রবিবারে রবি-বার – এ মৃদুল শ্রীমানী

মৃত্যুর নিপুণ শিল্প

পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারিতে ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২৫ তারিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন:
“বিষুবরেখা পার হয়ে চলেছি, এমন সময় হঠাৎ কখন শরীর গেল বিগড়ে : বিছানা ছাড়া গতি র‌ইল না। … দুঃখের অত‍্যাচার যখন অতিমাত্রায় চড়ে ওঠে তখন তাকে পরাভূত করতে পারি নে ; কিন্তু, তাকে অবজ্ঞা করবার অধিকার তো কেউ কাড়তে পারে না– আমার হাতে তার একটা উপায় আছে, সে হচ্ছে কবিতা-লেখা। তার বিষয়টা যা-ই হোক-না-কেন, লেখাটাই দুঃখের বিরুদ্ধে সিডিশন-বিশেষ। সিডিশনের দ্বারা প্রতাপশালীর বিশেষ অনিষ্ট হয় না, তাতে পীড়িত চিত্তের আত্মসম্ভ্রম রক্ষা হয়।
আমি সেই কাজে লাগলুম, বিছানায় পড়ে পড়ে কবিতা লেখা চলল। ….
…অন্ধ উত্তাপের পরিমাণ বেড়ে বেড়ে ক্রমে যেমন তা আলোকিত হয়, দুঃখের‌ও তেমনি পরিমাণভেদে প্রকাশভেদ হয়ে থাকে। যে দুঃখ প্রথমে কারাগারের মতো বিশ্বকে পৃথক করে মনকে কেবলমাত্র নিজের ব‍্যথার মধ্যেই বদ্ধ করে, সেই দুঃখেরই বেগ বাড়তে বাড়তে অবশেষে অবরোধ ভেঙে পড়ে এবং বিশ্বের দুঃখসমুদ্রের কোটালের বানকে অন্তরে প্রবেশ করবার পথ ছেড়ে দেয়। তখন নিজের ক্ষণিক ছোটো দুঃখটা মানুষের চিরকালীন বড়ো দুঃখের সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়; তার ছটফটানি চলে যায়। তখন দুঃখের দণ্ডটা একটা দীপ্ত আনন্দের মশাল হয়ে জ্বলে ওঠে।
প্রলয়কে ভয় যেই না-করা যায় অমনি দুঃখবীণার সুর বাঁধা সাঙ্গ হয়। গোড়ায় ঐ সুর-বাঁধবার সময়টাই হচ্ছে বড়ো কর্কশ, কেননা তখনো যে দ্বন্দ্ব ঘোচে নি। … বোধ হয়, প্রথম অবস্থায় ভয়ে ভরসায় যতক্ষণ টানাটানি চলতে থাকে ততক্ষণ ভারি কষ্ট। যতক্ষণ ভীষণকেই একমাত্র করে দেখি নে, যতক্ষণ তাকে অতিক্রম করেও জীবনের চিরপরিচিত ক্ষেত্রটা দেখা যায়, ততক্ষণ সেই দ্বন্দ্বের টানে ভয় কিছুতেই ছাড়তে চায় না। অবশেষে তাপের তীব্রতা বাড়তে বাড়তে রুদ্র যখন অদ্বিতীয় হয়ে দেখা দেন, প্রলয়ের গর্জন তখন সংগীত হয়ে ওঠে, তখন তার সঙ্গে নির্বিচারে সম্পূর্ণভাবে যোগ দেবার নিরতিশয় আগ্রহে মরিয়া করে তোলে। মৃত‍্যুকে তখন সত‍্য বলে জেনে গ্রহণ করি; তার একটা পূর্ণাত্মক রূপ দেখতে পাই বলে তার শূন‍্যাত্মকতার ভয় চলে যায়।
… জীবনের শেষ ক্ষণে মনের মধ্যে এই দ্বন্দ্বের কোলাহল যদি জেগে ওঠে তবে তাতেই বেসুর কর্কশ হয়; মৃত্যুর সম্পূর্ণ সংগীত শুনতে পাই নে, মৃত‍্যুকে সত‍্য বলে স্বীকার করার আনন্দ চলে যায়।”
অনুমান করা যায় যে ‘পূরবী’ কাব‍্যগ্রন্থের “ঝড়” শীর্ষক কবিতাটি রচনাকালের ( ২৪ অক্টোবর ১৯২৪) উপলব্ধিটিই বিবৃত করেছেন কবি।
১৯২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর বুয়েনোস এয়ারিস এ লিখলেন:
‘ওগো মোর না-পাওয়া গো, সায়াহ্নের করুণ কিরণে
পূরবীতে ডাক দাও আমার পাওয়ারে ক্ষণে ক্ষণে।’
(কবিতার নাম: না-পাওয়া)।
তার আগে ১৭ ডিসেম্বর তারিখে লিখেছিলেন:
‘ভেবেছি জেনেছি যাহা, বলেছি শুনেছি যাহা কানে,
সহসা গেয়েছি যাহা গানে,
ধরে নি তা মরণের বেড়া-ঘেরা প্রাণে।
যা পেয়েছি, যা করেছি দান
মর্তে তার কোথা পরিমাণ।
আমার মনের নৃত্য, কতবার জীবন মৃত‍্যুরে
লঙ্ঘিয়া চলিয়া গেছে চিরসুন্দরের সুরপুরে। …
আমি যে রূপের পদ্মে করেছি অরূপমধু পান,
দুঃখের বক্ষের মাঝে আনন্দের পেয়েছি সন্ধান,
অনন্ত মৌনের বাণী শুনেছি অন্তরে,
দেখেছি জ‍্যোতির পথ শূন‍্যময় আঁধারপ্রান্তরে।’
(কবিতার নাম: কঙ্কাল)।
তার‌ও আগে ১ ডিসেম্বর তারিখে লিখেছিলেন:
‘মোর রজনীর ভেঙেছে তিমিরবাঁধ,
পাও নি কি সংবাদ।
জেগে-ওঠা প্রাণে উথলিছে ব‍্যাকুলতা,
… এল যে আমার মন-বিলাবার বেলা,
খেলিব এবার সব হারাবার খেলা,
যা-কিছু দেবার রাখিব না আর ঢাকি..’
(কবিতার নাম: প্রভাতী)।
১৩৩০ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে লিখেছিলেন ‘লীলাসঙ্গিনী’ কবিতাটি। সেখানে লিখেছিলেন:
“দেখো না কি, হায়, বেলা চলে যায়–
সারা হয়ে এল দিন।
বাজে পূরবীর ছন্দে রবির
শেষ রাগিণীর বীন।
এতদিন হেথা ছিনু আমি পরবাসী
হারিয়ে ফেলেছি সেদিনের সেই বাঁশি,
…কেন অবেলায় ডেকেছ খেলায়,
সারা হয়ে এল দিন।”
‘পলাতকা’র (১৩২৫) পর ছোটোদের জন‍্য লেখা ‘শিশু ভোলানাথ'(১৩২৯) ছাড়া দীর্ঘকাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আর কোনো কবিতার বই প্রকাশ হয় নি। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের আশঙ্কা হচ্ছিল তাঁর কবিতা লেখার ক্ষমতায় ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে কিনা। এমন সময় মনে হল:
‘সহস্রের বন‍্যাস্রোতে জন্ম হতে মৃত্যুর আঁধারে
চলে যাই ভেসে।
নিজেরে হারায়ে ফেলি অস্পষ্টের প্রচ্ছন্ন পাথারে
কোন্ নিরুদ্দেশে।
নামহীন দীপ্তিহীন তৃপ্তিহীন আত্মবিস্মৃতির
তমসার মাঝে।
কোথা হতে অকস্মাৎ কর মোরে খুঁজিয়া বাহির
তাহা বুঝি না যে।
তব কণ্ঠে মোর নাম যেই শুনি, গান গেয়ে উঠি—
‘আছি, আমি আছি।’
(কবিতার নাম: আহ্বান, হারুনা-মারু জাহাজ, ১ অক্টোবর ১৯২৪)
‘পূরবী’ কাব‍্যগ্রন্থ সেই অসাড়তা ঝেড়ে ফেলে নতুন করে জাগা। তারিখহীন কবিতায় লিখলেন :
‘তাই তো যখন শেষে
একে একে আপন জনে সূর্য-আলোর অন্তরালের দেশে
আঁখির নাগাল এড়িয়ে পালায়, তখন রিক্ত শীর্ণ জীবন মম…
শূন‍্য বালুর একটি প্রান্তে ক্লান্ত বারি স্রস্ত অবহেলায়।…’ কবিতার নাম দিলেন পূরবী। সবুজ পত্রে জ‍্যৈষ্ঠ ১৩২৪ সংখ‍্যায় তা ছেপে বেরিয়েছিল।
আরেকটি তারিখহীন কবিতা ‘বিজয়ী’তে লিখলেন
শূন‍্যে নবীন সূর্য জাগে
ওই যে তাহার বিশ্ব-চেতন কেতন-আগে
জ্বলছে নূতন দীপ্তিরতন তিমির-মথন শুভ্ররাগে;
মশাল-ভস্ম লুপ্তিধুলায় নিত‍্যদিনের সুপ্তি মাগে।’
কবিতাটি বেরোলো প্রবাসীর চৈত্র ১৩২৪ সংখ‍্যায়। আপনজনেদের দাবি ছিল নূতন কবিতার ব‌ইয়ের। সজনীকান্ত দাস লিখেছিলেন:
“প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘ নয় বৎসরকাল কবির কোন‌ও কাব‍্যগ্রন্থ বাহির হয় নাই, সেই ১৯১৬ খ্রীস্টাব্দে বলাকা প্রকাশিত হ‌ইয়াছে…”
১৩৩২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে নবপ্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী-গ্রন্থালয়ের প্রথম ব‌ই হিসেবে করুণাবিন্দু বিশ্বাস পূরবী প্রকাশ করেছিলেন। পূরবী হল সূর্যাস্তকালীন রাগ। বা ঠিক তার পরবর্তী সময়ের রাগ। এর ভাবটি শান্ত, গম্ভীর। এর ঠাট হল মাড়োয়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চৌষট্টি বৎসর বয়সে, ১৯২৫ সালে প্রকাশ হল পূরবী। এই সময়েই রক্তকরবীতে মন ঢেলে রেখেছেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯২৪ সালে Red Oleanders বিশ্বভারতী কোয়ার্টার্লি পত্রিকায় বেরিয়েছে, আর ১৯২৫ এ গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয়েছে রক্তকরবীর ইংরেজি অনুবাদ। ১৯২৪ সালে বন্ধুত্ব হল ভিত্তোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে। তাঁকে প্রীতিমুগ্ধতায় নাম দিলেন বিজয়া। পূরবীর অনেকগুলি কবিতা ওকাম্পোর সান ইসিদ্রোর মিরালরিও বাগান বাড়িতে রচিত। এখান থেকে শুরু পাণ্ডুলিপিতে বিচিত্র আঁকিবুকি কাটা, যা বিকশিত হবে ছবি আঁকায়, আর ওকাম্পোর প্রশ্রয়ে ভালবাসায় পারীতে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হবে।
এতকিছুর মধ‍্যেও মৃত্যুর বিষয়টি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্থায়ীভাব হয়ে রয়ে গিয়েছে।
এই যাত্রায় লেনার্ড এলমহার্স্ট ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গী। তিনি কবির সেক্রেটারি হিসেবে ছিলেন। কবি যখন শরীর বিগড়ানোর সূত্রে বিছানা আশ্রয় করে কবিতা লিখে চলেছেন, ২৪ অক্টোবরে ‘ঝড়’ নামে কবিতা লেখার সূত্রে কালিদাস নাগকে জানাচ্ছেন, শরীর মন যখন পীড়িত হয় তখন আমি কবিতা লিখি। ২৬ অক্টোবরে, ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ৯ কার্তিক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশকে পত্রে লিখছেন, ভারতবর্ষ থেকে বেরিয়ে এসে এত কবিতা আমার জীবনে আর লিখিনি। ভারত মহাসাগরে গদ‍্যের সঙ্গে মিশোল দিয়ে কবিতা লিখেচি– এ (আন্ডেস) জাহাজে একেবারে নির্জলা পদ‍্য। সাতদিনে বারোটা কবিতা স্বদেশের আবহাওয়াতেও সহজ নয়।…এই কবিতাগুলো সব বৈকালীতে ছাপতে পারবে। উল্লেখ্য যে পূরবী ব‌ইয়ের নাম ভাবা হয়েছিল “বৈকালী”। নিজেকে ফুরিয়ে যাওয়া শক্তি ভেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে হাহুতাশ, তাকে অবশ‍্য জাহাজ যাত্রার সঙ্গী তথা সেক্রেটারি লেনার্ড এলমহার্স্ট বিশেষ গুরুত্ব দেন নি। এলমহার্স্ট ০৯ নভেম্বর, ১৯২৪ তারিখে তাঁর ভাবী পত্নী ডরোথিকে রবীন্দ্রনাথের শারীরিক অবস্থার সম্পর্কে লিখেছেন:
‘The poet caught a chill on the boat, it developed into “flu” , he prepared to die after some hesitation and promptly got well, never ceasing to turn his imagination into poetry even at his worst.’

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।