জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর।
বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন।
চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।
আজ ভারতের জাতীয় পতাকাকে স্মরণ করি
হেঁটে চলেন এক বৃদ্ধা। হাতে তাঁর স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষার পতাকা। মিছিলের পুরোভাগে তিনি। অহিংস স্বাধীনতাকামীদের মিছিল। পুলিশ গুলি চালিয়েছিল অহিংস মিছিলের উপরে। যখন ক্ষমতায় যে, পুলিশ তখন তার। পুলিশ সর্বদা শাসকের। ইংরেজ শাসকের নির্দেশে অহিংস মিছিলের উপর গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। পুরোভাগে ছিলেন যে বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা, লোকের মুখে গান্ধিবুড়ি, গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন, তবুও পতাকাকে উচ্চে তুলে রাখলেন। পতাকার কথা ভাবলে, মিছিলের কথা ভাবলে, আমার গান্ধিবুড়িকে মনে পড়ে। অহিংসাব্রত, অনমনীয় মনোভাব আর আত্মবলিদান, সব মিলে মিশে আমার কাছে ওই পতাকাধারিণী মাতৃমূর্তি। যে মা ছেলেদের ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকতে বলেন না, যে মা সংগ্রামে মিছিলে আগুয়ান।
আজ বাইশ জুলাই। ১৯৪৭ সালে বাইশ জুলাই তারিখে আজ যাকে আমরা ভারতীয় জাতীয় পতাকা বলি, তা কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। জাতীয় পতাকা শুধুমাত্র একটি কাপড়ের টুকরো নয়, ওটা সমগ্র জাতির মর্যাদাবোধ, ঐক্য ও সংহতির প্রতীক।
ভারতীয় জাতীয় পতাকার গড়ে ওঠার ইতিহাস আছে। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় থেকেই এই গোটা জাতির ঐক্য ও মেলবন্ধনের প্রতীক হিসেবে পতাকার কথা ভাবা হয়। আমাদের স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষাটি সংহত হতে হতে পতাকাও বিকশিত বিবর্তিত হয়ে উঠেছে।
ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ। আর প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ। জগৎবিখ্যাত শিক্ষাবিদ দার্শনিক ছিলেন এই রাধাকৃষ্ণণ। তিনি ভারতের এই জাতীয় পতাকার বর্ণবিন্যাসের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। অনেকগুলি পতাকার ডিজাইনের সঙ্গে বর্তমানের পতাকার ডিজাইন, বর্ণবিন্যাস কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলির কাছে পেশ করেছিলেন পিঙ্গলি ভেঙ্কাইয়া।
এই পতাকার মর্যাদা রক্ষা করতে দার্শনিক শিক্ষাবিদ রাধাকৃষ্ণণ নির্লোভ সৎ দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতাদের প্রতীক হিসেবে গৈরিক বর্ণের ব্যাখ্যা করে শিবাজির ভগোয়া ঝাণ্ডাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছিলেন।
দেশে আবার নির্লোভ সৎ দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্ম হোক। দেশের মাতৃজাতির নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে চিহ্নিত করা হোক।
এই সুযোগে ১৩১৮ বঙ্গাব্দে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারতবিধাতা গানটিও স্মরণ করব। এই গানটি জাতীয় বীর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন। পরে স্বাধীন দেশ ভারতবিধাতা গানের মোট পাঁচটি স্তবকের প্রথমটি জাতীয় গাথা বা ন্যাশনাল অ্যানথেম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কৃত বন্দে মাতরম্ হল ভারতের জাতীয় সঙ্গীত বা ন্যাশনাল সঙ। বন্দে মাতরম বলতে বলতে কত যে স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদ হয়েছেন, তার কোনো সংখ্যাগণনা সম্ভব নয়। জেলখানায় অমানুষিক নির্যাতনের প্রহরেও বন্দে মাতরম্ ধ্বনি দিয়ে নিজেকে অটল রেখেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। ভারতবিধাতা গানটি পড়লে এক স্নেহময়ী মাতার ছবি মানসচক্ষে ভেসে ওঠে, যিনি সমস্ত সংকট ও দুঃখের ত্রাতা। বাংলা ভাষা সাহিত্য নিয়মিত পঠন পাঠন ও অনুধ্যানের অভ্যাস থাকলে বোঝা যায়, এই ভারতবিধাতা কবিতা কোনো রক্ত মাংসের শাসকের উদ্দেশে লেখা হতেই পারে না।
জাতীয় পতাকা ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে প্রণাম জানাই।