দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ২২২)

পর্ব – ২২২

কলেজ থেকে বেরোনোর সময় দেখতে শ‍্যামলী দেখতে পেল সকালে যে রাজনৈতিক দলের লোকেরা কৌটো নেড়ে সাত নভেম্বর উপলক্ষে পয়সা তুলছিল তারা এখনো তাই করে চলেছে। সহসা তার সত‍্যজিৎ রায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ফিল্মের কথাটা মনে পড়ে গেল। কলেজ হোস্টেলে বসে কৌটো থেকে পয়সা আশ্চর্য কৌশলে বের করে নিচ্ছে আদিনাথ। সিদ্ধার্থ চরিত্রে ধৃতিমান চ‍্যাটার্জি প্রতিবাদ করছে। ওই ফিল্মে নার্সদের সামাজিক সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে নার্সদের সংগঠন খুব তেড়েফুঁড়ে উঠেছিল। কিন্তু জনস্বার্থের নাম করে পয়সা তুলে সেটা অনেক সময় কি খাতে খরচ হয়, তা দেখানো সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলের নেতারা কিছু বলেন নি। অবশ‍্য সত‍্যজিৎ রায় কোনো রাজনৈতিক দলের নাম ব‍্যবহার করলে কি হত, বলা যায় না। সম্ভবতঃ নার্সদের মতো করে তাদেরকে বোঝানো যেত না।
অথচ আসল কাজটি বেশ উৎরে দিলেন সত‍্যজিৎ রায়। এই যে কৌটো নাড়া, এর ভিতরে ঢুকে দেখলে কি কি দেখা যেতে পারে, তার একটা আভাস দিয়ে দিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা গান আছে দেখা না দেখায় মেশা…. শ‍্যামলীর বলতে ইচ্ছে করছে, বলা না বলায় মেশা…।
সোভিয়েত বিপ্লবটা ঠিক কি ছিল? বাবা বলেন কলকাতায় ক্রুশ্চেভ আর বুলগানিন এসেছিলেন।
সালটা ছিল ১৯৫৫, অল্পদিন হয় দেশ স্বাধীন হয়েছে। এই রকম নভেম্বরের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী নিকোলাই বুলগানিন, আর সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি নিকিতা ক্রুশ্চেভকে অসাধারণ সংবর্ধনা জানিয়েছিল কলকাতা। ২৯ নভেম্বর সারা দুনিয়াজোড়া খবর হয়েছিল ক্রুশ্চেভ বুলগানিনের কলকাতা সফর। কুড়ি লক্ষের বেশি মানুষ দেখতে এসেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বকে। সাড়ে সাত মাইল লম্বা রাস্তা ভিড়ে ভিড়াক্কার। অতো বিপুল জনসমাগম ভারতের ইতিহাসে কখনো হয় নি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় অতিথি হিসেবে গিয়েছেন। বলেছেন, এ জন্মের তীর্থদর্শন। আর ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত অতিথিদের সংবর্ধনা জানাতে কুড়িলক্ষ মানুষ পথে নেমে বুঝিয়ে দিলেন সমাজতন্ত্র ও বিপ্লব নিয়ে সাধারণ ভারতীয় মানুষের আকুতি কোন্ পর্যায়ের!
শ‍্যামলীর কাছে ওরা এসে বলল, আমাদের কৌটোয় পয়সা দাও। শ‍্যামলী বিনীতভাবে বলল, আমার যা দেবার, তা সকালে দিয়েছি। অতি উৎসাহী কয়েকজন বলল, আবার না হয় দিলে!
শ‍্যামলী বলল, আমি যখন দিয়েছি বলছি, তখন আবার দিতে বলার কি প্রয়োজন?
তারা বলল, আমরা প্রকৃত বাম গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই।
শ‍্যামলীর বলতে ইচ্ছে করছিল, পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ সাল থেকে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আছে। বাম গণতান্ত্রিক চেতনা বলতে কি দাঁড় করানো হয়েছে মানুষ তা খুব দেখতে পাচ্ছে। আর কাজী নজরুল ইসলামের আমার কৈফিয়ৎ কবিতার পংক্তি মনে পড়ল। এল কোটি টাকা, না এল স্বরাজ, টাকা দিতে নারে ভুখারী সমাজ… ভূমিসংস্কার আইনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কার্যক্রম যৌথ খামারের ধারণাকে পাশ কাটিয়ে একটা উদ্ভট ভূমিসংস্কার খাড়া করেছে বামফ্রন্ট। এরা গাছেরও খাবে, তলার‌ও কুড়োবে! সাত বছর যেতে না যেতেই আলমারি থেকে কঙ্কাল বেরোতে শুরু করে দিয়েছে। এক‌ই পথে চলে, তোমরা অন‍্য কি করে দেখাবে?
এমন সময় শ‍্যামলীর মনে পড়ল অনসূয়াদি বার বার করে বলেছেন, এই সময় কোনোভাবেই তর্কবিতর্কে জড়িয়ে পড়া যাবে না। গোবিন্দচন্দ্র দৌড়ে এসে কৌটোয় একটা টাকা ঢুকিয়ে শ‍্যামলীকে তাগাদা লাগাল, গাড়িতে ওঠো!

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।