতি মগজটাকে পুরে রেখেছেন। আটখানা হাড় যেন সেলাই করে ঠোঙা বানিয়েছেন প্রকৃতি। সিঙাড়ার ভিতর যেমন পুর থাকে, তেমন খুলির ভিতর পাট পাট করে রাখা থাকে মগজ।
খোকা বলে, আটখানা হাড়?
হ্যাঁ, ওরা আট ভাই, আটে অষ্টবসু। ফ্রন্টাল, প্যারেইটাল দুটো, টেম্পোরাল দুটো, স্ফেনয়েড, অকসিপিটাল আর এথময়েড। হল আটখানা?
জ্যেঠুর থুতনিতে হাত বুলিয়ে খোকা জিগ্যেস করে আর মুখে?
খোকা বলে, জ্যেঠু, আমি জানি আমাদের মগজে খবরাখবর পাঠাবার কাজ করে স্নায়ু।
জ্যাঠামশায় বললেন, একা একা খেলা যায় না। টিম লাগে। ফুটবল খেলা তো করো? এক একটা সাইডে কজন করে খেলুড়ে থাকে?
এগারো জন।
তাহলে শোনো, এক মগজের এলাকাতেই স্নায়ুর টিমে বারো ধরনের স্নায়ু। নাম শোনো, অলফ্যাকটরি, অপটিক, অকিউলোমোটর, ট্রকলিয়ার, ট্রাইজেমিনাল, অ্যাবডুসেনটস, ফেসিয়াল, ভেসটিবিউলোককলিয়ার, গ্লসোফ্যারেনজিয়াল, ভেগাস, অ্যাকসেসরি আর হাইপোগ্লসাল। এই বারো রকম।
জ্যাঠাইমা বলেন, বারোভূতের কেত্তন।
খোকা, এর মধ্যে কে কি কাজ করবে, তার ভাগাভাগি আছে। ফুটবলে যেমন কে কোথায় খেলবে বলে দেওয়া থাকে, সেই রকম। অকিউলোমোটর, ট্রকলিয়ার আর অ্যাবডুসেনটস মিলে চোখটা নাড়ায়। ফেসিয়াল মুখটা নাড়ায়, অ্যাকসেসরি মাথাটা নাড়ায়, হাইপোগ্লসাল জিভ নাড়ায়। অলফ্যাকটরি গন্ধ শোঁকায় আর অপটিক দেখতে সাহায্য করে।
জ্যেঠুর কোলের কাছ থেকে ছিটকে গিয়ে দেরাজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খোকা মনের সুখে জিভ ভ্যাঙায়, চোখ ঘোরায়, মাথাটা এদিক ওদিক করে।