সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মৌসুমী নন্দী (যাপন চিত্র)

কেন ?

সাহেব বারান্দায় বসে বিকালের সূর্য ডোবা দেখতে চা খাচ্ছিল ভ্যাইজাক শহরের একটা হোটেলে পাঁচতলার ব্যালকনীতে বসে ৷ দূর থেকে সমুদ্রে মিশে যাওয়া সূর্যটাকে দেখে কেমন যেন মনটা আকুলিবিকুলি করছিল ,মাঝে মাঝে ঝড়ো হাওয়া আর যেন সেই কষ্টটা উসকে দিচ্ছিল ৷ একদৃষ্টে দূরের ওই সূর্যটার ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়াটাকে অনুভব করছিল ৷হঠাৎ মনে হলো এখন যদি আমার পাশে এষা থাকতো তাহলে হয়তো আমাদের ফ্রেম টা সম্পূর্ণ হতো ৷ এষা পুরো নাম এষণা ৷ কলেজে সবাই এষা করে ডাকতো ৷ কলেজে ঢুকেই প্রথম দেখাতেই এষার প্রতি কেমন একটা ভালোলাগা তৈরী হয়েছিল ৷ দেখতে ডানকাটা পরী না হলেও চেহারকটার মধ্যে কেমন মায়ামাখানো ব্যক্তিত্ব ছিল ৷ আস্তে আস্তে কথা বলতো কিন্তু যথেষ্ট সপ্রতিভ ৷ এ হেন এষা সকলের প্রিয় হলেও সাহেবের সাথেই এষার বন্ডিং তৈরী হয়েছিল ৷ পাঁচ বছর চুটিয়ে প্রেম করার পর এষা চাকরী পেল একটা মাল্টি নাশান্যাল কোম্পানীতে ৷ কলেজ বলতে ইনজিনিয়ারিং কলেজ ৷ সাহেব তখনও ভালো কিছু পায় নি দেখে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল ৷অবশেষে খবর হলো সাহেব একটা আইটিসেক্টররে চাকরী পেয়েছে ৷ খুব খুশী দুজনে ৷এষা পেয়েছিলো ভাইজ্যাকে আর সাহেব বাঙ্গালোরে ৷ কিন্তু তাতেও অসুবিধা ছিল না যার যার ছুটি মত দুজনে দেখা করতো ৷কখনো এষা যেতো সাহেবের কাছে কখনো সাহেব আসতো এষার কাছে ৷ এরকম করে দুবছর চলার পরে সাহবেবের কোম্পানী সাহেবকে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ছিলো ৷ সাহেব বলো এষা চলো এবার আমরা বিয়ে করি আর তুমিও চলো আমার সাথে ৷ এষা বললো ঠিক আছে ৷ দুজনে মিলে একসাথে বিয়ের কেনাকাটা করলো দিনক্ষণ ও ঠিক হলো ৷ এষার বাড়ীতে এষার মা ছাড়া আর কেউ নেই আর সাহেবের বাড়ীতেও সাহেবের দিদি জামাইবাবু ছাড়া আর কেউ ছিল না ,মা বাবা আগেই মারা গেছেন ৷ দিদি জামাইবাবুর কাছেই মানুষ সাহেব ৷ সবাই মিলে ঠিক করলো বাইরের লোকজন না ডেকে পরিবারের লোকজন নিয়েই মন্দিরেই বিয়েটা হবে ৷ সেই মত বিয়ের দিন সকালে ভ্যাইজাকের বেঙ্কটেশ মন্দিরে সময়ের একটু আগেই পৌঁছে গেছে সাহেবের পরিবার ৷ বিয়ের আয়োজনে শেষ মিনিট প্রস্তুতি দেখে নিল সাহেব ৷ এবার ঘড়ি দেখছে ঘন ঘন ৷ এতক্ষণে তো এষা আর ওর মায়ের এসে যাবার কথা ৷ দিদিকে বলে সাহেব এগিয়ে গেল গেটের দিকে অধীর হয়ে ৷ সময় পার হয়ে এক ঘন্টা হয়ে গেলো ,দু ঘন্টা হয়ে গেলো এষার দেখা নেই ৷ মোবাইলে ফোন করলে বলছে মোবাইল সুইচড অফ ৷ গাড়ী নিয়ে দৌড়ে গেল এষার অফিসে সেখানে গিয়ে শুনলো এষা তো গতকালই চাকরী ছেড়ে দিয়েছে ৷এবার গেলো এষা যেখানে থাকতো মাকে নিয়ে ৷ সেখানে গিয়েও দেখে বড়ো তালা দেওয়া ৷আশেপাশে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো ওরা বিক্রি করে দিয়েছে ৷ সাহেব বুঝতেই পারছে না কি এমন হলো এষা এইভাবে পালিয়ে গেলো তার ভালোবাসাকে মিথ্যা করে ৷ মনের মধ্যে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছিল ৷ একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কেন কেন কেন !
তারপরে প্রায় ১৫বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে সাহেব এখনো একই প্রশ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় মনের মধ্যে ৷ কি এমন হলো এষার যে এভাবে পালিয়ে যেতে হলো ! এরমধ্যে বিদেশ থেকে আবার ফিরে এসেছে ব্যাঙ্গালোরে সাহেব ৷ অনেক খুঁজেছে এষাকে কোথাও পায় নি ৷কোনো খবর পর্যন্ত না ৷ মাঝে এখনো সাহেব আসে ভ্যাইজাকে ৷ ঘুরে আসে সেইসব জায়গা যেখানে ও আর এষা সময় কাটাতো ৷ বয়স প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই ৷ চুলের মধ্যে সাদা পাক এসেছে ৷ কিন্তু চেহেরায় জৌলুস একটুও কমে নি ৷ এখনো কলিগ থেকে দিদি জামাইবাবু বলে সাহেব বিয়ে করবার জন্য ৷ দেশে বিদেশে অনেক মেয়েরাও অফার দিয়ে সাহেবকে ৷সাহেবের মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘোরে কেন ! আর এষার মুখটা ভেসে ওঠে ৷ হঠাৎ মোবাইলের রিং এ সাহেবের সম্বিত ফিরে এলো ৷ স্ক্রীণে অজানা একটা নম্বর ভাসছে ৷ ধরবো না ধরবো করেও ধরলো হ্যালো – এই সায়েব কেমন আছো ?? গলা শুনেই সাহেব চমকে উঠলো ্মনে হচ্চে হৃদপিন্ডটা এক্কেবারে গলার কাছে উঠে এসেছে ৷ কার গলা শুনছে এষা না ! ও কিছু বলার আগেই ওপ্রান্ত থেকে এষা বলে উঠলো শোনো কাল বেঙ্কটেশের মন্দিরে আসবে ঠিক দশটায় কাল তোমার আমার বিয়ে ৷ আবার বিয়ে ?? এই বিয়ে থেকেই তো তুমি পালিয়ে গেছিলে ? সাহেব বললো আরো বললো তুমি কি করে ভাবলে আমি এতদিন বিয়ে করিনি বা আমার কোনো সংসার নেই ! এছাড়া আমি কোথায় আছি তা জেনেই কেন তুমি আমায় টাইম দিয়ে বলছো যেতে? এটা কি ছেলেখেলা এর আগেরবার বিয়ের দিন আমার ফেসলস করে তুমি গায়েব হয়ে গিয়েছিলে ৷ আগে বল কেন আমার সাথে এমন করেছিলে ?? এষা হেসে উঠলো আর বললো আমি জানি তুমি এখন ভাইজ্যাকেই আছো , আর এখনো তুমি আমায় খুব ভালোবাসো আর আমার ওভার কনফিডেন্স আছে কাল তুমি আসবে এবং আমায় বিয়েও করবে ৷ আর যদি জানতে চাও সেদিন কি হয়েছিল তো তোমায় আসতেই হবে নইলে তুমি কোনোদিনও জানতে পারবে কেন আমি চলে গেছিলাম ৷ যাক রাখছি কৌতূহল আর ভালোবাসা থাকলে এসো নইলে এসো না তবে আমি জানি তুমি আসবেই আর তারজন্যই তো তুমি তোমার ফোন নম্বরটা এখনো পাল্টাও নি এবং এখনো প্রতিমাসে একবার ভ্যাইজাকে আসো ৷ ওকে রাখি কাল কথা হবে বলে ফোন টা কেটে দিল ৷
সাহেব রিং ব্যাক করলো কিন্তু মোবাইল সুইচড অফ বললো ৷ মনের ভিতরে ঝড় চলছে কিছুই বুঝতে পারছে না সাহেব খুশী হবে না আবারো হাসির পাত্র হবে ! এতদিন পরে আবার কেন ?? অনেক ভেবে দিদি জামাইবাবু কে ফোন করলো সাহেব ৷ সব বললো ৷ সব শুনে জিজু বললেন তোমাকেই ঠিক করতে হবে ৷যাবে কি যাবে না ! যদি জানতে চাও তাহলে যাও কেন সেদিন চলে গেছিলো আর এতদিন ধরে তো ওর অপেক্ষাতেই জীবন কাটাচ্ছিলে ,এর থেকে বেশী কিছু বলবো না তোমায় বাকীটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে ৷
অনেক ভেবে সাহেব দশটার সময় বেঙ্কটেশের মন্দিরে গেলো ৷ মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দেখে দিদি জিজু আর এষা দাঁড়িয়ে আছে এষার হাতে বরমালা ৷দিদি জামাইবাবুকে দেখে চমকে উঠল সাহেব ৷ তোমরা এখানে ?? দিদি হাসতে হাসতে বললো জানতাম তো তুই আসবি তাই বরপক্ষ হিসাবে আগে থেকেই হাজির আর এষার মা এখন আর বেঁচে নেই তাই কনেপক্ষও এখন আমরা ৷ সাহেব বললো এখন আগে বলো কেন চলে গিয়েছিলে আগে ! এষা বললো আগে বিয়ে করো বিয়ের পরে সব বলবো আর যদি জানতে না চাও তাহলে করো না ৷ সাহেব এষার বিয়েটা হয়ে গেলো ৷ এবার সাহেব বললো এবার তো বলো ৷ এষা বললো বিয়ের আগের রাতে হাতে রির্পোট গুলো পৌঁছেছিল আমার ক্যানসার হয়েছে আর আমি নাকি মাত্র একবছরের মেহমান ৷ দিদি জামাইবাবু সব জানেন ৷ আমি ওদের সঙ্গে সবসময়ই যোগাযোগ রেখেছি আর আমিই ওদের তোমাকে জানাতে না করেছিলাম কারণ আমি জানতাম এটা শুনলে তুমি আমায় কখনোই ছেড়ে যেতে না ৷ ভেবেছিলাম একটা ধোঁকাবাজের ভূমিকা পালন করলে যদি আমায় ঘৃণা করে নতুন কোনো সম্পর্ক তৈরী করে বিয়ে করে সুখী হও কিন্তু আমার মৃত্যু টা তুমি মেনে নিতে পারতে না সেই মুহূর্তে তোমার ক্যারিয়ারের খুব পিক টাইম ছিল তাই কোনো কিছু না ভেবে বুকের উপর পাথর রেখে ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ৷ কিন্তু এতবছরেও তুমি একটুও বদলাও নি ৷ আমিও এখনকার চাকরী ছেড়ে মুম্বাইয়ে গিয়ে আই সেক্টরে কাজ নি ৷ আর সেই সাথে টাটা মেমোরিয়ালে লাগাতার চিকিৎসা করাই ৷ আজ আমি অনেকটা সুস্হ ৷ আর তুমি এতকিছুর পরেও যখন বিয়ে করনি তখন দিদি জামাইবাবু আমাকে বললো তোর মাও এখন বেঁচে নেই ,সাহেবও তোর স্মৃতি আকড়ে বসে আছে তাই আর কি দরকার লুকোচুরির ! সাহেব চুপ করে এগিয়ে এসে সকলের সামনে এষাকে জড়িয়ে ধরলো ৷ বললো এরপরে আর নিজে থেকে কিছু ভেবো না তোমার সব ভাবনা আমার ৷ যদি আগে জানাতে তাহলে আমাদের এতগুলো বছর নষ্ট হতো না ৷ এষা সাহেবের বুকে মাথা গুঁজে দিলো ৷

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।