দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৬২)

পর্ব – ১৬২

সবিতা বললেন, না দাদা, সে তেমন লোক নয়। পোড় খাওয়া মন। সহজে টসকাবে না। কারবারটা মন দিয়ে করতে চায়।
বাসন্তীবালা ঝঙ্কার দিয়ে বললেন, আমি মরে গেলে তুই যে চুলোয় যেতে চাস্ যাবি, আমি কিছু দেখতে আসব না। এত বড় সংসার। এত তার ফৈজৎ। সামলাবে কে?
সবিতা শান্ত গলায় বলল, আমি মনস্থির করে ফেলেছি। তোমার সংসারের দুবেলার রান্না বান্না সব করে দিয়ে ঢেকে গুছিয়ে চাপা দিয়ে আলমারিতে রেখে দিইচি। সময় হলে গরম করে খেও। শীতের বেলা। খারাপ হবে না। রুটির আটা মেখে রেখেছি। কটা রুটি দাদাকে টাটকা টাটকা বেলে  সেঁকে দিও।
বাসন্তীবালা কেঁদে ফেলে বললেন, এমনি করেই যদি বাঁশ দিবি, তো এসেছিলি কেন? এতখানি শয়তানি পুষে রেখেছিলি পেটে পেটে?
শশাঙ্ক খরখরে গলায় বললেন, তুই এখান থেকে চলে গেলে আমার কতবড় বদনামটা হবে বোঝার মতো বুদ্ধি তোর আছে? লোকজন পাঁচকথা বলতে ছাড়বে?
সবিতা শক্ত হয়ে বলল, তোমার নামে কেউ আকথা কুকথা বললে একবার খপর দিও। তাকে যাচ্ছেতাই করে বলে আসতে পারব। তারপর গলা নামিয়ে বলল, শোনো দাদা, আমার কথা শোনো, অন্ধকার ঘরে একটা টবের গাছ রেখে জানলার একটা পাল্লা খুলে রেখে দেখো, গাছ আলো ধরতে ওদিক পানে বাঁকছে। সব মানুষ একটা আলো খুঁজতে চায়। আজ আমি আলো খুঁজে পেয়েছি দাদা, আমাকে তুমি আর আটকিও না। জানো দাদা, রাধিকাসুন্দরী রান্নাঘরে বসে ডালে কাঠি দিতে দিতে বাঁশির সুর শুনে আনমনা হয়ে যেতেন। ডাল পুড়ে যেত। শাউড়ি ননদ যা নয় তাই বলে গাল দিত। তবু আঁধার রাতে দোর খুলে কাদা পেছল পথে পা টিপে টিপে কৃষ্ণসঙ্গ করতে যেতে তার বাধত না। আকাশ ভেঙে বিষ্টি পড়ছে, পথে ব‍্যাঙের ডাকে সাপেরা বেরিয়ে এসে ঘুরঘুর করছে, সে সব কোনো দিকে না তাকিয়ে রাধা চলেছে। অভিসারে যাবে বলে সারাদিন তার কত প্রস্তুতি! উঠোনে জল ঢেলে কাদা করে পা টিপে টিপে চলা অভ‍্যেস করে। পায়ের নূপুরের উপর কাপড়ের টুকরো বেঁধে রাখে ঝুমঝুম আওয়াজ চাপা দেবে বলে। আলোর খোঁজ পেলে তাকে আর কোনো কিছুতেই ঠেকাতে পারে না দাদা। তোমার মেয়ের কাছে শুনেছি, বিলেতে রাজা বড্ড বেশি ট‍্যাকসো চাপালে, রাণি রাজাকে মিনতি করে বললেন, ওগো, ওরা গরিব মানুষ। ওরকম পাষাণ হোয়ো না। যেটুই রয় সয়, সেটুকুই নিয়ো। প্রজাদের মেরে বড়লোক হয়ে কোনো গৌরব নেই। রাজা শুনলেন না। তুমি ঘরের মেয়েমানুষ। রাজ‍্যের ব‍্যাপারে তোমার নাক গলানোর কি দরকার? রাণি বারবার মিনতি করাতেও রাজা যখন শুনলেন না, তখন রাণি বললেন তোমার কাছে সুবিচার পেলাম না বলে পিতিবাদ করে আমি উদোম গায়ে শহরের চৌরঙ্গীতে ঘুরে বেড়াব। তাতে তোমার সম্মান বাড়বে তো? রাজা করলেন কি, শহরময় ঢ‍্যাঁড়া পিটিয়ে বলে দিলেন, অমুক দিনে রাণি বেরোবেন। ওদিন সবাই ঘরের ভেতর দোর জানলা আটকে বসে থাকবে। খুললেই শাস্তি।
রাণি যখন ঘোড়ায় চেপে এলো গায়ে বেরোলো, তখন ভগবানের কী আশ্চর্য লীলা, রাণির চুলে ঢাকা পড়ল তার যৌবন। এক বদমাশ জানলার ফোকর দিয়ে দেখতে চেয়েছিল। বিদ্যুৎ চমকে তার চোখ গেল ঝলসে।
শ‍্যামলী বলল, লেডি গোডিভা আর পিপিং টমের গল্প।
বোঝানোর চেষ্টা বৃথা গেল দেখে, শশাঙ্ক পাল ক্ষেপে গেলেন। বললেন, এই বাঁদর মেয়েটার খপ্পরে পড়ে তোর সব নষ্ট হতে বসেছে। ওকে এড়িয়ে চল্ বলে দিচ্ছি। ন‌ইলে খুব বিপদে পড়বি।
সবিতা উদাসীন ভঙ্গিতে বললেন, সাগরে পেতেছি শয‍্যা, গোষ্পদে কিবা ভয়! দাদা, যেতে আমায় হবেই। তোমার ভাল লাগুক, না লাগুক, আমি যাব‌ই।
শশাঙ্ক বললেন, সবিতা, খবরদার, ঘরের বাইরে এক পা রাখবি তো পা খোঁড়া করে রেখে দেব।
শ‍্যামলী আর চুপ করে বসে থাকতে পারল না। বলল, বাবা, এ তোমার বাড়াবাড়ি হচ্ছে। তুমি তোমার কথাটা বলার সুযোগ পেয়েছ। এবার পিসিকে নিজের মতো চলতে দাও। একটা অ্যাডাল্ট মানুষকে আইনতঃ তুমি আটকে রাখতে পারো না। সে যেখানে থাকতে চাইবে, যার সাথে থাকতে চাইবে, তাতে বাধা দেবার আইনি এক্তিয়ার তোমার নেই। এটা সাংবিধানিক অধিকার।
শশাঙ্ক মেয়ের দিকে তেড়ে উঠে বললেন, মারব তোকে জুতোর বাড়ি! উকিলের সাথে মিশে মিশে খুব আইন কপচাতে শিখেছিস না? মেরে মুখ ফাটিয়ে দিলে তবে বুঝতে পারবি।
শ‍্যামলী বলল, তোমার যুক্তি ফুরিয়ে গিয়েছে, তাই এই ভাষায় কথা বলছ। পিসিকে যেতে দাও। ওকে আটকিও না।
শশাঙ্ক শ‍্যামলীকে আবার তড়পে উঠলে সবিতা বলল, তুমি মিথ‍্যে মিথ‍্যে ওকে বকছ দাদা। তোমাদের বকাবকি শুনে আমিও ওকে বকতাম। আর ভেতরে ভেতরে ওর কথাগুলো আমার ভেতর আরো বেশি বেশি করে কাজ করত। শুনেছি, রাবণ আর কুম্ভকর্ণ না কি জয় বিজয় নামে বিষ্ণুর দুই দরোয়ান ছিল। কি একটা দোষ ঘটতে দুভাইয়ের স্বর্গে থাকা হল না। জানা গেল সাধুপথে চললে সাতজন্মে মুক্তি পাবে। আর শত্রুতা করলে, রামের হাতে মরে তিনজন্মেই রেহাই। দারোয়ান দুটো কেঁদে উঠে বললো, আমরা তোমাকে শত্রুভাবেই ভজনা করব প্রভু। তো শ‍্যামলীকে তোমাদের নকল করে যতো মুখঝুক করেছি, ততোই রাতের অন্ধকারে একলাটি বিছানায় শুয়ে ওর কথাগুলো আমায় বেশি বেশি করে ভাবিয়েছে। ওর কথা নিয়ে আমি যতো ভেবেছি, ভেতরে ভেতরে আমি ততো বদলে গিয়েছি।
শশাঙ্ক হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে বললেন, তাহলে ও যখন তোর গুরু হয়েছে, ওর মতো করেই তুই আজ এর সাথে, কাল ওর সাথে ঘুরে বেড়া। যার তার সাথে শো।
সবিতা শশাঙ্ককে ধমকে উঠে বলল, বাজে কথা বোলো না দাদা। মুখে পোকা পড়বে। ও কারো বাড়ি যায় না। কারো সাথে ঘোরে না। তবে বাড়ি বয়ে কেউ দেখা করতে এলে, সম্মান দেখিয়ে কথা বলে। তোমরাই ওকে কোণঠাসা করেছ। ও পড়তে চায়, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। এখন ওকে জোর করে বিয়ের জন‍্যে চাপ দিও না।
শশাঙ্ক শ‍্যামলীর উদ্দেশে একটা অশ্রাব্য গালি দিয়ে ফেলতেই সাপিনীর মতো সবিতা ফোঁস করে উঠলেন, নিজের মেয়ে হলে একথাটা বলতে পারতে দাদা? বলেই জিভ কেটে ফেলে বাসন্তীবালার মুখের দিকে তাকালেন সবিতা। বাসন্তীবালা দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলেছেন। শ‍্যামলীর মুখ হঠাৎই কেন যেন রক্তশূন‍্য হয়ে গেছে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।