মৃদুল শ্রীমানীর ধারাবাহিক

জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

মহা প্রাচীন ভারতের ডানপিটে ভ্রূণ ( ১ – ৩)

(বিধিসম্মত সতর্কীকরণ : এই লেখা সাধু মহাত্মা ও নাবালক দের পড়া নিষেধ)

বাপ রে, কি ডানপিটে ভ্রূণ! ১

সুকুমার রায় তো মাত্র চৌত্রিশ বছর বেঁচে অতো সুন্দর লেখাগুলি রেখে গেলেন আমার জন্য। আমি তাঁর সেই ডানপিটে ছেলের আগের ঘটনাটা লিখবো।
মনে করে দেখুন আমাদের মহা প্রাচীন ভারতে কি রকম ডানপিটে ভ্রূণ হত। হ্যাঁ, মোটেও ভুল দেখছেন না। ডানপিটে ভ্রূণ। অভিমন্যুর কথাই বলি। গর্ভবতী স্ত্রীর সাথে গপ্পো গাছা করতেন অর্জুন, তৃতীয় পাণ্ডব। স্ত্রীর নাম সুভদ্রা। তো অর্জুন এক মহা ধনুর্ধর। উনি গপ্পো করবেন, আড্ডা দেবেন আর তীর ধনুকের কথা উঠবে না, সে কি হয়?
তো মায়ের গর্ভে থেকে থেকেই বাপের প্রফেশনাল স্কিল অনেকটা অর্জন করে ফেলেছিলেন অভিমন্যু। না , সুভদ্রার ছেলের আর বেশি শেখা হলো না। কিন্তু চক্র ব্যূহে ঢুকে পড়ার মতো স্কিল হয়ে গিয়েছিল। তার পর কাকা জ্যাঠারা সাতজনায় মিলে খুব মারলে গো ওকে। একটা নাবালক ছেলেকে জব্দ করতে জোট বেঁধেছিল সপ্তরথী। সাত সাতজন ভীমবল যোদ্ধা। অভিমন্যু কিন্তু ওসব মাতৃগর্ভে ভ্রূণ অবস্থায় শিখে রেখেছে। বাপ রে, কি ডানপিটে ভ্রূণ!
আর এক ডানপিটে হলেন বিশ্রবা মুনি। তিনি পুলস্ত্য মুনির ছেলে, আর সেই হিসেবে ব্রহ্মার নাতি। রাজর্ষি তৃণবিন্দুর কন্যা হবির্ভু দেবীর গর্ভে বিশ্রবা জন্মেছিলেন। এই মুনি যখন জন্মাচ্ছেন, মাতৃ জঠরের অন্ধকার থেকে আলোয় ভূমিষ্ঠ হচ্ছেন, তখনই অনেক গুলি বেদ তাঁর পড়া হয়ে গিয়েছে। বেদ পাঠ করতে করতে এই বিশ্রবা জন্মেছিলেন। এই মুনির ছেলে কুবের। তিনি দেববর্ণিনীর গর্ভে জন্মান। বিশ্রবার সবচেয়ে নামকরা ছেলে হল রাবণ। সে জন্মায় কৈকসীর গর্ভে। এই হল বেদ পাঠ করতে করতে জন্মানো ভ্রূণ। বাপ রে, কি ডানপিটে ভ্রূণ!
আর এক ডানপিটে হলেন অষ্টাবক্র মুনি। তাঁর দেহ আট খানা জায়গায় বাঁকাচোরা হয়ে যায় তাঁর নিজের বাপ কহোড় মুনির অভিশাপে। কহোড় ছিলেন মহর্ষি উদ্দালকের শিষ্য। তিনি কহোড়ের সাথে নিজ কন্যা সুমতির বিয়ে দেন। সুমতির আরেক নাম সুজাতা। সুমতি গর্ভবতী হলেন। সুমতি মুনির কন্যা, মুনির ঘরণী। আশ্রমে থাকা মেয়ে, তপোবনের বউ। বেদপাঠ শুনতে শুনতে গর্ভেই সুমতির ছেলে মহা পণ্ডিত ও বেদবিৎ হয়ে পড়ে। একদিন কহোড় বেদ পড়ছেন, সুমতি, মুনির গর্ভবতী বউ কাছে বসে বেদপাঠ শুনছেন, এমন সময় গর্ভস্থ শিশু তার পিতা কহোড়ের বেদপাঠ অশুদ্ধ বলে উঠল। ব্যস, তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন কহোড়। আরে ব্যাটা, তোর এখনো জন্মাতে দেরি আছে, আর এর মধ্যেই বাপের বেদপাঠের ত্রুটি ধরছিস। তোর মন মেজাজ যদি গর্ভাবস্থায় এত বাঁকা, তাহলে তোর আট জায়গায় বাঁকা শরীর নিয়ে জন্ম হোক। তাই হল। অষ্টাবক্র বিকলাঙ্গ শরীর নিয়ে ভূমিষ্ঠ হলেন। পরে অবশ্য কহোড়ের ভুল ভাঙে। কেননা এই তার্কিক পুত্রই তাঁকে ঘোর বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। বাপ রে, কি ডানপিটে ভ্রূণ!

বাপ রে, কি ডানপিটে ভ্রূণ! ২

আমাদের সময়ে যেমন সব গুরুরা আছেন, আশারাম বাপু, গুরমিত রাম রহিম, সব এক একটি অতীব বদমাশ ধর্ষণ বিশেষজ্ঞ, মহা প্রাচীন ভারতেও তেমন বিশিষ্ট ধর্ষক গুরুরা ছিলেন। দেবগুরু বৃহস্পতি ছিলেন এমন একজন অতি বিশিষ্ট ধর্ষক গুরু। তিনি তাঁর বৌদিকে গর্ভবতী অবস্থায় ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছিলেন। বৌদির নাম মমতা। তো মমতা বৌদি আসলে বৃহস্পতির বড় দাদা উতথ্যের স্ত্রী। উতথ্য ও বৃহস্পতি দুজনেই সপ্তর্ষির অন্যতম অঙ্গিরার পুত্র। অঙ্গিরার বিয়ে হয়েছিল কর্দম ঋষির কন্যার সাথে। সে কন্যাটির নাম ছিল শ্রদ্ধা। বৃহস্পতি ও তার দাদা উতথ্য দুই জনেই এই শ্রদ্ধার সন্তান।
তো বৃহস্পতি দেবগুরু। অতীব নামী পুরোহিত। তাঁর ইচ্ছে হল নিজের বড় দাদার স্ত্রী মমতার সঙ্গে যৌন সঙ্গম করবেন। এই ইচ্ছে মমতার কাছে প্রকাশ করলে মমতা খুব যত্নের সাথে দেবর বৃহস্পতিকে বুঝিয়ে বললেন আমি গর্ভবতী। তুমি আমার সাথে এমন আচরণ কোরো না।
বৃহস্পতির মাথায় কি মাতৃসমা বউদির যুক্তি ঢোকে। তিনি সবলে মমতাকে পোশাক হীন করে নিয়ে সেই গর্ভবতী নারীর স্ত্রী অঙ্গে নিজ লিঙ্গ প্রবেশের তীব্র চেষ্টা করে চললেন। শুক্র পাত পর্যন্ত হয়ে গেল। মমতার কান্নাকাটিতে তাঁর গর্ভস্থ ভ্রূণ নিজের পা দিয়ে মাতৃ অঙ্গে কাকার শুক্র প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে দিল। বৃহস্পতির শুক্র আর মমতার যোনিপথে অগ্রসর হতে পারল না। তা মাটিতে পড়ে গেল। পরে সেই বীর্য থেকে জন্ম নেবেন ভরদ্বাজ মুনি। গর্ভস্থ ভ্রূণের এই দাপট দেখে দেবগুরু বৃহস্পতি খুব ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে অভিশাপ দিলেন। বললেন তুমি আমার শুক্রকে মাটিতে ফেলে দিলে। তুমি দীর্ঘ তামসে প্রবেশ করো। অর্থাৎ অন্ধ হয়ে জন্মাও। মমতার সেই সন্তানের নাম হল দীর্ঘতমা।
অন্ধ হয়ে জন্মালেও এমন ভ্রূণের গল্প আর দুটি খুঁজে বের করুন তো!

বাপ রে, কী ডানপিটে ভ্রূণ! ৩

মহা প্রাচীন ভারতে মাতৃগর্ভে ভ্রূণ অবস্থায় থাকাকালীন মহা মুনিরা বেদ মুখস্থ করে ফেলতে পারতেন, উদাহরণ রাবণের পিতা বিশ্ৰবা মুনি। বেদ ঠিক কী রকম করে উচ্চারণ করতে হয়, তার খুঁটিনাটি জানতেন। উদাহরণ কহোড় পুত্র অষ্টাবক্র মুনি। নারী ধর্ষণ হলে মনুষ্যত্বের দাবিতে প্রাণপণে বাধা দিতে হয়, আর বেশিরভাগ মেয়ে, যাঁরা ধর্ষিত হন, পরিচিত লোকের হাতেই হন, এই কলিযুগীয় তথ্যটা তাঁরা জানতেন। উদাহরণ উতথ্য পুত্র দীর্ঘতমা মুনি। ক্ষত্রিয়ের মধ্যে অসামান্য স্মৃতিধর অভিমন্যুকে ভুলতে পারব না। চক্রব্যূহে কি করে ঢুকতে হয়, সেটা তিনি মা সুভদ্রার গর্ভে বসেই শিখে রেখেছিলেন।
তো আজ যে মহামুনি কে স্মরণ করে দিনের সূচনা করছি তিনি হলেন মহর্ষি ভৃগুর পুত্র চ্যবন। তাঁর গর্ভধারিণী মায়ের নাম ছিল পুলোমা। এই পুলোমার একটি প্রাক বিবাহ ঘোটালা ছিল। পুলোমার একটি প্রেমিক ছিলেন। কি জানেন, সে আবার ছিল রাক্ষস। অদ্ভুত ব্যাপার, প্রেমিকটির নামও ছিল পুলোমা। তো রাক্ষস পুলোমা এই মেয়ে পুলোমা কে খুব ভালোবাসত। মনে মনে নিজের স্ত্রী হিসেবেই জানত। মেয়ের বাপও খানিক খানিক জানতেন। কিন্তু মাঝখানে দাঁড়ালেন ভৃগু মুনি। তিনি ব্রহ্মার যজ্ঞসম্ভব পুত্র। তাঁর পেডিগ্রির কথাটা ভেবে দেখুন। ভৃগুর মতো পাত্র হাতছাড়া করা যায়? তা ছাড়া ব্রহ্মার পুত্রকে কন্যাদান করলে বিনিময়ে ভাল বর পাবার আশাও ছিল। রাক্ষসের ঘরে মেয়ে দিলে বর প্রাপ্তির কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তো কন্যার হিসেবি বাপ মেয়ের রাক্ষস প্রেমিককে এড়িয়ে ভৃগুর সাথেই রীতিমতো বিয়ের আয়োজন করলেন।
তার পর থেকে প্রেমিক রাক্ষস তক্কে তক্কে থাকে। কি করে পরের হাত থেকে ভালবাসার মানুষকে উদ্ধার করবে এই তার ধ্যান জ্ঞান। একদিন গর্ভবতী স্ত্রীকে আশ্রমে একা রেখে ভৃগু মুনি গিয়েছেন স্নান করতে। বউকে একা রেখে গেলেও তাঁরা মহা প্রাচীন ভারতীয় কায়দায় নজরদারি চালাতেন। তো প্রেমিক পুলোমা অতটা আন্দাজ করে নি। সে আশ্রমে মেয়ে পুলোমা একা, আর কাছে পিঠে ভৃগুমুনি নেই দেখে বরাহ অর্থাৎ শূকরের রূপ ধরে পুরোনো প্রেমিকাকে নিয়ে পিঠটান দিল।
কিন্তু রাক্ষস আন্দাজ করতে পারে নি যে ভৃগুমুনি তার ভালবাসার মেয়েটির গর্ভে কাকে রেখেছেন। গর্ভস্থ পুত্র তার মাকে একটা রাক্ষস নিয়ে পালাচ্ছে দেখে হা রে রে রে করে বেরিয়ে পড়লেন। তার তেজে পুলোমা রাক্ষস পুড়ে মোলো। এই গর্ভস্থ শিশু হলেন বিখ্যাত চ্যবন মুনি।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!