১৯২০ সালে আজকের দিনে জার্মানি তে নাৎসি পার্টি গড়ে ওঠে। নাৎসিরা গোটা দেশটাকে একটা ছাঁচে ঢালতে চেয়েছিল। জন্মের পর প্রথম দশটা বছর নাৎসি পার্টি বড় পুঁজির বিরুদ্ধে বলত, বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে কথা বলত, বড় ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে বলত। কিন্তু ১৯৩০এর দশকে সে সব পাট চুকিয়ে সোজাসুজি ইহুদিবিদ্বেষী আর মার্কসবাদ বিরোধী হয়ে উঠল।
নাৎসি পার্টির জন্মই হয়েছিল কমিউনিজম থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে আনার জন্য। হিটলার নাকি ইহুদিদের মানুষের পর্যায়েই মনে করত না। গেগেনরেস বলত।
গেগেনরেস মানে না-মানুষ।
নাৎসি তাত্ত্বিকরা মনে করতেন, ইহুদিরা পোকামাকড় জীবাণুর স্তরের প্রাণী। এদের মেরে ফেলাই এদের প্রতি সুবিচার করা। আর ভাবতেন ইহুদিরা বদমাইশি করে মার্কসবাদ সৃষ্টি করেছে জার্মানদের বাঁশ দেবার জন্য।
১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারিতে অ্যাডলফ হিটলারকে জার্মানির চ্যান্সেলর বলে ঘোষণা করা হয়। জার্মানির প্রেসিডেন্ট পল ভন হিন্ডেনবুর্গ হিটলারকে চ্যান্সেলর পদে অভিষিক্ত করেন।
১৯২১ সালের ২৯ জুলাই আন্তন ড্রেক্সলারকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে হিটলার পার্টি চেয়ারম্যান হলেন। ক্রমে নিজেকে ফুয়েরার বা সর্বময় নেতা বলে ঘোষণা করে নিলেন। সেটা ১৯২৫। হিটলার নানা ভাবে হিন্ডেনবুর্গকে কায়দা করে বুঝিয়ে তাঁকে দিয়ে নিজেকে জার্মানির চ্যান্সেলর ঘোষণা করান। আর তারপরেই সাতাশে ফেব্রুয়ারিতে রাইখস্ট্যাগে আগুন লাগার ছুতোয় বিরোধী রাজনৈতিক দলের লোকেদের উপর সাংঘাতিক দমন পীড়ন নামিয়ে আনলেন। নাগরিক অধিকারগুলো কেড়ে নিলেন। বিশেষ করে ইহুদিদের আইনি, অর্থনৈতিক, আর সামাজিক অধিকার গুলো কেড়ে নিলেন হিটলার। তেত্রিশ সালের পয়লা এপ্রিল ইহুদিদের ব্যবসা করার উপর জনগণের বয়কট ডাকা হল, সাত এপ্রিল আইন করা হল যে, সিভিল সার্ভিসে ইহুদিদের জায়গা নেই। তারপর বলা হল যে, ইহুদিদের ওকালতি জজিয়তি করা বন্ধ, সংবাদপত্র পরিচালনা বা সম্পাদনা বন্ধ, প্রেস ক্লাব বা জার্ণালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন করা বন্ধ। এমনকি ইহুদিদের কোনো ফার্ম বা খামারবাড়ির মালিক হবার অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ওই তেত্রিশ সালের মার্চে সাইলেশিয়া এলাকায় আদালত চত্বরে ঢুকে একদল লোক ইহুদি আইনজীবীদের বেধড়ক পেটাল। ড্রেসডেন এলাকায় আদালতে শুনানি চলাকালীন সওয়ালরত ইহুদি আইনজীবী, বিচারের কাজে ব্যস্ত বিচারককে কলার ধরে চড় থাপ্পড় কিল ঘুঁষি মারতে মারতে কোর্টরুম থেকে টেনে বের করে এনেছিল।তেত্রিশ সালে জার্মানিতে ইহুদি পরিচালিত বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ছিল পঞ্চাশ হাজার। আর হিটলারী জমানায় ওদের চাপ দেওয়া হল, এই ব্যবসা জার্মানদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। ১৯৩৯ এর এপ্রিল মাসে ইহুদি মালিকানার ব্যবসা কমে দাঁড়ায় মোটামুটি সাত হাজারটি।
১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে অ্যাডলফ হিটলারের পরিকল্পনায় নাৎসি জার্মানি আর জার্মান অধিকৃত ইউরোপ আর সাঙ্গোপাঙ্গ দেশগুলিতে প্রায় ছয় মিলিয়ন ইহুদিকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়। মিলিয়ন মানে দশলক্ষ। এই যে ষাট লাখ ইহুদিকে হিটলারি শয়তানিতে মরতে হল, এটা গোটা ইউরোপের ইহুদি জনগোষ্ঠীর তিনভাগের দুই ভাগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইহুদি জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এরমধ্যে পোল্যাণ্ডে প্রায় পঁয়ত্রিশ লাখ, হাঙ্গেরিতে লাখ আষ্টেক, জার্মানিতে সোয়া পাঁচ লাখ, ফ্রান্সে সাড়ে তিন লাখ, চেকোশ্লোভাকিয়াতেও সাড়ে তিন লাখ, অষ্ট্রিয়ায় দু লাখের সামান্য একটু কম, নেদারল্যান্ডসে লাখ দেড়েকের একটু কম ইহুদি ছিল। রুমানিয়ায় ছিল আট লক্ষ ইহুদি সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিল ত্রিশ লাখ ইহুদি।
১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হলেন। নাৎসিরা জার্মানির রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করল। জার্মান নেতারা বললেন, জার্মানিতে জনতার শক্তি জেগেছে। একে তাঁরা বললেন “ভোল্কজেমিইনশ্যাফট” । নাৎসিরা মানুষকে দুভাগে ভাগ করল। যারা তাদের পছন্দের, তাদের নাম দেওয়া হল “ভোল্কজেনোসেন” বা জাতীয় সহযোদ্ধা। আর অপছন্দের লোকদের শত্রু বলে দাগিয়ে দিয়ে নাম দেওয়া হল “জেমিইনশ্যাফটফ্রেমদি”। মানে শত্তুর।
নাৎসি পার্টি জাতিবিদ্বেষ ছড়ালো ভয়ঙ্কর ভাবে। তারা ইহুদি আর রোমাদের শত্রু বলল। আর মার্কসবাদী, উদারপন্থী এমন কি খৃস্টানদের পর্যন্ত শত্রু বলে দিন। শত্রু মানে জাতশত্রু। হাড়ে হাড়ে শত্রুতা।
গোটা মধ্যযুগ ধরে খৃস্টীয় ধর্মতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ইহুদিদের উপর অত্যাচার হয়েছে। খৃস্টীয় ধর্মতত্ত্ব বলে ইহুদিরা যিশুকে খুন করেছে। রিফর্মেশনের পরেও ক্যাথলিক আর লুথেরান খৃস্টানরা ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে গিয়েছে। এমনকি অনেকেই বলেন, ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’ নাটকে উইলিয়াম শেক্সপিয়র যে “শাইলক” চরিত্রটি দেখিয়েছেন, তা ইহুদি জনগোষ্ঠীকে হেয় করে। এই যে ইহুদিদের প্রতি ঘৃণার মনোভাব, এটা চাগিয়ে তোলেন দার্শনিক হাউসটন স্টুয়ার্ট চেম্বারলেন আর পল ডি ল্যাগার্ড। বিজ্ঞানের ফোঁটা তিলক পরিয়ে একটা অপবিজ্ঞানকে বাজারে হাজির করেছিলেন ওঁরা। আর্য জাতি সব জাতির সেরা এবং কারা আর্য, তাও তাঁরা স্থির করে দিয়েছিলেন। ইহুদিদের জঘন্যতম পর্যায়ের জীব বলে গণ্য করতে বলা হল। গোটা জার্মানি জুড়ে এই ধারণাটা খুব জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু হিটলারের আমলে এই জাতিবিদ্বেষ একটা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে ফেলল। দেখা দিল কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, গ্যাসচেম্বার। মানুষের চর্বি দিয়ে সাবান বানানো, উদ্ভট সব মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট, ভাবলেই মনখারাপ হয়।
উগ্র দক্ষিণপন্থী নাৎসি পার্টির সূচনা আন্তন ড্রেক্সলারের হাতে। তারিখটা ছিল ১৯২০ সালের চব্বিশে ফেব্রুয়ারি। তবে সূচনার আগেও একটা সূচনা ছিল। এই আন্তন ড্রেক্সলার লোকটা আসলে একটা ছোটখাটো তালা মিস্ত্রি ছিল। আর “ফাদারল্যাণ্ড পার্টি” নামে একটা দক্ষিণপন্থী পার্টি করত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে, ১৯১৮ সালের ৭ মার্চ একটা ছোট পলিটিক্যাল গ্রুপ গড়ে ওঠে। ওর একটা খটোমটো জার্মান নাম আছে। ওর নামটা ইংরেজি ভাষায় বলতে হলে ‘ফ্রি ওয়ার্কার্স কমিটি ফর এ গুড পিস’ বলতে হবে। মিউনিখ শহরে ড্রেক্সলার এই সংগঠনের একটা শাখা খোলেন।
এই সংগঠনের লোকজন বিশ্বাস করত জার্মানরা প্রকৃত আর্যজাতি। আর ইহুদি লোকগুলো নরকের কীট। এইজন্য ইহুদিদের সভ্যজগৎ থেকে বিতাড়িত করা দরকার বলে মনে করত জার্মানরা। এই যে নিজেদেরকে আর্যজাতি বলে আখ্যা দিল জার্মানরা, এই সূত্রে নিজেদেরকে বলল “হেরেনভোল্ক”।
ডায়াট্রিশ এককার্ট, ফেলিক্স গ্রাফ ভন বোথমার আর কার্ল হ্যারার প্রমুখের সহযোগিতা নিয়ে আন্তন ড্রেক্সলার একটা পলিটিক্যাল ওয়ার্কার্স সার্কেল গড়ে তোলেন। তারপর ১৯১৯ সালের ০৫ জানুয়ারি তারিখে ওই ফ্রি ওয়ার্কার্স কমিটি ফর এ গুড পিস আর পলিটিক্যাল ওয়ার্কার্স সার্কেল একসাথে জোড়াতাড়া দিয়ে ড্রেক্সলার জার্মান সোশিয়ালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি গড়ে তোলেন। ক’দিন বাদে পার্টির নামে “সোশিয়ালিস্ট” শব্দটা নিয়ে বাদপ্রতিবাদ করেন কার্ল হ্যারার। তখন পার্টির নাম থেকে সোশিয়ালিস্ট শব্দটা ছেঁটে ফেলে জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি দাঁড়ায়। এটাই কদিন বাদে ১৯২০ সালে নাৎসিদল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নাৎসি শব্দটা হিটলারের বিপক্ষের লোকজন ঘৃণাভরে তৈরি করেছে। আসল নামটা ছিল এন এস ডি এ পি, ন্যাশনাল সোশিয়ালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি।
অ্যাডলফ হিটলারের জন্ম ১৮৮৯ সালের এপ্রিলে। কুড়ি তারিখে। অতি সাধারণ অস্ট্রিয়ান জার্মান পরিবারের সন্তান হিটলার সিকসটিনথ ব্যাভেরিয়ান রেজিমেন্টে নিচতলার সৈনিক ছিলেন। জার্মান ভাষায় বলতে হবে, গেফ্রেইটার। এই সাদামাটা সৈনিক লোকটা একটা অভ্যুত্থান ঘটাবার চেষ্টা করে ধরা পড়েন, আর ১৯২৩ সালে জেলে যান।
জেলে বসে বসে ডিকটেশন দিয়ে হিটলার একটা বই লেখান। মেইন ক্যাম্পফ। আমাদের লাইব্রেরিতে আছে। খুব নামকরা বই। তবে বইটার নাম আসলে মেইন ক্যাম্পফ ছিল না। ওটা প্রকাশকের উর্বর মস্তিষ্কের অবদান। হিটলার তাঁর বইটার নাম দিয়েছিলেন ‘ফোর অ্যাণ্ড হাফ ইয়ার্স অফ স্ট্রাগল এগেইনস্ট লাইজ় স্টুপিডিটি অ্যাণ্ড কাওয়ার্ডিস।’ প্রকাশন সংস্থার কর্তা ম্যাক্স আমান ওই নামকে কেটে ছেঁটে ‘মেইন ক্যাম্পফ’ করে দিলেন। ও কথাটার মানে হল আমার সংগ্রাম। বইটা প্রথম বের হয় ১৯২৫ সালের ১৮ জুলাই। সেটা জার্মান ভাষায়। তার পর বৎসর ১৯২৬ সালে দ্বিতীয় খণ্ড বের হয়। ১৯৩৩ সালের অক্টোবরের তের তারিখে এই বইটার একটা সংক্ষিপ্ত ইংরেজি সংস্করণ বের হয়। ১৯৩৯ সালে, যখন হিটলার তাঁর ক্ষমতার মধ্যগগনে তখন ইংরেজিতে বইটার পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ বেরোয়।
আজ নাৎসি পার্টির জন্মদিন। একশো বছর আগে ১৯২০ সালের চব্বিশ ফেব্রুয়ারিতে জন্ম। আর পঁচিশ বছর পর ১৯৪৫ সালে দশ অক্টোবর ওই নাৎসি জমানা শেষ। তবে হিটলারি মানসিক গঠন আজও আছে। জাতিবিদ্বেষ, উগ্র জাতীয়তাবাদী হুমকি আজও আছে। ওই পথে হিটলারের জন্ম। আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে।