|| অনিশ্চয়তা ও ওয়ার্নার কার্ল হাইজেনবার্গ: পরমাণু জগতের একটি পরিচয় || লিখেছেন মৃদুল শ্রীমানী

অনিশ্চয়তা ও ওয়ার্নার কার্ল হাইজেনবার্গ: পরমাণু জগতের একটি পরিচয়

১| অনিশ্চয়তা ও পরমাণুর জগৎ।

অনিশ্চয়তা আমাদের জীবনের প্রাত‍্যহিক অভিজ্ঞতা। আজ তো যা হোক হল, কাল কী হবে, এ প্রশ্ন কুরে কুরে কখনো খায় নি, অতি সাধারণ মানুষের জীবনে এটা হয় না।

কিন্তু বিজ্ঞানে?

ওই নিয়েই একটা দামি কথা বললেন ওয়ার্নার কার্ল হাইজেনবার্গ ( ৫ ডিসেম্বর ১৯০১ – ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬)।

জার্মান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ তাঁর অনিশ্চয়তা সূত্রের জন‍্য বিশ্ববন্দিত। ১৯২৭ সালে তাঁর এই তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৩২ সালে কোয়ান্টাম বলবিদ‍্যা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিতে তাঁকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল সম্মানে ভূষিত করা হয়।

অনিশ্চয়তা সূত্র বোঝাতে গিয়ে হাইজেনবার্গ বললেন, কোনো একটা জিনিসের অবস্থান আর তার ভরবেগ একসঙ্গে সুনির্দিষ্ট ভাবে পরিমাপ করা অসম্ভব। বাস্তবেও অসম্ভব, তত্ত্বগতভাবেও অসম্ভব। আরো বললেন, কোনো জিনিসের সুনির্দিষ্ট অবস্থান আর একই সঙ্গে তার সুনির্দিষ্ট ভরবেগ , এইসব নির্ধারণ করার কোনো সুযোগ প্রকৃতিতে নেই।

বললেন, কোনো একটা কণার একজোড়া বস্তুগত পরিমাপ করা, যেমন ধরা যাক, কোনো কণার অবস্থান আর ভরবেগ একই সঙ্গে কেমন হবে, তা তার প্রাথমিক অবস্থান থেকে আন্দাজ করার বেশ একটু সীমাবদ্ধতা আছে। যদি বলার চেষ্টাও করা হয়, তবে তার সঠিক হবার সম্ভাবনা কতদূর, তার বেশ একটা মৌলিক ধাঁচের সীমাবদ্ধতা আছে।

এই যে একজোড়া বাস্তব বিষয়, অবস্থান আর ভরবেগ, এই গোছের জুড়িকে বলে কমপ্লিমেন্টারি ভ‍্যারিয়েবলস। পুরোনো দিনের লব্জে কনজুগেট ভ‍্যারিয়েবলস। বললেন, কোনো কণার অবস্থান যদি নিখুঁত করে পরিমাপ করা হয়, তাহলে তার ভরবেগকে সেই মাপের নিখুঁত করে নির্ধারণ করা যাবে না। কণাটির অবস্থানের পরিমাপ যত নিখুঁত করতে চিওয়া হবে, ভরবেগ নির্ধারণ নিখুঁত হবির সম্ভাবনা ততই কমবে। এর বিপরীতটাও সত‍্য। অর্থাৎ ভরবেগ নিপুণভাবে নির্ধারণ করতে গেলে অবস্থান পরিমাপের নির্ভুলতা সেইভাবে কমবে।

অবশ‍্য হাইজেনবার্গের এই তত্ত্ব অতিপরমাণুর জগতে কার্যকর। আমরা ওকে বলব কোয়ান্টাম জগৎ।

২| কোয়ান্টাম কথা

 

কোনো কিছুর উপর আলো পড়লে তা থেকে ইলেকট্রন বিচ্ছুরিত হয়। আলেকজান্দ্রে এডমন্ড বেকারেল ১৮৩৯ সালে ব‍্যাপারটা নজর করেছিলেন।

১৮৮৭ সালে হাইনরিশ হার্ৎজ এ নিয়ে বিস্তৃততর অনুসন্ধান করেন। ১৯০২ সালে ফিলিপ লেনার্ড এ নিয়ে ভিন্নতর গবেষণা করেছিলেন। ১৯০৫ সালে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের শক্তির ন‍্যূনতম কণা বা কোয়ান্টাম নির্ধারণ করেন। ওই যেন কোয়ান্টাম জগতের সিংহদুয়ার খোলা। এই যে কোয়ান্টা, মানে এই ছোট্ট এতটুকু একটা জিনিস, এটা একটা তড়িৎ নিরপেক্ষ কণা। এর নাম দেওয়া হল ফোটন কণা। যদিও ফোটন নামটা পরিচিতি পেয়েছে পরবর্তীকালে। আইনস্টাইন বলেছিলেন আলোক কোয়ান্টা। এর মধ্যেই ১৯০০ সালে ম‍্যাক্স প্ল‍্যাঙ্ক ( ২৩ এপ্রিল ১৮৫৮ – ৪ অক্টোবর ১৯৪৭) দেখিয়েছিলেন একটা ফোটনের শক্তি আর তার কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সির মধ‍্যে একটা গাণিতিক সম্পর্ক আছে। ওই সম্পর্কের মান নির্ধারণ করা যায়। ওই হল প্ল‍্যাঙ্ক ধ্রুবক। শক্তি কোয়ান্টা নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতিতে ১৯১৮ সালে ম‍্যাক্স প্ল‍্যাঙ্ককে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।

আলোর কোয়ান্টা নিয়ে আইনস্টাইনের ১৯০৫ সালের গবেষণার সূত্রে রবার্ট অ্যানড্রুজ মিলিকান বিস্তারিত গবেষণা করে জানান আইনস্টাইনের ধারণা সত‍্য। তখন, ১৯২১ সালে, গবেষণা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হবার বছর পনেরো ষোল পরে আইনস্টাইনের নোবেল সম্মান জোটে। মিলিকান প্ল‍্যাঙ্কের ধ্রুবকের নিখুঁততর মান নির্ধারণ করেছিলেন।

হাইজেনবার্গের কথাটা অতিপরমাণুর জগতে খাটে, সে কথা আগেই বলেছি। অতিপরমাণুর জগৎটা জানতে বুঝতে হাইজেনবার্গের শিক্ষক আর্নল্ড জোহানস সমারফেল্ড ( ৫ ডিসেম্বর ১৮৬৮ – ২৬ এপ্রিল ১৯৫১) তাঁকে হাতে ধরে নীলস বোরের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেটা ১৯২২ সালের জুন মাস। হাইজেনবার্গের বয়স তখনও একুশে পৌঁছয় নি। ওই ১৯২২ সালেই নীলস হেনরিক ডেভিড বোর ( ৭ অক্টোবর ১৮৮৫ – ১৮ নভেম্বর ১৯৬২) পরমাণুর গঠন বিন‍্যাস ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের বিকাশে তাঁর মৌলিক অবদানের স্বীকৃতিতে নোবেল সম্মান অর্জন করবেন।

শুধুমাত্র হাইজেনবার্গই নয়, তাঁর একেবারেই সমবয়সী, মাত্র কয়েকটি মাসের ছোট, আরেক অসামান্য প্রতিভাধর পল ডিরাক ( ৮ আগস্ট ১৯০২ – ২০ অক্টোবর ১৯৮৪) ও নীলস বোরের কাছে পরমাণুবিদ‍্যা চর্চা করতে গিয়েছিলেন। বোর এর সঙ্গে হাইজেনবার্গের কী আলোচনা হয়েছিল জানার আগে সেই সময় পর্যন্ত পরমাণুতত্ত্বে কি বিকাশ হয়েছিল, তা লক্ষ করা উচিত।

নীলস বোর আর ম‍্যাক্স প্ল‍্যাঙ্ক এঁদেরকে কোয়ান্টাম তত্ত্বের উদ্গাতা বলা উচিত। দুজনেই কোয়ান্টা নিয়ে কাজ করে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল সম্মান পেয়েছেন। ম‍্যাক্স প্ল‍্যাঙ্ক আগে, ১৯১৮ সালে। আর তারপর নীলস বোর, ১৯২২ সালে। আইনস্টাইনকে কোয়ান্টাম তত্ত্বের তৃতীয় উদ্গাতা বলা উচিত। আলোকে তিনি কোয়ান্টা হিসেবে ব‍্যাখ‍্যা করে ফোটো ইলেকট্রিক তত্ত্ব গড়ে তুলে ১৯২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন।

 

পরমাণুর গঠন নিয়ে কিছু কথা।

আধুনিক যুগে ইংরেজ রসায়নবিদ জন ডালটন ( ৬ সেপ্টেম্বর ১৭৬৬ – ২৭ জুলাই ১৮৪৪) পরমাণুর গঠনসংক্রান্ত ধারণা দেন।

গ্রীক পণ্ডিত ডিমোক্রিটাসের ভাবনার অনুসরণে ১৮০০ সাল নাগাদ তিনি বলেন, পরমাণু অবিভাজ্য।

১৭৯৪ সালে স্বশিক্ষিত জন ডালটন ম‍্যাঞ্চেস্টারের লিটারারি ও ফিলজফিক‍্যাল সোসাইটির সদস‍্য হিসেবে নির্বাচিত হলেন।

১৮০০ সালে ডালটন ওই সোসাইটির সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। পর বৎসর তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ চার চারটি সন্দর্ভ ওই সোসাইটির সভায় পাঠ করলেন। সন্দর্ভ গুলি হল ১) মিশ্র গ‍্যাসের গঠনবিন‍্যাস কি রকম, ২) ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্রায় ভ‍্যাকুয়ামে ও বাতাসের মধ‍্যে স্টিমের এবং অন‍্যবিধ বাষ্পের চাপ বিষয়ক, ৩) বাষ্পায়ন সম্পর্কে, এবং ৪) গ‍্যাসের তাপীয় প্রসারণ বিষয়ক। এই চারটি গবেষণাপত্র ওই লিটারারি অ্যাণ্ড ফিলজফিক‍্যাল সোসাইটির ১৮০২ সালের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হল। উষ্ণ বাতাস এবং উষ্ণতার কারণে বাতাস ও বিবিধ গ‍্যাসের প্রসারণ নিয়ে গভীর ভাবে ভাবতে ভাবতে ডালটন তাঁর পরমাণুবাদের জন্ম দেন। ডালটন সিদ্ধান্ত করেন যে প্রতিটি পদার্থ অতিশয় ক্ষুদ্র কণাএকক দিয়ে তৈরি ও এই এককগুলি অবিভাজ‍্য। এগুলিকে অ্যাটম বা পরমাণু বলে চেনালেন। আলাদা আলাদা পদার্থ পারমাণবিক স্তরেও ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির হয়ে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন পরমাণুকে ভিন্ন ভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন দিয়েও চেনালেন তিনি। পরমাণু সম্পর্কে নতুন নতুন ভাবনা চিন্তার সূচনা করে দিয়ে আধুনিক যুগের পরমাণুবাদের জনক হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন জন ডালটন।

ডালটনের সমসময়েই খাঁটি বৈজ্ঞানিকের অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে পদার্থের প্রাথমিক গঠনের গভীরে তাকালেন অ্যামেদিও অ্যাভোগ‍্যাড্রো। লোরেঞ্জো রোমানো অ্যামেদিও কার্লো অ্যাভোগ‍্যাড্রো ছিলেন ইটালিয়ান ভদ্রলোক। ৯ আগস্ট তাঁর জন্মদিন। ১৭৭৬ সালে জন্মেছিলেন। মারা গিয়েছিলেন ১৮৫৬ সালের ৯ জুলাই। ১৮১১ সালে, যখন অ্যাভোগ‍্যাড্রোর বয়স পঁয়ত্রিশ, তখন একটি বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ লিখে তিনি বললেন, সমান তাপমাত্রা আর চাপে একই পরিমাণ গ‍্যাসে একই সংখ্যক অণু থাকবে। চাপ ও তাপে গ‍্যাসের আয়তনের হেরফের নিয়ে বয়েল, চার্লস আর গে লুসাক নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন। অ্যাভোগ‍্যাড্রো বললেন, একই রকম পরিবেশে সমান তাপমাত্রা ও সমান চাপে সম পরিমাণ গ‍্যাসের প্রাথমিক পদার্থের, সেটা অণু পরমাণু যাই হোক না কেন, তার সংখ‍্যাটা একই রকম। এটাকে তিনি বললেন প্রকল্প বা হাইপথিসিস। হাইপথিসিস কেন? না, তখনো তো যুক্তি ও বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে জিনিসটা প্রমাণিত হয়নি। ওই যে কথাটা অ্যাভোগ‍্যাড্রো বললেন, ওই কথার সূত্র ধরে ১৮৬৫ সালে যোহান যোসেফ লসচমিট একটা অণুর আয়তন সম্বন্ধে ধারণা করলেন। ১৯০৯ সালে জাঁ ব‍্যাপটিস্ট পেরিন এই অণুর সংখ্যা নিয়ে গভীর আলোকপাত করলেন।

এইসূত্রে রবার্ট ব্রাউনের নামটা উল্লেখ করতে হয়। রবার্ট ব্রাউন (২১ ডিসেম্বর ১৭৭৩ – ১০ জুন ১৮৫৮) ছিলেন উদ্ভিদবিদ। তিনি ক্লারকিয়া পুলচেলা নামের উদ্ভিদের পরাগরেণুকে জলে ডুবিয়ে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে লক্ষ করছিলেন। সেটা ১৮২৭ সাল। ব্রাউন লক্ষ করলেন যে, তরল বা গ‍্যাসে অর্থাৎ ফ্লুইডে যদি কোনো কণা রাখা থাকে, তখন সেই কণাটার একটা অনিয়ন্ত্রিত এলোমেলো খেয়ালখুশির চলন দেখা যায়। আশেপাশের গতিশীল অণুরাই কণাটাকে ঠেলাঠেলি করে ওভাবে দৌড় করায়।

১৮২৮ সালে ব্রাউন তাঁর এই গবেষণা সম্পর্কে একটা প্রতিবেদন প‍্যামফ্লেট আকারে প্রকাশ করে বলেন, এই ঠেলাঠেলির সম্পর্কটা পদার্থের একটা সাধারণ ধর্ম। অর্থাৎ সর্বত্র এটা দেখা যাবে।

এর প্রায় আট দশক পর, ১৯০৫ সালে, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বললেন যে, পরাগরেণুর ওই যে চলন এটা প্রতিটি একক জলের অণুর ঠেলায় হচ্ছে। অ্যানালেন ডার ফিজিক এ তাঁর যে চারটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল, এটি তারই একটি।

আইনস্টাইনের এই বক্তব্য নিয়ে বিশদে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন ফরাসি বৈজ্ঞানিক জাঁ ব‍্যাপটিস্ট পেরিন ( ৩০ সেপ্টেম্বর ১৮৭০ – ১৭ এপ্রিল ১৯৪২)। বিস্তারিত অনুসন্ধান করে পেরিন জানালেন আইনস্টাইনের ব‍্যাখ‍্যা সঠিক এবং পদার্থ পরমাণু দিয়ে তৈরি। এজন‍্য পেরিন ১৯২৬ সালে নোবেল সম্মানে ভূষিত হন।

পদার্থবিজ্ঞানে গভীরভাবে আলোকপাত করেছিলেন স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম‍্যাক্সওয়েল ( ১৩ জুন ১৮৩১ – ৫ নভেম্বর ১৮৭৯)। ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত এ ডাইনামিক‍্যাল থিওরি অফ দ‍্য ইলেকট্রোম‍্যাগনেটিক ফিল্ড গ্রন্থে তিনি জানালেন, বৈদ্যুতিক আর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তরঙ্গের মতো দুলতে দুলতে আলোর বেগে স্পেসের মধ‍্য দিয়ে ছুটে চলে। আলোকেও তিনি আন্দোলিত তরঙ্গ ভঙ্গ হিসেবে ব‍্যাখ‍্যা করলেন।

অথচ বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী আইজ‍্যাক নিউটন ( ৪ জানুয়ারি ১৬৪৩ – ৩১ মার্চ ১৭২৭) আলোকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণা হিসেবে অনুভব করেছিলেন। নিউটন তাঁর ১৬৭০ থেকে ১৬৭২ সালের গবেষণার সূত্রে অপটিকস নামে মহাগ্রন্থ গড়ে তুলেছিলেন।

ইংরেজি ভাষায় সে বই ১৭০৪ সালে বেরিয়েছিল।

এর গোড়ায় ছিল তাঁরই একটা নোটবই, যার নাম, অফ কালারস। এতে নিউটন বলেছিলেন, আলো কণা দিয়ে তৈরি। অপটিকস লেখার সময় নিউটন বললেন, আলো অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি, আর পদার্থ একটু বড় বড় কণা দিয়ে তৈরি।

অথচ তাঁর থেকে বয়সে চৌদ্দ বছরের বড় ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনস ( ১৪ এপ্রিল ১৬২৯ – ৮ জুলাই ১৬৯৫) আলোকে তরঙ্গ হিসেবে দেখিয়েছিলেন। ১৬৭৮ সালে এ নিয়ে গবেষণা করে আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব গড়ে তোলেন। এটা আরো বিকশিত হয়ে ১৬৯০ সালে ট্রাইট দে লা লুমিয়ে নামে বিখ্যাত বইয়ের রূপ নেয়।

লোকজন নিউটনের কথায় ভরসা রেখেছিল। হাইগেনসকে পাত্তা দেয়নি। কিন্তু হাইগেনস এর বক্তব্য ও যুক্তি যে সঠিক ছিল, তা পরে ধরা পড়ল। টমাস ইয়ং ( ১৩ জুন ১৭৭৩ – ১০ মে ১৮২৯) এবং দোমিনিক ফ্রানকয়েস জাঁ আরাগো ( ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৭৮৬ – ২ অক্টোবর ১৮৫৩) দেখিয়ে দিলেন হাইগেনস এর বক্তব্য সঠিক। ইয়ং ১৮১৭ সালে আলো নিয়ে গবেষণা করেছেন আর তার পরের বৎসর ১৮১৮ তে এ নিয়ে চর্চা শুরু করেছেন অগাস্টিন জাঁ ফ্রেসনেল ( ১০ মে ১৭৮৮ – ১৪ জুলাই ১৮২৭)। ১৮৩০ এর পরে পরে আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব জনমনে যথেষ্ট জমি পেয়ে গেল। ১৮৮৭ সালের

আগে ধারণা ছিল ইথারের মধ‍্যে সকল গ্রহ নক্ষত্র ভাসছে। ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন – মর্লি পরীক্ষার দ্বারা ইথারের অস্তিত্ব চিরতরে নাকচ হয়ে গেল। অ্যালবার্ট আব্রাহাম মাইকেলসন ( ১৯ ডিসেম্বর ১৮৫২ – ০৯ মে ১৯৩১ ) ছিলেন একজন আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী। ১৮৬৯ সাল থেকেই তিনি আলোর চলা নিয়ে গবেষণা করে চলেছিলেন। ১৮৮৭ সালে তিনি আরেকজন বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইলিয়ামস মর্লি ( ২৯ জানুয়ারি ১৮৩৮ – ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২৩) এর সঙ্গে একযোগে কাজ করা শুরু করেন। ওই বৎসরের নভেম্বরে ওঁরা ইথারের অস্তিত্ব নাকচ করে দিতে সমর্থ হন। মাইকেলসন তাঁর গবেষণার জন‍্য ১৯০৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। মাইকলসন মর্লি পরীক্ষা পদার্থবিজ্ঞানের বিকাশে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এমনকি যুগন্ধর বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন ইথারের অস্তিত্ব নাকচ করে দেওয়া এই পরীক্ষা তাঁকে সরাসরিভাবে উদ্দীপিত করেছিল।

পদার্থ বিজ্ঞানে বিপুল অবদান রেখেছেন স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম‍্যাক্সওয়েল (১৩ জুন ১৮৩১ – ৫ নভেম্বর ১৮৭৯)। ম‍্যাক্সওয়েল বিদ্যুৎ আর চৌম্বকত্ব সম্পর্কে গবেষণা তাঁর সম সময় অবধি যে চেহারা নিয়েছিল, তার সবটুকু ভাল ভাবে দেখে শুনে, অনুধাবন করে, নিজের উচ্চমানের গণিত প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে তত্ত্বগত আঙ্গিকে সূত্রাকারে বিদ্বৎসমাজের কাছে পেশ করলেন। গাণিতিক বোধের সাহায্যে ম‍্যাক্সওয়েল ধরে ফেললেন যে, বিদ্যুৎ, চৌম্বকত্ব আর আলো, এগুলি সবই একই অভিন্ন ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বহিঃপ্রকাশ। আমরা এখন এগুলিকে তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ বলি। বিদ্যুৎ, চৌম্বকত্ব আর আলো যে একই ঘটনার বহিঃপ্রকাশ, গণিতের সূত্রের আকারে সেটা বোঝাতে পারার সামর্থ্য ম‍্যাক্সওয়েল সাহেবকে তত্ত্বগত পদার্থবিদ‍্যায় যুগনায়কের আসন দিয়েছে।তাঁর সূত্রগুলিকে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে দ্বিতীয় মহান একীকরণ বলে চেনানো হয়। প্রথম একীকরণটি সংঘটিত করেছিলেন মহাবিজ্ঞানী আইজ‍্যাক নিউটন।

মাইকেল ফ‍্যারাডের কাজের উপর অনেক দিন ধরে ম‍্যাক্সওয়েল পড়াশুনা করছিলেন। ১৮৫৫ সালে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলজফিক‍্যাল সোসাইটিতে অন ফ‍্যারাডেজ লাইনস অফ ফোর্স নাম দিয়ে একটা গবেষণাপত্র পাঠ করেন। ফ‍্যারাডে বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে যা যা কাজকর্ম করে ছিলেন, তা এই গবেষণাপত্রে সুসমঞ্জস ও সুসংহতভাবে পেশ করেছিলেন। আরো বছর ছয়েক পরে ১৮৬১ সালের মার্চ মাসে তিনি ওই বিষয়গুলিকে অন ফিজিক‍্যাল লাইনস অফ ফোর্স নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করলেন।

১৮৬৫ সালে প্রকাশিত হয় ম‍্যাক্সওয়েল সাহেবের গবেষণা সন্দর্ভ এ ডাইনামিক থিওরি অফ দ‍্য ইলেকট্রো ম‍্যাগনেটিক ফিল্ড। তাতে তিনি দেখালেন যে শূন‍্য মাধ‍্যমে বিদ্যুৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্র তরঙ্গ আকারে আলোর সমান গতিবেগে ছোটে। দেখালেন বিদ্যুৎ আর চৌম্বক তরঙ্গ যে কারণে সৃষ্টি হয়, আলোকতরঙ্গও সেই একই মাধ‍্যমের আন্দোলিত হবার ফল। এই বিদ্যুৎ আর চৌম্বকত্ব আর আলো নিয়ে ম‍্যাক্সওয়েল কুড়িখানা গাণিতিক সূত্র খাড়া করে ১৮৭৩ সালে লিখলেন এ ট্রিটিজ অন ইলেকট্রিসিটি অ্যাণ্ড ম‍্যাগনেটিজম।

ম‍্যাক্সওয়েল সাহেব বিদ্যুৎ ও চুম্বকের আন্তঃসম্পর্ককে বোঝাবার জন‍্য কুড়িখানা সমীকরণ দাঁড় করিয়েছিলেন। এর বছর আষ্টেক পরে ১৮৮১ সালে অলিভার হেভিসাইড ( ১৮ মে ১৮৫০ – ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯২৫) ওই কুড়িখানা সমীকরণ ছেঁটেকেটে তার সারবস্তু নিংড়ে বের করে মাত্র চারটি সমীকরণে দান করে দিলেন।

ম‍্যাক্সওয়েল বলেছিলেন, শুধুমাত্র বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলেই চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয় না, বিদ্যুৎ ক্ষেত্রের পরিবর্তনের ফলেও চুম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়। ম‍্যাক্সওয়েলের এই বক্তব্যের সূত্রে বিদ‍্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের তত্ত্বগত অস্তিত্ব প্রমাণিত হল। পরে তার বাস্তব অস্তিত্ব হাতে কলমে করে দেখিয়েছেন হাইনরিশ হার্ৎজ ( ২২ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৭ – ১ জানুয়ারি ১৮৮৪)।

বিজ্ঞানী জেমস জোসেফ টমসন ( ১৮ ডিসেম্বর ১৮৫৬ – ৩০ আগস্ট ১৯৪০) ১৮৯৭ সালে ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন। তিনি অবশ্য একে করপাসল বলতেন। তারিখটা ছিল ১৮৯৭ সালের ৩০ এপ্রিল। দিনটা ছিল শুক্রবার। জেমস জোসেফ টমসন লণ্ডনে রয়‍্যাল ইনস্টিটিউশনে বক্তৃতা করছিলেন। ওইরকম বক্তৃতা করতে করতেই ক্রুকস টিউব নাড়াচাড়া করতে করতে তিনি ইলেকট্রন আবিষ্কার করে ফেলেন। টমসন পদার্থ, তার গঠন বিন‍্যাস, বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য, এসব নিয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ‍্যাসের ভিতর দিয়ে বৈদ্যুতিক শক্তির চালনা সূত্রে ১৯০৬ সালে তাঁকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

পরমাণুর গঠন সম্পর্কে তিনি প্লাম পুডিং মডেল পেশ করেন। ধনাত্মক চার্জের পুডিং এর মধ‍্যে যেন প্লাম ফল সাজানো হয়েছে, এইভাবে তিনি পরমাণুর সঙ্গে ইলেকট্রনের সহাবস্থানের মডেল পেশ করেন। পরমাণুর গঠন সম্পর্কে টমসনের ধারণা বাতিল করে নতুন একটি ধারণা দিলেন আর্নস্ট রাদারফোর্ড ( ৩০ আগস্ট ১৮৭১ – ১৯ অক্টোবর ১৯৩৭)।

তিনি প্রোটন আবিষ্কার করেছেন। ১৯০৮ থেকে ১৯১৩ অবধি গবেষণা করে তিনি পরমাণুর ভিন্নতর মডেল খাড়া করেছেন। তিনি এই সময়টাতে হান্স গিগার ও আর্নেস্ট মার্সডেনের সহযোগিতা নিয়ে বললেন, পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর অতিসূক্ষ্ম একটি কেন্দ্রীয় অংশের মধ‍্যে থাকে। রাদারফোর্ড১৯০৮ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন‌। পদার্থের ভাঙনের বিষয়ে আলোকপাত ও তেজস্ক্রিয় বস্তুর রাসায়নিক ধর্ম বিষয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে রাদারফোর্ডকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।

এর পরে নীলস হেনরিক ডেভিড বোর ( ৭ অক্টোবর ১৮৮৫ – ১৮ নভেম্বর ১৯৬২) পরমাণুর আরেকটি রকম মডেল গড়ে তুললেন। বোর বললেন পরমাণুর কেন্দ্রকে ঘিরে স্থিতিশীল কক্ষপথে ইলেকট্রনগুলি ঘুরে চলেছে।

ইলেকট্রনের শক্তিস্তরগুলি সুনির্দিষ্ট। তবে তারা একটি শক্তিস্তর থেকে অন‍্য শক্তিস্তরে লাফিয়ে চলে যেতে পারে।

পরমাণুর গঠন বিন‍্যাস নিয়ে গবেষণা এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বের আলোয় পরমাণুর চরিত্র নিয়ে আলোকপাত করার জন্য ১৯২২ সালে নীলস বোরকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। এই নীলস বোরের সঙ্গে ছাত্র হাইজেনবার্গের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন আর্নল্ড জোহানস সমারফেল্ড ( ৫ ডিসেম্বর ১৮৬৮ – ২৬ এপ্রিল ১৯৫১)। সমারফেল্ড ছিলেন মিউনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইজেনবার্গের শিক্ষক। সমারফেল্ড নিজেও ছিলেন বড় মাপের গুণী পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর বহু ছাত্র এবং ছাত্রদের ছাত্রেরা পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী হয়েছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় যে বহু প্রথমসারির বৈজ্ঞানিকের অধ‍্যাপক আর্নল্ড সমারফেল্ডের নাম চুরাশিবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ওই পুরস্কার পাওয়া হয়ে ওঠেনি।

সমারফেল্ড ১৯১১ সাল থেকেই কোয়ান্টাম বিষয়ে কাজ করতে থাকেন। বস্তুত কোয়ান্টাম জগৎই তাঁর আকর্ষণের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। নীলস বোরের পরমাণুবাদ নিয়ে তিনি গভীরভাবে গবেষণা করেছেন। নীলস বোর যেখানে বলেছেন পরমাণুর ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রীণকে বৃত্তাকার পথে আবর্তন করে, সমারফেল্ড সেখানে দেখালেন আসলে ওই পথগুলি উপবৃত্তাকার। সমারফেল্ডের আরো অবদান হল, তিনি ১৯১৬ সালে চৌম্বকীয় কোয়ান্টাম সংখ‍্যার ধারণা দেন এবং তার চার বছর পরে অন্তস্থ কোয়ান্টাম সংখ‍্যার ধারণা দেন। ডিসেম্বর ১৯১৫ ও জানুয়ারি ১৯১৬ তে ব‍্যাভেরিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সান্সে দু দুটি প্রতিবেদন পাঠ করেছিলেন সমারফেল্ড। তারই সংশোধিত ও সম্পাদিত রূপ ১৯১৬ সালের জুলাই মাসে অ্যানালেন ডার ফিজিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

১৯২২ সালে সমারফেল্ড হাইজেনবার্গকে গটিংগেন এর বোর ফেস্টিভ্যালে নিয়ে গেলেন। বোর সেই ফেস্টিভ্যালে অতিথি বক্তা হিসাবে উপস্থিত হন। সেখানে বোর কোয়ান্টাম পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পর পর বেশ কতকগুলি সারগর্ভ বক্তৃতা দেন।

নীলস বোরকে সেই প্রথম দেখলেন সদ‍্যতরুণ হাইজেনবার্গ‌। তাঁকে দেখে, আলোচনা শুনে খুব ভাল লাঘল। সে মধুর স্মৃতি রইল বহুদিন।

অধ‍্যাপক সমারফেল্ডের পরামর্শ মেনে নিজের ডক্টরাল থিসিসে হাইজেনবার্গ টারবুলেন্স বা উথাল পাথাল স্রোতধারা নিয়ে গবেষণা করেছেন। ওই সন্দর্ভে ল‍্যামিনার ফ্লো বা সহজ শান্ত প্রবাহের সঙ্গে টারবুলেন্ট ফ্লো বা তোলপাড় করা উদ্দাম উথালপাথাল স্রোত, এই উভয়বিধ প্রবাহের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

ওর-সমারফেল্ড সমীকরণের মাধ্যমে হাইজেনবার্গ স্থিতিশীলতা বিষয়ক সমস‍্যাগুলি সমাধান করেছেন। ওর-সমারফেল্ড সমীকরণ একটি চতুর্থ ক্রম সমরৈখিক অন্তরক সমীকরণ এবং এর মাধ‍্যমে শান্ত প্রবাহ থেকে তৈরি ছোট ছোট সমস্যার সমাধান করা গেল।

মিউনিখের লুডউইগ ম‍্যাক্সিমিলিয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্নল্ড সমারফেল্ডের অধীনে হাইজেনবার্গ ডক্টরেট হন। সেটা ১৯২৩ সাল। তারপর পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ করার জন্য হাইজেনবার্গ গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন। সেখানে তিনি জীম‍্যান প্রভাবের কিছু অসঙ্গতির বিষয়ে গবেষণা করেছেন।

হাইজেনবার্গ পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত নিয়ে মিউনিখের লুডউইগ ম‍্যাক্সিমিলিয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছিলেন। সেখানে তাঁর শিক্ষক ছিলেন আর্নল্ড সমারফেল্ড ( ১৮৬৮ – ১৯৫১) এবং উইলহেলম উইয়েন ( ১৮৬৪ – ১৯২৮)। এরপর হাইজেনবার্গ গিয়েছিলেন গটিংগেন এর গেওর্গ অগাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি পদার্থবিজ্ঞান পড়েছেন ম‍্যাক্স বর্ন ( ১৮৮২ – ১৯৭০), এবং জেমস ফ্রাঙ্ক ( ১৮৮২ – ১৯৬৪) এর কাছে। আর গণিত চর্চা করেছেন ডেভিড হিলবার্ট ( ১৮৬২ – ১৯৪৩) এর কাছে। এইসব পড়াশুনা হাইজেনবার্গ করেছিলেন ১৯২০ থেকে ১৯২৩ সালের মধ‍্যে।

আর্নল্ড সমারফেল্ডের অধীনে হাইজেনবার্গ তাঁর ডক্টরাল থিসিস করেছিলেন। ১৯২৩ সালে হাইজেনবার্গ ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ডক্টরাল থিসিসে তিনি ল‍্যামিনার ফ্লো’র স্থিতিশীলতা ও টারবুলেন্ট ফ্লো’র প্রকৃতি ও ধরন ধারন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। গটিংগেন এ গিয়ে তিনি ম‍্যাক্স বর্নের অধীনে হ‍্যাবিলিটেশন বা পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ করেছেন। হ‍্যাবিলিটেশন রিসার্চে তাঁর থিসিস ছিল অ্যানোম‍্যালাস জীম‍্যান এফেক্ট নিয়ে।

নোবেলজয়ী ডাচ পদার্থবিজ্ঞানী পিটার জীম‍্যান ১৮৬৫ সালের ২৫ মে তারিখে জন্মেছিলেন। ১৯০২ সালে তিনি হেনড্রিক লোরেঞ্জ নামে তাঁর এক অধ‍্যাপকের সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নোবেল সম্মান লাভ করেন। নানাবিধ বিষয়ে জীম‍্যান গবেষণা করে থাকলেও তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে চৌম্বকক্ষেত্রের মধ‍্যে আলোক রশ্মির বর্ণালীর বহুধাবিভক্ত হবার ঘটনাসূত্রে। একেই বলে জীম‍্যান এফেক্ট।

১৮৯৬ সালে জীম‍্যান লক্ষ করলেন, একটি শিখায় কোনো পদার্থ দহন করতে করতে তা থেকে তৈরি আলোর বর্ণালীকে যদি একটি চৌম্বকক্ষেত্রের মধ‍্য দিয়ে পরিচালনা করা যায়, তখন বর্ণালীর আলোকরেখাগুলি দুইভাগ বা তিনভাগ এমনকি চারভাগ পর্যন্ত হয়ে যায়। জীম‍্যান এটা দেখে বেশ অবাক হলেন এবং ধন্দে পড়লেন। ওই ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ইলেকট্রনের অস্তিত্ব জানা ছিল না। জে জে টমসন, জন এস টাউনসেন্ড এবং এইচ এ উইলসন এর সঙ্গে একযোগে ক‍্যাথোড রশ্মি নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এইসূত্রে জে জে টমসন ১৮৯৭ সালে ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন।

আজ আমরা জানি, ইলেকট্রনের স্পিন আছে। ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগ রয়েছে। ওই স্পিন ইলেকট্রনের একটি মৌলিক পরিচয়। একটি চৌম্বকক্ষেত্রে বিপরীত স্পিনের ইলেকট্রনগুলির কক্ষপথ পরিবর্তন করার সময় আলাদা আলাদা শক্তিমাত্রা থাকে। এই স্পিনের ভিন্নতার জন‍্যই একটি বর্ণালী রেখার পরিবর্তে দুই, তিন, চার ইত্যাদি সংখ‍্যক বর্ণালী রেখা দেখা যায়।

কোয়ান্টাম বলবিদ‍্যার হালফিল ধারণায়, ইলেকট্রন যখন নির্দিষ্ট শক্তিস্তর থেকে অন‍্য শক্তিস্তরে উন্নীত হয়, তখন আলোর বর্ণালীর ছটা বের হয়। এই প্রতিটি শক্তিস্তর আলাদা আলাদা কৌণিক ভরবেগের দ্বারা সুচিহ্নিত। চৌম্বকক্ষেত্রের মধ‍্যে পড়লে এই রশ্মির বিভাজন ঘটে যায়। একই অভিন্ন শক্তিমাত্রার আলাদা আলাদা অবস্থা হয়। এই আলাদা আলাদা অবস্থার কারণে আলাদা আলাদা বর্ণালীরেখা দেখা যায়। পরমাণুর কেন্দ্রীণ বা নিউক্লিয়াসের একটা চৌম্বকক্ষেত্র রয়েছে। পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ওই আভ‍্যন্তরীণ চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে বাইরে রাখা চৌম্বকীয় পরিবেশের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় বর্ণালীর এই আলাদা হয়ে যাবার ঘটনাটি ঘটে।

ইলেকট্রনের যে স্পিন আছে, জীম‍্যানের গবেষণাকালে তা জানা ছিল না। স্পিনের পার্থক্যের কারণে বর্ণালীর আলো ভাঙার বৈচিত্র্য হয়। অথচ স্পিনের ধারণা তৈরি হয় নি। এই জন‍্য জীম‍্যান এফেক্ট বিভিন্ন ধরনের হত। একেই বলা হল অ্যানোম‍্যালাস জীম‍্যান এফেক্ট। যখন ইলেকট্রনের নেট স্পিন শূন‍্য নয়, এমন হয়, তখন এই বৈচিত্র্য দেখা দেয়। সেই সময় স্পিনজনিত ব‍্যাখ‍্যা ছিল না বলে ব‍্যাপারটাকে লোকে গোলমেলে ভাবত। তাই অ্যানোম‍্যালাস কথাটা এসেছিল।

জীম‍্যান এফেক্ট এর এই গোলমেলে জিনিসটা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে হাইজেনবার্গের চিন্তার উচ্চতা সুচিহ্নিত হয়ে গেল। তিনি নীলস বোরের দেওয়া পরমাণুর গঠনসংক্রান্ত ধারণা টপকে গিয়ে হাফ ইনটিজার কোয়ান্টাম সংখ‍্যার তত্ত্ব এনে দিলেন‌।

১৯২৫ সালে বর্ণালীর এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে হাইজেনবার্গ ইলেকট্রনকে অ্যানহারমোনিক অসিলেটর বা অসমঞ্জস দোলক হিসেবে ব‍্যাখ‍্যা করেছিলেন।

ওই সময় ম‍্যাক্স বর্ন তাঁর নতুন সহযোগী প‍্যাসকুয়াল জর্ডন ( ১৯০২ – ১৯৮০) এর সঙ্গে একত্রে কাজ করতে গিয়ে উপলব্ধি করলেন যে, এই জিনিসটা ম‍্যাট্রিক্স বীজগণিত আকারে প্রকাশ করা সম্ভব। এই ভাবনা থেকে বর্ন আর জর্ডন ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কোয়ান্টাম বলবিদ‍্যা প্রসঙ্গে নাম দিয়ে একটা গবেষণাপত্র তৈরি করে ফেললেন।

হাইজেনবার্গও সে প্রচেষ্টা দেখে শুনে বর্ন আর জর্ডনের সঙ্গে জোট বেঁধে নভেম্বর মাসে কোয়ান্টাম বলবিদ‍্যা প্রসঙ্গে ২ নামে আরো একটি গবেষণা পত্র তৈরি করে ফেললেন। ওই গবেষণা পত্রটিই আজ নতুন কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রাথমিক ও ভিত্তিমূলক দলিল হিসেবে গণ‍্য হয়।

হাইজেনবার্গের গবেষণা সূত্রে আরো একজন বিজ্ঞানীর নাম করতে হবে। তিনি হেনড্রিক ক্র‍্যামারস ( ১৭ ডিসেম্বর ১৮৯৪ – ২৪ এপ্রিল ১৯৫২)।

ক্র‍্যামারস নীলস বোরের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ কিভাবে পদার্থের সঙ্গে ক্রিয়া করে, তা বুঝতে চেয়ে তিনি গবেষণা করেছেন।

১৯২৫ সালে হাইজেনবার্গের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্র‍্যামারস লক্ষ করেছিলেন ইলেকট্রনের সঙ্গে ধাক্কায় ফোটন কিভাবে ছিটকে যায়। এই সূত্রে তাঁরা দুজনে মিলে একটা সূত্র তৈরি করেছেন।

এই ক্র‍্যামারস এর সঙ্গে কাজ করতে করতে হাইজেনবার্গ ম‍্যাট্রিক্স বলবিদ‍্যার ধারণা গড়ে তোলেন। এর দ্বারা কোয়ান্টাম তত্ত্বের পুরোনো ধারণা বদলে দেওয়া গেল। হাইজেনবার্গ দেখালেন ধ্রুপদী পদার্থবিদ‍্যার গতি বিষয়ক ধারণা কোয়ান্টাম স্তরে প্রযোজ্য নয়। তিনি দেখালেন, পরমাণুর অভ‍্যন্তরে ইলেকট্রন কিন্তু ধরাবাঁধা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে না। বরং ইলেকট্রনের চলনপথ যেন এলোমেলো অস্পষ্ট ছন্নছাড়া গোছের।

নীলস বোরের সঙ্গে হাইজেনবার্গের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর রিসার্চ গাইড আর্নল্ড সমারফেল্ড। সেটা ছিল ১৯২২ এর জুন। ১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাইজেনবার্গের আবার সুযোগ হল নীলস বোরের কাছে যাবার। এবার আর গুণমুগ্ধ শ্রোতা হিসেবে নয়, গবেষণা সঙ্গী হিসেবে। রকফেলার ফাউন্ডেশনের ইন্টারন‍্যাশনাল এডুকেশন বোর্ডের থেকে একটা ফেলোশিপ জুটিয়ে নিয়ে নীলস বোরের সঙ্গে গবেষণা করবেন বলে রওনা হলেন তিনি। নীলস বোর তখন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ থিওরেটিক‍্যাল ফিজিক্স এর ডিরেক্টর পদে আসীন। ১৯২৪ এর ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯২৫ এর ১ মে অবধি বোরের সঙ্গে কাজ করেন হাইজেনবার্গ।

১৯২৫ এর সেপ্টেম্বরে হাইজেনবার্গের গবেষণা পত্র প্রকাশিত হল, কোয়ান্টাম থিওরেটিক‍্যাল রিইনটারপ্রিটেশন অফ কাইনেম‍্যাটিক অ্যাণ্ড মেকানিক্যাল রিলেশনস। অর্থাৎ কোয়ান্টাম তত্ত্বের আলোকে গতিবিদ‍্যা ও যান্ত্রিক সম্পর্কের নতুনতর ব‍্যাখ‍্যা।

কোপেনহেগেনের নীলস বোর ইনস্টিটিউটে কোয়ান্টাম বলবিদ‍্যার গাণিতিক ভিত্তি নিয়ে কাজ করতে করতে ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ তাঁর অনিশ্চয়তা সূত্র গড়ে তোলেন।

হাইজেনবার্গ আবার ফিরে আসেন বোর ইনস্টিটিউট এ, কোপেনহেগেনে। সেখানে বোরের সঙ্গে আলাপচারিতা করতে করতে গতিবিদ‍্যা ও বলবিদ‍্যার আলোকে কোয়ান্টাম তত্ত্বকে তিনি আরো বিকশিত করলেন। ১৯২৭ এর মার্চ মাসে ওঁর নতুন গবেষণা পত্র তৈরি হয়ে গেল।
ওর গাণিতিক ব‍্যাপারে পল ডিরাকের অবদান রইল।

১৯৬৬ সালে হাইজেনবার্গ লিখেছিলেন ফিলজফিক প্রবলেমস অফ নিউক্লিয়ার সায়েন্স অর্থাৎ পরমাণু বিজ্ঞানের কিছু দার্শনিক সংকট। এই রকম সময়েই হাইজেনবার্গ তাঁর আত্মজীবনী লেখা শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে সে বই জার্মানির মিউনিক শহরে পাইপার ভেরল‍্যাগ প্রকাশন সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়। হাইজেনবার্গ ভেবেছিলেন দার্শনিকতা ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে তাঁর যে ভাবনা চিন্তা, তা নিয়েই তিনি আত্মজীবনী তৈরি করবেন। তিনি যে বিষয়গুলি লিখলেন তা হল:
১ যথার্থ ও নৈষ্ঠিক বিজ্ঞানচর্চার লক্ষ্য কী?
২ পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান চর্চায় ভাষা নিয়ে সংকট।
৩ গণিত এবং বিজ্ঞানে বিমূর্ততা।
৪ পদার্থের বিভাজ‍্যতা অথবা ইম‍্যানুয়েল কান্টের অ্যান্টিনমি।
৫ বুনিয়াদি সমতা
৬ বিজ্ঞান ও ধর্ম।
১৯৭১ সালে সে বই ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরে অন্যান্য ভাষাতেও প্রকাশ হয়েছিল।
তাঁর মৃত্যুর পর, ১৯৮০ সালে তাঁর স্ত্রী এলিজাবেথ হাইজেনবার্গ স্বামীর স্মরণে প্রকাশ করেছিলেন “একজন অরাজনৈতিক ব‍্যক্তিত্বের রাজনৈতিক জীবন” নামে একটি গ্রন্থ। সেখানে তিনি স্বামীকে প্রথমতঃ এবং প্রধানতঃ একজন দিলখোলা ব‍্যক্তিত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হাইজেনবার্গের তুখোড় ও ঝকঝকে বিজ্ঞানীসত্তা সেই দিলদরিয়া মানুষটির পরে। তার পরে আসে তাঁর উচ্চ সামর্থ্যের শিল্পীসত্তা। এইসব দায়িত্ব পালনের পর নিছক কর্তব‍্যবোধ থেকে হাইজেনবার্গ রাজনীতির মধ‍্যে ছিলেন।
হাইজেনবার্গ বলেছিলেন প্রাকৃতিক বিজ্ঞান শুধুমাত্র প্রকৃতিকে আমাদের কাছে বর্ণনা ও ব‍্যাখ‍্যাই করে না, প্রকৃতিবিজ্ঞান আসলে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের একটা লীলাখেলা। বলেছিলেন, আজ পর্যন্ত যেসব বৈজ্ঞানিক ধারণা আমাদের হাতে রয়েছে, তা দিয়ে বাস্তব জগতের অতি সামান্য অংশকে বুঝতে পারা যায়। যা আমরা এখনো বুঝতে পারি নি, তার পরিমাণ বিরাট ও অনন্ত।
আমরা অজানাকে ক্রমশঃ জানব, বুঝব, আর এই জানাবোঝা বলতে ঠিক কী বোঝায়, সেটাও বুঝব। বলেছিলেন, পরমাণু বা মৌলিক কণাগুলি নিজেরা আসল সত‍্য নয়, তারা যেন একটি সম্ভাবনার জগৎ তৈরি করে। বাস্তব জগতের চেয়ে যা পৃথক।
আরো বলেছিলেন, আমরা বিশ্বজগৎকে যে রকম ভাবি তার চাইতেও সেটি অবাক করাই শুধু নয়, আমরা যতদূর ভাবতে পারি, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি এগিয়ে এ জগৎ আশ্চর্য।

 

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!