দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৯৩)

পর্ব – ১৯৩

ওসি গম্ভীর হয়ে গেলেন। শ‍্যামলী বলল, আমি একটা অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে। তবু আপনি আমাকে এতটা কথা বলার সুযোগ দিলেন বলে আমি কৃতজ্ঞ।
ওসি শ‍্যামলীর দিকে তাকালেন। তারপর একটা ফাইল টেনে নিলেন। বললেন, আজ কলেজে আপনার সাথে একটা স্টুডেন্টস ইউনিয়নের গোলমাল বেধেছিল। কিন্তু আপনি কলেজের সিনিয়র ক্লাসে পড়েন। গোলমাল পাকানোটা অ্যাভয়েড করলে ভাল হয়।
শ‍্যামলী বলল, প্রাচীন মিশরের লোকজন এই পার্থিব জীবনটাকে বলত সরাইখানা। একটা রাত কোনোমতে কাটিয়ে দেবার ব‍্যবস্থা। আর সম্রাটরা ক্ষমতা পেয়েই পিরামিড বানাতে লেগে যেত।
ওসি বলল, আমার কথার সাথে এই কথাটার যোগাযোগ কি? আপনি বাজে বকাটা হ‍্যাবিট করে ফেলেছেন।
শ‍্যামলী বলল, দয়া করে বাজে কথার শেষটুকু শুনুন। ওই যে পিরামিড হত, ওর ভিতর দামি দামি সাজ সরঞ্জাম যোগাতে হত। এমন কি দাস দাসীও যোগাতে হত। কাঠের কফিনের মধ‍্যে খুব নিপুণ ভাবে মৃতদেহ সংরক্ষণ করতে হত। আর সোনার মুখোশ থাকত।
ওসি বললেন, বুঝতে পারলাম আপনি মিশর নিয়ে অনেক কিছু জানেন। কিন্তু, এরসাথে আমার কথার যোগসূত্রটা কি?
শ‍্যামলী বলল, কিন্তু জানেন, পিরামিড বানাতে যাদেরকে খাটতে হত, বড় বড় পাথরের চাঙড় যারা ঠেলেঠুলে উপরে তুলত, তাদের জীবনের কথা এখন কেউ কেউ ভাবতে চাইছে। তারা চব্বিশ ঘণ্টার মধ‍্যে আঠারো থেকে কুড়ি ঘণ্টা পরিশ্রম করত। হাড়ভাঙা খাটুনি আর পুষ্টিকর খাবার না পেয়ে শরীর খুব ক্ষীণ হয়ে যেত। গায়ের ময়লা সাফ করার সময়টুকুও ওরা পেত না। মাছের মত গন্ধ বেরোতো গা দিয়ে।
 এই যে পার্থিব জীবন, এর যে কোনো দাম আছে, সেটাই তারা বুঝে উঠতে পারত না। আমার  সৌভাগ্য যে আমি এই বাস্তব জীবনটার মর্ম বুঝি। আর মতপ্রকাশের অধিকার তার একটা অবিচ্ছেদ্য শর্ত। কথা আমি বলব‌ই। সুযোগ আমি খুঁজে নেব‌ই।
মাথা নিচু করে একমনে ফাইল স্টাডি করতে থাকেন ওসি। শ‍্যামলী ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ল।
রাস্তায় নেমে তার মনে হল বেশ খিদে খিদে পাচ্ছে।
মনে পড়ল, সারাদিন খাওয়া হয় নি। একটা দোকানে মুড়ি ভাজছে দেখতে পেয়ে সেখানে গিয়ে একটাকার মুড়ি ছোলাভাজা কিনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেতে লাগল। উফ্, কি খিদেটাই না পেয়েছিল!
 শ‍্যামলী রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মুড়ি খাচ্ছে, এমন সময় একজন প্রবীণ লোক কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি শশাঙ্ক পালের ছোট খুকি না?
খুকি কথাটা শুনে খুব অস্বস্তি বোধ হল শ‍্যামলীর। খিদের জ্বালায় তাড়াতাড়ি করে খাচ্ছিল বলে গলাটা শুকিয়ে গেছে। কোনো মতে ঘাড় নেড়ে শ‍্যামলী সহমত প্রকাশ করল।
প্রবীণ ভদ্রলোক বললেন, তা তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুড়ি খাচ্ছ যে?
শ‍্যামলী খুব অবাক হয়ে গেল। আশ্চর্য, একটা মানুষ খাচ্ছে। তো তাকে এত কথা জিজ্ঞাসা না করলেই নয়? তবুও সে ধৈর্য ধরে বলল, আজ্ঞে, বসার জায়গা তো নেই।
ভদ্রলোক বললেন, এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাওয়া মোটেও ভালো নয়। ধুলো পড়তে পারে। তাছাড়া তুমি ভদ্রবাড়ির মেয়ে।
শ‍্যামলীর মনে হল একবার বলেই দেয়, আমি সবে গতকাল জেনেছি, পালেরা আমাকে কুড়িয়ে পেয়েছিল। আর আমি গতকাল থেকে ট‌ইট‌ই করে হেঁটে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে চলেছি। কিন্তু অতটা বলা অসমীচীন হবে বলে সে ম্লান হেসে বলল, মুড়ি খেতে আমার খুব ভাল লাগে।
ভদ্রলোক বললেন, তোমার বাবাকে অনেক দিন দেখতে পাই না। ভাল আছেন তো?
শ‍্যামলী বলল, আছেন। এমন সময়ই তার মনে পড়ল, একদিন একটা বিতর্ক সভায় সে  মেয়েদের পুরুষদের মতোই সম কাজে সম বেতন পাবার অধিকার নিয়ে বলে স্টেজ থেকে নামার পরে এই লোকটিই এসে বলেছিলেন, মেয়েদের চাকরি করে কি লাভ? সব পয়সাই তো লিপস্টিক আর নেলপলিশ মাখতে চলে যায়। ক্লাস এইটে পড়ে তখন। দিদি টুয়েলভে। দিদি সাথে ছিল। দিদি বলেছিল, আপনি যা জানেন না, তা বলবেন না। দিদি তখন শাড়ি পরে। তন্বী। সুন্দরী। চোখে মুখে তারুণ্য জাজ্বল‍্যমান।
 তার সামনে দাঁড়িয়ে আর বিরুদ্ধতা করার সাহস হয় নি লোকটির। অমন একটা মেয়ে যদি একবার বলে, এই লোকটা আমাদের ডিসটার্ব করছে, তাহলে অনেক ছেলে আস্তিন গুটিয়ে দৌড়ে আসবে। লোকটা মানে মানে সরে পড়েছিল। পরে দিদি খোঁজ নিয়ে বলেছিল, লোকটা একটা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। ওর তিনটে মেয়ে। সব কটাই পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে।
শ‍্যামলী বলল, মেয়েদের যদি রাস্তায় খিদে পেয়ে যায়, তাহলে এই মফস্বল শহরে যেখানে দোকানে বসে খাওয়ার সুবিধা নেই, তারা কি করবে বলতে পারেন?
লোকটি বলল, আমি তোমাদের স্বজাতি। তোমাকে দেখে কেউ খারাপ না ভাবে, তাই বলছিলাম।
শ‍্যামলী বলল, খিদে পেলে আমি খাই, এটা দেখতে পেয়ে কেউ আমাকে খারাপ ভাবলে সেটা তার সমস‍্যা। আর মেয়েদের অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন করা আসলে তার অধিকার হরণ করা ছাড়া আর কিছু নয়। আপনি এবার আসুন।
তারপর শ‍্যামলী ঢুকল পাল অটোমোবাইল এ। ঠিক এক সপ্তাহ সে এখানে ঢোকেনি। সেই ইন্দিরা গান্ধী খুন হবার সন্ধ্যায় গুরশরণকে খুঁজতে গুরুদ্বারে গিয়েছিল, তারপর আর আসা হয়ে ওঠেনি। বাচ্চা শ্রমিকটা গেটে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে দেখতে পেয়েই ভিতরে সুড়ুৎ করে সেঁধিয়ে গেল। শ‍্যামলীর মনটা ছাঁৎ করে উঠল।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।