গল্পেরা জোনাকি -তে মৌসুমি মন্ডল দেবনাথ
রুরু
অনেকদিন পরে এলাম আমাদের স্কুলবাড়িতে। বড় দীঘির পাড়ের মার্কেটে টুকটাক শপিং করতে যাচ্ছিলাম। আমাদের বাড়ি থেকে বড় দীঘি খুব একটা দূর নয়। এখন আর অস্ট্রিওপোরেসিসের জন্যে খুব একটা হাঁটতে পারিনা। একটা টোটো রিকশা ধরলে মন্দ হতো না। তবু ইচ্ছে হল পুরোনো রাস্তায় একটু হাঁটি। হঠাৎই একটা ব্ল্যাক ওয়াগনার গাড়ি এসে পাশে দাঁড়ালো, ভিতর থেকে কে একজন ভদ্রলোক বলে উঠলেন,”ম্যাডাম দীঘির পাড়ে যাচ্ছেন তো? চলুন উঠে পড়ুন। আমি ওদিকেই যাচ্ছি। আপনাকে নামিয়ে দেবো…”
আমি একটু ইতস্ততঃ করে উঠেই পড়লাম। অপরিচিত মানুষের কাছে লিফট নিচ্ছি, কিছু হবে না তো! ভাবনাটাকে আর বিস্তৃতি না দিয়ে নিজেই নিজেকে বোঝ দিলাম, কীইবা আর হবে এই দশ মিনিট দূরত্বের রাস্তায়! এইসব সাতপাঁচ ভাবছি। এমন সময় ভদ্রলোক আামার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কি… লেখালেখি কেমন চলছে? প্লাস্টিকের ফুল গল্পটার শেষটা তো আর লিখলেন না? আপনার কবিতা পড়ি কিন্তু ফেসবুকে…”
ডার্ক গ্রীন এভিয়েটরের সোনালী ফ্রেমে শেষ বিকেলের আলো এসে চিকচিক করে উঠলো। মাঝবয়েসী ভদ্রলোকটির রাশভারী চমৎকার হাসিটার সঙ্গে মোলায়েম সোনালী রোদ্দুর মিশে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়লো কৃত্তিবাস স্যারের সেই আপ্তবাক্যটি, “চকচক করিলেই সকল কিছু সোনা হয় না।”
“কি ম্যাডাম, কী ভাবছেন? … চকচক করিলেই সকল জিনিস সোনা হয় না।”
আমি চমকে উঠলাম। আরে! লোকটা কী থটরিডিং জানে নাকি!
আর এই হাসিটা… কোথায় কবে যেন কেউ এমনি এক ভঙ্গিতে হাসতো … কিছুতেই মনে পড়ছে না। ইনি কি তবে আমাকে চেনেন?
রোদ চশমার আড়ালে ওই ফ্রেঞ্চ কাট কাঁচা পাকা দাড়িওয়ালা মুখটাকে চেনার অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না।
স্কুলিং কম্প্লিট হওয়ার পরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চলে গেছিলাম। প্রথম প্রথম কলকাতায় দম বন্ধ হয়ে আসতো… হোস্টেলও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই। ছোট্ট শহরটা থেকে ওখানে গিয়ে তাল মেলাতে অনেকটাই সময় লেগে গিয়েছিল আমার। কেউ এগিয়ে এসে বন্ধুত্ব করতে এলেই কেমন একটা গুটিয়ে যেতাম যেন। তারপরে আস্তে আস্তে বন্ধু হল। স্টুডেন্টস ইউনিয়ন রুমে পোস্টার লেখার হাত পোক্ত হল। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়লাম। আমিও ভাবতে লাগলাম এই যাদবপুর এইট বি চিকেন রোল, বেঙ্গল ল্যাম্পের লেবু চায়ের আড্ডার ঠেক, মিলনদার ক্যান্টিনের ঝাল ঝাল ঘুগনি পাউরুটি … তুমুল আড্ডা… উফফ্! এসব না থাকলে কী জীবনটা জীবন হতো! এসব হলেও ডিপার্টমেন্টে রোজই যেতাম। শিবাজীদার ক্লাস, নবনীতাদি, কবিতাদি, শোভাদি, অভীকদার ক্লাসগুলো না করলে হয়তো আমার কোনও ব্যক্তিত্বই তৈরী হতো না আজ। ক্যাম্পাসের ঝিলের হাওয়ায় হাওয়ায় আমি যে কবে মানিয়ে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতারই একজন হয়ে গেলাম মালুম হলো না। আর এখন তো ঘরগেহস্থালীই কলকাতায়… অনেকদিন পর পর আসি নিজের এই জন্ম শহরে ফিরে। অনেককিছুই আর চিনতে পারিনা। পরিচিত মানুষের মুখগুলো এখন ঝাপসা হয়ে গেছে। চিনতে পারিনা কাউকেই … তারাও হয়তোবা চেনেন না আর সেই গান করতে ভালোবাসা পাখি মেয়েটাকে।
সেরকমই হয়তো ইনিও, হয়তো না…
গাড়িটা যেন স্লো মোশনে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিলো। সিডিতে লিওনার্দ কোহেনের ইংলিশ গানের একটি ব্রেন ঠান্ডা করা গান চলছে গমগম করা ভয়েসে।
“I’m ready,
my lord…
There’s a lover in the story
But the story’s still the same
There’s a lullaby for suffering
And a paradox to blame
But it’s written in the scriptures
And it’s not some idle claim
You want it darker
We kill the flame…”
“একটু পরেই তো নেমে যাবেন… এখনই কী কুয়াশা জাঁকিয়ে পড়েছে দেখুন। এক মগ ব্ল্যাক কফি হবে নাকি! ”
আমি আড়ষ্ট হয়ে পড়লাম। “না না… এই তো সামনেই নেমে পড়বো। এখন আর কফি কেন। তাছাড়া আমি চা খেয়েই বেড়িয়েছি বুঝলেন।”
“হুম! আদ্যোপান্ত কলকাতার মানুষ হয়ে গেছেন দেখছি। ”
আমি জোর করে একটু হাসলাম।
সেই ভদ্রলোকটিও মুচকি মুচকি হাসছেন। ঘ্যাঁচ করে গাড়িটা রাস্তার ধারে দাঁড় করালেন। বললেন, “আরে আমি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নই,যে হালুম করে খেতে আসবো আপনাকে। আজ সারাটা দিন তিনটে সাইট ভিজিট করতে হয়েছে। আমার ওই একটি দোষ। কফি বা চা একা খেতে একদমই ভাল লাগেনা। এক কাপ খেয়েই দেখুন। খুব একটা খারাপ বানাই না। পিছনের সীট থেকে ঝুঁকে একটি পেল্লাই সাইজের ব্যাগ থেকে ফ্লাস্ক, দুটো দারুণ সুন্দর কফি মগ আর কফির কৌটো, সুগার কিউব বের করে আনলেন। কফি বানানো শেষ হলে নিজেরটায় সুগার কিউব আর আমারটায় কিছু না দিয়ে হাতে দিলেন। ব্যাগটা যথাস্থানে রাখতে রাখতে বললেন, “সুগার ফ্রি না খাওয়াই ভাল। এখনই এত্তো সুগার ফুগার বাঁধিয়ে কী যে করেছেন! ”
আমার আবারও চমক লাগার পালা। এই লোকটা আমার এত্তো খবর জানে কী করে! আশ্চর্য তো!
থানাটা ক্রশ করার পরেই অবাক কান্ড! স্কুল যাওয়ার পথটা এখান থেকেই শুরু হয়। বড় দীঘির পাড়ে যেতে যেতে স্কুলটা পড়ে। দেখলাম নতুন বড় স্টেডিয়ামটার জায়গায় বি.বি.আই. স্কুলের সেই পুরোনো খেলার মাঠটা সবুজ হয়ে আছে। ঘাসের উপরে সাদা সাদা কুয়াশার গুঁড়োর দাগ স্পষ্ট। কারা যেন সাদা জুঁই রঙা পোশাকে ক্রিকেট খেলছে। বেশ কিছু দর্শকও আছে। কেউ কেউ ভীড় এড়াতে রাস্তার দু ‘পাশের গাছগুলোতে চড়ে খেলা দেখছে। ত্রিপুরার রাজা বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য বাহাদুর নগরগুলোকে সাজিয়েছিলেন দুষ্প্রাপ্য সব গাছ লাগিয়ে। এই রাস্তারও দুই পাড়ে আছে দুধ সাদা ইউরোপীয়ান ইউক্যালিপটাস, বিশাল বপুর বটল ব্রাশ, বৃদ্ধ ছাতিম, হলদে রাধাকিশোর, কৃষ্ণচূড়া, কুইন দেবদারু, নাগকেশরের গাছ। এরা শুধু ছায়াই দেয়না। এতো অপূর্ব ফুলে ঢেকে রাখে সারাটা রাস্তা, যে মানুষ পথের ক্লান্তি ভুলতে বাধ্য হবেই…
এবার ধর্মনগরে আসার সময়ে দেখেছিলাম রাস্তাটা বেশ বড় করা হয়েছে। রাস্তার মাঝখানে রেলিং দেয়া ডাবল ওয়ের ডিভাইডারে থরে থরে ফুটে আছে হাইব্রিড টগর, হাসনুহানা, কাগজফুল। সাঁ সাঁ করে ঝকমকে গাড়ি, টোটো রিকশা চলছে। কোথায় গেলো ওই সব! আমার বাইফোকাল চশমা বিন্দু বিন্দু অশ্রুকণায় ঝাপসা হয়ে এলো সেই হারিয়ে যাওয়া দৃশ্যগুলোকে না দেখে।
ড্রাইভারের সীটে যিনি, তিনি স্মিত মুখে হাসছিলেন কালো চশমার আড়াল থেকে। আমাকে বলে উঠলেন, আপনাকে আপনার স্কুলের সামনে নামিয়ে দিচ্ছি। বাকিটা আপনি ম্যানেজ করে নিন।
আমি বললাম, অজস্র ধন্যবাদ। কোনও টাকা দিতে হবে কিনা ভাবছি, কিন্তু ড্রাইভার ভদ্রলোক কোথায়?
ওর সীটে কে একটা বছর বারোর ছেলে বসা। আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে। বুলবুলির মতো সরু গলায় বললো, “কিরে, চিনতে পারছিস?”
আমি ভালো করে চেয়ে দেখলাম, আরে এতো আমাদের রুরু! আমাদের সঙ্গে প্রাইমারীতে পড়তো। কী আশ্চর্য! ওর পরনে সেই মর্নিং স্কুলের ইউনিফর্ম। মেরুন হাফপ্যান্ট, সাদা শার্ট। আমাকে দিব্য হেসে হেসে মজা করে বললো, কিরে মৌসুমী জলবায়ু আজও বিষ্টি ফিস্টি ঝরাবি নাকি? তোর স্কুলের লেট হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি চলে যা…”
আমার ভিতরের এক অপ্রতিরোধ্য দুর্নিবার ইচ্ছে আমাকে স্কুলগেটের দিকে নিয়ে চললো। গ্রীলের মস্ত বড়ো গেটে হালকা চাপ দিতেই খুলে গেলো। ভিতর থেকে একটা চাপা সুমধুর কোলাহল ভেসে আসছে। কী আশ্চর্য! বড়ো দিদিমনির রুম ঘেঁষে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটা কী টকটকে লাল ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে এখনও। গাছটা আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দুলে উঠলো। ওর গা জুড়ে অজস্র হাত, পা বেরিয়ে আছে। রুরু, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলে, ফুল গাছেদের অনেক হাত আর পা থাকতে হয়। সবাই একসাথে খেলবে রোদের সাথে, বৃষ্টির সাথে। একটা কুচকুচে কালো রঙের ফিঙে, আর দু ‘টো লাল গলাওয়ালা বুলবুল কী একটা গানের ফিউসন গাইতে গাইতে একটা ফুলে ঢাকা ডালে এসে বসলো। আমি হেসে ফেললাম…
হঠাৎ খাঁকি রঙের পোশাক পরা একজন পিওন অখিল মামা এসে বললো, কিগো মৌসুমী দিদি, আজকে এত্তো লেট কেন? শরীর খারাপ নাকি?
আমি ক্লাশ ইলেভেনের সেকশন A- র দিকে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলাম। আজ সাইকোলজি প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা। আমার প্রিয় সাবজেক্ট। বারান্দায় রত্না দিদিমনি দাঁড়িয়ে মায়া মায়া টোল পড়া হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে ক্লাস রুমে চলে যেতে বললেন।
ক্লাস রুমের ভিতরে শাঁওলি, কবরী, অজন্তা, মিলিরা বকবক করছে। ওরা যেন সবাই সাদা অভ্র কুচির পালকে ঢাকা পায়রা। ইচ্ছেখুশির নীলে উড়ছে উড়ছে মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। আমিও ওদেরই একজন। ছুঁড়ে ফেলে দিলাম আমার বাইফোকাল চশমা। এই তো ব্ল্যাকবোর্ডে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মিন,মিডিয়ান,মুডের ফর্মুলা। আমার পায়ের ব্যথা কোথায় চলে গেছে। স্কুল মাঠের যেখানটায় খাবার জলের কলগুলো, সেখানে দৌড়ে গিয়ে আঁজলা ভরে অনেকটা জল খেলাম। সারা শরীরের ক্লান্তি একঝলকে দূর হয়ে গেলো।
রুরু বলে, জলই আমাদের প্রাণ। জন্মের আগে আমরা নাকি মায়েদের পেটে নাভিপদ্মের সঙ্গে জুড়ে থাকি। আর সেই পেটের ভেতরটায় সমুদ্রের মতো শুধু জল আর জল। আমরা জলে সাঁতার কাটি।
“কি সাঁতার রে রুরু??”
রুরু একটু থমকালো এবার। “এই তো যা যা স্ট্রোকস তুই জানিস আর কি! হাঙ্গেরিয়ান, বাটারফ্লাই, ফ্রি স্টাইল আর আমার মতো ডুব সাঁতার। ”
রুরু আমার কাছে একটি এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো। স্কুলের সিলেবাসের বাইরে আরও যে কত কিছু সে জানে! এমনকি কবিতাও লেখে।
রুরুর ভাল নাম ইভান। ওরা রাশিয়ান। অনেক বছর আগে নাকি রুরুর ঠাকুরদার বাবা রাশিয়ায় যুদ্ধের সময়ে ভারতে চলে আসেন ফ্যামিলি নিয়ে। ওর দুজন দিদিও আছে। ওদের নামগুলোও রাশিয়ান। ভ্যালেন্তিনা আর তাইস্কা। আর রুরুর মায়ের নাম ভেরা। রুরুর বাবা ONGC তে ইঞ্জিনীয়ার। ত্রিপুরার পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ান। রুরুরা খুব ফর্সা। শীতকালে ওদের গালের রঙ লাল টুকটুকে হয়ে যেতো। ভেরা আন্টি খুব সুন্দর টিপটপ করে ঘরদোর সাজিয়ে রাখতেন। আমি সেইসব সাজানো ঘরকে অবাক চোখে দেখতাম। কী নিপুন হাতে কুরুশের ঢাকনা, জামা, সোয়েটোর বুনতেন। আমার মাকে একবার পেটিকোট আর ব্লাউজ বানিয়ে উপহার দিয়েছিলেন। পেটিকোট গুলোর নীচে রঙের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে লেস বোনা ছিল। আর ব্লাউজগুলোর হাতায়, গলায় লেসের কনট্রাস্ট কালারের ফ্রিল লাগানো। মা সেগুলো পেয়ে আনন্দে দিশাহারা হয়ে গিয়েছিল।
আমাদের দু’বাড়িতে বিশেষ বিশেষ রান্নার দেয়া নেয়াটা একটা অভ্যেসের সেতুর মতোই হয়ে গিয়েছিল।
আমরাও এটাই সত্যি ভেবে একটু একটু করে বড়ো হয়েও যাচ্ছিলাম। তখন ক্লাস টুয়েলভ। রুরু সায়েন্স নিয়ে বিবিআই স্কুলে পড়ছে। আমি আর্টস। স্কুল তখন আমাদের আলাদা। সেবছরের শীতে আমরা পাড়ার কয়েকটি পরিবার মিলে পিকনিকে গেছি হাফলং টি গার্ডেনে। খাওয়া দাওয়ার পরে একসময় রায় কাকু বললেন চলো সবাই এবার চা পাতাকে কি করে প্রসেসিং করে প্যাকেটে সিল করা হয় দেখতে যাই।
আমি, রুরু, তাইস্কা, তিতাস সবাই তখন লুডো খেলায় ব্যস্ত। তাইস্কা আর তিতাসদের সব গুটি উঠে গেছে। ওরা বললো, এই চল কাকু ডাকছেন ফ্যাক্টরি দেখতে যাওয়ার জন্যে। রুরু আমার হাত চেপে ধরলো জোরে।
“না তুই যাবি না। খেলাটা আগে শেষ হোক। ”
“ছাড় রুরু। ব্যথা লাগছে আমার। ”
তাইস্কা আর তিতাস আমাদেরকে সেই চা বাগানের মধ্যে বিকেলটুকুর কাছে একা রেখে চলে গেলো।
রুরু তাকিয়ে আছে আমার মুখের দিকে। আমার অস্বস্তি হচ্ছিলো। চাপা গলায় বললাম, “কি হচ্ছে রুরু? এমন করে কি দেখছিস? ”
“দেখছি তুই কত অন্যরকম বড়ো হয়ে গেছিস!”
“কেন? আজ নতুন দেখলি নাকি? তুইও তো …”
হঠাৎ রুরু আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আমার শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিলো।
কিন্তু রুরুতো আমাকে ছোট্ট থেকেই কত জড়িয়ে ধরেছে। কখনও তো এমন হয়নি। আমি বললাম, “রুরু ছাড়। কেউ দেখে ফেলবে। ” রুরু বললো, “দেখুক গে। ” আমার মুখটা ওর হাতের তালুতে। “মিছরি, আমি তোকে ভালবাসি। তুই বাসিস না? ভালবাসায় কোনও পাপ নেই রে। ” রুরুর ঠোঁট আমার ঠোঁটকে শুষে নিচ্ছে। আমার বন্ধ হয়ে আসা চোখের উপরে দুটো গাঢ় চুম্বন রেখে দিলো ছোট্টবেলার খেলার সাথী। আমার ছোট্ট কিশোরী বুকে মুখ গুঁজে রুরু বললো,” আমাকে ছেড়ে যাসনা কোথাও কোনওদিন। তাহলে বাঁচবো না আমি। শোন, আমি অক্সফোর্ডে পড়ার চান্স পেয়েছি রে। ফাইনালের পরে চলে যাবো। তুই আমাকে ভুলে যাবিনা তো মিছরি? ফিরে এসে বিয়ে করবো তোকে। তুই অন্য কারোর হলে আমি তোকে মেরে নিজেও মরে যাবো। মনে রাখিস। ”
আমি এতগুলো আকস্মিকতায় থরথর করে কাঁপছিলাম। ওর পাশেই অনেকক্ষণ আগে একটা শালপাতার ঠোঙা দেখেছিলাম। রুরু তার থেকে দুটো পিঙ্ক অর্কিডের বিনে সুতোর মালা বের করলো। একটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,”নে পরিয়ে দে…” আমি যেন এক সম্মোহনের মধ্যে আছি। পরিয়ে দিলাম রুরুর গলায় মালা। রুরু আমাকে আরও কাছে টেনে আনলো। আমার সদ্য ফোঁটা কিশোরী স্তন ওর গায়ে ঠেকে আছে। আমার গলায় মালা পরিয়ে দিলো রুরু। হাত ধরে আমাকে শুইয়ে দিলো আকাশের তলায় ঘাসের বিছানায়। চারদিকের ইউক্যালিপটাস গাছগুলো থেকে নেমে এসেছে, অজস্র বুনো ফুল ও অর্কিডের মালা। যেন বনদেবী সাজিয়ে দিয়েছে আমাদের বাসর। রুরুর হাত আমাকে পোশাক থেকে উন্মোচন করে দিলো। আমার সকল বাঁধা কোথাও স্রোতে ভেসেই গেলো। আমি আর রুরু কোনও এক গহীন সুখের পুকুরে যেন ডুব দিলাম। গলায় দীর্ঘ একটি চুম্বন। তারপর দুই আত্মা আবার আলাদা হলো। দু’হাতে মুখ ঢেকে বললাম, “এ তুই কী করলি রুরু! ”
রুরু বললো,”দূর বোকা! যা সব হাজবেন্ড, ওয়াইফেরা করে,তাইতো করলাম। আমরা মালাবদল করেছি মিছরি। এখন থেকে তুই তো আমার ওয়াইফ! ”
হঠাৎ কানে এলো অনেকগুলো কন্ঠস্বর। ওরা সবাই হৈ হৈ করে ফিরে আসছে।
বাইশ বছর পর আমি হেঁটে চলেছি
রিক্ত এক নগরীর রাস্তায়…
আমি হাঁটছি বড়দীঘির রাস্তা ধরে। রাস্তার ডিভাইডারের রেলিংয়ের গায়ে ফুটে আছে আধুনিক হাইব্রিড টগর, নয়নতারার ফুল। হুশ হুশ করে লেটেস্ট মডেলের গাড়ি আমার পাশ দিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে। লাল রঙের ম্যাজিক কার সার সার দাঁড়িয়ে আছে স্ট্যান্ডে। কত নতুন নতুন দোকানপাট,শপিংমল …এখানকার মানুষজনেরা চেনেনা আমাকে। আমি তাদেরকে চিনিনা। জেনারেশন গ্যাপ।
এই রাস্তাটা যেন হঠাৎই অনেকটা দীর্ঘ হয়ে গেছে। আমি আমার ব্যথাগ্রস্ত পা টেনে টেনে হেঁটে আর পথ শেষ করতে পারছিনা। এখানে এতো এতো মানুষ এলো কোথা থেকে! দীঘির সেই টলটলে স্বচ্ছ জলে অনবরত সাঁতার কাটা শুভ্র রাজহাঁসের দল আর নেই…মাঝখানে বসেছে বিশাল ডলফিন ফোয়ারা ও ডলফিনেরা ফরর ফরর করে মুখ উঁচু করে জল ছুঁড়ে দিচ্ছে আকাশের দিকে। দীঘির শূন্য বুকে চলছে লাইট এন্ড সাউন্ডের খেলা। শহরটার সবুজ ভেদ করে রাস্তায় রাস্তায় যে ব্রাউন ভেড়ার দলগুলো ঘুরে বেড়াতো, ওরাই বা কোথায় গেলো! ওই তো পূর্বাশা কো-অপারেটিভের বাড়িটা। কিন্তু সেই অজস্র ঝুরি নেমে আসা বটগাছটা কোথায় গেলো! ছোটবেলায় দেখতাম কী অদ্ভুত সুন্দর লাল লাল বটফল খেতে আসতো টিয়া পাখির ঝাঁক…কিছু কিছু ছোট ডাল থাকতো আমরা কিচিরমিচির করে সেগুলো নিতে যেতাম। কারা যেন বলতো সেগুলো ডাইনির হাত। তবুও আমাদের উৎসাহ কমতো না। আমরা সেই ছোট্ট ছোট্ট ডালগুলো দিয়ে টিফিন পিরিয়ডে একজন আরেকজনকে সুড়সুড়ি দিতাম। এই বটগাছটাকে জড়িয়ে একটা বড় মাধবীলতার গাছ ছিল। মনে হতো বটগাছেরই ফুল রুরু আমাকে গাছে চড়ে মাধবীলতা ফুল এনে দিতো। আর আমি চিৎকার দিচ্ছি, “অ্যাই রুরু, পড়ে যাবি তো। নেমে আয়। নেমে আয় বলছি। রুরু প্লিজ নেমে আয়। ”
নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠলাম, রুরু নেমে যা বলছি…