সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে মৃদুল শ্রীমানী (অন্তিম পর্ব)

আবেল পুরাণ: নিলস হেনরিক আবেল স্মরণলেখ
৪
আবেলের মা অ্যানি মেরি সিমোনসেন দক্ষিণ নরওয়ের আগদের কাউন্টির রাইজর শহরের মেয়ে ছিলেন। তিনি ছিলেন নিলস হেনরিক স্যাক্সিলিড সিমোনসেনের কন্যা। অ্যানি মেরির বাবা ছিলেন রাইজরের একজন বড় ব্যবসাদার আর একটা বাণিজ্য জাহাজের মালিক। স্বভাবতই অ্যানি মেরি একটু আরামের পরিবেশেই বড় হয়েছিলেন। বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখানোর দিকে মা হিসাবে অ্যানি মেরির কোনো আগ্রহ ছিল না। হৈ হল্লা, ফূর্তি আমোদ প্রমোদ আর মদের নেশায় তাঁর সময় কাটত।
অ্যানি মেরির স্বামী সোরেন গেওর্গ আবেল ছিলেন অতি সাধারণ মাপের একজন পাদ্রি। বাচ্চাদের পড়ানোর ভার ছিল বাবার উপর। তিনি হাতে নকল করা পুঁথি কিনে এনে সন্তানদের পড়াতেন। হাতে নকল করা পুঁথিতে যথেষ্ট ভুলভাল লেখাও থাকত। সোরেন গেওর্গ আবেল স্টরটিং অর্থাৎ নরওয়ের এককক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেটা ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দ। সেই বছরেই সবে স্টরটিং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পর বৎসর ১৮১৫ তে নিলস হেনরিক আবেলকে ক্যাথিড্রাল স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হল। তখন তার বয়স তেরো। ১৮১৮ তে ওই স্কুলে গণিত শিক্ষক হিসেবে বার্নট মাইকেল হম্বো (২৩ মার্চ ১৭৯২ – ২৮ মার্চ ১৮৫০) যোগদান করেন।
হম্বো লক্ষ্য করলেন, নিলস হেনরিক আবেল গণিতে তুখোড়। তখন তিনি তাকে উচ্চশ্রেণীর গণিত চর্চায় উদ্বুদ্ধ করেন। এই ১৮১৮ তেই নিলস হেনরিকের বাবা সোরেন গেওর্গ আবেল ধর্মতাত্ত্বিক স্টেনার জোহানস স্টেনারসেন এর সঙ্গে প্রকাশ্য বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন। এই বিতর্কটা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়ে হৈ হৈ পড়ে গেল। স্টেনারসেন ধর্মীয় লোক হলেও সোজা সরল মানুষ ছিলেন না। তাঁকে চটিয়ে দিয়ে সামান্য পাদ্রি সোরেন গেওর্গের বিরাট বিপদ ঘনিয়ে এল। তার উপর সোরেন কারস্টেন ট্যাঙ্ক অ্যাঙ্কারের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন। কারস্টেন ট্যাঙ্ক অ্যাঙ্কার ছিলেন নরওয়ের সংবিধান প্রণেতা ব্যক্তিদের একজন। নরওয়ে-তে তাঁকে ফাদার অফ দি কনসটিটিউশন বলা হত। তার উপর তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ তথা রাজপুরুষ। রাজপুরুষ কারস্টেন ধরেই নিলেন সোরেন গেওর্গ আবেল তাঁকে অপমান করেছেন। কারস্টেনের কঠিন প্রতিশোধে সোরেনের রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়ে গেল। ধর্মীয় পেশা এবং রাজনীতি, এই দুই জায়গা থেকেই একরকম বিতাড়িত হয়ে সোরেন গেওর্গ আবেল কোণঠাসা হয়ে গেলেন। একাকিত্ব এবং হতাশার সঙ্গে ভয়ংকর মদের নেশা তাঁকে গিলে ফেলল। এর দু বছর পর আঠারো বছরের নিলস হেনরিক কে ফেলে তিনি মারা পড়লেন।
পর বৎসর ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে নিলস হেনরিক রয়াল ফ্রেডারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৮১১ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্ক-নরওয়ের যৌথ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এখন এটি অসলো বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত। যাই হোক রয়াল ফ্রেডারিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির টাকা আবেলের হাতে ছিল না। টাকার যোগাড় করতে তাঁর শিক্ষক বার্নট মাইকেল হম্বো তাঁকে একটি স্কলারশিপ পেতে সাহায্য করেছিলেন।এছাড়াও হম্বো তাঁর বন্ধু বান্ধব পরিচিত জনের কাছ থেকে চাঁদা তুলে ছাত্রের পড়ার বন্দোবস্ত করলেন। যে সময়ে আবেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন, তখনই নরওয়ের লোক জেনে গেছে আবেল গণিতের একজন মস্ত প্রতিভা। হম্বো বেশ বুঝতে পারছিলেন, এ ছেলেটাকে আর কিছু শেখানোর মতো পুঁজি তাঁর নেই। আবেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বসে গণিতের সাম্প্রতিকতম জার্নালগুলি পড়তেন।
১৮২২ খ্রিস্টাব্দে আবেল স্নাতক হলেন। গণিতে অসম্ভব রকমের ভাল ফল করলেন আর অন্যান্য বিষয়ে মোটামুটি গোছের নম্বর পেলেন। যেহেতু বাড়ি থেকে আবেলকে অর্থসাহায্য করে উঠতে পারত না, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরাই তাঁকে খেতে পরতে সাহায্য করতেন। প্রফেসর ক্রিস্টোফার হ্যানস্টিন তাঁকে মাথা গোঁজার জন্য নিজের বাড়ির চিলেকোঠা ঘরে জায়গা করে দিয়েছিলেন।
আবেলের জীবনে প্রফেসর ক্রিস্টোফার হ্যানস্টিন (২৬ সেপ্টেম্বর ১৭৮৪ – ১১ এপ্রিল ১৮৭৩) এর খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। হ্যানস্টিন ছিলেন নরওয়ের একজন ভূপদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ, পদার্থবিদ, এবং গণিতজ্ঞ। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র নিয়ে মূল্যবান গবেষণা তাঁকে বড় পরিচিতি এনে দিয়েছিল। হ্যানস্টিন সাহেব হান্স ক্রিশ্চিয়ান ওরস্টেড, মাইকেল ফ্যারাডে প্রমুখ বড় বড় বিজ্ঞানসাধকের সঙ্গে পত্রালাপ করতেন। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে হ্যানস্টিন নরওয়ের রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গ অর্থাৎ জাতীয় পঞ্জিকার সম্পাদক পদে বৃত হন। ১৮১৭ তে নরওয়ের ম্যাপিং অথরিটির সহ নির্দেশক বা কো ডাইরেক্টর হিসেবে নিয়োজিত হন। ১৮১৮ তে তিনি রয়াল নরওয়েজিয়ান সোসাইটি অফ সায়েন্স অ্যাণ্ড লেটারস এর সদস্যপদ পেয়েছিলেন। অরোরা বোরিয়ালিস এবং পৃথিবীর চৌম্বকীয় ধর্ম নিয়ে তাঁর গবেষণাপত্রগুলি সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয় ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে গণিত বিষয়ে পড়াশুনা করতে আবেল ভর্তি হয়েছিলেন রয়াল ফ্রেডারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবেল তাঁর উজ্জ্বল গণিতপ্রতিভার জোরে অধ্যাপকের নজরে পড়ে গেলেন। ১৮২২ এ অধ্যাপক হ্যানস্টিন রয়াল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস এর সদস্য পদ পেয়েছিলেন, আর এই বছরেই তিনি নেচারভিডেনস্ক্যাবার্ন নামে একটি বিজ্ঞান পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। একাদিক্রমে আট বছর ধরে হ্যানস্টিন এই পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন। অধ্যাপক আবেলকে ধরে পড়লেন তাঁর পত্রিকায় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখতে।
অধ্যাপক হ্যানস্টিনের নেচারভিডেনস্ক্যাবার্ন পত্রিকাটিই ছিল নরওয়ের প্রথম সায়েন্টিফিক জার্নাল। ১৮২৩ এর গোড়ার দিকে নেচারভিডেনস্ক্যাবার্ন পত্রিকায় আবেলের প্রথম রচনা প্রকাশিত হয়। ওই ১৮২৩ এই নেচারভিডেনস্ক্যাবার্ন এ আবেলের আরো বেশ কয়েকটি রচনা প্রকাশের পর বোঝা গেল আবেলের লেখা আর তার বিষয়বস্তু আর তা উপস্থাপনের ধরন ধারন মোটেও সাধারণ মেধার পাঠকের উপযোগী নয়। অত্যন্ত উচ্চমানের পাঠপ্রস্তুতি ব্যতীত আবেলের লেখায় দন্তস্ফুট করার সাধ্য হবে না।
এরপর আবেল ওই ১৮২৩ এই ফরাসি ভাষায় একটি সন্দর্ভ লিখলেন। সমস্ত ধরনের ডিফারেনশিয়াল ফর্মূলাকে ইন্টিগ্রেট করার সম্ভাবনা কতটা তারই এক সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তিনি খাড়া করলেন। আবেলের অর্থসংকট চলছিল বলে তিনি রয়াল ফ্রেডরিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে মুদ্রণবাবদে অর্থসাহায্যের প্রার্থনা করলেন। কিন্তু এই সন্দর্ভটি রিভিউ করবার জন্য যাঁরা নিয়েছিলেন, তাঁরা এটি হারিয়ে ফেলেন। কিছুতেই আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।
১৮২৩ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি অধ্যাপক সোরেন রাসমুসেন (১৫ ডিসেম্বর ১৭৬৮ – ২৬ জুন ১৮৫০) আবেলকে কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে গণিতবিদ অধ্যাপক কার্ল ফার্দিনান্দ দেগেন ( ১ নভেম্বর ১৭৬৬ – ৮ এপ্রিল ১৮২৫) এবং অন্যান্য গণিতবিদদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলেন। এজন্য অধ্যাপক রাসমুসেন আবেলকে পথখরচ বাবদ কিছু টাকাও উপহার দিয়েছিলেন। অধ্যাপক দেগেন ছিলেল ডেনমার্কের রাজা অষ্টম ক্রিশ্চিয়ানের কৈশোরকালের শিক্ষক। দেগেন নম্বর থিওরির উপর উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিলেন। পেল ইকুয়েশন নিয়েও তিনি পূর্বজদের ধারণাকে বিকশিত করেছিলেন। কিন্তু দেগেনের খুব উল্লেখযোগ্য ও মৌলিক কাজ ছিল এইট স্কোয়ার আইডেনটিটির বিষয়ে। দেগেন কুইনটিক ইকুয়েশন নিয়ে আবেলের গবেষণা দেখলেন। কিন্তু ভেবে পেলেন না ঠিক কী বলবেন। তবে তরুণ প্রতিভা আবেলকে উৎসাহ দিলেন ইলিপটিক ফাংশন নিয়ে কাজ করতে। দেগেনের উৎসাহ আবেলকে অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু আবেল যখন তা সমাধা করেছিলেন, সেই ১৮২৭ এ দেগেন আর তা দেখার জন্য জীবিত ছিলেন না।
আবেল কোপেনহেগেনে গিয়ে ক্রিস্টিন কেম্প নামে একটি ভদ্র মার্জিত মনের মেয়ের সঙ্গে পরিচিত হন। সময়টা ১৮২৩। ১৮২৪ এ তাঁরা প্রণয়বদ্ধ হন। অধ্যাপক সোরেন রাসমুসেন যে সময় আবেলকে কোপেনহেগেনে পাঠিয়েছেন, তার কিছুদিন আগে ১৮১৮ – ১৮২০ এই সময়কালে ক্রিস্তিয়ানিয়া, বর্তমানের অসলো নির্বাচনী ক্ষেত্র থেকে নরওয়ের পার্লামেন্টে ডেপুটি মেম্বার হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তারও কিছুদিন আগে ১৮১৫ – ১৮১৭ এই সময়কালে ওই একই নির্বাচনী ক্ষেত্র থেকে অধ্যাপক রাসমুসেন নরওয়ের পার্লামেন্টে মেম্বার হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
যাই হোক, কোপেনহেগেন থেকে ফিরে আবেল বললেন, তিনি জার্মানি ও ফ্রান্সের সেরা গণিতবিদদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে চান। আর সেই খরচ জোটাতে তাঁর সরকারি স্কলারশিপ দরকার। কিন্তু সরকার তাঁকে দুই বৎসরের জন্য বার্ষিক হারে কিছু অর্থ মঞ্জুর করে বললেন, আবেল যদি অসলোয় থেকে দুই বৎসর সময়সীমার মধ্যে জার্মান ও ফরাসি ভাষা আয়ত্ত্ব করে ফেলতে পারেন, তখন তাঁকে বার্ষিক অনেকটা টাকা স্কলারশিপ দিয়ে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হবে।
এই জার্মান ও ফরাসি, দুই ভাষা নিয়ে পড়াশুনা করতে করতেই ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে আবেল প্রমাণ করে দিলেন যে র্যাডিক্যালের কুইনটিক সমীকরণ সম্ভব নয়। ওই ১৮২৩ এই তিনি এই সন্দর্ভটি ছেপে বের করলেন। কিন্তু ভীষণ আর্থিক টানাটানি থাকার কারণে খুব অল্প পরিসরে, অতি সংক্ষেপে ওটি ছাপতে হল। তার জন্য ভাষা রয়ে গেল দুর্বোধ্য ও কঠিন। কেননা সাধারণ মেধার লোকজনের বোঝার সুবিধা করে দিতে হলে যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন ছিল, ততখানি বিস্তৃত পরিসরে ছাপানোর টাকা আবেলের জোটে নি।
কয়েক বছর পরে, ১৮২৬ সালে অগাস্ট লিওপোল্ড ক্রেল সম্পাদিত ক্রেলস জার্নালের প্রথম ভলিউমে একটি বিস্তৃততর প্রমাণ পেশ করা হয়। এই অগাস্ট লিওপোল্ড ক্রেল এর সঙ্গে পরিচয়, ও হৃদ্যতা আবেলের জীবনে একটা বড় কাজ করেছে।
অগাস্ট লিওপোল্ড ক্রেল (১৭ মার্চ ১৭৮০ – ৬ অক্টোবর ১৮৫৫) ছিলেন একজন জার্মান গণিতপিপাসু। তিনি ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে জার্নাল ফর পিওর অ্যাণ্ড অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিকস নামে একটি মাসিক ত্রিভাষিক গণিত জার্নাল প্রকাশ করছিলেন। একইসঙ্গে জার্মান ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত এই সিরিয়াস গণিত জার্নালটি গণিতবিদদের মন কেড়েছিল। কার্ল ফ্রিডরিশ গাউসের মতো বিশ্ববরেণ্য গণিতপ্রতিভাও এই পত্রিকায় লেখা পাঠিয়েছিলেন। এই গণিত জার্নালটি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো গণিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তরফে প্রকাশিত না হলেও এটি গণিতবিদদের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। লোকজনের কাছে এটি ক্রেলস জার্নাল হিসেবে বেশি পরিচিত ছিল।
এই সময়ে বিশ্ববন্দিত গণিতপ্রতিভা ছিলেন জোহান কার্ল ফ্রিডরিশ গাউস ( ৩০ এপ্রিল ১৭৭৭ – ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৫)। বলা দরকার, গাউস সারা পৃথিবীর সর্বকালের সেরা একজন গণিতবিদ। আবেলের স্কলারশিপের শর্তই ছিল তিনি জার্মানির গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে গাউসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, আলাপ আলোচনা করবেন। কিন্তু কোপেনহেগেনে গিয়ে আবেল নিজের মত বদলে ফেললেন। তিনি বার্লিনে গিয়ে মাস চারেক থাকলেন। ওখানেই অগাস্ট লিওপোল্ড ক্রেল এর সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও ক্রমে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তাঁর থেকে বয়সে সতের আঠার বছরের বড় ক্রেল একটি সিরিয়াস গণিত জার্নাল প্রকাশ করতে চাইছেন জেনে আবেল তাঁকে সুপ্রচুর উৎসাহ যোগালেন, এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তিনি তাঁকে নিয়মিত ভাল ভাল গণিত সন্দর্ভ উপহার দেবেন। প্রথম বছরেই আবেল ক্রেলকে সাত সাতটি গবেষণাপত্র দিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে আবেল বীজগাণিতিক ডিফারেনশিয়ালের উপর একটি থিওরেম রচনা করেছিলেন। তিনি নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন যে এটাই তাঁর সেরা গণিত সন্দর্ভ। এটি তিনি ১৮২৬ এর অক্টোবরে সম্পূর্ণ করেন এবং ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস কে তুলে দেন। আবেলের এত যত্নের সন্দর্ভটিকে ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস আদৌ গুরুত্ব দেন নি এবং প্রকাশ না করে একপাশে ফেলে রেখেছিলেন। ইতিমধ্যে আবেলের পয়সা ফুরিয়ে যেতে তিনি বিদেশ সফরে ইতি টেনে ১৮২৭ এর মে মাসে নিজের দেশ নরওয়েতে প্রত্যাবর্তন করেন। এই যে তাঁর বিদেশ যাত্রার এইরকম পরিণতি, একে নরওয়ের সরকারি কর্তৃপক্ষ একেবারেই ভাল চোখে দেখলেন না, এবং আবেলের তরফে এটা বড় ধরনের ব্যর্থতা বলেই বিবেচনা করলেন। সরকারি কর্তৃপক্ষ বললেন, স্কলারশিপের শর্ত মান্য করে তিনি গাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নি, এবং প্যারিসে কোনো কিছুই প্রকাশ করে উঠতে পারেন নি। কেউ তলিয়ে বুঝতেই চাইলেন না যে, আবেল তাঁর সেরা সন্দর্ভটি ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস এ দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা সেটি অবহেলা ভরে ফেলে রেখেছিলেন। এই দোষে আবেলের শাস্তি হল যে, তাঁকে আর স্কলারশিপ দেওয়াই হল না। এদিকে প্যারিসে থাকতেই আবেল যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। নিরুপায় হয়ে নিঃস্ব আবেল নরওয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক থেকে কিছু টাকা ধার করেন। জীবদ্দশায় এই ধার আর তিনি শোধ করে উঠতে পারেন নি।
১৮২৮ এর বড়দিনের সময় তিনি তাঁর প্রেমিকা ক্রিস্টিন কেম্প এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে গিয়েছিলেন। যাওয়ার পথে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রেমিকার কাছে গিয়ে একটু সুস্থ বোধ করায় তাঁরা বড়দিনের ছুটির দিনগুলি একসাথে আনন্দে কাটান। তবে আবেলের জীবনীশক্তি যক্ষ্মার প্রকোপে দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিঃশেষিত হয়ে এসেছিল। ১৮২৯ এর ৬ এপ্রিল তাঁর জীবনাবসান হয়। এই করুণ মৃত্যুর দুইদিন পরে অগাস্ট লিওপোল্ড ক্রেলের একটা চিঠি এল, তাতে লেখা, বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় আবেলকে অধ্যাপক পদে নিয়োগ করতে চাইছেন।