স্পিনোজার কথা মনে করতে চেষ্টা করে শ্যামলী। একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখটা বাঙালির কাছে খুব স্মরণীয়। বাংলা ক্যালেণ্ডারে তারিখটা ছিল ফাল্গুনের আট । সন ১৩৫৮। বাংলা ভাষা ব্যবহার করার ন্যায়সঙ্গত অধিকার দাবি নিয়ে আন্দোলন হলেও তারিখটাকে বাঙালি একুশে ফেব্রুয়ারি বলেই চিরস্মরণীয় করে তুলেছে। বাংলাভাষার অবস্থান নিয়ে বাঙালির আত্ম-অন্বেষায় যে ভাষাচেতনার উন্মেষ ঘটে, তারই সূত্র ধরে বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তার চরম প্রকাশ ঘটে।
ওইদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পাকিস্তানী শাসকের জারি করা ১৪৪ ধারা অমান্য করে প্রকাশ্য রাজপথে বেরিয়ে এলে হিংস্র হয়ে উঠে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালামসহ কয়েকজন ছাত্রযুবা হতাহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকার স্বাধীনতা পিপাসু নাগরিকগণ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হন। পাকিস্তানি শাসকের অকথ্য নির্যাতন সত্ত্বেও ছাত্রদের পাশাপাশি একেবারে মেহনতি জনতা ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুনরায় রাজপথে নেমে আসে। তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় অংশগ্রহণ করে। ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে প্রতিবাদী জনতা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে তোলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রসমাজের উপর পাকিস্তানি শাসকের এহন নির্মম নির্যাতন ও গুলি করে হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন আরও বেগবান হয়।
কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখটা আরো কোনো কারণে স্মরণীয় হয়ে উঠলেও পারত। ১৬৭৭ সালে বারুখ স্পিনোজা ওইদিন প্রয়াত হন।
বাড়ির ছত্রছায়া থেকেই শুধু নয়, অভ্যস্ত জীবনমান থেকেও সটান বেরিয়ে এসে বাইশে পা দেওয়া তরুণী একটি মেয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা চালাতে চালাতে ভাবছিল বারুখ স্পিনোজাও তারই মতো বয়সে নিজের পরিবার, আর নিজের সমাজ থেকে নির্মমভাবে বিতাড়িত হয়েছিলেন নিজস্ব জীবনবোধের কারণে। ভগবান সম্বন্ধে যুবকটির উপলব্ধি আর হিব্রু ভাষায় লেখা বাইবেলের পবিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে স্পিনোজা তাঁর পরিবেশের ধর্মনেতাদের চক্ষুশূল হয়েছিলেন। ইহুদি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ স্পিনোজার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে দেন।
ছয় বছর বয়সে জন্মদাত্রী জননীকে হারিয়েছেন স্পিনোজা। প্রথাগত ইহুদি ধর্মীয় পরিমণ্ডলেই বড় হচ্ছিলেন তিনি। ধর্মীয় শিক্ষা সেই পরিবেশে অবশ্যকর্তব্য। ছোটবেলা থেকেই উজ্জ্বল ও মেধাবী ছাত্র হিসেবে শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেলেছিলেন। শিক্ষকরা আশা করছিলেন বড় হয়ে জাঁদরেল ধর্মনেতা বনবেন স্পিনোজা। কিন্তু বড় দাদা ইশাকের মৃত্যুর কারণে পারিবারিক ব্যবসার কাজে মাথা দেবার দরকারে সতেরো বছর বয়সেই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনায় ইতি পড়ল বারুখের। তা বলে কি সত্যি সত্যি তাঁর পড়াশুনা বন্ধ হল? বছর কুড়ি বয়সে তিনি বিখ্যাত নাস্তিক ফ্রান্সিস ভ্যান ডেন এণ্ডেন এর সংস্পর্শে আসেন। এণ্ডেন শুধুমাত্র নাস্তিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুক্ত চিন্তায় অভ্যস্ত একজন সতেজ সক্রিয় মানুষ। এহেন ফ্রান্সিস এণ্ডেনকে পথপ্রদর্শক হিসেবে পেয়ে বারুখের প্রতিবাদী যৌবন দেদীপ্যমান হয়ে উঠল।
একুশ মানে লড়াই। লড়াইয়ের একুশ। একুশ বছর বয়সে ১৫৬৪ সালে বারুখের বাবা মিগুয়েল চোখ বুজলেন। বাবার মৃত্যুতে বারুখ ইহুদি ধর্মীয় অনুশাসনকে মান্যতা দিয়ে এগারো মাস ধরে মৃতের উদ্দেশে মন্ত্রপাঠ ইত্যাদি করেছিলেন। তবুও তাঁর বোন রেবেকা মৃত বাবার সম্পত্তিতে বারুখকে অনধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করে মামলা করেন। রেবেকা চেয়েছিলেন বারুখের অংশটুকু তিনি একাই গ্রাস করবেন। পার্থিব সম্পত্তির প্রতি কিছুমাত্র লোভ না থাকলেও, রেবেকার অন্যায় উদগ্র লোভকে প্রতিহত করবেন বলেই বারুখ বোনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। প্রশ্নটা বারুখের কাছে অর্থনৈতিক ছিল না। সম্পূর্ণভাবে নৈতিক কারণে তিনি বোনের বিরুদ্ধে আদালতে যান। এবং মামলায় বারুখ জয়যুক্ত হয়েও কোনো আর্থিক সুবিধা না নিতে চেয়ে, পৈতৃক সম্পত্তিতে নিজের অংশটি বোন রেবেকাকেই দান করেন।
এতখানি উদারনৈতিক মানসিক গঠনের পুরস্কার বারুখ তাঁর পৈতৃক পরিবার থেকে দু হাত ভরে পেয়েছেন। কিছু দিনের মধ্যে পারিবারিক আপনজনেরা তাঁকে সম্পর্কচ্যুত করে। শুধুমাত্র পরিবার থেকেই আঘাত নয়, বারুখের উপর আক্রমণ শাণায় ধর্মীয় নেতারাও। ধর্মমন্দিরের সিঁড়িতে বিধর্মী পাষণ্ড বলে গালি দিয়ে ছোরা হাতে তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে একটি গুণ্ডা। বারুখের আলখাল্লাটি ছোরার কোপে ছিঁড়ে গিয়েছিল। ওই ছেঁড়া আলখাল্লাটা রিফু ও সেলাই পর্যন্ত না করেই দীর্ঘদিন ধরে পরে পরে পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন বারুখ। বলতেন, আমার সমাজ আমাকে এইভাবে পুরস্কৃত করেছেন।
মনে মনে বারুখের সাথে ভাব করে ফেলে সদ্য বাইশে পা দেওয়া একটি তেজস্বিনী।