অনসূয়া বললেন, শ্যামলী, তুই যদি একটু ভেবে দেখিস্ যে কত বিরুদ্ধতা মাথায় করে আম্বেদকর সাহেব এই সংবিধানখানা দাঁড় করিয়েছেন।
শ্যামলী বলল, দিদি, আম্বেদকরের ভূমিকা অস্বীকার করার প্রশ্ন নেই। ওই সঙ্গে আমি এশিয়ার মুক্তিসূর্য ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনীকেও ধন্যবাদ দেব।
অনসূয়া ভালভাবেই জানেন যে শ্যামলী ইন্দিরাজিকে ভীষণ অপছন্দ করে, এমনকি অনসূয়া নিজেও করেন, এবং বেশ বুঝতে পারছেন যে, শ্যামলী ব্যঙ্গচ্ছলেই প্রিয়দর্শিনীকে ধন্যবাদ দিচ্ছে, তবুও তিনি বললেন, ভারতের সংবিধানের প্রশ্নে ইন্দিরার কী দোষ তোর চোখে পড়ল?
শ্যামলী বলল, দোষারোপ করছি কোথায় দিদি, ইন্দিরাজিকে প্রশংসা করছি। তিনি কত মাথা খাটিয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনায় সেকুলার আর সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজ কথাটা লিখিয়ে দিলেন!
অনসূয়া গম্ভীর হয়ে বললেন, সেকুলার আর সোশিয়ালিস্টিক প্যাটার্ন এই কথাদুটো তো খারাপ নয়!
শ্যামলী বলল, হুম্, কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন রাখাও মোটেই খারাপ নয়। বধির মানুষের নাম রাখো সুকর্ণ।
অনসূয়া বললেন, তুই কি সেকুলারিজম এর বিরুদ্ধে? সোশিয়ালিজমের বিরুদ্ধে?
শ্যামলী বলল, আহাঃ, মদকে নাম দিন গঙ্গাজল, মুরগির নাম দিন রামপাখি। যতখুশি নাম দিন। কলিযুগে নামই সত্য।
অনসূয়া ভ্রূ কুঁচকে তাকান।
শ্যামলী বলে যেতে থাকে, সারা বিশ্বের জ্ঞানী গুণী লেখাপড়া জানা মানুষ সেকুলারিজম বলতে বোঝে ধর্মের সাথে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ। অন্ততপক্ষে রাষ্ট্র কোনোভাবেই কোনো ধর্মীয় স্বার্থের পৃষ্ঠপোষকতা করবে না। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর অভিধানে ওই কথার মানে দাঁড় করানো হল, সর্ব ধর্মে উৎসাহ দান। একই সাথে সাথে সেকুলারও হল, মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আলাদা ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রইল। এটাও রইল, ওটাও রইল। গাছেরও খাচ্ছি তলারও কুড়োচ্ছি। একটা নির্দিষ্ট ধর্মকে যদি কোনো রাষ্ট্র সমর্থন করে, তাকে শিক্ষিত লোকে থিওক্র্যাটিক স্টেট বলে। তাহলে অনেকগুলো ধর্মকে উৎসাহ যে রাষ্ট্র দেবে, তাকে মাল্টি থিওক্র্যাটিক স্টেট বলতে হবে। তো ইন্দিরাজি গায়ের জোরে কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন রাখলেন। তার জন্যে গায়ের জোরে অর্ডিন্যান্স আনলেন। বেয়াল্লিশতম সংবিধান সংশোধন।
দিদি, সেকুলারিজম এর একটা ইতিহাস আছে। সেকুলার হতে গেলে রেনে দেকার্তে, কবি মিলটন, দার্শনিক বারুখ স্পিনোজাকে মনে রাখতে হয়। তাদের কাজ কর্ম চিন্তা ভাবনা জানতে হয়। ইন্দিরাজির ওসব কিচ্ছু পড়াশুনা করার দরকার হয়নি। তাঁর খুশি হল, তিনি সংবিধানের পাতায় দুম করে সেকুলার আর সোশিয়ালিস্টিক প্যাটার্ন কথাটা ঢুকিয়ে দিলেন। হয়ে গেল!
অনসূয়া বললেন, শ্যামলী, তুই রেনে দেকার্তে, মিলটন আর স্পিনোজার কথা বলছিলি।
শ্যামলী উত্তর দিল, হ্যাঁ বলে ফেললাম।
রেনে দেকার্তে ছিলেন ফরাসি গণিতবিদ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক। ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে, তারপর পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তারপর যুক্তি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেবার কথা দেকার্তে বলেছিলেন। অ্যারিস্টটলের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্তির একটা পথ গড়ে বিজ্ঞানচর্চায় আধুনিকতার শুরু দেকার্তের হাতে। ইংরেজ কবি জন মিলটন তাঁর থেকে বছর তেরোর ছোটো, তিনি প্রশ্ন তুললেন, চার্চ সব ব্যাপারে নাক গলাবে কেন? মিলটন তো শুধু কবিতা লিখতেন না, সমকালীন রাজনৈতিক সংকট সমাধানে তাঁর প্রচুর চেষ্টা ছিল। ১৬৪১ সালে ইংল্যান্ডের চার্চের শাসনের খামখেয়ালিপনার বিরুদ্ধে লিখেছেন মিলটন। যুদ্ধের অজুহাতে ব্রিটিশ সরকার মতপ্রকাশের অধিকারের উপর বেড়ি পরিয়েছিল। ১৬৪৩ সালের অর্ডিন্যান্স। বলেছিল, কবি সাহিত্যিক কি লিখবে, তা আগেভাগে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে দেখিয়ে লাইসেন্স নিতে হবে। এর বিরুদ্ধে ওজস্বী বক্তৃতার ঢঙে মিলটন লিখেছেন অ্যারিওপ্যাগিটিকা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় অসামান্য বই। আজ থেকে তিনশো চল্লিশ বছর আগে ১৬৪৪ সালে, এই রকম নভেম্বর মাসে অ্যারিওপ্যাগিটিকা প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশের পর তার যে কপালে খুব আদর জুটেছিল তা নয়। পরে পরে মানুষ ভাবতে শিখে দেখল, এই বইটা চিন্তা ভাবনা করার স্বাধীনতার জন্য খুব দরকার।
আর ভাবতে বলি আমস্টারডামের বারুখ স্পিনোজার কথা। সারা জীবন লেন্সের কাচ ঘষে ঘষে কাচের গুঁড়োর ধুলোয় ফুসফুসের অসুখ বাধিয়ে চুয়াল্লিশ বছর বয়সে মরে গেলেন। সারাজীবন কোনো পুরস্কার, বা কোনো সম্মান গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। ভাল প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সুযোগ পর্যন্ত দিলে, তা নিতে অপছন্দ করেন। কেবল দূরবীন আর অণুবীক্ষণের লেন্স বানিয়ে বানিয়ে নিজেকে শেষ করে ফেললেন। মৃত্যুর পর পরই বের হল স্পিনোজার অমর বই এথিক্স। স্পিনোজা অবশ্য দেকার্তের মতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আর ইন্দিরা গান্ধী এমন সেকুলার হলেন যে ভিন্দ্রানওয়ালাকে রীতিমতো তোল্লাই দিয়ে মন্দিরের ভিতর গেড়ে বসতে দিলেন। তার সাংবাদিক খুনের কিনারা করলেন না। শেষে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সেনাবাহিনীর অনেক নিচতলা থেকে এমন একজনকে বাছাই করে তুলে আনলেন, যে লোকটা কিনা ভিন্দ্রানওয়ালার একই গাঁয়ের, একই সম্প্রদায়ের। দিদি, মানুষকে তো তার কাজ দিয়েই বুঝব! সেকুলারিজম নামের আড়ালে এই মহিলা জরুরি অবস্থা চাপিয়ে দিয়ে জঘন্য কণ্ঠরোধ করেছেন, আর যত রকম কুসংস্কার ভিতরে পুষেছেন।
এমন সময় কাজের মেয়েটি এসে বলল, তোমরা কি ঘড়ির দিকে তাকাও না? তখনই ঢং করে একটা ঘণ্টা পড়ল।