জানলা দিয়ে একদৃষ্টে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল সমরেশ। বিকেল হয়ে আসছে। হেমন্তের বেলা। এক্ষুণি চোখের নিমেষে সন্ধে নেমে যাবে। সামনে-পেছনে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য রং-চটা বাড়ি, ওপরে এক চিলতে ধোঁয়াটে আকাশ আর নীচে ঘিঞ্জি দোকানপাট, সবজিবাজার ও মাঝে মাঝে হুশ হুশ করে বিকট হর্ণ বাজিয়ে চলে যাওয়া অটো রিকশা ছাড়া অন্য কোনও প্রাকৃতিক দৃশ্য অবশ্য হাওড়া স্টেশন সংলগ্ন এই লজটা থেকে দেখতে পাওয়া যায় না। সমরেশের খুব জানতে ইচ্ছে করছিল আজ কত তারিখ। রাগ করে যেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল, সঙ্গে যে ফোনটা নেই সে খেয়াল ছিল না। সেদিনই বা কত তারিখ ছিল? তারিখ জানাটা কোনও সমস্যা নয়, লজের রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে ওরাই বলে দেবে, সেইসঙ্গে জানা যাবে সে এখানে কতদিন আছে এবং এখনও পর্যন্ত তার কত টাকা বিল হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে এই ভুলে যাওয়া রোগটা! এই জন্যই কি নন্দিনী তাকে অতিরিক্ত ওষুধগুলো খাওয়াতো? একদমই না! ভাবতেই চোয়াল শক্ত হল সমরেশের। নন্দিনী আসলে তাকে ওই ওষুধপত্রের বাহানায় বিষ দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল! সে নন্দিনীর সঙ্গে ওর স্কুলেরই আরেক শিক্ষকের গোপন প্রেমটা টের পেয়ে গেছিল যে! কী যেন নাম ছোকরার? চয়ন বোধহয়। স্কুলের পরে ব্যাটা নির্ঘাত রোজ নন্দিনীর সঙ্গে তাদের বাড়িতে আসত, তারপর তার অনুপস্থিতির সুযোগে…। কতদিন অফিস থেকে আগে আগে বেরিয়ে এসে লুকিয়ে বাড়ির বাইরে ওঁৎ পেতে থেকেছে সমরেশ ওদের হাতেনাতে ধরবে বলে, আচমকা বেল বাজিয়ে দেখেছে নন্দিনী কী অবস্থায় এসে দরজা খোলে, পুরো বাড়ি আঁতিপাতি করে চয়নকে খুঁজেছে, বন্ধ দরজার বাইরে কান পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছে ভেতরের ঘর থেকে যদি ওদের ফিসফিস, শীৎকার কানে আসে! একবার তো ধরেই ফেলেছিল প্রায় কিন্তু ওদের দুজনের সঙ্গে স্কুলের আরও দু-তিনজন ছিল বলে কিছু বলতে পারেনি। তার সন্দেহ আরও পোক্ত হল যখন নন্দিনী তাকে তার ব্লাডপ্রেশার বেড়ে গেছে বলে রুটিন চেক-আপের ছুতোয় একজন নতুন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। তার পর থেকেই তার রোজকার ওষুধের সংখ্যা তিন থেকে বেড়ে পাঁচ হয়ে যাওয়ায় সমরেশ বুঝেছিল তাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে নন্দিনী এবং ষড়যন্ত্রে ওই ডাক্তারও শামিল! অতএব প্রাণ বাঁচাতে নিজের নাম পরিচয় লুকিয়ে এই লজ।
এ কদিন সকাল হলেই নিয়ম করে চোখে রোদচশমা আর মাথায় টুপি পরে বাজারে ঢুকে খবরের কাগজের স্টলে প্রতিটি কাগজের পাতা উলটে উলটে দেখেছে তার নিরুদ্দেশ সম্পর্কে কোনও বিজ্ঞাপন আছে কিনা। আজও এই নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি। কোথাও কোনও বিজ্ঞাপন নেই। তবে কি কেউ চায় না সে ফিরে আসুক? নন্দিনী? এত সহজে ভুলে গেল তাদের বারো বছরের বিবাহিত জীবন? মা-বাবাকে তো কবেই হারিয়েছে, এক নন্দিনীকেই আঁকড়ে ছিল সে। তাদের দুজনের মাঝখানে সন্তান পর্যন্ত চায়নি। ঠোঁটে নোনতা জলের স্বাদ পেয়ে ঘোর কাটল সমরেশের। আজ এতদিন পর মনটা কেমন যেন করছে। একবার বাড়ি গিয়ে দেখবে নাকি নন্দিনী কেমন আছে? কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়নি তো কি, হয়তো পুলিশের কাছে ঠিকই গেছে! সমরেশ মনে মনে ঠিক করে নিল নন্দিনী যদি ক্ষমা চেয়ে নেয় তাহলে সে ফিরেই যাবে। এভাবে বাইরে বাইরে কদিনই বা থাকবে…পুলিশ আজ না হোক কাল ঠিক তাকে খুঁজে বার করবে। চোখ মুছে একটা ভালো জামা পরে পায়ে চটি গলালো সমরেশ।
কিন্তু একী! বাড়ি অন্ধকার কেন? নন্দিনী কি তবে বাপের বাড়িতে গিয়ে থাকছে এখন? তাহলে তো অন্ততঃ সদর দরজায় তালা থাকবে। অন্য বাড়িগুলো ভালো করে দেখল সমরেশ, লোডশেডিং-এর কোনও লক্ষণ নেই, তাছাড়া কলকাতা শহরে আজকাল লোডশেডিং হয় না বললেই চলে। বেল বাজাবে কি বাজাবে না চিন্তা করতে করতেই দরজা খুলে গেল। সামনে নন্দিনী। পেছনে চয়ন ও আরেকজন যাকে সমরেশ চেনেনা। সবার চোখেই অপার বিস্ময়। মাথায় রক্ত উঠে গেল সমরেশের। স্বামীর খোঁজ নেই, কুলটা মেয়েছেলে তলে তলে এই করে বেড়াচ্ছে! অন্ধকার বাড়িতে একজন নয়, দু-দুজন পুরুষমানুষের সঙ্গে…ছি ছি! দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তিনজনের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ল সমরেশ…।
…..……………………………………………………..
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা, ৭ নভেম্বরঃ ঢাকুরিয়া এলাকার একটি বাড়িতে রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হল তিনজনের। মৃতেরা হলেন গৃহকর্ত্রী নন্দিনী দত্ত (৪২), চয়ন দেববর্মন (৪৪) ও শ্রীকান্ত সাধু (৫০)। মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পরিচারিকা এসে অনেক ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের খবর দিলে তারা পুলিশকে জানায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দরজা
ভেঙে ঢুকে একটি ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তিনজনের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে। দেহগুলিতে আঘাতের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে, অতিরিক্ত আতঙ্কের কারণেই তাদের হৃদযন্ত্র বন্ধ হওয়ার ঘটনাটি ঘটেছে। যে ঘরে দেহগুলি ছিল সেখানে মোমবাতি, তেপায়া টেবিল, প্ল্যানচেট বোর্ড ও মৃত গৃহকর্তার ছবি দেখে পুলিশের অনুমান ঘটনার সময় ওই তিনজন আত্মা নামানোর মতো কোনও আধিভৌতিক প্রক্রিয়ায় লিপ্ত ছিলেন। প্রসঙ্গতঃ, এক মাস আগেই নন্দিনী দেবীর স্বামী সমরেশ দত্ত-র ঝুলন্ত দেহ হাওড়ার একটি লজ থেকে উদ্ধার হয়েছিল। তিনি মানসিক ভাবে অসুস্থ ছিলেন, ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে ডিল্যুশন অব ইনফিডেলিটি এবং প্যারানয়া বলা হয় অর্থাৎ স্ত্রী-এর ওপর ভ্রান্ত সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং তজ্জনিত ক্ষতির আশঙ্কার মতো সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে ভোগার কারণেই তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন বলে পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছিল….