রণজিৎ মজুমদার ভলান্টারি রিটায়ারমেন্টের পর এদিক ওদিক দু চারটে স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করতে গিয়ে টের পেলেন মন মানছে না। নামে ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট। কাজে বাধ্যতামূলক অবসর। টাকা বেশ অনেকটাই পেয়েছিলেন। তবে কি না মাগ্গি গণ্ডার বাজারে সুদের হার রোজ পড়ছে। এদিকে ওদিকে স্কুলে আবেদন করে পড়ানোর কাজ জুটছিল। কিন্তু তাতে পয়সা খুব কম। ঠকাবাজি কারবার। কেন্দ্রীয় সরকারি কারখানার নিজস্ব বিদ্যালয়ে অনেক দিন কাজ করতে করতে যে মান সম্মান পেতেন, তাতে টোল পড়ল। তবে আসল কারণটি অর্থনৈতিক। বাড়ির কাছে স্কুল ছিল বলে সকালে একটা ব্যাচ আর সন্ধ্যায় দুটো ব্যাচ পড়াতেন রণজিৎ। কিন্তু দূরের স্কুলে যাতায়াতের ঝক্কি সামলে সেই ব্যাচ বজায় রাখা শক্ত। তাই স্ত্রী মল্লিকার সাথে কথা বলেই বাইরে আর ঘোরাঘুরি না করে, ঘরেই মন বসালেন রণজিৎ। বরং সকালে একটি ব্যাচ বেড়ে গেল।
ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন রণজিৎ। ইংরেজি নিয়ে বাঙালির দুর্বলতা চিরকালের। তাই ইংরেজি মাস্টারের চাহিদা ঝারখণ্ড সীমান্ত লাগোয়া আধা শহরে যথেষ্ট। মল্লিকাও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। রণজিতের বাবা মা দুজনেই আছেন। দুজনেই শিক্ষক হিসেবে অবসরজীবন যাপন করছেন। তাঁরা পেনশন পান যথেষ্ট। তাঁদের আর্থিক ঝক্কি রণজিৎকে বহন করতে হয় না। বরং মা রণজিৎকে মাঝে মাঝেই কিছু টাকা জোর করে গুঁজে দেন। তাইতে রণজিৎ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মা একবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে, বিপর্যস্ত বোধ করে রণজিৎ ফেসবুকে পোস্ট করে ফেললেন, “মায়ের কিছু হয়ে গেলে আমার কী হবে!” যে কোনো কারণেই হোক, রণজিতের মা সে যাত্রা টিঁকে গেলেন।
কিন্তু স্থায়ী চাকরি থেকে অবসর নেওয়া রণজিৎ মনের দিক দিয়ে বেশ নড়বড়ে হয়ে পড়লেন। রাস্তায় বের হলে তাঁর মনে হয় লোকে তাঁকে দেখে হাসে। আচ্ছা, ভলান্টারি রিটায়ারমেন্টের জন্য দোষ কি আমার? মল্লিকা বোঝানোর চেষ্টা করেন, কেউ তোমাকে দেখে হাসে না। হাসবে কেন? দেশে কত কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ছাঁটাই হচ্ছে, তার কি লেখাজোখা আছে?
রণজিৎ এই সব নানা খুঁটিনাটি কারণে নিজেকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখছেন, এমন সময় হৈচৈ করে এসে পড়ল করোনা। এল তো এল, ডোবাতে এল। স্কুল কলেজ বন্ধ। সরকারি আপিসেও হাফ লোকের ছুটি। যে গাধারা চিরকাল কাজ করে, সেগুলোই খেটে চলেছে। আর বাকিরা ফেসবুকে উদয়াস্ত পরিশ্রম করছে।
দেশের মানুষকে যাতে না খেয়ে মরতে না হয়, সেজন্য সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের রাষ্ট্র দায়বদ্ধ। সুতরাং এক অংশের লোকজন একেবারে বিনি পয়সায় রেশন তুলছেন। রণজিতের বাড়ির সামনে এক প্রফেসর থাকেন। রণজিৎ জানে উনি কেতা করে বাড়ির গেটে লিখেছেন প্রফেসর। আসলে অনেক দিন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ছিলেন। সবে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হয়েছেন। সত্যি সত্যি প্রফেসর হতে অনেক দিন বাকি। এই লোকটি কায়দা করে নিজের গরিব রেশনকার্ড করেছেন। আর বিনে পয়সায় রেশন তুলছেন। রণজিতের বেমক্কা খুব রাগ হয়ে গেল। রণজিতের যেই কথা সেই কাজ। ফেসবুকে রণজিৎ পোস্ট করে বসলেন আমার বাড়ির সামনে এক প্রফেসর বিনে পয়সায় রেশন তোলেন। তাহলে আমি বেকার লোক, আমি কেন পয়সা দিয়ে রেশন কিনে খাব?
রেশনের চালের উপর রণজিতের পরিবার আদৌ নির্ভরশীল নয়। বাবা মায়ের পেনশনের পুরো টাকাটাই খরচ হয় না। মল্লিকার বেতনের টাকাটাও জমে। টাকার কোনো সংকট নেই। তবুও রণজিৎ মনে মনে চাপে থাকেন। রেশনের চাল বাড়ির কাজের মেয়ে পুরোটাই নেয়। তাকে কাজে লাগানোর সময়ে ওইভাবেই কথা হয়েছিল। তাই যে রেশনের চাল বাড়িতে কেউ ছুঁয়ে পর্যন্ত দ্যাখে না, সেই রেশন বিনে পয়সায় পাবার দাবি নিয়ে ফেসবুকে পোস্টানোর কোনো যুক্তি না থাকলেও রণজিৎ তা করে বসলেন। পাঁচ সদস্যের বাড়িতে বসে খাওয়ার লোক বলতে একমাত্র কন্যা। নইলে রণজিতের মা, বাবা, বৌ আর সে নিজে রোজগার করে। কিন্তু রণজিতের রাগ ছিল সামনের প্রফেসরের উপর। এদিকে বাড়ি হাঁকাচ্ছেন, বাইক ছাড়া এক পা চলেন না। ওদিকে রেশনের বেলা ভিখিরি সাজেন। রণজিৎ কিন্তু হিসেবি লোক। ওই প্রফেসরের নাম ধাম বা কোন্ কলেজে তিনি পড়ান, সে সব মোটেও ভাঙেন নি। এমন নয় যে তিনি চান সরকারি কর্মকর্তারা হাতেগরম তথ্য নিয়ে চটপট প্রবঞ্চককে ধরুন। প্রবঞ্চনা ব্যাপারটা পৃথিবী থেকে লোপাট হয়ে যাক, সেটাও যে রণজিৎ জোরদার ভাবে চান, তাও তো নয়। নইলে যখন চাকরি ছিল, তখনও তিনি চুটিয়ে টিউশন করতেন, এমনকি, যাতে ছেলেমেয়েরা তাঁর কাছে আসে তার জন্য নানাবিধ ছক কষতেন। ছকটা হত বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মশায়দের সাথে। তোমার ছাত্রকে তুমি আমার কাছে আসতে বলো। আমার ছাত্রকে তোমার কাছে পাঠাবো। এই সিণ্ডিকেট রাজ ভাঙুক, তা কোনোদিন চান নি রণজিৎ। আর এই টিউশন পড়িয়ে পাওয়া টাকাটা ইনকাম ট্যাকসে কোনোদিন দেখানোর চেষ্টা করেন নি রণজিৎ।
কিন্তু ফেসবুকে বিনে পয়সার রেশনের দাবি তুলে রণজিৎ ফ্যাস্তাকলে পড়লেন। মহকুমা শাসক তাঁর বাড়িতে পরদিনই লোক পাঠিয়ে দিয়ে লিখিত দরখাস্ত চেয়ে বসলেন। খসখস করে অভ্যস্ত ইংরেজিতে দরখাস্ত লিখে ইওরস ফেথফুলি অবদি লিখে ফেলেছেন তখন বৌ মল্লিকা রণজিৎকে ডেকে পাঠাল।
রণজিৎ আগন্তুকদের বাইরের ঘরে বসিয়ে মল্লিকা কি বলছেন শুনতে গেলেন।
মল্লিকা বলল, তোমার মাথায় কি ভূত চেপেছে?
রণজিৎ বলল, আস্তে বলো। ওরা শুনতে পাবে।
শুনুক। ওই দরখাস্ত তুমি জমা দেবে না। পাড়ার সবাই জানে আমি সরকারি স্কুলে পড়াই। আমাদের মোটে একটা বাচ্চা। দরখাস্ত দিয়ে আর লোক হাসিও না।
রণজিৎ বুঝতে পারলেন, তিনি নিজের প্যাঁচে নিজে জড়িয়ে পড়েছেন। হাত জোড় করে মহকুমা অফিসের পরিদর্শককে তিনি বললেন, যা হয়েছে হয়েছে ছেড়ে দিন। চা খান।
পরিদর্শক লোকটি একটু কাঠখোট্টা। সে বলল, এই করোনার দিনে রদ্দুর মাথায় করে আপনার বাড়ি চা খেতে আসি নি মশয়। দরখাস্ত লিখে দিন। কাল মাস্ক পরে এসে গরিব কার্ড নিয়ে যাবেন।
রণজিৎ কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, আমরা রেশনের চাল খাই না যে! পরিদর্শক ছাড়ার পাত্র নন। তিনি বললেন, যা বলবেন, লিখে দিন। সাহেব অফিসে বসে আছেন। আর সামনের বাড়ির প্রফেসর লোকটা কে?
হিসেবি লোক রণজিৎ আমতা আমতা করে বললেন, আপনার সাহেব ফেসবুক দেখেন?
পরিদর্শক বলল, দেখতে হয়। মানুষের ক্ষোভ বিক্ষোভ সামলানো ওঁর কাজ। তা আপনি লেখাটা দিন?
রণজিৎ বললেন, ভুল করে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়ে ফেলেছি বলে ভদ্দরলোকের ছেলের মান সম্মান নিয়ে টানাটানি করবেন?
পরিদর্শক বললেন, তাহলে আমি সাহেবকে বলি?
রণজিতের মুখে এসে গিয়েছিল, বলুন গে যান্। পরে ভাবলেন, সরকারি লোককে না চটিয়ে কাজ উদ্ধার করা যায় কি না? ভিতরের ঘর থেকে পর্দা সরিয়ে মুখটুকু বের করে মল্লিকা বললেন, আচ্ছা, ও যদি ফেসবুকের ওই পোস্টটা ডিলিট করে দেয়, তাহলে চলবে?
মল্লিকার মিষ্টি মুখ আর ততোধিক মিষ্টি কথা দেখে আর রণজিতের হাত কচলানো দেখে পরিদর্শক মশায়ের মায়া হল। বলে গেলেন, যাক্ গে। এমন পোস্ট আর দেবেন না, যা নিয়ে নিজেকে হাসির খোরাক হতে হয়। আপনার সম্বন্ধে পুরোপুরি খবর নিয়ে তবেই এসেছি। বৌমা স্কুলে পড়ান। আপনার বাবা মা পেনশনার। পেনশনার অ্যাসোসিয়েশনের মিটিংয়ে এসডিও সাহেবের হাতে ফুলের তোড়া দিয়েছিলেন। আর আপনার ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট। টিউটোরিয়াল হোম লেখা সাইনবোর্ডের ছবিটাও তুলে রেখেছি। শুনে রণজিৎ পরিদর্শক মশায়ের পায়ে পড়ে যান আর কি! বাঁচালেন মল্লিকা। বললেন, দাদা, আর বলবেন না। করোনা হয়ে অবদি বাচ্চারা টিউশন পড়তে আসে না। উনি কাজ খুঁজে না পেয়ে এইসব উদ্ভট কাণ্ড করে ফেলেছেন।
ভিতর থেকে কাজের মেয়ে জল আর মিষ্টি এনে টেবিলে রাখল। হাসিমুখে পরিদর্শক বললেন, মিষ্টি খেতে ভালবাসি। কিন্তু করোনার সময়ে বৌ বারণ করে দিয়েছে। মিষ্টির ছবি তুলে রাখি কেমন?
রণজিৎ হাতজোড় করে বললেন, ছবি তুলবেন না দোহাই দোহাই। আমি আর ফেসবুকে কখনো কিচ্ছু লিখব না।