ক্যাফে ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৭)

পরমাণু জগতে অনিশ্চয়তা ও ওয়ার্নার কার্ল হাইজেনবার্গ
অনিশ্চয়তা আমাদের জীবনের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা। আজ তো যা হোক হল, কাল কী হবে, এ প্রশ্ন কুরে কুরে কখনো খায় নি, অতি সাধারণ মানুষের জীবনে এটা হয় না।
কিন্তু বিজ্ঞানে?
ওই নিয়েই একটা দামি কথা বললেন ওয়ার্নার কার্ল হাইজেনবার্গ ( ৫ ডিসেম্বর ১৯০১ – ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬)। বললেন, পরমাণু বা মৌলিক কণাগুলি নিজেরা আসল সত্য নয়, তারা যেন একটি সম্ভাবনার জগৎ তৈরি করে। বাস্তব জগতের চেয়ে যা পৃথক। এসে গেল এক অনিশ্চয়তার কথা।
জার্মান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ তাঁর অনিশ্চয়তা সূত্রের জন্য বিশ্ববন্দিত। ১৯২৭ সালে তাঁর এই তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৩২ সালে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিতে তাঁকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল সম্মানে ভূষিত করা হয়।
অনিশ্চয়তা সূত্র বোঝাতে গিয়ে হাইজেনবার্গ বললেন, কোনো একটা জিনিসের অবস্থান আর তার ভরবেগ একসঙ্গে সুনির্দিষ্ট ভাবে পরিমাপ করা অসম্ভব। বাস্তবেও অসম্ভব, তত্ত্বগতভাবেও অসম্ভব। আরো বললেন, কোনো জিনিসের সুনির্দিষ্ট অবস্থান আর একই সঙ্গে তার সুনির্দিষ্ট ভরবেগ, এইসব নির্ধারণ করার কোনো সুযোগ প্রকৃতিতে নেই।
হাইজেনবার্গ বললেন, কোনো একটা কণার একজোড়া বস্তুগত পরিমাপ করা, যেমন ধরা যাক, কোনো কণার অবস্থান আর ভরবেগ একই সঙ্গে কেমন হবে, তা তার প্রাথমিক অবস্থান থেকে আন্দাজ করার বেশ একটু সীমাবদ্ধতা আছে। যদি বলার চেষ্টাও করা হয়, তবে তার সঠিক হবার সম্ভাবনা কতদূর, তার বেশ একটা মৌলিক ধাঁচের সীমাবদ্ধতা আছে। এই যে একজোড়া বাস্তব বিষয়, অবস্থান আর ভরবেগ, এই গোছের জুড়িকে বলে কমপ্লিমেন্টারি ভ্যারিয়েবলস। পুরোনো দিনের লব্জে কনজুগেট ভ্যারিয়েবলস। বললেন, কোনো কণার অবস্থান যদি নিখুঁত করে পরিমাপ করা হয়, তাহলে তার ভরবেগকে সেই মাপের নিখুঁত করে নির্ধারণ করা যাবে না। কণাটির অবস্থানের পরিমাপ যত নিখুঁত করতে চিওয়া হবে, ভরবেগ নির্ধারণ নিখুঁত হবার সম্ভাবনা ততই কমবে। একইসঙ্গে এর বিপরীতটাও সত্য। অর্থাৎ ভরবেগ নিপুণভাবে নির্ধারণ করতে গেলে অবস্থান পরিমাপের নির্ভুলতা সেইভাবে কমবে।
অবশ্য হাইজেনবার্গের এই তত্ত্ব অতিপরমাণুর জগতে কার্যকর। আমরা ওকে বলব কোয়ান্টাম জগৎ। কোনো কিছুর উপর আলো পড়লে তা থেকে ইলেকট্রন বিচ্ছুরিত হয়। আলেকজান্দ্রে এডমন্ড বেকারেল ১৮৩৯ সালে ব্যাপারটা নজর করেছিলেন। ১৮৮৭ সালে হাইনরিশ হার্ৎজ এ নিয়ে বিস্তৃততর অনুসন্ধান করেন। ১৯০২ সালে ফিলিপ লেনার্ড এ নিয়ে ভিন্নতর গবেষণা করেছিলেন। ১৯০৫ সালে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের শক্তির ন্যূনতম কণা বা কোয়ান্টাম নির্ধারণ করেন। ওই যেন কোয়ান্টাম জগতের সিংহদুয়ার খোলা। এই যে কোয়ান্টা, মানে এই ছোট্ট এতটুকু একটা জিনিস, এটা একটা তড়িৎ নিরপেক্ষ কণা। এর নাম দেওয়া হল ফোটন কণা। যদিও ফোটন নামটা পরিচিতি পেয়েছে পরবর্তীকালে। আইনস্টাইন বলেছিলেন আলোক কোয়ান্টা। এর মধ্যেই ১৯০০ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ( ২৩ এপ্রিল ১৮৫৮ – ৪ অক্টোবর ১৯৪৭) দেখিয়েছিলেন একটা ফোটনের শক্তি আর তার কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সির মধ্যে একটা গাণিতিক সম্পর্ক আছে। ওই সম্পর্কের মান নির্ধারণ করা যায়। ওই হল প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবক। শক্তি কোয়ান্টা নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতিতে ১৯১৮ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ককে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
আলোর কোয়ান্টা নিয়ে আইনস্টাইনের ১৯০৫ সালের গবেষণার সূত্রে রবার্ট অ্যানড্রুজ মিলিকান বিস্তারিত গবেষণা করে জানান আইনস্টাইনের ধারণা সত্য। তখন, ১৯২১ সালে, গবেষণা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হবার বছর পনেরো ষোল পরে আইনস্টাইনের নোবেল সম্মান জোটে। মিলিকান প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবকের নিখুঁততর মান নির্ধারণ করেছিলেন।
হাইজেনবার্গের কথাটা অতিপরমাণুর জগতে খাটে, সে কথা আগেই বলেছি। অতিপরমাণুর জগৎটা জানতে বুঝতে হাইজেনবার্গের শিক্ষক আর্নল্ড জোহানস সমারফেল্ড ( ৫ ডিসেম্বর ১৮৬৮ – ২৬ এপ্রিল ১৯৫১) তাঁকে হাতে ধরে নিলস বোরের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেটা ১৯২২ সালের জুন মাস। হাইজেনবার্গের বয়স তখনও একুশে পৌঁছয় নি। ওই ১৯২২ সালেই নিলস হেনরিক ডেভিড বোর ( ৭ অক্টোবর ১৮৮৫ – ১৮ নভেম্বর ১৯৬২) পরমাণুর গঠন বিন্যাস ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের বিকাশে তাঁর মৌলিক অবদানের স্বীকৃতিতে নোবেল সম্মান অর্জন করবেন।
শুধুমাত্র হাইজেনবার্গই নয়, তাঁর একেবারেই সমবয়সী, মাত্র কয়েকটি মাসের ছোট, আরেক অসামান্য প্রতিভাধর পল ডিরাক ( ৮ আগস্ট ১৯০২ – ২০ অক্টোবর ১৯৮৪) ও নিলস বোরের কাছে পরমাণুবিদ্যা চর্চা করতে গিয়েছিলেন। বোরের সঙ্গে ছাত্র হাইজেনবার্গের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আর্নল্ড জোহানস সমারফেল্ড ( ৫ ডিসেম্বর ১৮৬৮ – ২৬ এপ্রিল ১৯৫১)। সমারফেল্ড ছিলেন মিউনিখ লুডউইগ ম্যাক্সিমিলিয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইজেনবার্গের শিক্ষক । সমারফেল্ড নিজেও ছিলেন বড় মাপের গুণী পদার্থবিজ্ঞানী। সমারফেল্ড ১৯১১ সাল থেকেই কোয়ান্টাম বিষয়ে কাজ করছিলেন। বস্তুত কোয়ান্টাম জগৎই তাঁর আকর্ষণের প্রধান ক্ষেত্র ছিল। নিলস বোরের পরমাণুবাদ নিয়ে তিনি গভীরভাবে গবেষণা করেছেন। নিলস বোর যেখানে বলেছেন পরমাণুর ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রীণকে বৃত্তাকার পথে আবর্তন করে, সমারফেল্ড সেখানে দেখালেন আসলে ওই পথগুলি উপবৃত্তাকার। সমারফেল্ডের আরো অবদান হল, তিনি ১৯১৬ সালে চৌম্বকীয় কোয়ান্টাম সংখ্যার ধারণা দেন এবং তার চার বছর পরে অন্তস্থ কোয়ান্টাম সংখ্যার ধারণা দেন। ডিসেম্বর ১৯১৫ ও জানুয়ারি ১৯১৬ তে ব্যাভেরিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সান্সে দু দুটি প্রতিবেদন পাঠ করেছিলেন সমারফেল্ড। তারই সংশোধিত ও সম্পাদিত রূপ ১৯১৬ সালের জুলাই মাসে অ্যানালেন ডার ফিজিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২২ সালে সমারফেল্ড হাইজেনবার্গকে গটিংগেন এর বোর ফেস্টিভ্যালে নিয়ে গেলেন। বোর সেই ফেস্টিভ্যালে অতিথি বক্তা হিসাবে উপস্থিত হন। সেখানে বোর কোয়ান্টাম পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পর পর বেশ কতকগুলি সারগর্ভ বক্তৃতা দেন। নিলস বোরকে সেই প্রথম দেখলেন সদ্যতরুণ হাইজেনবার্গ। তাঁকে দেখে, আলোচনা শুনে খুব ভাল লাঘল। সে মধুর স্মৃতি রইল বহুদিন।
হাইজেনবার্গ পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত নিয়ে মিউনিখের লুডউইগ ম্যাক্সিমিলিয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছিলেন। সেখানে তাঁর শিক্ষক ছিলেন আর্নল্ড সমারফেল্ড ( ১৮৬৮ – ১৯৫১) এবং উইলহেলম উইয়েন ( ১৮৬৪ – ১৯২৮)। এরপর হাইজেনবার্গ গিয়েছিলেন গটিংগেন এর গেওর্গ অগাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি পদার্থবিজ্ঞান পড়েছেন ম্যাক্স বর্ন ( ১৮৮২ – ১৯৭০), এবং জেমস ফ্রাঙ্ক ( ১৮৮২ – ১৯৬৪) এর কাছে। আর গণিত চর্চা করেছেন ডেভিড হিলবার্ট ( ১৮৬২ – ১৯৪৩) এর কাছে। এইসব পড়াশুনা হাইজেনবার্গ করেছিলেন ১৯২০ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে। জীম্যান প্রভাবের কিছু অসঙ্গতির বিষয়ে হাইজেনবার্গের নজর ছিল। গটিংগেন এ গিয়ে তিনি ম্যাক্স বর্নের অধীনে হ্যাবিলিটেশন বা পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ করেছেন। হ্যাবিলিটেশন রিসার্চে তাঁর থিসিস ছিল অ্যানোম্যালাস জীম্যান এফেক্ট নিয়ে।
নোবেলজয়ী ডাচ পদার্থবিজ্ঞানী পিটার জীম্যান ১৮৬৫ সালের ২৫ মে তারিখে জন্মেছিলেন। ১৯০২ সালে তিনি হেনড্রিক লোরেঞ্জ নামে তাঁর এক অধ্যাপকের সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নোবেল সম্মান লাভ করেন। নানাবিধ বিষয়ে জীম্যান গবেষণা করে থাকলেও তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে আলোক রশ্মির বর্ণালীর বহুধাবিভক্ত হবার ঘটনাসূত্রে। একেই বলে জীম্যান এফেক্ট।
১৮৯৬ সালে জীম্যান লক্ষ করলেন, একটি শিখায় কোনো পদার্থ দহন করতে করতে তা থেকে তৈরি আলোর বর্ণালীকে যদি একটি চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে পরিচালনা করা যায়, তখন বর্ণালীর আলোকরেখাগুলি দুইভাগ বা তিনভাগ এমনকি চারভাগ পর্যন্ত হয়ে যায়। জীম্যান এটা দেখে বেশ অবাক হলেন এবং ধন্দে পড়লেন। ওই ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ইলেকট্রনের অস্তিত্ব জানা ছিল না। জে জে টমসন, জন এস টাউনসেন্ড এবং এইচ এ উইলসন এর সঙ্গে একযোগে ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এইসূত্রে জে জে টমসন ১৮৯৭ সালে ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন।
আজ আমরা জানি, ইলেকট্রনের স্পিন আছে। ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগ রয়েছে। ওই স্পিন ইলেকট্রনের একটি মৌলিক পরিচয়। একটি চৌম্বকক্ষেত্রে বিপরীত স্পিনের ইলেকট্রনগুলির কক্ষপথ পরিবর্তন করার সময় আলাদা আলাদা শক্তিমাত্রা থাকে। এই স্পিনের ভিন্নতার জন্যই একটি বর্ণালী রেখার পরিবর্তে দুই, তিন, চার ইত্যাদি সংখ্যক বর্ণালী রেখা দেখা যায়।
কোয়ান্টাম বলবিদ্যার হালফিল ধারণায়, ইলেকট্রন যখন নির্দিষ্ট শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে উন্নীত হয়, তখন আলোর বর্ণালীর ছটা বের হয়। এই প্রতিটি শক্তিস্তর আলাদা আলাদা কৌণিক ভরবেগের দ্বারা সুচিহ্নিত। চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে পড়লে এই রশ্মির বিভাজন ঘটে যায়। একই অভিন্ন শক্তিমাত্রার আলাদা আলাদা অবস্থা হয়। এই আলাদা আলাদা অবস্থার কারণে আলাদা আলাদা বর্ণালীরেখা দেখা যায়। পরমাণুর কেন্দ্রীণ বা নিউক্লিয়াসের একটা চৌম্বকক্ষেত্র রয়েছে। পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ওই আভ্যন্তরীণ চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে বাইরে রাখা চৌম্বকীয় পরিবেশের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় বর্ণালীর এই আলাদা হয়ে যাবার ঘটনাটি ঘটে।
ইলেকট্রনের যে স্পিন আছে, জীম্যানের গবেষণাকালে তা জানা ছিল না। স্পিনের পার্থক্যের কারণে বর্ণালীর আলো ভাঙার বৈচিত্র্য হয়। অথচ স্পিনের ধারণা তৈরি হয় নি। এই জন্য জীম্যান এফেক্ট বিভিন্ন ধরনের হত। একেই বলা হল অ্যানোম্যালাস জীম্যান এফেক্ট। যখন ইলেকট্রনের নেট স্পিন শূন্য নয়, এমন হয়, তখন এই বৈচিত্র্য দেখা দেয়। সেই সময় স্পিনজনিত ব্যাখ্যা ছিল না বলে ব্যাপারটাকে লোকে গোলমেলে ভাবত। তাই অ্যানোম্যালাস কথাটা এসেছিল।
জীম্যান এফেক্ট এর এই গোলমেলে জিনিসটা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে হাইজেনবার্গের চিন্তার উচ্চতা সুচিহ্নিত হয়ে গেল। তিনি নিলস বোরের দেওয়া পরমাণুর গঠনসংক্রান্ত ধারণা টপকে গিয়ে হাফ ইনটিজার কোয়ান্টাম সংখ্যার তত্ত্ব এনে দিলেন।
১৯২৫ সালে বর্ণালীর এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে হাইজেনবার্গ ইলেকট্রনকে অ্যানহারমোনিক অসিলেটর বা অসমঞ্জস দোলক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। ওই সময় ম্যাক্স বর্ন তাঁর নতুন সহযোগী প্যাসকুয়াল জর্ডন ( ১৯০২ – ১৯৮০) এর সঙ্গে একত্রে কাজ করতে গিয়ে উপলব্ধি করলেন যে, এই জিনিসটা ম্যাট্রিক্স বীজগণিত আকারে প্রকাশ করা সম্ভব। এই ভাবনা থেকে ম্যাক্স বর্ন আর প্যাসকুয়াল জর্ডন ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা প্রসঙ্গে নাম দিয়ে একটা গবেষণাপত্র তৈরি করে ফেললেন। হাইজেনবার্গও সে প্রচেষ্টা দেখে শুনে ম্যাক্স বর্ন আর প্যাসকুয়াল জর্ডনের সঙ্গে জোট বেঁধে নভেম্বর মাসে “কোয়ান্টাম বলবিদ্যা প্রসঙ্গে ২” নামে আরো একটি গবেষণা পত্র তৈরি করে ফেললেন। ওই গবেষণা পত্রটিই আজ নতুন কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রাথমিক ও ভিত্তিমূলক দলিল হিসেবে গণ্য হয়।
হাইজেনবার্গের গবেষণা সূত্রে আরো একজন বিজ্ঞানীর নাম করতে হবে। তিনি হেনড্রিক ক্র্যামারস ( ১৭ ডিসেম্বর ১৮৯৪ – ২৪ এপ্রিল ১৯৫২)। ক্র্যামারস নীলস বোরের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ কিভাবে পদার্থের সঙ্গে ক্রিয়া করে, তা বুঝতে চেয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। ১৯২৫ সালে হাইজেনবার্গের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্র্যামারস লক্ষ করেছিলেন ইলেকট্রনের সঙ্গে ধাক্কায় ফোটন কিভাবে ছিটকে যায়। এই সূত্রে তাঁরা দুজনে মিলে একটা সূত্র তৈরি করেছেন। এই হেনড্রিক ক্র্যামারস এর সঙ্গে কাজ করতে করতে হাইজেনবার্গ ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যার ধারণা গড়ে তোলেন। এর দ্বারা কোয়ান্টাম তত্ত্বের পুরোনো ধারণা বদলে দেওয়া গেল। হাইজেনবার্গ দেখালেন ধ্রুপদী পদার্থবিদ্যার গতি বিষয়ক ধারণা কোয়ান্টাম স্তরে প্রযোজ্য নয়। তিনি দেখালেন, পরমাণুর অভ্যন্তরে ইলেকট্রন কিন্তু ধরাবাঁধা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে না। বরং ইলেকট্রনের চলনপথ যেন এলোমেলো অস্পষ্ট ছন্নছাড়া গোছের। ১৯২৫ এর সেপ্টেম্বরে হাইজেনবার্গের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হল, কোয়ান্টাম থিওরেটিক্যাল রিইনটারপ্রিটেশন অফ কাইনেম্যাটিক অ্যাণ্ড মেকানিক্যাল রিলেশনস। অর্থাৎ কোয়ান্টাম তত্ত্বের আলোকে গতিবিদ্যা ও যান্ত্রিক সম্পর্কের নতুনতর ব্যাখ্যা।
কোপেনহেগেনের নিলস বোর ইনস্টিটিউটে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার গাণিতিক ভিত্তি নিয়ে কাজ করতে করতে ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ তাঁর অনিশ্চয়তা সূত্র গড়ে তোলেন। হাইজেনবার্গ আবার ফিরে আসেন বোর ইনস্টিটিউট এ, কোপেনহেগেনে। সেখানে বোরের সঙ্গে আলাপচারিতা করতে করতে গতিবিদ্যা ও বলবিদ্যার আলোকে কোয়ান্টাম তত্ত্বকে তিনি আরো বিকশিত করলেন। ১৯২৭ এর মার্চ মাসে ওঁর নতুন গবেষণা পত্র তৈরি হয়ে গেল। ওর গাণিতিক ব্যাপারে পল ডিরাকের অবদান রইল।
হাইজেনবার্গ বলেছিলেন প্রাকৃতিক বিজ্ঞান শুধুমাত্র প্রকৃতিকে আমাদের কাছে বর্ণনা ও ব্যাখ্যাই করে না, প্রকৃতিবিজ্ঞান আসলে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের একটা লীলাখেলা। বলেছিলেন, আজ পর্যন্ত যেসব বৈজ্ঞানিক ধারণা আমাদের হাতে রয়েছে, তা দিয়ে বাস্তব জগতের অতি সামান্য অংশকে বুঝতে পারা যায়। যা আমরা এখনো বুঝতে পারি নি, তার পরিমাণ বিরাট ও অনন্ত।
আমরা অজানাকে ক্রমশঃ জানব, বুঝব, আর এই জানাবোঝা বলতে ঠিক কী বোঝায়, সেটাও বুঝব। বলেছিলেন, পরমাণু বা মৌলিক কণাগুলি নিজেরা আসল সত্য নয়, তারা যেন একটি সম্ভাবনার জগৎ তৈরি করে। বাস্তব জগতের চেয়ে যা পৃথক।
আরো বলেছিলেন, আমরা বিশ্বজগৎকে যে রকম ভাবি তার চাইতেও সেটি অবাক করাই শুধু নয়, আমরা যতদূর ভাবতে পারি, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি এগিয়ে এ জগৎ আশ্চর্য।