সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মৌসুমী নন্দী (যাপন চিত্র)

ফলহারিণী কালী পুজো
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ষোড়শী পূজো বিগ্রহে, শঙ্খে, যন্ত্রে করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে
শ্রী শ্রী মা’কে ষোড়শী রূপে পূজো করলেন তার একটি বিশেষ কারণ ছিল ৷
দিনটা ছিল ১৪৫ বছর আগে এক ১৩ জ্যৈষ্ঠ, অমাবস্যা …
‘ফলহারিনি’ কালীপূজার রাত।দক্ষিণেশ্বরে স্বগৃহে শ্রী রামকৃষ্ণদেব নিজ অর্ধাঙ্গিনী সারদা দেবীকে বসিয়েছেন পূজার বেদীতে।
‘কালীর ব্যাটা ‘রামকৃষ্ণ পরমহংস সেদিন ধর্মপত্নীকে পূজা করলেন কালী হিসেবে নয় ,আদি শক্তির সুন্দরতম রুপ ‘ললিতা ত্রিপুরসুন্দরী ‘ বা ষোড়শী দেবী রুপে। প্রার্থনামন্ত্র উচ্চারণ করলেন ” হে সর্বশক্তির অধীশ্বরী মাত ত্রিপুরসুন্দরী, সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর,ইহার শরীর মনকে পবিত্র করিয়া ইহাতে আবির্ভূত হইয়া সর্বকল্যান সাধন কর।“
পরে তিনি মাতাঠাকুরানির অঙ্গে মন্ত্রসকলের যথাবিধি বিন্যাস করে সাক্ষাত দেবীজ্ঞানে তাকে ষোড়শোপচারে পূজা করলেন। পুজান্তে ভোগ নিবেদিত হল। অবশেষে পুজক নিবেদিত মিস্টান্নাদির কিয়দংশ স্বহস্তে তুলে নিয়ে দেবীর শ্রীমুখে প্রদান করলেন। দেখতে দেখতে বাহ্যজ্ঞ্যানশূন্যা শ্রীমা সমাধিস্থা হলেন;ঠাকুরও অর্ধ বাহ্যদশায় মন্ত্রোচ্চারন করতে করতে সমাধিরাজ্যে চলে গেলেন।
অনন্তর আপনার সহিত নিজ সাধনার ফল এবং জপের মালা প্রভৃতি সর্বস্ব দেবীর চরনে চিরকালের জন্যে বিসর্জন দিয়ে মন্ত্রোচ্চারন করতে লাগলেন” হে সর্বমঙ্গলের মঙ্গল স্বরূপে,হে সর্ব কর্ম নিস্পন্নকারীনী,হে শরনদায়িনি,ত্রিনয়নী,শিবগেহিনি গৌরী,হে নারায়ণী,তোমাকে প্রনাম করি”।পুজা সমাপ্ত হোলো- “মূর্তিমতী বিদ্যারুপিনি মানবীর দেহাবলম্বনে ঈশ্বরীর উপাসনাপুরবক ঠাকুরের সাধনার পরিসমাপ্তি হল।“
শ্রী রামকৃষ্ণের সেই পূজার দেবী -ই ভাবীকালে বিশ্বব্যাপী রামকৃষ্ণ ভাব আন্দোলনের ভিত্তি—- বেলুড় মঠের সংঘ জননী রুপে শ্রী মা সারদা দেবী।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তো ষোড়শী পূজো বিগ্রহে, শঙ্খে, যন্ত্রে করতে পারতেন। কিন্তু তিনি কেন শ্রী শ্রী মাকে ষোড়শী রূপে পূজো করলেন ?
এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা ঠাকুর,মা, স্বামীজির তিনটি কথা উল্লেখ করতে পারি। ঠাকুর মায়ের সম্পর্কে বলেছিলেন, “ও সারদা, সরস্বতী, এবার ঞ্জান দিতে এসেছে।রূপ থাকলে অশুদ্ধ চোখে দেখে, পাছে লোকের অকল্যাণ হয়, তাই এবার রূপ ঢেকে এসেছে।…”স্বামীজি মাকে “জ্যান্ত দূর্গা” বলে সম্বোধন করেছেন। আবার মা স্বয়ং নিজের সম্পর্কে শিবুদাদাকে বলেছিলেন,”লোকে বলে কালী”। কিন্তু দূর্গা, কালী এবং সরস্বতী আখ্যা মায়ের স্বরূপকে সম্পূর্ণ ভাবে ব্যাখ্যা করে না।এই দেবী সমূহ (দূর্গা,কালী, সরস্বতী) মায়ের বিভূতি বা অংশ। পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে দেবী ষোড়শীর স্বরূপের যে চিত্র পাওয়া যায়,সেই চিত্রের সাথে শ্রী মায়ের স্বরূপ যেন মিলেমিশে যাচ্ছে। সুতরাং এই কথা আমরা অকপটে স্বীকার করতে শ্রী শ্রী মা স্বরূপত হলেন ষোড়শী বা ত্রিপুরাসুন্দরী। এত শক্তি নিয়ে কোনো অবতার সঙ্গিনী(সীতা,রাধা, বিষ্ণুপ্রিয়া) এর আগে আসেনি। এজন্য শ্রীরামকৃষ্ণ হলেন সর্বযুগ অপেক্ষা সর্বশ্রেষ্ঠ যুগাবতার। ঠাকুর তাঁর সাধনা শুরু করেছিলেন মা কালীর সাধনার মধ্যে দিয়ে; আর এই সাধনা ছিল আদ্যাশক্তির একটি অংশের পূজা, এরপর বিভিন্ন সাধনায় সিদ্ধ হয়ে ঠাকুর অন্তিম পূজো করছেন ঘণিভূত আদ্যশক্তি,চিন্ময়ী বিগ্রহ শ্রী মা সারদা দেবীর উদ্দেশ্যে।পূজা সমাপনান্তে মায়ের চরণে ঠাকুর সমগ্র সাধনার ফল ও জপের মালা সমর্পণ করলেন। এই পূজার মাধ্যমে নিদ্রিতা আদ্যাশক্তি জাগ্রতা হলেন, ঠাকুরের মধ্যে মায়ের শক্তি সঞ্চারিত হতে লাগলো। ফলস্বরূপ ঠাকুরের কাছে ভক্ত সমাগম শুরু হল, কোলকাতার মানুষদের মধ্যে ঠাকুরের নাম প্রচারিত হতে শুরু করল। এই পূজোর পর রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনে এক নব অধ্যায়ের সূচনা হল।
জ্যৈষ্ঠ মাসের আমাবস্যায় হয় ‘ফলহারিনী’ কালীপুজো। এমন দিনে বিভিন্ন অশান্তি, মহামারী, বাধা, বিঘ্ন থেকে মুক্তি লাভ করতে, কথিত আছে, ফলহারিনী অমাবস্যার দিন মা কালীকে অর্পণ করতে হয় যে কোনও ফল। শাস্ত্রজ্ঞদের মতে মাকে তুষ্ট করতে ফল দিয়েই তাঁর পুজো করতে হবে এই ফলহারিণী আমাবস্যায়। সাধক তাঁর ইষ্টদেবীকে বিভিন্ন ফল দিয়ে ভোগ নিবেদন করে থাকেন।
মূলতঃ আম, জাম, কাঁঠাল ইত্যাদি গাছের ফল নয়, এই দিন মায়ের চরণে সাধকেরা তার কর্মফল অর্পন করে থাকেন — মোক্ষফল প্রাপ্তির জন্য। কারণ এই মানব জীবন পাপ ও পূন্য এই দুই নিয়েই আমাদের জীবন, দুই নিয়েই কর্মফল। যেটা বেড়ে যায় মানব জাতি তখন সেই দিকেই আকৃষ্ট হয়ে যায়৷ তাই এই দিনেই মায়ের চরনে পাপ-পূন্যের ফল অর্থাৎ কর্মফল অর্পণ করতে হয় মোক্ষফল লাভের আশায় শাস্ত্রে বলা হয় — জীবনই সর্বস্ব। অর্থাৎ একদিকে ফলহারিণী যা সাধকের কর্মফল হরণ করেন। অপর দিকে কর্মফল হরণ করে সাধককে তাঁর অভীষ্টফল, মোক্ষফল প্রদান করেন।
বাঙালি জীবনে ফলহারিণী কালী পুজোর তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এই দিনেই তাঁর স্ত্রী সারদা দেবীকে পুজো করেছিলেন জগৎ কল্যাণের জন্য। ১২৮০ বঙ্গাব্দে জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে তিনি দক্ষিণেশ্বরে আদ্যাশক্তি সগুণরূপের পুজো করেছিলেন। তিনি ফলহারিণী কালী পুজোর দিন শ্রীমা সারদাকে “ষোড়শীরূপে” পুজো করেছিলেন বলে আজও রামকৃষ্ণমঠ ও আশ্রমে এই পুজো ‘ষোড়শী’ পুজো নামে পরিচিত। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর মোক্ষপ্রাপ্তির জন্য এই নিয়মে পুজো করলেও, আগেই বলেছি, এই দিনটিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ নানাবিধ ফল দিয়ে কালীর পুজো করে থাকেন।
এমনিতেই প্রতি মাসে কালীর পুজোয় সকলের সার্বিক কল্যাণ হয়। আর ফলহারিণী কালীপুজো করলে আমাদের প্রত্যেকের বিদ্যা, কর্ম ও অর্থভাগ্যের উন্নতি ঘটে। প্রেম-প্রণয়ে বাধা দূর হয়, দাম্পত্য সাংসারিক জীবনেও সুখশান্তি লাভ হয় ও সাধকের জীবনে মোক্ষফল প্রাপ্তি হয়।
অনেকে বলে থাকেন, এই অমাবস্যা যোগ চলাকালীন কোনো কালীমন্দিরে বা স্রোতস্বিনী নদীতে নিজের প্রিয় ফল বিজোড় সংখ্যায়(১,৩,৫,৭,৯) নিয়ে সঙ্কল্প বাক্য পাঠ করে দান করলে মা তা গ্ৰহন করে ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন, সর্ব বাধা নাশ বা সর্ব কামনা পূর্ণ করা সম্ভব হয় ৷
ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব ফলহারিনী অমাবস্যায় সারদা মাকে ষোড়শী রূপে পূজা করেছিলেন।কিন্তু না তিনি মায়ের কাছে কোনো ক্ষুদ্র চাওয়া নিয়ে পূজা করেন নি।তার চাওয়া ছিলো অনেক বড়ো। সবাই অবাক হবেন জেনে কি তাঁর চাওয়া ছিলো আর তিনি কি জন্য ই পূজা করেছিলেন।কি ছিলো তার এত বড়ো চাওয়া?
কর্মফল ভোগ শেষ না হলে মানুষের মোক্ষ প্রাপ্তি হয় না।যা করেছি বা করছি আগে ভুগতেই হবে তারপর মুক্তি।তা কত জন্মে হবে কোনো ঠিক নেই।রামকৃষ্ণ দেব একথা জানতেন।তাই মোক্ষ প্রাপ্তির জন্য তিনি এইদিন এই রূপে মায়ের পূজা করেন যেন মা সমস্ত কর্মফল তার হরন করেন এবং রামকৃষ্ণ দেব ফিরতে পারেন পরমধাম।যা আত্মার নিজের ঘর।
বুদ্ধিমান মানুষ ভগবান কে ছেড়ে কেউ জড়জগৎ এর যন্ত্রনা সহ্য করতে চান না।আর তিনি তো ছিলেন পরম সাধক।
আজ কজন মোক্ষ প্রাপ্তির জন্য মায়ের পূজা করবে জানি না।কারন জাগতিক চাওয়া পাওয়ার মোহে মানুষ আচ্ছন্ন হয়ে প্রকৃত সুখ কোথায় তা জানার চেষ্টাও করে না আর অন্য কেউ বোঝাতে চাইলে উপহাস করে।
মাও মনে মনে হাসবে আমার সন্তানেরা শুধু চাইতে আসে।দিলে মাকালি ভালো।একটু দেরীতে দিলে বলবে আমার মনোষ্কামনা পূরন হয় নি আমি আর পূজা দেবো না মা আমার কথা শোনে না ৷
গতকাল মানে ২৯ শে মে ছিল ফলহারিণী অমাবস্যা ৷ পাশের বাড়ীতে পূজো হল ৷দেখলাম ওই বাড়ী মেয়ে ও মায়ের উপর ভর এলো ৷ ভরের ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না ৷ কিন্তু টিভিতেও দেখলাম দক্ষিণেশ্বরে , তারাপীঠেও এই পূজো হচ্ছে জাঁকজমকে ৷ ফলহারিণী পূজো করলে সকলে বলে আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটে , মনোস্কামনা পূর্ণ হয় ৷ আজকাল ব্যবস্তার কারণে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সনাতনী কথা ৷ তাই গুগুল থেকে তথ্য নিয়ে একটু লেখার চেষ্টা করলাম ৷ ফলহারিণী কালী পুজো করলে মনস্কাম পূর্ণ হয় কি না হয় সেই বিষয়ে যাবো না কারণ আমি মনে করি বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর ..৷ সকলে ভালো থাকবেন ৷