দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৮১)

পর্ব – ১৮১

বাথরুম থেকে ফিরে এসে শ‍্যামলী বলল, সেকুলারিজম বলতে বিজ্ঞানসাধকদের এই গোটা সংগ্রামটা আত্মস্থ করতে হয়। প্রতিটি কাজের পিছনে যুক্তি কাজ করছে। কোনো অতিলৌকিক কিছু কাজ করছে না, এটা বুঝতে পারাটা সেকুলারিজম এ পৌঁছনোর একটা জরুরি ধাপ। একে বাদ দিয়ে যদি কেউ সেকুলারিজম বলে, তো আমি বলব সেটা ভাঁওতাবাজি, ফক্কিকারী কারবার। ইন্দিরা গান্ধীকে নতুন করে চেনার তো কিছুই নেই। বেশি আগের কথা নয়, এই তো ১৯৮০ সালের তেইশে জুন ইন্দিরা গান্ধীর ছোটছেলে সঞ্জয় গান্ধীর কথাটা ভাবুন।
অনসূয়া বললেন, হ‍্যাঁ, একটা স‍্যাড কেস। কি যে ওর দরকার ছিল প্লেন চালাতে যাবার!
শ‍্যামলী বলল, দিদি, কথাটা সেটুকুতেই মিটে যায় না। প্লেনটা কার সেটা লক্ষ্য করা দরকার। ওই পিটস এস টু এয়ার ক্র‍্যাফটটার মালিক ছিলেন ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী। ওরফে ধীরেন্দ্র চৌধারি, বাড়ি মধুবনী, বিহার। এই ব্রহ্মচারী লোকটা ষাটের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশচারীদের হঠযোগ শেখাতে যেতেন। নেহরুজী তাঁকে ডেকে বললেন, আমার মেয়েটাকে একটু যোগব‍্যায়াম শেখাও।
বিহারিবাবুর ভারি ডিগনিফায়েড চেহারা, ছ ফুটের ওপর লম্বা। হাত পায়ের গঠন অতি চমৎকার। গায়ের রঙ যথেষ্ট ফরসা। লোকজন বলত, ব্রহ্মচারীর চেহারাটি বিলকুল যীশুখ্রীস্টের মত। আমার খুব সন্দেহ আছে যীশুখ্রীস্টের যে ছবিটি চার্চে থাকে, আসল যীশু অমন চেহারার ধারেকাছে ছিলেন কি না, মনে হয় খেটে খাঝয়া হদ্দ গরিবের মতোই দেখাতো আসল যীশুকে। সে কথা থাক্। তো এই চৌধারিবাবু  ইন্দিরা গান্ধীর ব‍্যক্তিগত ব‍্যায়াম শিক্ষক হলেন।
অনসূয়া হেসে বললেন, চেহারার যা বর্ণনা দিচ্ছিস, যে কোনো মেয়েই তো প্রেমে পড়ে যাবে রে!
শ‍্যামলী বলল, দিদি, এই ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারীর বয়স এখন ঠিক ষাট একষট্টি হবে, কেননা, ১৯২৪ এর গোড়ার দিকে জন্মেছেন, তো এই ব্রহ্মচারী সত্তর দশকের শেষের দিকে রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম দূরদর্শনে প্রতি বুধবার যোগাভ‍্যাস নামে অনুষ্ঠান করতেন। ১৯৫০ সালে ভারতীয় সরকারি সংস্থা ফিল্মস ডিভিসন এন এস থাপা কে দিয়ে একটা ফিল্ম করায় সূক্ষ্ম ব‍্যায়াম। ওতে বিহারিবাবু এই চৌধারিকে দেখানো হয়েছিল।
অনসূয়া বললেন, বাহ্ শ‍্যামলী, তুই তো প্রচুর খবর রাখিস্!
শ‍্যামলী বলল, সঞ্জয় গান্ধী যে বিমান দুর্ঘটনাটি ঘটালেন, এবং মারা পড়লেন, সেই বিমানের মালিক ছিলেন এই ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী, সেকথা তো আগেই বলেছি। ওটা তিনি ফরেনের ভক্তদের থেকে গিফট পেয়েছিলেন। শুধু একটা এয়ার ক্র‍্যাফট মাত্র নয়, অজস্র দামি দামি চোখ ধাঁধানো বিলিতি গাড়ি উপহার পেয়েছেন এই ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী।
অনসূয়া বললেন, তা ভালবেসে যদি বিদেশি ভক্তরা গুরুকে উপহার দেয় তো কী করার আছে!
শ‍্যামলী বলল, না, আমার প্রশ্ন সেখানে নয়। কেউ দিয়েছে আর উনি নিয়েছেন। যদিও ভারতীয় সুপ্রাচীন মূল‍্যবোধ বলে, সন্ন্যাসী ব্রহ্মচারীগণ দানপরিগ্রহ করবেন না। এমনকি কিছুমাত্র সঞ্চয় পর্যন্ত করবেন না। সে কথা যাক্, কিন্তু এই লোকটি বিদেশ থেকে এই যেসব সাংঘাতিক দামি দামি গাড়ি গিফট পেতেন, সে বাবদে একটি পয়সাও কাস্টমস ডিউটি ভারত সরকার পেত না। আপনি একজন আইনজীবী। এর ভিতরের অসঙ্গতি, আর প্রশাসনিক কর্তৃত্বের কোন্ গভীর মহলের সঙ্গে যোগসাজশ থাকলে তবেই এমন হতে পারে, সেটা ভেবে দেখবেন।
সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যুর পর ব্রহ্মচারীর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি নানা মহলের চোখে পড়েছে। আগে যখন সঞ্জয় গান্ধী বস্তি সাফাই অভিযান করছেন, গরিবের উপর জোর খাটিয়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণের নামে খাসি করছেন, সেইসব কুকর্মের প্রবল উৎসাহদাতা ছিলেন ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী। ইন্দিরার কুখ্যাত জরুরি অবস্থা জারিকেও এই লোকটা ভীষণ ভাবে সাপোর্ট করে ছিল। কি করে যে এই লোকটা দিল্লির পশ জায়গায় বিশ্বায়তন যোগাশ্রম বানিয়ে ফেলল, তা বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়। জরুরি অবস্থার শেষে ইন্দিরা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অপসৃত হলে ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে অশুভ আঁতাতের অভিযোগ উঠেছে।
এই এক ছকে কাজ করে গেছেন রজনীশ, মহেশ যোগী, সত‍্য সাঁইবাবা। বিশাল চোখ ধাঁধানো সম্পত্তি, দামি দামি বিদেশী গাড়ি, বিদেশেও সম্পত্তি, ধ‍্যান যোগাভ‍্যাস আর অতীন্দ্রিয় চর্চার নামে অবাধ যৌনতার খেলা, আর ভারতীয় প্রশাসনের চোখ বুজে থাকা, সব এক ছক। ধর্মের ব‍্যাপক ইণ্ডাস্ট্রি।
অনসূয়া বললেন, জরুরি অবস্থার গোড়ার দিকের কথাগুলো জানিস্ তো?
শ‍্যামলী বলল, ওটাকে আমি ইন্দিরার উদগ্র ক্ষমতা লালসার সাথে জড়িয়ে দেখতে চাই। সাতষট্টি থেকে একাত্তর, এই সময়টায় ইন্দিরা ভারতীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোটাকে পকেটে পুরে ফেলেছেন। শুধুমাত্র সংবিধানের কিছু ব‍্যবস্থা পথের কাঁটা হয়ে আছে। আর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সব কজনকে কেনা যায় নি। ইন্দিরা তক্কে তক্কে আছেন, কি করে ভারতীয় সংবিধানটাকে মনের মতো করে কেটে ছেঁটে নেওয়া যায়। আর ১৯৬৭ সালে গোলকনাথ কেসে সুপ্রিম কোর্ট বলে দিল যে, ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি পরিবর্তন করা যাবে না। শুরু হয়ে গেল বাঘবন্দী লড়াই।
তখন ইন্দিরাজি পার্লামেন্টে বিশাল মেজরিটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে রয়েছেন। তিনি চব্বিশতম সংবিধান সংশোধন করিয়ে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে টপকে গেলেন। তারপর ছাব্বিশ নম্বর সংশোধন করে প্রিভি পার্স তুলে দিলেন। সুপ্রিম কোর্টে কেশবানন্দ ভারতী মামলা হল।
এই মামলায় বিচারপতি এ এন রায় ইন্দিরা গান্ধীর ইচ্ছাপূরণ করলেন। ইনাম হিসেবে তিন তিনটে সিনিয়র জজকে টপকে এ এন রায়কে চিফ জাস্টিস অফ ইণ্ডিয়া বানিয়ে দেওয়া হল। ওই কেশবানন্দ ভারতী মামলায় এক‌ই বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি শেলাত, বিচারপতি হেগড়ে আর বিচারপতি গ্রোভার। কিন্তু ওঁদেরকে টপকে গেলেন তুলনায় একটু হলেও জুনিয়র এ এন রায়।  এ এক লজ্জাকর বলব, না ন‍্যক্কারজনক বলব জানি না, দৃষ্টান্তস্থাপন করলেন ইন্দিরা গান্ধী। আগামী ইলেকশনে জনতা অ্যালায়েন্স ক্ষমতায় আসছে এ রকম শোনা যাচ্ছে। ক্ষমতা হারাবার ভয়ে ইন্দিরা গান্ধী ব‍্যাপক রিগিং করে ভোটে জিতলেন। ইলেকশনে ওঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রিগিং এর কারণে হারলেন জনতা নেতা রাজ নারায়ণ। তিনি গেলেন হাইকোর্টে। এলাহাবাদ হাইকোর্ট সব কাগজ দেখল শুনল বুঝল। পঁচাত্তরের  ১২ জুন তারিখে বিচারপতি জগমোহনলাল সিনহা ইন্দিরা গান্ধীর জয়কে অসাংবিধানিক, বেআইনি ও অনৈতিক বলে রায় দিলেন। ওদিকে জনতা নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ সম্পূর্ণ ক্রান্তির ডাক দিয়েছেন। বিপুল সংখ্যক রেলশ্রমিক সংগঠিত হয়ে রেল ধর্মঘট গড়ে তুলেছে। এই সময় রেলশ্রমিকদের সর্বভারতীয় স্তরের গুরুত্বপূর্ণ নেতা জর্জ ফার্ণাণ্ডেজকে জেলে পুরে দিলেন ইন্দিরা। আর এলাহাবাদ হাইকোর্টের বার‌ই জুনের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা আনলেন। সুপ্রিম কোর্টের সব বিচারপতি তো আর সমান নন। বিচারপতি ভি আর কৃষ্ণ আয়ার সেই অসাধারণ উঁচু মনের লোক। তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়কে উচ্চে তুলে ধরবেন ইন্দিরা এমন আঁচ পেয়ে গিয়েছিলেন। ইতিমধ্যেই ইন্দিরা গান্ধী দেশে যাবতীয় বিরোধী কণ্ঠকে কব্জা করতে চেয়ে জরুরি অবস্থা জারির প্ল‍্যান ছকে ফেলেছেন। একাজে তাঁর দোসর হয়েছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাতি, দুঁদে ব‍্যারিস্টার সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়, যিনি তখন বাংলার কুখ্যাত রক্তলোলুপ মুখ্যমন্ত্রী। আগেই জানুয়ারির গোড়ায় বোমার আঘাতে মারা গিয়েছেন রেলমন্ত্রী ললিত নারায়ণ মিশ্র। দোসরা জানুয়ারি বোম ছুঁড়েছে। তেসরা জানুয়ারিতে মিশ্র শেষ। মিশ্র নাকি জানতেন এমনটা হতে যাচ্ছে। সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারকে তিনি নাকি আভাস দিয়েছিলেন। যাইহোক, জানুয়ারির তিনতারিখে ঘটে যাওয়া মন্ত্রী খুনকে চাগিয়ে তুলে রেল ধর্মঘটের সাথেই গোটা দেশের নাগরিক সমাজের কণ্ঠরোধের প্ল‍্যান এঁটে রেখেছিলেন ইন্দিরা। চিত্রনাট্য লিখেছেন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়। পঁচাত্তরের চব্বিশে জুন যেই না সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির চেয়ারে বসে ভি আর কৃষ্ণ আয়ার বললেন, এলাহাবাদ হাইকোর্ট ইন্দিরার নির্বাচনকে বাতিল করে দিয়ে সঠিক কাজ করেছেন, তখনই ইন্দিরা গান্ধী ক্ষেপে গিয়ে পরেরদিন পঁচিশে জুন জরুরি অবস্থা জারি করে দিলেন। এই বীভৎসতা চলবে সাতাত্তর সালের একুশে মার্চ পর্যন্ত।
একটানা এতগুলি কথা বলে শ‍্যামলী হাঁফাতে থাকে।
একটু দম নিয়ে শ‍্যামলী বলল, এই ইন্দিরা যদি বলে সেকুলারিজম, আর সোশিয়ালিস্টিক সোসাইটি, তখন সেই বেড়ালটার কথা মনে পড়ে, যে বলেছিল , মাছ খাব না, আঁশ ছোঁবো না, দীক্ষা নেবো, কাশী যাব।
শ‍্যামলীর কথা বলার ভঙ্গি শুনে অনসূয়া হেসে ফেললেন। কাজের সহায়িকা মহিলাটিও। মনে হল, সেও সব বুঝতে পারছে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।