|| আন্তনি ভ্যান লিউয়েনহক || স্মরণলেখায় মৃদুল শ্রীমানী

এক যে ছিলেন আন্তনি ভ্যান লিউয়েনহক। নেদারল্যান্ডসের লোক। ডাচ। কাজ করতেন কাপড়ের দোকানে। ষোল বছর বয়সে হিসাব রক্ষকের ফাই ফরমাশ খাটা দিয়ে কর্মজীবন শুরু। হবে না কেন! মাথার উপর বাপ না থাকলে যা হয়। জন্মদাতা বাবা ছিলেন হস্তশিল্পী। তো আন্তনির যখন মোটে পাঁচ বছর বয়স, তার বাবা চোখ বুজলেন। তার মা তখন আরেকটি লোকের ঘর করতে শুরু করলেন। আরো বছর পাঁচ পরে, আন্তনির দশ বছর বয়সে তার সৎ বাপও চোখ বুজলেন। এই আন্তনি কিনা হয়ে গেলেন অণুজীববিজ্ঞানের পথিকৃৎ। নিজের সময়ের নমস্য বিজ্ঞানী।
কিন্তু কী করে?
আন্তনি বয়স কালে নিজেই সে উত্তর দিয়েছেন। না, আমি নামজাদা হতে চাই নি। লোকে আমায় ধন্য ধন্য করবে এমন কোনো স্বপ্ন আমার ছিল না। আমার শুধু প্রচণ্ড জানতে আর নেড়ুবুঝে দেখতে খেয়াল যেত। যা কিছু হয়েছি, ওই জানবার দুর্নিবার আগ্রহে হয়েছি।
কাপড়ের দোকানের হিসাব নবীশের অ্যাপ্রেন্টিসকে কাপড়ের গুণাগুণ খতিয়ে দেখতে হত। কতটুকু জায়গায় কতটা সুতো রয়েছে, তা যাচাই করে কাপড়ের গুণ নির্ধারণ করা হত। সেই সুতো গুণে দেখতে হত আতস কাচ বাগিয়ে। আতস কাচ আন্তনি পাবেন কোথায়! বোতলের তলার কাঁচ দিয়ে সেই লেন্স বানিয়ে নিতেন নিজেই। হস্তশিল্পী বাবার হাতযশের খানিকটা ছেলে পেয়েছিলেন। লেন্স তাঁর হাতে জবরদস্ত রকমে তৈরি হত। কৌশলটি নিজের কাছে লুকিয়ে রাখতেন। পাঁচকান করতেন না। এই ভাবে একদিন বানিয়ে ফেললেন সিঙ্গল লেন্স অণুবীক্ষণ। ওঁর সমবয়সী বিজ্ঞানী রবার্ট হুক ( ১৬৩৫ – ১৭০৩) ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েলের সহযোগী। হুক রয়াল সোসাইটির সদস্য ছিলেন। আবার কলেজে জ্যামিতিশাস্ত্রের অধ্যাপনাও করেছেন। তিনিও লেন্স দিয়ে অণুবীক্ষণ তৈরি করে পোকা মাকড় নজর করতেন। বই লিখেছিলেন মাইক্রোগ্রাফিয়া। কিন্তু লিউয়েনহক অনেক উঁচু মানের লেন্স বানাতেন। অন্যের লেন্স যেখানে মূল দ্রষ্টব্য বস্তুর বিশ থেকে ত্রিশ গুণ বিবর্ধিত ছবি দেখাতো, লিউয়েনহক এর তৈরি লেন্স দুশো সত্তরগুণ বড় করে দেখাতে জানত। ওই পুঁজি তে লিউয়েনহক মৌমাছি, উকুন, এইসব প্রাণীকে লক্ষ করে ফেললেন। লেন্স বাগিয়ে দেখতেন বুঝতেন আর চিঠি লিখতেন রয়াল সোসাইটিতে। লক্ষ করতেন ব্যাকটিরিয়া আর পুকুরের জলে নানা বহুকোশী জীব। দেখতেন শুক্রাণু, পেশিতন্তু আর রক্তবহা নালী। দেখে শুনে লোহিত রক্ত কণিকার ব্যাপারে বিস্তারিত লিখে ফেললেন। জীবৎকালে রয়াল সোসাইটির কাছে প্রায় ১৯০টি বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ পাঠিয়েছিলেন। ১৬৯৫ সালের দিকে তা আরকানা ন্যাচুরা ডিটেকটর নামে প্রকাশ পায়।
আজ তাঁর জন্মদিন। ১৬৩২ সালের ২৪ অক্টোবর তারিখে জন্মেছিলেন। নব্বই বৎসর বয়সে ১৭২৩ খ্রীস্টাব্দের ২৬ আগস্ট তারিখে প্রয়াত হন।।