এই সময়ের লেখায় ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

ভাইরাসের টাইম বোমার উপরে বসে রয়েছি আমরা

বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রভাবে আমাদের দেশ ও প্রায় গোটা পৃথিবী চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তিরই এখন নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। ঘরবাড়ি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, অফিস-আদালত, রাস্তাঘাট, শহর-বন্দর, গ্রামগঞ্জ-সর্বত্র সবার মাঝেই সীমাহীন উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা, চরম অস্থিরতা-কখন জানি কী দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়! খুবই ভয়াবহ ও বড় পরিসরে মহামারী-মহামন্দার আশঙ্কা! এছাড়া গত চার দশক ধরে আমরা ঘর করছি সার্স-কোভ, মার্স, অ্যাভিয়ান ফ্লু, কেরলের নিপা ভাইরাস, সার্স-কোভ-২ নিয়ে এবং এরা সবই প্রাণিবাহিত রোগ। এই আতঙ্কের সময় প্রশ্ন উঠছে তাহলে বিশ্বে কতো ভাইরাস রয়েছে? উত্তরে যেটা জানা গেলা তা হলো ভাইরাসের সুপ্ত আগ্নেয়গিরির উপরে বসে আছি আমরা। এমনটাই জানাচ্ছেন বিজ্ঞানী-গবেষকেরা। আর সংক্রমণের শুরু থেকেই ক্রমাগত চরিত্র বদল করে চলেছে করোনা ভাইরাস। সেই সঙ্গে পাল্টেছে মহামারীর এপিসেন্টারও। চিন থেকে ইতালি হয়ে আমেরিকা ঘুরে এখন হটস্পট ব্রাজিল কোভিড-১৯-এর। সারা পৃথিবী জুড়ে আক্রান্ত প্রায় ৫৬ লক্ষ মানুষ।
এইমুহুর্তে করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক-সহ দেশের আরও তিন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গবেষকের করা সমীক্ষায় এই দাবি করা হচ্ছে যে করোনা সংক্রমণ ভারতে চরম পর্যায়ে পৌঁছতে পারে জুন মাসের শেষ দিকে। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দেশ জুড়ে অত্যন্ত ধীর গতিতে কমতে শুরু করতে পারে এই সংক্রমণ। সংক্রমণ একেবারে কমের দিকে পৌঁছবে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে।
আর তার মধ্যেই নতুন আশঙ্কার কথা শোনালেন ব্রাজিলের ইকোলজিস্ট দাভিদ লাপোলা। কোভিড-১৯ মহামারীর পরবর্তী হট জোন হতে চলেছে পৃথিবীর ফুসফুস আমাজন। প্রাণঘাতী মারণ ভাইরাসের কামড়ে যখন গোটা বিশ্ব থরহরি কম্পমান, তখনই পরবর্তী ভাইরাস নিয়ে সতর্ক করে দিলেন ব্রাজিলের বিজ্ঞানীরা। বিশ্ববাসীকে তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন, ‘পরবর্তী ভাইরাস আসতে পারে পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে খ্যাত অ্যামাজনের জঙ্গল থেকে।’ পরবর্তীকালে মারণ ভাইরাসের হাত থেকে রেহাই পেতে হলে নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংসের মতো আত্মঘাতী কাজ থেকে বিরত হতে হবে বলেও জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আদৌ সেই সতর্কতায় কী কর্ণপাত করবে নির্বিচারে জঙ্গল ধ্বংসে উদ্যত একদল অর্থলিপ্সু মানুষ?
ব্রাজিলের পরিবেশ বিজ্ঞানী ডেভিড লাপোলার কথায়, ‘যত বেশি বনাঞ্চল ধংস হবে, তত বেশি প্রাণঘাতী ভাইরাস মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। কারণ বনভূমি হলো মানুষ ও ভাইরাসের মাঝে ঢাল। বন্য প্রাণির শরীরে থাকা অজানা ভাইরাস ছড়ানো রোধ করতে হলে বনাঞ্চল ধংস আটকাতে হবে সবার আগে।’ যেভাবে গত কয়েক বছর ধরে ব্রাজিলের অ্যামাজনে বনাঞ্চল ধবংস করা হচ্ছে তা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, ‘অ্যামাজনের জঙ্গলে নির্বিচারে বনভূমি ধংস করা হচ্ছে। গত বছরই অ্যামাজনের ব্রাজিলিয়ান অংশে দশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের বেশি বনভূমি ধংস করা হয়েছে, যা উদ্বেগের বিষয়। চলতি বছর এপ্রিল পর্যন্ত অ্যামাজনে এক হাজার ২০২০ বর্গ কিলোমিটার বনভূমি নষ্ট হয়েছে। সারা বিশ্বের ২০ শতাংশ অক্সিজেনের জোগান দেয় অ্যামাজন বনভূমি। ওই বনাঞ্চলে বহু নাম না জানা প্রাণিও রয়েছে। তাদের শরীরে রয়েছে অজানা প্রাণঘাতী ভাইরাস। সেই ভাইরাস একবার মানুষের মধ্যে ছড়াতে শুরু করলে বিপদ।’
আর ঠিক এটাই হতে চলেছে আমাজনের ক্ষেত্রে। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত বিজ্ঞানী লাপোলা জানাচ্ছেন, আমাজন নিজেই একটি ভাইরাসের আধার। জানা, অজানা নানান প্রজাতির ভাইরাস রয়েছে সেখানে। কিন্তু গত বছর থেকে যেভাবে বনভূমি নষ্ট করা হচ্ছে, বিঘ্নিত করা হচ্ছে ভারসাম্য— তাতে নতুন করে ভয়ঙ্কর কোনো মহামারীর উৎস হয়ে উঠে পারে আমাজন।
গত বছর আমাজনে নগরায়নের হার বেড়েছিল ৮৫ শতাংশ। এই বছরের প্রথম চারমাসে অবৈধভাবে চাষ, খননের কাজের জন্য মুছে গেছে প্রায় ২০২ বর্গকিমি বনভূমি। এই নগরায়নের ফলে মানুষের থেকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে বন্যপ্রাণীরা। আমাজনের প্রাণীরা বিপরীত সংক্রমণের শিকার হলে তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। বিপুল জীববৈচিত্র্য থাকার কারণে পৃথিবীর বৃহত্তম করোনার আধার হয়ে উঠতে পারে আমাজন। এবং সেই ক্ষতি হবে অপূরণীয়।
তাই নতুন কোনো বিপর্যয় থেকে বাঁচতে এখন একমাত্র উপায় যে বনাঞ্চল রক্ষা করা, তা স্পষ্টই উঠে আসে লাপোলার গবেষণায়। আমাজনের অপব্যবহার বন্ধ করে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। সতর্ক করেছেন, ভারসাম্য না ফিরিয়ে আনলে নিজেদের অজানা বিপদই ডেকে আনবে মানুষ…
সারা বিশ্বের ২০ শতাংশ অক্সিজেনের জোগান দেয় অ্যামাজন বনভূমি। তার থেকেও বড় কথা, এই বনভূমিতে বহু নাম না জানা প্রাণীও রয়েছে। তাদের শরীরে রয়েছে অজানা প্রাণঘাতী ভাইরাস। সেই ভাইরাস একবার মানুষের মধ্যে ছড়াতে শুরু করলে বিপদ।
ব্রাজিলের পরিবেশ বিজ্ঞানী ডেভিড লাপোলা জানিয়েছেন, বনাঞ্চলে নগরায়ন করলে বিভিন্ন প্রাণী থেকে ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়ানো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। অ্যামাজনের গভীর অরণ্যে বহু চেনা—অচেনা ভাইরাস রয়েছে। মানুষ বনাঞ্চল ধংস করে গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করলে সেই ভাইরাসে সংক্রমিত হবে। আর অ্যামাজন যেভাবে ধংস করা হচ্ছে তাতে এর পর সেখান থেকেই নতুন কোনও ভাইরাস ছড়াতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) ‘সাউথ-ইস্ট এশিয়া রিজিয়ন অফিস’-এর ‘কমিউনিকেবল ডিজিজেস’-এর প্রাক্তন ডিরেক্টর রাজেশ ভাটিয়া বলেন, এই মুহূর্তে প্রায় সাড়ে দশ লক্ষ অচেনা ভাইরাস রয়েছে মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণি জগতে। তাদের মধ্যে কমপক্ষে সাত লক্ষ ভাইরাসই যে-কোনও রোগ সংক্রমণে সক্ষম। এর মধ্যে মাত্র ২৬০টি ভাইরাসকে চিহ্নিত করা গিয়েছে।
ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি ইউনিভার্সিটির ভাইরোলজি বিভাগের গবেষক মারিয়া সোদারলুন্ড ভেনার্মো বলেন, ‘‘ভাইরাসের টাইম বোমার উপরে বসে রয়েছি আমরা। তার বিস্ফোরণ আটকাতে উহানের মতো বন্যপ্রাণি কেনাবেচার সব বাজার বন্ধ করতে হবে।
রাজেশ ভাটিয়া আরও জানান, গত চার দশক ছিল ভাইরাসের দশক। গত ৪০ বছরে নতুন ১৮টি প্যাথোজেনকে চিহ্নিত করা গিয়েছে। ১২টি নতুন ভাইরাস কোনও না কোনও জন্তু থেকে এসেছে। আরও ১২টি ভাইরাসকে মনে করা হচ্ছে, বিশ্বজনীন মহামারির ক্ষেত্রে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে।
ঋণ: ইন্টারনেট
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!