সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ৬)

মজুর, মার্ক্স ও মে দিবস


মে দিবসের কথায় অগাস্ট স্পিজ (১৮৫৫ – ১৮৮৭) এর কথাও মনে রাখতে হবে। ওঁর বাবা ছিলেন জার্মানিতে বনদপ্তরের আধিকারিক। তিনি চিরতরে চোখ বুজলেন ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে। তখন স্পিজ নাবালক। বছর পনেরো বয়স। বাবা স্পিজের অল্প বয়সে মারা গেলেও মায়ের আর্থিক অবস্থা যথেষ্ট স্বচ্ছল ছিল। কিন্তু স্পিজ পাড়ি দিলেন আমেরিকায়। সেখানে অবশ‍্য তাঁর বেশ কয়েকজন আর্থিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত আত্মীয় স্বজন ছিলেন। তো স্পিজ চিকাগোয় থেকে সোফা, গদি, তোষক, বালিশ ইত‍্যাদির ওয়াড় বা খাপ তৈরির কাজে লাগলেন। ওই কাজ করতে করতে আমেরিকান সমাজে শ্রমিকদের উপর কী অকথ্য নির্যাতন ও দমন পীড়ন চলতে থাকে তা স্বচক্ষে দেখতে দেখতে একসময়ের স্বচ্ছল ঘরের ছেলে স্পিজ নিজেকে গরিব মানুষের বন্ধু হিসেবে ভাবতে শুরু করলেন। ১৮৭৭ সালে তিনি সোশিয়ালিস্ট লেবার পার্টির সঙ্গে যুক্ত হলেন। তখন বাইশ বছরের তাজা তরুণ। ক্রমে স্পিজ ওই সংগঠনের ভিতরে যে লড়াকু অংশ, তাদের নেতা হিসেবে মাথা তুললেন।
আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পরে, বিশেষতঃ দীর্ঘকাল ব‍্যাপী মন্দার পরে আবার শিল্পোৎপাদনের জোয়ার আসে। চিকাগো হয়ে ওঠে একটা গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্র। আর হাজারে হাজারে জার্মান শ্রমিক দুটো রোজগারের আশায় সেখানে পাড়ি দিতে থাকে। এইসব শ্রমিকদের গড় দৈনিক রোজগার ছিল দেড় ডলার। সপ্তাহে ছয়দিন কাজ করতে হত, আর ছয়দিনে ষাট ঘণ্টারও বেশি কাজ করতে হত। শ্রমিকরা চাইত পরিচ্ছন্ন ও ভদ্র পরিবেশে কাজ করতে। এজন্য তারা সংগঠিতও হচ্ছিল।
নাইটস অফ লেবার, বা শ্রমিকদের মুক্তিযোদ্ধা নামে সংগঠন, যারা সমাজতন্ত্রে আস্থা রাখত না, এমনকি কোনো বৈপ্লবিক কর্মসূচি পর্যন্ত গ্রহণ করা স্থগিত রেখেছিল, শুধুমাত্র দৈনিক কাজের সময় সীমাকে আট ঘণ্টার মধ্যে বেঁধে রাখার দাবিকে সমর্থন করেছিল বলেই, ১৮৮৪তে তাদের সদস‍্যসংখ‍্যা সত্তর হাজার থেকে ১৮৮৬ তে দশগুণ বেড়ে সাত লক্ষে পৌঁছে গেল। চিকাগো হয়ে উঠল নৈরাজ‍্যবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। হাজারে হাজারে জার্মান অভিবাসী শ্রমিকৈর মনের খিদে মেটাতো আরবেইটার জাইটুঙ নামে জার্মান ভাষার সংবাদপত্র।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।