দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৮৯)

পর্ব – ১৮৯

গাড়ি এগোতে এগোতে একজায়গায় শ‍্যামলী বলল, গোবিন্দকাকা, আমায় এইখানেই নামিয়ে দাও।

গোবিন্দচন্দ্র রাজি হল না। বলল, ম‍্যাডাম বলে দিয়েছিলেন, তোমাকে যেন তোমার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি। তাছাড়া, তোমার বাবা কাল ফোন করে ছিলেন। আমি ধরেছিলাম। বলেছিলাম, তুমি ম‍্যাডামের কাছে এসেছ। রাতে ফিরবে না, ম‍্যাডামের কাছেই থাকবে। পাল দা একটু রেগে আছেন তোমার উপর। ম‍্যাডাম বলেছেন, আমি যেন হাজির থেকে পরিস্থিতি সামলে দিই।
শ‍্যামলী বলল, না না, দিদিকে বোলো, এখনই বাড়ি যাব না।  একটু পরে কটা কাজ সামলে নিয়ে তারপর যাব।
গোবিন্দচন্দ্র বলল, দ‍্যাখো, তোমার ভাই দুটো যে রকম মারকুটে, উকিলবাড়ি আসার ওরা একটা খারাপ মানে করবে। আর মারধোর করবে।
শ‍্যামলী বলল, না, আমার একটু কাজ আছে। আমাকে এখনই নামিয়ে দাও।
তবুও ড্রাইভার রাজি হয় না দেখে সে বলল, দ‍্যাখো গোবিন্দকাকা, তুমি ছোটবেলায় আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরেছ, সেই কারণে তুমি অবশ্যই আমার গুরুজন। তবুও বলছি, এখন আমি বড় হয়েছি, নিজের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেবার একটা মন আমার তৈরি হয়ে গিয়েছে। এখন আমি আর কোলের শিশুটি ন‌ই। তুমি আমাকে নামিয়ে দাও। আমি দিদিকে সব বুঝিয়ে বলব।
গোবিন্দচন্দ্র বলল, জানি, আজ তোমার জন্য আমার কপালে দুঃখ আছে। তবু বলছি, বিপদে পড়লে মুখ বুজে মার খেও না। জানিয়ে দিও এ তল্লাটের সেরা উকিল তোমার সাথে আছে।
শ‍্যামলী গাড়ি থেকে নেমে হেসে বলল, যাও সাবধানে যাও।
গোবিন্দচন্দ্র বলল, এই কথাটা কার বলার, আর কে বলছে!
শ‍্যামলী হাঁটছিল। এমন সময় পিছন থেকে একটা গাড়ি কাছে এসে দাঁড়াল। তার কালো কাচ নামিয়ে ভিতরের আরোহী তাকে নাম ধরে ডাকল।
শ‍্যামলী ভ্রূ কুঁচকে তাকাল, কাছে গিয়ে দেখল, গাড়ির ভিতর হিরণ দাশগুপ্ত। তিনি দরজা খুলে বললেন, উঠে আয়, কোথায় যাচ্ছিস, পৌঁছে দিই।
শ‍্যামলী একটু অবাক হল। আজ সকালে কলেজে ইনি তাকে তুমি বলে সম্বোধন করেছেন। অথচ এখন হৃদ‍্যতা দেখিয়ে তুই বলছেন। শ‍্যামলী সতর্ক হল এবং বলল, না হিরণবাবু, আমি গাড়ি করেই যাচ্ছিলাম। শখ করে একটু হাঁটছি। আমার হাঁটতে খুব ভালো লাগে।
 হিরণ বললেন, শোন্ তোকে না কি  ছাত্র ফেডারেশনের মেয়েরা মেরেছে?
শ‍্যামলী বলল, সত‍্য কথা স্পষ্ট করে বলতে চাইলে অমন পুরস্কার জুটে যায়। ও আমাদের শিরোভূষণ। আজ তো আপনিও ভয় দেখালেন আমাকে রাজনৈতিক ভাবে দেখে নেবেন।
হিরণ বললেন, তুই আমার কথার মাঝখানে অত কথা ক‌ইলি, জানিস্, এখানে আমার মুখের উপর কেউ কথা বলে না?
শ‍্যামলী বলল, তাই যদি হয়, সেটা আপনার দুর্ভাগ্য বলতে হবে।
হিরণ গাঢ় স্বরে বললেন, তোর কাছে আজ একটা আবদার করলাম। তুই তো সেটা রাখলিই না। উপরন্তু আমাকে কত রকম শুনিয়ে দিলি। তুই জানিস্, এতে আমার ইমেজ কতটা ধাক্কা খেয়েছে?
শ‍্যামলী বলল, আপনাকে দেখে লোকজন ভয় পাক, কুঁকড়ে থাকুক, এই ইমেজটাকে আপনার পছন্দ হয়? আমি হলে তো লজ্জায় মরেই যেতাম।
হিরণ একটু অস্থির হয়ে উঠে বললেন, শোন্, আমাদের জেলা লিডাররা ঠিক করেছে, তোকে আমরা সব রকম প্রটেকশন দেব। এটাই আমাদের পলিটিক‍্যাল ট‍্যাকটিকস।
শ‍্যামলী বলল, কেন হিরণবাবু, আমার প্রতি এই অহৈতুকী করুণা কেন? আমি মোটেও আপনাদের পলিটিক‍্যাল কৃপার যোগ্য ন‌ই।
হিরণ অধৈর্য হয়ে বললেন, শোন্, আমাদের ছেলেরা তোকে যদি কেউ কিছু বলতে আসে, তুই বলে দিবি, হিরণদার সাথে আমার কথা হয়ে গেছে। মনে থাকবে?
শ‍্যামলী হেসে বলল, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। আপনাদের দুই পার্টির একটা শো ডাউন দরকার। মাঝখানে আমি গরিব বেচারি জড়িয়ে গেলাম।
হিরণ বললেন, শোন্, আমার তাড়া আছে। কেউ কোনো সমস্যা করলে আমায় একটা খবর দিবি। আজ চলি।
শ‍্যামলী অবাক হয়ে লক্ষ্য করল যে হিরণের ফিয়েট গাড়ির নম্বরটা হল ৬৬৬। আরে, এই সংখ্যাটা তো ভারি অদ্ভুত। এর ডিজিটগুলো যোগ করলে ৬+৬+৬= ১৮ হয়, আবার এর মৌলিক গুণনীয়ক গুলো অর্থাৎ ২, ৩,৩ আর ৩৭ এর ডিজিটগুলোর যোগফল‌ও ১৮। ২+৩+৩+৩+৭= ১৮। এই জন‍্য একে স্মিথ নম্বর বলে। আবার বীস্ট নম্বর‌ও বলে। আবার ৬৬৬ = দুই এর বর্গ প্লাস তিনের বর্গ প্লাস পাঁচের বর্গ প্লাস সাতের বর্গ প্লাস এগারোর বর্গ প্লাস তেরর বর্গ প্লাস সতেরর বর্গ। এই দুই, তিন, পাঁচ সাত, এগারো, তের আর সতের, সব কটা ধারাবাহিক মৌলিক সংখ্যা।
নিশ্চয়ই ৬৬৬ সংখ‍্যাটার আরো অনেক রকম বৈশিষ্ট্য থাকবে। আজ এমন সব ঘটনা ঘটে গেল, যার অনেক রকম ফলাফল হবে। সবচাইতে ভালো হল ক্লাসের মেয়েদের সঙ্গে তার কিছুটা কথাবার্তা হল। ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী সংগঠকেরা তাকে না মারলে, ক্লাসের ছাত্রীদের মধ‍্যে তার প্রতি এই আনুকূল্য তৈরি হত না। শ‍্যামলী ভাবল, এই মার খাওয়াটা তার কাছে নিজেকে কাছ থেকে দেখার অনেক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ওই যে হিরণ বলে গেলেন, তোকে আমরা পলিটিক‍্যাল প্রটেকশন দেব, এটা এখন ওদের দায় হয়ে গেছে। একটা পরিস্থিতি কত রকম দিক দিয়ে কাজ করছে। ৬৬৬ এর মতোন।

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!