সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ৫)

মজুর, মার্ক্স ও মে দিবস
৫
১৮৭১ সালে পারী কমিউনের ঘটনা সদ্যোতরুণ অ্যালবার্ট পারসনসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। অ্যালবার্ট নিজেকে কমিউনিস্ট বিপ্লবী হিসেবে ভাবতে শুরু করেন। পরের বছর ১৮৭২ সালে তিনি এবং লুসি গঞ্জালেস বিবাহ করেন।
শুধুমাত্র নিজেকে কমিউনিস্ট ভেবেই অ্যালবার্ট ক্ষান্ত হননি, শ্রমিকশ্রেণির লড়াকু সংগঠন গড়ে তুলতেও আত্মনিয়োগ করেছেন।
আমেরিকার সোশিয়ালিস্ট লেবার পার্টি ১৮৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নিউ জার্সির নেওয়ার্কে একটি কনভেনশন আয়োজন করেন। অ্যালবার্ট সেখানে ডেলিগেট হিসাবে যোগদান করেন।
আমেরিকার ওয়ার্কমেনস পার্টি নির্বাচন আয়োজন করেছিল সেখানে প্রদত্ত ভোটের ছয়ভাগের একভাগ অর্জন করে অ্যালবার্ট চিকাগো শহরের অল্ডারম্যান হন। ১৮৭৭ এ এই গ্রেট রেলওয়ে ধর্মঘট হয়। তার আয়োজন করতে চিকাগো মার্কেট স্ট্রিট সমাবেশে অ্যালবার্ট বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হন। ১৮৭৯ তে বছরের শেষের দিকে সোশিয়ালিস্ট লেবার পার্টির দ্বিতীয় জাতীয় কনভেনশন হয়েছিল। অ্যালবার্ট সেই কনভেনশনে অংশগ্রহণ করেন।
১৮৮১ তে একটি নতুন বিপ্লবী সংগঠন মাথা তুলল। ইন্টারন্যাশনাল রেভলিউশনারি সোশিয়ালিস্ট। এই সংগঠনের সূচনাপর্বে পারসনস ডেলিগেট ছিলেন। ১৮৮৩ র অক্টোবরে পিটসবার্গে নতুন করে আরেকটি সংগঠন মাথা তুলল। ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং পিপলস অ্যাসোসিয়েশন। অ্যালবার্ট তাদের কনভেনশনেও ডেলিগেট হলেন।
কিন্তু ক্রমেই তিনি প্রথাগত শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতি শ্রদ্ধা হারাচ্ছিলেন। তথাকথিত শ্রমিক ইউনিয়নের ভিতরের অসংগতিগুলি, নিয়মতান্ত্রিকতাগুলি অ্যালবার্টকে ক্লান্ত করছিল। তিনি ক্রমশঃ প্রথাগত শ্রমিক ইউনিয়নের বিভিন্ন ধরনের কাজের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে দিনবদলের উপযোগী কোনো সংগঠন তৈরি করতে চাইছিলেন। এই লক্ষ্যে অ্যালবার্ট পারসনস দি অ্যালার্ম নামে একটি পত্রিকা বের করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরের চার তারিখে প্রকাশ পেল অ্যালবার্ট পারসনসের দি অ্যালার্ম। চার পেজ ব্রডশীটের একটা পত্রিকা। শিরোনামের কাছে লেখা থাকত এ সোশিয়ালিস্টিক উইকলি, একটি সমাজতন্ত্রী সাপ্তাহিক। আরো লেখা থাকত, দুনিয়ার মজদুর, এক হও। অ্যালবার্টের কাগজে লুসি পারসনস নিয়মিত লিখতেন। সে কাগজে লেখা থাকত, দুনিয়ার মজদুর, এক হও।
পনেরো হাজার কপি ছাপা হয়েছিল নবীন এই পত্রিকাটি। আপোসহীন বৈপ্লবিক স্পর্ধায় বিশ্বাসী অ্যালবার্ট নিজেকে নৈরাজ্যবাদী বলতেন। নৈরাজ্যবাদের ব্যাখ্যাও অ্যালবার্ট দিয়েছিলেন তাঁর কাগজে। বলেছিলেন, একজন নৈরাজ্যবাদীও শান্তিতে বিশ্বাস করে, আস্থা রাখে, কিন্তু স্বাধীনতাকে বলি দিয়ে, মুক্তিকে বিসর্জন দিয়ে যে নিবীর্যের শান্তি, তাতে সে বিশ্বাস করে না।
১৮৮৬র শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছিলেন তাঁরা। মে মাসের পহেলা মিশিগান অ্যাভিনিউ ধরে আশি হাজার মানুষের বলিষ্ঠ মিছিল চলেছে। তার পুরোভাগে রয়েছেন লুসি এবং অ্যালবার্ট। সঙ্গে তাঁদের দুই শিশুসন্তান। নিজের সংসার ও সন্তানদের নিরাপদ দূরত্বে সুরক্ষিত রেখে যে একধরনের শৌখিন বামপন্থার চর্চা দেশে দেশে দেখা যায়, এই দম্পতি, লুসি ও অ্যালবার্ট, তার থেকে বহুদূরে ছিলেন।