১৮৮৬ সাল। পহেলা জানুয়ারি। গদাধর চাটুজ্যে মশায় কাশীপুরের বাগানবাড়িতে। গলায় দুরারোগ্য অসুখ। খেতে কষ্ট। ঢোঁক গিলতে কষ্ট। তবু তাঁর সহজ সরল আলাপচারিতা আর নিজের ভাবে বিভোর কথা শুনতে কিছু কিছু লোক আসেন। সংসারী লোক সব। বেশিরভাগই পয়সাঅলা। আর অনেকেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। পয়সাঅলা সংসারী লোকের যা যা বৈশিষ্ট্য থাকে, তা এঁদেরও আছে। তা থাকবে না কেন। বলে, কামিনী কাঞ্চন। গদাধর তাঁদের বলেন, সংসারে পাঁকাল মাছের মতো থাকবে। বলেন না, সংসার ছেড়ে বেরিয়ে এসো। বলেন, কাজলের ঘরেই থাকো, কিন্তু সাবধানে থেকো। বলেন ঢেঁকিতে ধান ভানার কথা। এদিকে কোলের ছেলেকে মাই দিচ্ছে। দিচ্ছে দিচ্ছে, বাচ্চা বিয়োলে মাই দিতে হয়। তবে মনটা আছে ঢেঁকির মুষলের দিকে। নইলে হাত ছেঁচে যাবে। সংসারী মানুষ সংসার ছেড়ে যেতে পারে না। যদি যাব ভাবে, যেখানে যায়, সেখানে নতুন করে সংসার ফেঁদে বসে। এক কমলি কা ওয়াস্তে। এক যে ছিল সাধু। কৌপীনবন্ত। তার কৌপীন ইঁদুরে কেটে দিয়ে যায়। সাধু লজ্জাস্থানটুকু না ঢেকে মাধুকরীতে বেরোয় কি করে। ইঁদুর তাড়াতে বেড়াল পোষা। বেড়ালের দুধের জন্য গাইগরু পোষা। এই করে আবার সংসারে জড়িয়ে পড়া। সংসারী মানুষ অবাক হয়ে শোনে। আহা, ঠাকুরটি মনের কথা বড়ো সহজ করে বলেন গো। তারপর বলেন, একজনের মাগ ( অস্যার্থ গৃহিণী, গদাধর অমন বলতেন) বলেছিল, অমুকের কি ভক্তি! একে একে গেরুয়া, কমণ্ডলু, সব যোগাড় করছে। তাই শুনে প্রকৃত বিবাগী স্ত্রীকে বললেন, ওরে ওইভাবে বৈরাগ্য হয় কি? স্ত্রী বললে, কীভাবে হয়? স্বামী বললেন, তবে এই দ্যাখ, বলে কাপড়টি খুলে রেখে, গামছা সম্বল হয়ে বেরিয়ে পড়লেন। আর ফিরলেন না। ভক্তদের দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। আহা, ঐশ্বরিক কৃপা না হলে কি অমন বৈরাগ্য হয়!
সংসারের ভালবাসা কেমন, বলেন ঠাকুর। এক ব্যক্তি গুরুর কাছে বলে, আমার স্ত্রী আমায় ভালবাসে, মা স্নেহ করেন, পুত্রকন্যারা ভক্তি করে। আমি সংসার ছাড়ব কি করে? তখন, গুরু তাকে একটা ঔষধ দিলেন। তা খেলে মরবে না, তবে অনেকক্ষণ মড়ার মতো পড়ে থাকবে। লোকজন ভাববে মরে গিয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিটির চেতনা থাকবে। সব শুনতে পাবে, বুঝতে পারবে। গুরুকৃপায় সাংসারিক সম্পর্কের আসল চেহারাটা ধরা পড়ে যায়।
ভক্ত ভৈরব গিরিশ। মদ্যপানে আসক্ত। বেশ্যাবাড়ি নিয়মিত গমন। সেকালে থিয়েটারে অভিনেত্রীদের ওখান থেকেই আনতে হত যে! ভদ্র গৃহস্থ পরিবারের মেয়েরা যে পুরুষের সামনে বেরোতো না। কথাটিও গুছিয়ে বলতে শিখত না। আর গান বাজনা অভিনয়! সে সব বহুদূরের ব্যাপার। তাই বেশ্যারা ভরসা। নটী বিনোদিনীকে চৈতন্যলীলায় দেখলেন ঠাকুর। চৈতন্যভাবে বিভোল হয়ে অভিনয় করছে নটী। মরা মরা বলতে বলতে রামনাম এসেছিল রত্নাকরের মুখে। ক্রমে সে বাল্মীকি। তার কণ্ঠে রামায়ণী গান। অভিনয় করতে করতেও সুস্থ আলোচনার সুযোগ আসবে। গদাধর বলেন, ওতে লোকশিক্ষে হয়। গিরিশ, জি সি ঘোষ সেই পথ তৈরি করবেন। লোকে বলে, জি সির পাপ, মদ্যপান, বেশ্যাগমন, যত কুকাজকে ঠাকুর গ্রহণ করেছেন। জি সি নাকি তাঁকে বকলমা দিয়েছেন। জি সির হয়ে গদাধরই ঠাকুরকে ডাকবেন। ভক্তের বোঝা ভগবান বয়।
ঠাকুর কল্পতরুর গল্প বলেল। সে এক অলৌকিক তরু। ভক্তিভরে তার কাছে হাত পাতলে, যা চাইবি, তাই পাবি।
ঠাকুর সাধনা করেছেন হিন্দু ভাবে, মুসলমান ভাবে, আবার খ্রীস্টানভাবে। আমরা ধর্মীয় বিভেদ ভুলব কি? ঠাকুর যেতেন সবার কাছে। বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর, কেশব সেন। নানাবিধ আলোচনা করতেন। তাঁদের কৃতিত্বের খবরাখবর রাখতেন। মতে মেলে না বলে হৃদ্যতার অভাব হত না। আমরা মতান্তর হলে মনান্তর করে ফেলি। সর্বজনে সুপ্রচুর প্রীতি দিতে পারি কি? নিজের স্ত্রীকে সম্মান করতেন ঠাকুর। ও সারদা, জ্ঞান দিতে এসেছে, এভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। আমরা ঘরে ঘরে দাম্পত্য কলহ বন্ধ করব কি? চড় মেরেছিলেন রাণী রাসমণিকে। তিনি রাণী। মন্দিরের মালিক। অগাধ প্রতিপত্তিওয়ালা মানুষ। আমরা বড়লোকের অসৎ আচরণের প্রতিবাদ করতে নির্ভীক ভাবে রুখে দাঁড়াব তো? ঠাকুর সেই ভক্তিপরায়ণ সাপের গল্প বলছেন। তাকে ফোঁস করতে শেখাচ্ছেন। বলছেন, ফোঁসটুকু করতে হয়। আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থা ব্যাঙ্ক রেল এলআইসি বিএসএনএল চক্রান্ত করে বরবাদ করা হচ্ছে। আমরা ল্যালাভোলা হয়ে থাকব, না ফোঁস করব?
সময় বলে দেবে, আমরা কল্পবৃক্ষের নিচে সমবেত হব কি না।