রবিবারে রবি-বার – এ মৃদুল শ্রীমানী – ৩

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা “যাত্রা”

“বিচিত্রিতা” কাব্যগ্রন্থে ‘যাত্রা’ নামে রবীন্দ্র কবিতাটিকে স্মরণ করি। ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের ১২ মাঘ কবিতাটি লিখেছেন। তখন কবির বয়স সত্তরের বাঁক পেরিয়ে একাত্তরের দিকে গড়িয়েছে। সত্তর বছরের জীবনের অভিজ্ঞান তাঁর মনোজগতে এক অদ্ভুত আলো ঢেলে দিয়েছে।
নিজের কবিজীবন, স্বাদেশিকতা, নৈতিকতা, দেশের স্বার্থে নানা বিষয়ে জড়িয়ে যাওয়া, শান্তিনিকেতনে গোটা বিশ্বকে একটি নীড়ে মেলানোর পরিকল্পনা আর বিশ্বমানবতা আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা হয়ে ওঠা, তাঁকে সামগ্রিক মানবজীবনের সারাৎসারটি হাতের মুঠোয় নিয়ে দেখার চোখ দিয়েছে। ওই প্রজ্ঞাদীপ্ত চোখে সমাজের দুই মেরুর জীবনের রূপ ধরা পড়ে।
রাজায় রাজায় যুদ্ধ বাধে। যুদ্ধের কত না আয়োজন, কত না সরঞ্জাম আর কৃৎকৌশল। যুদ্ধ করে নিজের ক্ষমতা জাহির করাটাই রাজার বৈশিষ্ট্য।
মন্ত্রীরা পিছন হতে নানা চক্রান্ত ষড়যন্ত্রের জালে কূট সমস্যা ঘনিয়ে তোলে। ওই শয়তানি জটিলতা তৈরিতেই মন্ত্রিত্বের কায়দা কেতা। বণিকের দল ছুটে বেড়ায় দেশে দেশান্তরে বিশুদ্ধ মুনাফার খোঁজে।
মুনাফার দরকারে এক দেশের সাথে আর এক দেশের যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। যুদ্ধের সাজ সরঞ্জাম বিক্রি করেও বণিকের মুনাফা। তাই যুদ্ধের জন্যে রাজাকে পুঁজি যোগাতেও বণিকের বাধে না। সময়ে সেটা বিপুল মুনাফা হয়ে ফিরে আসে।
যুদ্ধে বলি হয় সাধারণ মানুষ। তারা প্রাণ দেয়, তাদের অঙ্গহানি হয় যুদ্ধে। যুদ্ধে মেয়েরা স্বামী সন্তানহারা হয়। যাদের পরিবার যুদ্ধে যায় না, তারাও গৃহহারা উদ্বাস্তু হয়। জয়ীপক্ষ লুঠেরার ভূমিকা নিয়ে ফেলে নিমেষে। তাদের লালসায় মেয়েরা ধর্ষিতা হয়। লক্ষ লক্ষ জীবনের মূল্যে রাজাদের যুদ্ধ।
মন্ত্রীদের চক্রান্তে অতি বিশ্বস্ত লোকও গুপ্ত ঘাতকের হাতে মারা পড়ে। অপবাদ ও কলঙ্কের বোঝা চাপিয়ে মন্ত্রীর দল সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠকে হেয় প্রতিপন্ন করার মধ্যে কৃতিত্ব অনুভব করে।

বণিকেরা অজস্র মানুষের রক্ত নিংড়ে মুনাফা বানায়। লাঠির জোরে গরিব চাষাকে দাদন নিতে বাধ্য করে। সময়ে কষ্টের ফসল জলের দামে দখল করে। হাড় ভাঙা খাটুনি খেটেও চাষি ন্যায্য দাম পায় না বলে তার গরিবানা ঘুচতে চায় না। পয়সার প্রভাবে দেশের আইন কানুন বিচার ব্যবস্থাকে ট্যাঁকে পুরে রাখে বণিকেরা।
নিজেদের সম্পর্কে এদের মূল্যায়ন খুব উঁচু। এরা সকলেই নিজেদের দারুণ ভাবে সফল মনে করে। স্বর্গের শান্তিকে ব্যঙ্গ করে এদের বীরত্বের কীর্তিগাথা।
আর পণ্ডিতেরা? তারাও সাধারণ মানুষের কেউ নয়। বিদ্যা প্রকাশ করে ক্ষমতাবানদের কাছে খ্যাতি ও পুরস্কার আদায় তার লক্ষ্য। অহংএর গজদন্ত মিনারে পণ্ডিতকুলের অবস্থান।

এর একেবারে উল্টো পিঠে সাধারণ মানুষের জীবন। কবির চোখে ধরা পড়ে সাধারণের জীবনে যেন নেমে এসেছে ক্লান্তির ছায়া। গ্রাম্য নদীটির স্রোতও ক্লান্ত। সূর্যও যেন ক্লান্ত হয়েই অস্তে যাচ্ছে। মাঠ ও যেন স্তব্ধ হয়ে আছে। অন্ধকার নেমে আসছে। সাধারণ মানুষ যুদ্ধ চায় নি। তারা কোনো চক্রান্ত করে নি। ষড়যন্ত্রে জড়ায় নি। বিশ্বজোড়া বাজার দখল করতে মরিয়া হয়ে ঝাঁপায় নি।

একটি অতি সাধারণ পল্লীবালিকার বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবার অনুষঙ্গে সাধারণের জীবনকে দেখিয়েছেন কবি। নৌকায় নব বিবাহিতা বধূ দুরু দুরু বুকে দূর পল্লীতে অজানা শ্বশুরঘরে পাড়ি দেয়। সে সব দিনে তো মেয়ের বিয়ের বয়স বেশি ছিল না। তাই যেন বালিকাবধূর বুক দুরু দুরু করে। কেন করে? সে মেয়ে যে জানে না কাদের ঘরে যাচ্ছে, জানে না নতুন জায়গায় সকলে তাকে কেমন ভাবে গ্রহণ করবে। সে জানে তাকেই শুধু সবকিছু মানিয়ে নিতে হবে। বাপের ঘরের স্নেহ সেখানে মিলবে কি না, সে ব্যাপারে সে তো নিশ্চিত নয়। পদে পদে তার দোষ ধরা হবে কি না, কথায় কথায় অসম্মানিত হতে হবে কি না, তাও জানা নেই। মেয়ের তরফে সম্পূর্ণ এক অনিশ্চিত জীবনে ঝাঁপিয়ে পড়া।
সাধারণ মানুষেরও যেন তাই। রাজা, মন্ত্রী, বণিক, পণ্ডিত মিলে নিজের নিজের স্বার্থে পৃথিবীটা কুটিল করে দিল। সাধারণ মানুষ যেন গ্রাম্য নদীটির মতোই ক্লান্ত, মাঠের মতোই স্তব্ধ। অন্ধকার যেন নেমে আসছে। সন্ধ্যাতারা দেখা দিল। এই কি প্রাপ্য ছিল জীবনের? এই কি কাঙ্ক্ষিত জীবনযাত্রা? সাধারণের ভবিতব্য কি শুধুই নীরক্ত হতে থাকা?

“যাত্রা” কবিতাটি প্রশ্ন তুলে দিয়ে গেল।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!