ছোটগল্পে কেয়া রায়

প্যানিক

১)
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পেপার খুলেই অশোক চিৎকার করে বলল—- মণি, শিগগির দেখে যাও।
মণিমালা স্বামীর হাইহাই ধাইধাই স্বভাব জানে। তাই গ্যাসটা সিম করে ধীরেসুস্থে চায়ের কাপটা নিয়ে ঘরে এল। “কি হলটা কি?”
—– আরে ভয়ানক ব্যাপার। করোনা বলে একটা নতুন রোগ বেরিয়েছে। সাংঘাতিক ছোঁয়াচে। চীনের উহান প্রদেশে হাজার খানেক মানুষ মারা গেছে। লক্ষ লক্ষ অ্যাফেক্টেড। কী যে হবে!
মণিমালা খবরটা পড়ল। হুমম। সাংঘাতিক ব্যাপারই বটে। অশোকের এক্সাইমেন্টটা এক্ষেত্রে অহেতুক বলা যাচ্ছে না। প্রতিবেশী দেশ অচেনা রোগে আক্রান্ত, এটা উদ্বেগেরই বিষয়। তবে অশোক সব ব্যাপারেই বেশী হাইপার, অস্থির। তাই মণিমালা কথা না বাড়িয়ে কিচেনে ঢুকে গেল। কিন্তু মনে কাঁটার মতো একটা খচখচে অস্বস্তি থেকেই গেল।
ফ্রেব্রুয়ারির মাঝামাঝি অশোক মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। মণিমালা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করাতে বলল—– সব শেষ হয়ে গেল। কলকাতায় ঢুকে গেছে করোনা। এক বখাটে ছোঁড়া লন্ডন থেকে এই রোগ বয়ে নিয়ে এসেছে। সে ফিরে এসে দেদার ঘুরে বেড়িয়েছে কলকাতায়। আর বাঁচার পথ নেই।
মণিমালা হতাশ হলেও মুখে প্রকাশ করল না। কারণ তাহলে অশোক আরো উদ্বেগে ভুগবে। ইতিমধ্যে কোভিড 19 বিষয়ে ইন্টারনেটে কিছু কিছু পড়েছে। রোগটা সাধারণ ফ্লু হলেও খুব বিপজ্জনক। আলোর মতো দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে মানুষ থেকে মানুষে। হু এই রোগকে প্যানডেমিক ঘোষণা করে সতর্ক করেছে সব রাষ্ট্রকে।
পরদিনই অশোক বাজার থেকে তিরিশ বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর পঞ্চাশটা সাবান এনে ঘরে মজুত করল। ঘন্টায় ঘন্টায় তার হাত ধোয়া চলল। আর চলল চারবেলা নুন গরম জলে গার্গল, ভাপ নেওয়া, উষ্ণ লেবুজল খাওয়া। প্রতিবেশীরা তার রকম সকম দেখে ঠাট্টা তামাশা করতে লাগল। তাতে অবশ্য অশোকের কিছু যায় আসে না।
অশোক পেশায় একজন শিক্ষক। মার্চ মাস থেকে সে স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিল। ছেলের স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করল। শুধু তাই নয়, পাশের বাড়ির ছেলে কৌশিক অরুণাচলে ম্যানেজমেন্ট পড়ে। সে বাড়ি ফিরতেই অশোক সোজা লোকাল পুলিশে ফোন করে খবর দিয়ে দিল। পুলিশ এসে ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে গেল কোভিড টেষ্ট করাতে। এই ঘটনায় মণিমালা খুব রেগে গেল।
“পাড়ায় এত লোক আছে, তুমি কেন আগ বাড়িয়ে পুলিশে খবর দিলে!!? কৌশিকের বাবা মা কী ভাবল! আর অরুণাচলে কোনো করোনা কেসই নেই। সবেতে তোমার বাড়াবাড়ি।”
—- না না মণি। ট্রেনে ফিরছে। রাস্তাতেও তো ইনফেকটেড হতে পারে। ও কোভিড টেষ্ট করে নেগেটিভ হলে তবেই পাড়ায় ঢুকতে দেব। সাবধানের মার নেই।
—- যা ইচ্ছে করো তুমি। এত লোক আছে, তোমার মতো করোনার ভয়ে কেউ মরছে না। কী জ্বালায় যে পড়েছি! ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করো। যাদের কোনো ক্রনিক রোগ আছে বা যাদের বয়স ষাটের ওপরে তারা মরছে এই রোগে। আমরা ঘরে আছি। আমাদের কিচ্ছু হবে না।
—– আরে না না। ইটালী স্পেন ইংল্যান্ডে অল্প বয়সীরাও ভুরি ভুরি মরছে। এই রোগকে আন্ডার এস্টিমেট কোরো না। ভারতে গোষ্ঠী সংক্রমণ শুরু হলে কী হবে ভাবতে পারছ! আমরা কেউ বাঁচব না।
২)
মার্চের পঁচিশ তারিখ থেকে দেশে লক ডাউন ঘোষণা হল। মহামারী ধীরে ধীরে জনসমাজে রোগের বিস্তার ঘটাতে লাগল। পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল অশোকের পাগলামি। সে ঘরের জানলা দরজা অব্দি খুলতে দেয় না। কাজের লোক দুটোকে পাওনা গন্ডা মিটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে সেই কবেই। বাজারে যায় না। ওয়াচ ম্যানকে নিচ থেকে সবজি কিনে বাইরে রেখে দিয়ে চলে যেতে বলে। তারপর সেই সবজি তিরিশ মিনিট ভিনিগারে ডুবিয়ে জীবানু মুক্ত করে। বৈশাখের কড়া রোদে নিজে দাঁড়িয়ে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। জামা কাপড় চাদর তোয়ালে রোজ গরম জলে কাচে। ব্লিচিং পাউডার দিয়ে নিজেই ঘর মোছে দুইবেলা। ডাষ্টিং করে। এমনকি সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, সে ঘরের মধ্যেও সকলকে মাস্ক পরতে বাধ্য করল। নিজের রক্তচাপ মাপে চারবেলা। থার্মোমিটার বগলে চেপে চিন্তিত মুখে বসে থাকে দিনরাত।
অশোকের মন অন্যদিকে ঘোরাতে মণিমালা রাতে নিরাবরণ হয়ে তাকে আহ্বান করে রতিক্রীড়ায়। হা হতোষ্মি! কোথায় কি! অশোক ছিটকে সরে গিয়ে বলে,” না না। এখন এসব একদম না। দূরে থাকো। করোনা থেকে বাঁচতে হবে। ডিসট্যান্স মেনটেন করো।”
অশোকের এই বাড়াবাড়িতে তিতিবিরক্ত হয়ে গেল মণিমালা আর ছেলে। সারাদিন ধরে ইন্টারনেট ঘেটে ঘেটে নিত্য নতুন বাঁচার উপায় বের করছে আর পরিবারের ওপর সেগুলো জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছে। তার গোয়ার্তুমি মাত্রা ছাড়িয়ে গেল।
এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে হঠাৎ ফ্ল্যাটে হুড়ুম দাড়ুম। কি না, অশোক নাকি নেটে অক্সিজেন সিলিন্ডার অর্ডার করেছে। কোম্পানি থেকে অক্সিজেন সাপ্লাই করে কড়কড়ে ষাটটি হাজার টাকা নিয়ে চলে গেল। অশোক অপ্রস্তুত হেসে বলল—– মণি, তোমাকে বলা হয়নি। যদি হঠাৎ এই রোগটা হয়, কোনো ডাক্তার পাবো না লক ডাউনে। নব্বই শতাংশ আক্রান্ত লোক অক্সিজেন পেলেই বেঁচে যায়। হাসপাতালে অক্সিজেনের ক্রাইসিস। ঘরেই যাতে অক্সিজেন পাই, তাই কিনেই ফেললাম। বুঝলে?
—– এই লক ডাউনের বাজারে এতগুলো টাকা গচ্চা!! তুমি কি পাগল? বাড়িটাকে তো হাসপাতাল বানিয়েই ছেড়েছ। অক্সিজেনটাই বাকি ছিল। তোমার ভয়ের জন্যে আমাদের বাঁচা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির মধ্যেই তো আছি চব্বিশটি ঘণ্টা। কি করে করোনা হবে আমাদের!!?
অশোকে বোঝানো মানে ভষ্মে ঘি ঢালা। সারাদিন সে হাত ধোয় আর চারবেলা গরম জলে স্নান করে। এই করে করে সে মে মাসের গোড়াতে ঠান্ডা লাগিয়ে ফেলল। কিছুই না তেমন। হালকা জ্বর। ব্যসস, প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেল অশোক। ও নিশ্চিত যে ওর করোনা হয়েছে। প্রতি ঘন্টায় ও থার্মোমিটারে জ্বর মাপতে লাগল। অকারণে অক্সিজেন মাস্ক পরে শুয়ে থাকে। মণিমালা অনেক বুঝিয়েও ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিল। অশোক এখন দিনরাত কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে থাকে আর বিড়বিড় করে কি সব বকে। তার না আছে খাওয়া, না আছে ঘুম। তিন দিন ধরে সারা রাত সে বিনিদ্র। চোখ লাল, উসকো খুশকো চুল। কারো কথা যেন তার কানেই যায় না।
সেদিন রাতে হঠাৎই মণিমালার ঘুম ভেঙে গেল। জিরো পাওয়ার আলোতে সে দেখল, অশোক স্ট্রিপ খুলে কী যেন ওষুধ খাচ্ছে। তড়াক করে উঠে পড়ল মণিমালা। “দেখি দেখি, তুমি কি ওষুধ খাচ্ছ?” আলো জ্বেলে জোর করে কেড়ে নিয়ে মণিমালা দেখল, ওষুধটার নাম হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন! সর্বনাশ করেছে! একসঙ্গে চার চারটে ট্যাবলেট খেয়ে নিয়েছে অশোক। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল মণিমালা। অশোক কোত্থেকে জোগাড় করেছে এই ওষুধ! ও চেঁচিয়ে বলল—- “এসব তুমি কী করছ!? আজই টিভিতে দেখলাম, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া এই ওষুধ খেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কে এনে দিল এই ওষুধ? আমাকে না বলে কেন একা একা এত বড় সিদ্ধান্ত নিলে?”
মৃত্যুর কথায় ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল অশোক। এই চারমাসে তার শরীর শুকিয়ে দড়ি হয়ে গেছে। চোখের তলায় পুরু কালি। প্রেতের মতো চেহারা নিয়ে সে সারারাত ফ্ল্যাটে পায়চারি করে। নির্ঘুম। আর সারাদিন শুয়ে থাকে। মণিমালা ওকে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিল। অশোক বলতে লাগল—- “মণি, আ…আমার কি হবে? আ…আমি কি আর বাঁচব না? করোনা আমাকে শেষ করে দিল। আমার বুকের ভিতরটা কী প্রচণ্ড কাঁপছে! এত ঘাম কেন হচ্ছে! ভীষণ গরম লাগছে। শ্বাস নিতে পারছি না। উফ, কী কষ্ট!”
সারারাত ভুলভাল বকে, ছটফট করে ভোরের দিকে এলিয়ে পড়ল অশোক। মণিমালা অবস্থা ভালো বুঝলো না। ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না। গা হাত পা ঠান্ডা। বিপি ভীষণ লো। লক ডাউনে ডাক্তার আসতে আসতে সব শেষ হয়ে গেল। ডাক্তার সব শুনে ডেথ সার্টিফিকেট লিখতে লিখতে বললেন—- “ভোর রাতে হার্ট ফেল করেছে। প্যানিক অ্যাটাক। বিশ্ব জুড়ে এর প্রকোপ বাড়ছে। দুর্বল মনের মানুষরা করোনা ত্রাস মেনে নিতে পারছে না। কেউ ভয়ে ভাবনায় আত্মহত্যা করছে। কেউ বা উদ্বেগে দুর্ভাবনায় যেচে নিজের মৃত্যুকে ডেকে আনছে। অথচ করোনার মৃত্যুহার কিছুই না। মাত্র দুই শতাংশ। সুস্থ হবার সম্ভাবনা পঁচানব্বই শতাংশ।”
অশোকের বয়স হয়েছিল মাত্র একচল্লিশ ।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!