গল্পেসল্পে মৃদুল শ্রীমানী

ধূমকেতু ও এডমণ্ড হ‍্যালি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি কাজী নজরুল ইসলামকে পুত্রতুল‍্য স্নেহ করতেন। কাজী নজরুল ইসলাম একবার “ধূমকেতু” নামে এক পত্রিকা করবেন বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে একটি কবিতার আবদার করেন। নজরুল ইসলামের প্রতি সুগভীর স্নেহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখেন “আয় চলে আয় রে ধূমকেতু, আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু….”। এই কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হস্তাক্ষরে ধূমকেতু পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার প্রচ্ছদে ছাপা হত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সৌরজগতের নানা খুঁটিনাটি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বালক অবস্থায় গ্রহ নক্ষত্র সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করতেন। ওই অল্প বয়সেই বালক রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন “গ্রহগণ জীবের বাসভূমি”। একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও ভেবে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠিক আগে যিনি জন্মেছিলেন, মহর্ষি ও সারদাদেবীর সেই সন্তানের নাম ছিল সোমেন্দ্রনাথ। রবি তাঁকে ডাকতেন সোমদাদা। রবির জন্মের এক বৎসর পরে সারদা দেবী পুনরায় একটি সন্তানের জন্ম দেন। তিনি অল্পায়ু ছিলেন। তাঁর নাম ছিল বুধেন্দ্রনাথ। সোম, রবি ও বুধ, এই সব নামের ঝঙ্কারে বালক রবির মনে জ‍্যোতিষ্ক বিষয়ে কৌতূহল জন্মায় নি, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় না।
১৯১০ সালে এল এক ধূমকেতু।
সারা পৃথিবীর জ‍্যোতির্বিদ‍ সেই ধূমকেতু নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “বিশ্বপরিচয়” ব‌ইতে হ‍্যালির ধূমকেতুর চমৎকার আর্টপ্লেট যুক্ত করেছেন।
ধূমকেতুর বাস সৌরজগতের প্রত‍্যন্ত অঞ্চলে। তার নাম কুইপার বেল্ট। আরো পিছনে আছে উর্ট ক্লাউড। সৌরজগতের গ্রহ, বামন গ্রহ, উপগ্রহ ও গ্রহাণুপুঞ্জ তৈরির পর যা কিছু জঞ্জাল পড়ে আছে ওই প্রত‍্যন্ত এলাকায়। জল, মিথেন, কার্বন ডাই অকসাইড সুতীব্র ঠাণ্ডায় বরফ হয়ে থাকে। আর থাকে কিছু ধূলা। এই নিয়ে ধূমকেতুর শরীর তৈরি। সূর্যের টানে তারা কুইপার বেল্টের গহন থেকে বেরিয়ে সূর্যের অভিমুখে ছোটে। যতো সূর্যের কাছে পৌঁছায়, ততই গ‍্যাসীয় বরফ তাপের ফলে বাষ্পীয় শরীর নিয়ে দেখনস‌ই চেহারা নেয়। তখন সেই বরফের দলা থেকে বেরোনো গ‍্যাস একটি পুচ্ছের চেহারা নেয়। সূর্যের আলোয় সে পুচ্ছের চকিত অভাবনীয় রূপ মানুষের মনে যুগে যুগে গভীর ছাপ রেখে গিয়েছে।
পৃথিবীর মতো গ্রহ পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরে থেকে তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের উপর আরো কয়েক ঘণ্টায় রবিপ্রদক্ষিণ করে। গণিতবিদেরা সেই প্রদক্ষিণ পথকে উপবৃত্তাকার বলেন। তবে সূর্যের থেকে পৃথিবীর দূরত্বের কথা খেয়াল রাখলে, পৃথিবীর ঘুরনপথকে সাদা চোখে বৃত্তের পরিধির মতোই ঠেকবে। সেই তুলনায় অনেক ধূমকেতুর গতিপথ একেবারেই অন‍্য রকম। গণিতবিদেরা সে পথকে অধিবৃত্ত হিসেবে চেনান।
হ‍্যালির ধূমকেতু মোটামুটি সোয়া পঁচাত্তর বছর অন্তর অন্তর নিয়ম করে সূর্যের কাছে পাড়ি দেয়। কেননা, এই ধূমকেতুর গতিপথ উপবৃত্তাকার। ১৯৮৬ সালে সে দেখা দিয়ে চলে গেছে। আবার আসতে অনেক দেরি।
এই যে হ‍্যালির ধূমকেতুর কথা বলছি, এর আবিষ্কর্তা এডমণ্ড হ‍্যালির আজ জন্মদিন।

১৬৫৬ সালে নভেম্বরের আট তারিখে এডমণ্ড হ‍্যালির জন্ম। ১৭৪২ সালের ১৪ জানুয়ারিতে তাঁর প্রয়াণ।
এডমণ্ড হ‍্যালি ছিলেন গণিতজ্ঞ জ‍্যোতির্বিদ‍। তিনি আইজ‍্যাক নিউটনের গুণগ্রাহী ছিলেন। নিউটনীয় বলবিদ‍্যা নিয়ে তিনি আগ্রহী ছিলেন। নিউটনের মহাগ্রন্থ “প্রিন্সিপিয়া” প্রকাশে আর্থিক দায়ভার হ‍্যালি গ্রহণ করেছিলেন।
১৬৮২ সালের সেপ্টেম্বরে বছর পঁচিশের তরুণ হ‍্যালি ধূমকেতু সম্পর্কে প্রগাঢ় চর্চা করেন। নিউটনীয় বলবিদ‍্যার আলোকে তিনি নিজের জ‍্যোতির্বিদ‍্যা চর্চা মাজা ঘসা করেছিলেন। নিজের গবেষণা সঞ্জাত জ্ঞান হ‍্যালি ১৭০৫ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশ করেন।

সেই গবেষণা সন্দর্ভের নাম ছিল সিনপসিস অফ অ্যাসট্রোনমি অফ কমেটস। হ‍্যালি তাঁর সন্দর্ভে জানিয়েছিলেন যে হ‍্যালির ধূমকেতু ফিরে আসবে ১৭৫৮ সালে। কিন্তু নিজের গণনার যাথার্থ‍্য লক্ষ্য করে তৃপ্তি পাবার জন্য তিনি জীবিত ছিলেন না।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।