ছেলে-টা নবম বা- দশম শ্রেণী-তে পড়তো ৷ সম্ভব হলে- তাই ৷ নিশ্চিত না ৷ যদিও জন্ম-লগ্ন হতে, চেনা তাকে ৷ দেখতে দেখতে সময় পার হওয়া-দের এক-জন ৷ এক-দম শৈশবে’র সার হতে, চেনা ৷ যখন- দেহে পরিধেয় ওঠে-নি সচেতন-ভাবে, তখন থেকে ৷
কিন্তু- চেনা কী আর- এতো সহজ ? মানুষ কখন যে- কোন মনোবৃত্তি’র খোরাকে, কি করে বসে, কেউ কী- পূর্ব হতে, আঁচ করতে পারে ? পারে-না ৷ তার জন্য- বিশেষ ব্যক্তিত্ব হওয়া- দরকার ৷ এই যেমন- যাদুকর ৷ জগতে সবাই একেক-জন যাদুকর নয় ৷ কেউ কেউ ৷ তার মধ্যে আমি পড়ি-না, এ-টা পরিস্কার বলা দরকার ৷
বলতে গেলে, বলতে হয়- ঘটনা-টা পৃথিবী’র সবচেয়ে আকষ্বিক ঘটনা’র মধ্যে এ-টাও এক-টা ৷ বলবো ৷ এক-টু ধৈর্য ধরতে হবে ৷ তার আগে বলে নেই, কিছু- পূর্ব কথা ৷
আমার এক-টা স্বভাব আছে ৷ শিশু প্রাণ-দের সাথে- টুকটাক মজা করা’র প্রবণতা ৷ যেমন- সবুজ কারো নাম ৷ আর- তার মায়ে’র নাম- পারুল আকতার ৷ তো- তাকে সরাসরি তার নাম ধরে- না ডেকে, ডাকতাম- পারু’র মা’র নাতি ৷ এক-টু জিলাপি’র প্যাঁচে ৷ এ-তে ডাক-তো হতো ৷ তা-তে বিপরীত পক্ষে’র নার্ভে’র উধ্ব-গতি বা- নিম্ন-গতি’র কোনো- আসর হয়-তো বসতো-না ৷ আবার- রাগে’র বা- ভাবে’র কোনো- বিশেষ মনো-বৈকল্যও ঘটতো-না ৷ অন্তত- আমার এই স্বভাবে’র বাধ হতো-না ৷
জায়েদ-কে এভাবে ডাকতাম- দেখা হলে ৷ অতি-শৈশবে জায়েদ তার অভিব্যক্তি-টা’ই বুঝতো-না ৷ যখন- বুঝ-তে শুরু করলো ৷ তখন- সে শুধু- শুনে’ই নিতো ৷ এ ব্যাপারে তার- মতি অবশ্য জানা’র তাগিদ অনুভব করি-নি, কোনো-দিন ৷ যাক সে কথা ৷
জায়েদ’- এর বাড়ি আর- আমার বাড়ি’র মাঝে’র দূরত্ব ১০০ মিটারে’রও কম ৷ তার সিংহ ভাগ দখল করে রয়েছে, এক-টা দীঘি’র প্রস্থ-ভাগ ৷ ও-দিকে অনধিক ৫০ মিটারে’র বিপরীতে তার পূর্বসূরি-দের বাড়ি ৷ মূল বাড়ি হতে সরে, তাদের বর্তমানে- আসা ৷ নিজ বাড়ি আর- পিতা-মহে’র বাড়ি আসা-যাওয়া’র পথে, তার সাথে, হতো দেখা ৷ কোনো-দিন ছেলে-টি নিজ হতে, এক-টি কথাও বলে-নি ৷ তার অতি-শৈশব, শৈশব, বয়ঃসন্ধি-কাল পুরো -সময় ধরে ৷
তিন-চার বছর বলতে গেলে- চোখে’ই পরে-নি, ছেলে-টি ঐ পথে ৷ যে পথে- তার সাথে, দেখা হতো ৷ যেহেতু উচ্চ-বিদ্যালয়-কে কেন্দ্র করে- বন্ধু-দের সংস্পর্শ তাকে ততো-দিনে, অন্য এক বিভোরতায়- পৌঁছে দিয়েছিলো হয়-তো ৷ বয়সে’র পরিপাকে নানান- আশা, স্বপ্ন, স্ফূর্তি দানা বেধে উঠছিলো- হয়-তো তখন ৷ পূরণ অপূরণে’র অবস্থানিক গোলক-ধাঁধা’র খপ্পরও-তো জীবনে’র সাথে সাথে- হাঁটছিলো ৷ বিবেক, অ-বিবেকে’র গ্যাঁড়াকলে’র হাতছানি-তো রয়েছে’ই ৷ যে বয়সে- উচিত, অনুচিত বিষয়-ভাবনা থাকে, অ-পরিপক্ব ৷ হ্যাঁ- সে সময়ে’র কথা’ই বলছি ৷
পথ বদলে গেলেও হঠাৎ কখনো কখনো- চার-ছয় মাসে’র ব্যবধানে, বাজারে আসা-যাওয়া’র পথে- দেখা মিলতো ৷ গ্রামীণ পরিবেশ ৷ হালকা ইমেজ ৷ শান্ত দিক্চক্র ৷ কিন্তু- আমার দিক থেকে, তার- একান্ত ছোটো-বেলাকার সেই এক-তরফা বাক্য-বিনোদনে’র কর্ম-টি আর- হতো-না ৷ কারণে বলতে হয়- বায়সিক আচরণ-বিধি’র ব্যাপার ৷ সেও নিরিবিলি পাশ কেটে চলে, যেতো- বাড়ি হলে বাড়ি, বাজার হলে বাজার ৷
এক-দিন পড়ন্ত বিকেলে- বাজারে’র দিকে, হাঁটছি ৷ জায়েদ বাজার হতে ফিরছে, বাড়ি’র উদ্দেশ্য ৷ হঠাৎ বলা নেই, কয়া নেই থমথমে যোগাযোগে’র ভেতর- শান্ত, ভদ্রোচিত কন্ঠে সে- সালাম দিয়ে বসে ৷ সাথে বাড়তি জিজ্ঞেস করে- কাকা ভালো আছেন ?
হতভম্ব হই-নি ৷ আশ্চর্য হই-নি যদিও এই আকষ্বিকতা’র হাপরে ৷ বেলা যেতে যেতে, যেমন- সূর্য নীল-শান্ত হয়ে উঠে, প্রখরতা ঝেড়ে ৷ মানুষে’র ধীর-স্থির-ভদ্র-তাও সময়ে’র কার্নিস ধরে- সজ্জন হয়ে উঠে ৷ কিন্তু- এক-টা ঝাকুনী-তো দিয়েছে, তার- পরিবেশ-বান্ধব নিয়ামক হয়ে ওঠা’র প্রয়াস ৷
বিকেলে’র শ্রাদ্ধ ভ্রমণ সেরে- বাড়ি ফিরেছি ৷ সময়ে’র পর সময় তার- রূপ বদলে, রাতে’র নিরবতা ছেড়ে, রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে’র আলোকিত প্রহর আমাকে শুনিয়েছে- পৃথিবী’র সবচেয়ে অদ্ভুত, অ-বিবেচিত খবর-টি ৷ সম্ভবতঃ আমার মা’- এর কাছ থেকে শোনা- জায়েদ’- এর মৃত্যু তথা- আত্ম-হননে’র সংবাদ-টি ৷ কারণে- জায়েদ’- এর বাবা-মা তার স্বপ্ন পূরণে’র ব্যর্থ ৷
জায়েদ-রা তিন-ভাই, এক-বোন ৷ সে ক্রমে- সবার ছোটো ৷ অলরেডি সবার বড়ো ভাই’- এর মোটর-সাইকেল ছিলো- এক-টা ৷ তার জন্যে তা-তে নিবেশে’র বাধা- থাকা’র কথা নয় ৷ কিন্তু- নিজস্ব মোটর সাইকেল চাই তার ৷ সেই বায়না অ-পূরণে, সে- মৃত্যু’র মতো দানবে’র সাথে- হ্যান্ডসেক করেছে, মাত্র- পনেরো বছর বয়সে ৷
জায়েদ’- এর পিতা-মাতা নাকি তাকে আশ্বাস দিয়েছিলো- সে যখন- কলেজে পড়বে, তখন- তারা তার স্বপ্ন-পূরণে সহায়ক হবে ৷ সে সময় তাদের নিউ মডেলে’র জায়েদ’- এর সেই কাঙ্খিত মোটর-সাইকেল-টি কিনে দেওয়া’র সামর্থ্য ছিলো-না, জানা মতে ৷ কিন্তু- জায়েদ তার মন-কে শান্ত রাখতে, ব্যর্থ হওয়া’র ফল-স্বরূপ এক-টা অ-কাল মূত্যু’র ইতিহাস গড়ে, চলে গেলো- না ফেরা’র অনন্ত, অপার বসবাসে ৷ এক রাগে’র বশবর্তী তাকে রেল-গাড়ি’র জবদস্ত ওজনে’র লোহা’র কঠিন- কর্তনে’র নিচে পরতে, বাধ্য করেছিলো ৷
জায়েদ’- এর মৃত্যু পূর্ববর্তী আগে’র দিনে’র ঐ আচানক আমার সাথে- কথা বলে ওঠা-টা এক মর্ম-পীড়িত রহস্য হয়ে, ধরা দেয়- আমার ভেতরে’র আরবানে ৷ কারণে, অ-কারণে মনে’র আসবাব হয়ে উঠে, হরহামেশা’ই ৷ এক-টা পর্ব পর্ব- চলতি মায়া হয়ে দৌড়ায়- সময়ে’র বাগডোরে ৷ মাঝে মাঝে হৃদয়ে’র অন্দর-টা চির চির করে উঠে, এই ভাবনায় যে- কোনো দৈব সঙ্গত-কারণে যদি- তার সাথে- আমার এক-টা লম্বা কথা’র যোগাড় হতো ৷ আলোচনায় আলোচনায়- তার ভেতরে’র যতো- মন-বৈকল্যে’র আঁধার জমা ছিলো ৷ সে-গুলো বেরিয়ে আসতো- বাইরে’র হাওয়ায় ৷ এক-টা সুযোগ হয়-তো মিলতো- তাকে যু্ক্তি, প্রমাণে, দর্শনে, সময়ে’র সাবধানতায়- জীবনে’র হাসি-কান্না’র পর্ব-গুলো ভাগ ভাগ করে, যদি- তার সামনে রাখা যেতো ৷ সে হয়-তো বোধে’ই নিতো যে- সব-কিছু’র এক-টা প্রয়োজন থাকে সরবার, সারাবার ৷ বুঝে’ই যেতো স্বপ্ন-পূরণে’র অনেক-গুলো দিন থাকে, অনেক-গুলো রাত থাকে ৷