T3 || আমি ও রবীন্দ্রনাথ || সংখ্যায় মৃদুল শ্রীমানী

হরিমোহিনীর গল্প
রবীন্দ্রনাথের “গোরা” উপন্যাসে পরেশবাবুর বাড়িতে আশ্রিত সুচরিতার মাসির একটা গল্প মেলে ধরেন রবীন্দ্রনাথ। সুচরিতার মাসিটি তার মায়ের বড় দিদি। সুচরিতার মায়েরা দুই বোন। বড় হরিমোহিনীর বিয়ে হয়েছিল খুবই অল্পবয়সে, বিখ্যাত জমিদার পরিবারে। কিন্তু অল্পবয়সী, নিতান্ত বালিকা বধূটিকে একেবারেই হেলাফেলায় দিন কাটাতে হত। বড় জমিদার বাড়ির বধূ হওয়া সত্ত্বেও প্রচুর দৈহিক শ্রম করতে হত। অনেক বেলায় সামান্য অবশিষ্ট খাদ্য মিলত, যার পুষ্টিমূল্য হত যৎসামান্য। রাতেও ওই পরিস্থিতি। সামান্য আহারের পর বালিকা যার সাথে হোক শুয়ে পড়তে বাধ্য হত। কোনো কোনো দিন বিছানা টুকুও জুটতো না। কাঠের পিঁড়ি পেতে কোনো মতে গা এলিয়ে দিতে বাধ্য হতেন শিশু হরিমোহিনী।
বালিকার এহেন অনাদরের কারণ ছিল তার পিতৃপক্ষের আর্থিক ক্ষমতার সাথে বরপক্ষের আর্থিক দাবির তাল মিল না হওয়া। বাড়ির সকলে হরিমোহিনীকে দাসীতুল্য ব্যবহার করে দেখে তার বরও তার সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
হরিমোহিনীর একটি কন্যা সন্তান জন্মায়। তাতে তার উপর শ্বশুর বাড়ির অত্যাচার বাড়তে থাকে। পরে একটি পুত্র হলে সেই অসহনীয় অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। স্বামীও ক্রমে ক্রমে হরিমোহিনীর বশে আসতে থাকেন। পরে হরিমোহিনী আরো আর্থিক বিচার বিবেচনার পরিচয় তুলে ধরে নিজের জায়গা আর একটু শক্ত করেন। এমন সময় বালক পুত্রের মৃত্যু হয় অকালে, আর দিন কয়েক পরেই স্বামীকেও হারান হরিমোহিনী।
হরিমোহিনী তার মেয়ে মনোরমার বিয়ে দিয়েছিলেন কার্তিকের মতো রূপবান বরের সাথে। লেখক হরিমোহিনীর মুখে বলিয়েছেন যে মনোরমার শ্বশুরবাড়িতে খাওয়া পরার সংগতি ছিল। কিন্তু মনোরমার বিয়ে আদৌ সুখের হয় নি। বরটি রূপে কার্তিক হলে কি হবে, সাংসারিক জীবনে ঘোর অমানুষ ছিলেন। নেশা ও আনুষঙ্গিক বদ অভ্যাসের শিকার মনোরমার বর হরিমোহিনীর কাছে প্রথমে টাকার আবদার করত। মনোরমা তার মাকে তার বরের এমন আবদার কে প্রশ্রয় দিতে বারণ করত। আভাসে ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইত অতি অপাত্রে খারাপ কাজের জন্যই টাকা নয়ছয় করা হচ্ছে। হরিমোহিনীর চেতনা আসত না। তিনি এমন কি মেয়েকে লুকিয়ে জামাইকে নেশার কড়ি যোগাতেন।
হরিমোহিনীর টাকার ওপর জামাইয়ের আবদার পরে পরে জোর খাটানো, জেদ ও আরো পরে নির্যাতনের পর্যায়ে পৌঁছে গেল।হরিমোহিনীকে জামাই যেন ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করল। টাকা না দিলে মেয়ের উপর অত্যাচার হবে, মেয়ে মারধোর খাবে, এই ভয়ে আর উদ্বেগে হরিমোহিনী টাকা দিয়ে চলতেন। সে সম্পর্ক শেষ হল স্বামীর হাতে মারধোর খেয়ে গর্ভবতী মনোরমার গর্ভপাতজনিত মৃত্যুতে।
মনোরমার মায়ের কাছে সে খবর পৌঁছনোর আগেই শ্বশুরবাড়ির লোকে গোপনে রাতারাতি মনোরমার মৃতদেহের সৎকার করে ফেলেছিল। হরিমোহিনী জানতে পেরেছিলেন তাঁর একজন দেওরই কুসংগ ও কুবুদ্ধি দিয়ে মনোরমার বরকে নষ্ট করেছিল। হরিমোহিনীর শ্বশুরের প্রয়াণের পরে, যখন তাঁর স্বামী বেঁচে, তখনই দেবরের দল শত্রুতা শুরু করেছিল। তাদের সাথে সম্পত্তি নিয়ে মামলায় জড়িয়ে বিস্তর সম্পত্তি নষ্ট হয়। তারপর দেবরদের একজনের উদ্যোগেই মনোরমার জামাই বিপথে পরিচালিত হয়। এমন কি স্বামী পুত্রহীনা হরিমোহিনীর একমাত্র মেয়ের জন্য টাকা জমাবার প্রচেষ্টাও দেবরদের কাছে অপরাধ বলে গণ্য হত। স্বামী পুত্রকে হারিয়ে মেয়ের জন্য চিন্তা ও সঞ্চয় করলেও দেবরদের ক্রোধ। কন্যার বরকে দেবরেরা বিপথে চালালো। জামাইয়ের হাতে মেয়ের নিয়মিত নিগ্রহ। শেষে গর্ভপাতে কন্যার মৃত্যু। মাকে লুকিয়ে রাতারাতি মেয়ের সৎকার। একেবারে অন্তিমে দেবরদের চক্রান্তে নিরাশ্রয় ভিটেছাড়া হওয়া। পুরোটার গভীরে ঢুকলে দেখা যাবে হরিমোহিনী পুরুষতন্ত্রকে ভয়জনিত ভক্তি করতেন। জামাইয়ের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে তিনি নিয়মিত ঘুষ দিয়ে গিয়েছেন। সেখানে মেয়ে নানাভাবে তাঁর টাকা দেবার বদভ্যাসকে রুখতে চাইলে হরিমোহিনী মেয়েকে লুকিয়ে জামাইকে নেশার কড়ি যুগিয়ে গিয়েছেন। জামাই যে মেয়েকে মারধোর করতে অভ্যস্ত এটাও হরিমোহিনী বোধের বাইরে থেকে গিয়েছে। গর্ভবতী অবস্থায় মেয়ে অত্যাচারী পিশাচ বরের হাত থেকে রেহাই চাইলে হরিমোহিনী জামাইয়ের পাষণ্ড সুলভ আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারেন নি। কন্যার মৃত্যুর পর শোকাচ্ছন্ন হরিমোহিনীকে যখন দেবরদের লোভের হাত থেকে পুরোনো বিশ্বস্ত কর্মচারী নীলকান্ত রক্ষা করতে চেষ্টা করছে, তার সে উদ্যোগে জল ঢেলে দেবরদের চক্রান্তকে সফল করে দেন হরিমোহিনী নিজে।
পরে আমরা দেখব পুরুষতন্ত্র কে কিভাবে ভয় পেতে পেতে হরিমোহিনী নিজে পুরুষতন্ত্রের তলপিবাহক হয়ে উঠেছেন। সুচরিতাকে তিনি নিজের পেটের মেয়ে মনোরমার সামিল করে দেখতে চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন, কিন্তু গোরার প্রতি সুচরিতার ঐকান্তিক প্রেম তাঁর সমর্থন পায় নি। যাতে গোরার সাথে কন্যাসমা সুচরিতার বিয়ে না হয়, এ বাবদে বৃদ্ধা হরিমোহিনী বিস্তর মাথা ঘামিয়েছিলেন। যে দেবরদের সাথে মকদ্দমা করে তাঁদের পৃথক হতে হয়েছিল, যারা তাঁর জামাইকে কুপথে চালিত করেছিল, যাঁরা শেষ অবধি তাঁকে ভিটেছাড়া করতে লজ্জাবোধ করে নি, সেই দেবরদের একজন সদ্য বিপত্নীক কৈলাসের সাথে সুচরিতার দোজবরে বিয়ে দেবার উদ্যোগ নিতে তাঁর বাধল না। আসলে ধর্মীয় গোঁড়ামিই হরিমোহিনীকে এইদিকে ঠেলে দিয়েছে। ধর্মগোঁড়া হরিমোহিনী নিজে অত্যাচারিত হয়েও বাস্তবে অত্যাচারীর দলে ভিড়ে গিয়েছেন। একজন মেয়ে হয়ে আরেকটি মেয়ের রুচি ও স্বাধীন চেতনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন পুরুষতন্ত্রের প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে। হরিমোহিনীর গল্প আমাদের কত কথা বলে দেয়।