দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৫৩)

পর্ব – ১৫৩

সবিতা শশাঙ্ক পালের ঘরে মশারি টাঙিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা দাদা, শ‍্যামলিমা যে এত ঠাকুর দেবতার কথা বলে, সে সব সত্যি?
শশাঙ্ক বললেন, জানি না। এসব লোকজন ছিল বলেও বুঝতে পারি না।
সবিতা বললেন, শ‍্যামলী এমনভাবে কথাগুলো বলে যায়, যে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না।
তারপর বললেন, আচ্ছা, মহাভারত তো ব‍্যাসদেব লিখেছেন?
শশাঙ্ক শুয়ে শুয়ে চোখ বুজিয়ে বললেন, হুঁ।
সবিতা বললেন, শ‍্যামলী বলে, না গণেশ ঠাকুর লিখেছেন।
শশাঙ্ক বললেন, কি জানি, হবে হয় তো।
সবিতা বললেন, আরো কি বলে জানো, ব‍্যাসদেব মহাভারত বলে যাচ্ছিল, শুনে শুনে গণেশ ঠাকুর লিখে ফেলছিল।
শশাঙ্ক বললেন, হুঁ।
সবিতা বললেন, দাদা?
শশাঙ্ক তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে বললেন, ব‌অল।
সবিতা বললেন, তাহলে মহাভারত কে লিখল? ব‍্যাসদেব না গণেশ?
শশাঙ্ক বললেন, শ‍্যামলী কি বলছে? কে লিখেছে?
সবিতা বললেন, শ‍্যামলী বলছে, কোনো একটা জিনিসকে ওপর থেকে দেখে যা মনে হয়, অনেক গভীরে তলিয়ে দেখলে অন‍্য রকম কিছু জানা যায়।
ঘুম চোখে শশাঙ্ক বললেন, হুঁ।
সবিতা বললেন, দাদা, কি করে হুঁ বলছ ? একটা জিনিস দু রকম হয়? ও বলছে, তলিয়ে দেখলে বারবার করে যাচাই করলে যেটা বোঝা যাচ্ছে, সেটা সত‍্যির কাছাকাছি। বোঝো দাদা, সত‍্যি নয়, ও বলছে সত‍্যির কাছাকাছি।
শশাঙ্ক উঠে বসলেন। বললেন, কি হয়েছে বল্ তো তোর? আমাকে কি ঘুমাতে দিবি না?
সবিতা বললেন, আচ্ছা, নাগর দোলায় চড়লে তো বোঝা যায় সেটা ঘুরছে?
শশাঙ্ক বললেন, ওই ঘোরাটাই তো মজা।
সবিতা বলল, না না, সবার মজা হয় না। একজন কে দেখেছি পরিত্রাহি চেঁচাচ্ছে, ওগো আমাকে নামিয়ে দাও গো। আরেক জন হিঃ হিঃ হিঃ
শশাঙ্ক বললেন, কিসের হিঃ হিঃ হিঃ?
সবিতা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বলল, একেবারে পেচ্ছাপ করে ভাসিয়ে দিয়েছিল। দোলাওয়ালা খুব রেগে গিয়েছিল।
শশাঙ্ক বললেন, সবার শরীর সমান নয়, ঝাঁকুনিতে অনেকের শরীর খারাপ করে। গ্রাম থেকে তোকে যখন বাসে করে আনলাম, তুই কবার বমি করেছিলি খেয়াল আছে?
সবিতা বললেন, তা আমি বাসে তখনও বিশেষ চড়ি নি। বমি হবে না?
শশাঙ্ক বললেন, সবার হয় না।
 সবিতা বলল, শ‍্যামলী কি বলে জানো? পৃথিবী নাকি নাগরদোলার মতো বনবনিয়ে ঘু্রছে। শুধুই ঘুরছে  তাও নয়, ঘুরতে ঘুরতে আবার ঘুরছে।
শশাঙ্ক বললেন, হুঁ।
সবিতা বললেন, কিসের হুঁ? অতো জোরে ঘুরছে, আর মোটেও টের পাচ্ছি না, এমন হয় না কি?
শশাঙ্ক বললেন, পৃথিবী অনেক বড়ো তো। তাই টের পাস না।
সবিতা বললেন, শ‍্যামলী তাহলে ঠিক বলেছে তাই না দাদা?
 শশাঙ্ক একটু সাবধান হয়ে বললেন, এই কথাটা তো ব‌ইতেই আছে। তুই পড়তে চাইলে তুইও জানতে পারতিস।
সবিতা বললেন, বেশি পড়াশুনা করলে না কি মেয়েদের বর মরে যায়? তাহলে, আমার বরটা মরে গেল কেন? আমি তো কখনো ইশকুলে যাই নি?
নিজের ঘরে বসে বসে বাসন্তীবালা জপ করছিলেন। তিনি সবিতার উদ্দেশে  বললেন, তোর দাদাকে এবার ঘুমাতে দে। আর কোনো কথা নয়। এবার নিচে যা।
সবিতা সে কথায় কান না দিয়ে বললেন, শ‍্যামলী আরো কি বলেছে জানো?
শশাঙ্ক বললেন কি?
সবিতা বললেন, গণেশ ঠাকুর না কি দুর্গাঠাকুরের পেটের ছেলে নয়?
শশাঙ্ক পাল বললেন, গণেশ ঠাকুর কি ওকে সেই কথা কয়ে গিয়েছে?
সবিতা বললেন, তোমার মেয়ে বলছে, দুর্গা ঠাকুরকে জয়া বিজয়া দুই সখী উঠোনে তেলমালিশ করছিল। পাশে রাস্তা দিয়ে বিষ্ণু যাচ্ছিল। দুর্গা ঠাকুরের মাই দেখতে পেয়ে বিষ্ণুর খুব ইচ্ছে করল ওই মাই খাবে। এদিকে তেলমালিশ করতে করতে দুর্গা ঠাকুরের গা থেকে ময়লা উঠেছিল। সেই ময়লাটা দিয়ে দুর্গা ঠাকুর একটা পুতুল বানিয়েছিল। বিষ্ণু সেই পুতুলের ভিতর ঢুকে পড়ে ওঁয়া ওঁয়া করে কেঁদে উঠলো। সেটাই নাকি গণেশ। এসব সত‍্যি দাদা?
 শশাঙ্ক বললেন, তোকে বোকা পেয়ে এইসব গালগল্প বলেছে। স্বামীসঙ্গ না হলে মেয়েরা মা হয়?
সবিতা বললেন, আজকাল নাকি অনেক রকম হচ্ছে গো। এই আটাত্তর সালে একটা ডাক্তার না কি নলের ভেতর একটা বাচ্চা বানিয়ে দিয়েছে। কি সুভাষ মুখার্জি না কি নাম। কেউ পাত্তা দিল না বলে একাশি সালে ডাক্তারটা আপ্তঘাতী হয়েছে।
 শশাঙ্ক বললেন, হুঁ, এমন একটা কথা আমিও শুনেছি।
সবিতা বলল, ধ‍্যুস, নলের ভেতর আবার বাচ্চা হয়? যতো বুজরুকি! শ‍্যামলী সব ভুলভাল বলে, তাই না দাদা?
শশাঙ্ক বললেন, কাগজে বেরিয়েছিল, অভিমান করে ডাক্তারটা মরে গেছে।
সবিতা বলল, তাহলে গণেশ‌ও পুতুল থেকে হতে পারে?
বাসন্তীবালা  জপ ছেড়ে উঠে এসে বললেন, এবার তুই নিচে যাবি?
সবিতা বললেন, যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। চেঁচাচ্ছ কেন? মাথার মধ্যে প্রশ্নগুলো ঘুরঘুর করে। তাই। শোনো, কাল আমি একটু বাপের বাড়ির গাঁয়ে যাব।
বাসন্তীবালা বললেন, সে কি রে? সেখানে তোর কে আছে? কার কাছে গিয়ে উঠবি?
শক্ত হয়ে সবিতা বললেন, বাপের পোড়ো ভিটেটা একবার দেখে আসব।
বাসন্তীবালা বললেন, তুই গেলে ছেলে মেয়েদের রান্না খাওয়া মুক্ত করা কে দেখবে?
সবিতা গোঁ ভরে বলল,  ভদ্রলোকদের বাড়ি ঝি মাগীটাও মাঝে মাঝে ছুটি পায়। আমি তোমার বিনে মাইনের ঝি বলে কি শখ হলে বাপের বাড়ির দেশে একবেলার জন‍্যেও যেতে পাব না? আমি ভোর ভোর রেঁধে গুছিয়ে রেখে যাব।
শশাঙ্ক বললেন, আচ্ছা, আচ্ছা, যাস্ খন।
বাসন্তীবালা স্বামীর দিকে চেয়ে হাত নাড়িয়ে বললেন, কাল রমানাথের বাড়িতে মৎস‍্যমুখী। যেতে হবে না?
শশাঙ্ক বললেন, কোন্ মুখে সেখানে যাবে? তোমার মেয়ে তাদেরকে কড়া কড়া কথা শুনিয়ে এসেছে। এখন তুমি যদি গাল বাড়িয়ে চড় খেয়ে আসতে চাও তো যেও।
বাসন্তীবালা সবিতাকে বললেন, অন‍্য একদিন যাস্। টাটকা টাটকা খাবার না পেলে অন্তুটা বড্ড হুজ্জোত করে।
সবিতা গোঁ ভরে বলল, আমি স্বপন দেখেছি, বেলগাছের ডালে বসে আমার মরা বাবা পা দোলাচ্ছে, আর বলছে, বড্ড তেষ্টা। সবি, এট্টু জল দে না।
বাসন্তীবালা বললেন, রাম রাম রাম, এসব কি অলুক্ষুণে কথা রে?
শশাঙ্ক বললেন, ও রকম হয় না রে সবিতা। ও তোর মনের ভুল।
সবিতা কোমরে আঁচল জড়িয়ে বলল, হ‍্যাঁ, দিন দুনিয়ার সবকিছু তোমরা জেনে বসে আছ। অন‍্যেরা যা জানে বোঝে সব ভুল, তাই না? কাল আমি যাব‌ই।
শশাঙ্ক বললেন, বললাম তো, কাল তুই সেখানে ঘুরে আসিস। তবে, মরে যাবার পর মানুষের আর কিছু থাকে না। ওসব মনের ভুল।
সবিতা জিজ্ঞেস করল, তাহলে মরে গেলে মানুষের কি হয়? শ্রাদ্ধ শান্তি করে কেন? তোমার মেয়ে নকুড় নন্দীর শ্রাদ্ধে যেতে চায় নি। জোর করে তাকে পাঠানোর সময় এ কথাটা মনে ছিল না? সে একটু ছাতে গিয়ে গল্প করেছে তো কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গিয়েছে? রমানাথের মা কি শ‍্যামলীকে আগে দেখে নি? সে মেয়ে কি মিউ মিউ করে ঘোরার মতো মেয়ে? তাকে ডাইনী বলবে কোন্ সাহসে?
আমার মেয়ে হলে আমি বলতাম, বেশ করেছে গল্প করতে ছাতে গিয়েছে। শাসন করতে হয়, তোদের বাড়ির ছেলেকে আগে শাসন কর্! মেয়েটা বলছে বিয়ে করবো না। তো তাকে নিয়ে ঝুলোঝুলি কেন রে বাপু! ভূভারতে তোদের আর মেয়ে জোটে না? আমার মেয়েকে ডাইনী বলিস কোন্ সাহসে? ওকে বিয়োতে কষ্ট হয় নি আমার? বানের জলে ভেসে এসেছিল বুঝি?
বাসন্তীবালা সব শুনে সোফার উপর ধপ করে বসে পড়লেন। দরজায় এসে দাঁড়িয়ে কড়া স্বরে শ‍্যামলী বলল, পিসি, আর একটা কথাও নয়। যাও শুতে যাও।
বাসন্তীবালার দিকে একটা দৃষ্টি হেনে সবিতা নিচে চলে গেল।
ক্রমশ…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।